জহির রায়হান

জহির রায়হানঃ অনন্ত ফাল্গুনের পথিক

একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁদের আলাদা করে কেবল রাজনৈতিক, লেখক, সাংবাদিক বা চলচ্চিত্রকার হিসেবে সঙ্গায়িত করা যায় না। তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি জাতির কণ্ঠস্বর, সময়ের সাহসী সন্তান এবং ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কারিগর। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার লড়াইয়ে জহির রায়হান ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ।

মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের একটি ছোট জীবন পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর কলম, ক্যামেরা আর রাজনৈতিক চেতনা দিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে এমন এক গভীর ছাপ রেখে গেছেন, যা আজও আমাদের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হয়ে টিকে আছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ—বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের প্রতিটি ধাপে তিনি ছিলেন সামনের সারির একজন নির্ভীক যোদ্ধা।

বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিয়েছে; কিন্তু বাঙালির বাংলাদেশের জন্ম তার বহু আগে। সেই জন্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ভাষা আন্দোলন। আর ভাষা আন্দোলনের অর্থ কেবল বাংলা ভাষার অধিকার নয়। এর গভীরে ছিল একটি বৃহত্তর প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করবে, নাকি মানুষ নিজের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় নির্মাণ করবে?

জহির রায়হান এই প্রশ্নের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন না। ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। তাঁর কাছে ভাষা তাই কখনো নিছক সাহিত্যিক উপাদান ছিল না; ভাষা ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। পরবর্তী সাহিত্যেও ভাষা আন্দোলন তাঁর কাছে মিছিল ও পুলিশের সংঘর্ষের ইতিহাস হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে তারুণ্য, প্রেম, ভয়, বন্ধুত্ব, আত্মমর্যাদা ও প্রতিবাদের অভিজ্ঞতা। ‘আরেক ফাল্গুন’-এর মতো রচনায় এই মানবিক রূপটি বিশেষভাবে স্পষ্ট।

এখানেই জহিরের শিল্পীসত্তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাইরে রাখেননি। রাষ্ট্রের ইতিহাসকে তিনি মানুষের জীবনের ইতিহাসে অনুবাদ করেছেন।

জহির রায়হানের সাহিত্য-চলচ্চিত্রকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই নতুন করে পড়া দরকার।

‘হাজার বছর ধরে’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’—এই রচনাগুলোর বিষয় আলাদা, পরিসর আলাদা, চরিত্র আলাদা; কিন্তু তাদের গভীরে একটি প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি আছে: মানুষ কীভাবে তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে থাকে?

জহির রায়হানের চলচ্চিত্রের মধ্যেও তার এই মৌলিক বৈশিষ্ট্য খুজে পাওয়া যায়। তিনি বুঝেছিলেন, গণমানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদের পরিচিত আবেগ ও গল্পের ভাষার মধ্যেই নতুন অর্থ সৃষ্টি করতে হবে। চলচ্চিত্রকে শুধু শৈল্পিক দৃষ্টিতে নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন যাপন, বিশ্বাস, চিন্তা, রাজনীতি ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভিতরেই শিল্পের নতুন ভাষা তৈরি করা সম্ভব।

‘অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র’-এর মতো লেখায় তিনি চলচ্চিত্রের শিল্পরূপ, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক দায় নিয়ে ভেবেছেন। চলচ্চিত্র তাঁর কাছে সমাজ-বিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদনশিল্প নয়; সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, নাটক ও প্রযুক্তির সম্মিলিত আধুনিক শিল্পরূপ।

কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও মৌলিক প্রশ্ন—চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক মালিকানা কি তার নন্দনতত্ত্ব নির্ধারণ করে? যে শিল্পের অর্থ দেয় একটি শ্রেণি, সেই শিল্প কি সেই শ্রেণির মূল্যবোধের বাইরে যেতে পারে? চলচ্চিত্র কি মানুষের চেতনায় কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে?

এই প্রশ্নগুলো জহিরকে তাঁর সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র-চিন্তকে পরিণত করে।

তাঁর কাছে চলচ্চিত্র শুধু মানুষকে কী দেখাবে—এটি নয়; চলচ্চিত্র মানুষকে কীভাবে দেখতে শেখাবে—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ জহিরের চলচ্চিত্রভাষা শুধু আবেগ তৈরি করতে চায়নি; দর্শককে ইতিহাসের একজন সচেতন প্রত্যক্ষদর্শীতে পরিণত করতেও চেয়েছে।

জহির রায়হানের আসল নাম ছিল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল এক স্বাধীনচেতা স্বভাব এবং তীব্র সমাজসচেতনতা। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন এমন এক উত্তাল সময়ে, যখন ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর নেমে আসছে একের পর এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে পড়ার সময় থেকেই তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে বামপন্থী প্রগতিশীল চিন্তাধারা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের মুক্তি ছাড়া এই জাতির সত্যিকারের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

রাজনীতিকে তিনি কেবল কথার কথা হিসেবে নেননি, নিয়েছিলেন জীবনের ব্রত হিসেবে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেছিল এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৪৪ ধারা জারি করেছিল, তখন সেই বিধিনিষেধ ভেঙে যে দশজন দুঃসাহসী তরুণ মিছিল নিয়ে সবার আগে রাজপথে নেমেছিলেন, জহির রায়হান ছিলেন তাঁদের একজন। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার অপরাধে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কিছুদিন কারাগারে থাকতে হয়। সেই তরুণ বয়সের কারাবাস ও ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ রক্তক্ষরণ তাঁর ভেতরে এমন এক প্রতিবাদের আগুন জ্বেলে দিয়েছিল, যা তাঁর সারা জীবনের সমস্ত সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের শুরু হলেও খুব দ্রুতই তিনি কথাসাহিত্যের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর লেখালেখির মূল শক্তি ছিল মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষের খাঁটি জীবনচিত্র। তিনি কোনো কাল্পনিক বা অলীক জগতে বিচরণ করতেন না; তাঁর লেখার চরিত্রগুলো উঠে আসত আমাদের চেনা পরিবেশ, গ্রামীণ কাদা-মাটি আর শহরের মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েন থেকে।

তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এই উপন্যাসে তিনি আবহমান বাংলার নিভৃত পল্লীজীবনের এমন এক ছবি এঁকেছেন, যা পাঠকের মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। টুনি, মন্তু কিংবা মকবুলের মতো চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, দারিদ্র্য, বহুবিবাহের নির্মম বাস্তবতা এবং একই সাথে বেঁচে থাকার এক অনন্ত লড়াইকে তুলে ধরেছেন। সেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি দারিদ্র্য আছে, কুসংস্কার আছে, ক্ষমতার অসমতা আছে, নারীর অসহায়তা আছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা সামাজিক শৃঙ্খল আছে।

‘রাত বাড়ছে। হাজার বছরের পুরনো সেই রাত’ উপন্যাসের শেষের এই ‘হাজার বছর’ যেন শুধু একটি দীর্ঘ সময়ের নাম নয়; যেন সেই একই প্রশ্নের নাম—এত যুগ ধরে মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু তার জীবন কতটা বদলেছে?

এই প্রশ্ন জহিরের সাহিত্যকে গভীর সামাজিক অর্থ দেয়।

অন্যদিকে নগরের মানুষের জীবনসংকট নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘বরফ গলা নদী’। এই উপন্যাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপড়েন, অভাবের তাড়নায় নৈতিক স্খলন এবং মানবিক সম্পর্কের ভাঙন খুব নির্মম ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে। মাহমুদ চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব এবং একটি পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা আসলে সে সময়ের পুরো মধ্যবিত্ত সমাজেরই প্রতিচ্ছবি ছিল। নাগরিক মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক মর্যাদার চাপ ও স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাতকে সামনে এনেছেন।

অর্থাৎ তাঁর বাংলাদেশ শুধু নদী-মাঠ-ধানক্ষেতের বাংলাদেশ নয়; এটি অফিসের, বাসাবাড়ির, শহরের, মধ্যবিত্তের, অর্থকষ্টে জর্জরিত পরিবারেরও বাংলাদেশ। গ্রাম ও শহর, লোকজীবন ও আধুনিকতা, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত—এই বহুত্বের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের মানুষকে দেখতে চেয়েছেন। এছাড়া ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘আর কত দিন’ এর মতো উপন্যাসগুলোতে তিনি বারবার মানুষের আবেগ, সমাজের অসংগতি এবং যুদ্ধের ভয়াল রূপকে সামনে এনেছেন।

বিশেষ করে ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি। ভাষা আন্দোলনের রক্তমাখা পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে শোক ও কান্না শেষ পর্যন্ত শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। উপন্যাসের সেই অবিস্মরণীয় বাক্য—‘আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব’—কেবল উপন্যাসের কোনো সাধারণ সংলাপ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল পুরো বাঙালি জাতির মনের কথা। পরবর্তী সময়ে প্রতিটি আন্দোলনে এই বাক্যটি মানুষকে নতুন করে রাজপথে নামার সাহস জুগিয়েছিল। ২০২৪ সালের ছাত্রদের গনঅভ্যূত্থানেও ‘আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব’— নতুন আবেদন নিয়ে ফিরে আসে।

সাহিত্য রচনার পাশাপাশি জহির রায়হান খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের সাধারণ ও অশিক্ষিত মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দিতে চলচ্চিত্রের চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম আর কিছু হতে পারে না। সেই ভাবনা থেকেই তিনি যুক্ত হন সিনেমা নির্মাণের জগতে। তৎকালীন সময়ে ঢাকাই চলচ্চিত্র ছিল মূলত উর্দু ছবির প্রভাব ও সস্তা বাণিজ্যিক অনুকরণে বন্দি। জহির রায়হান এসে সেই পুরো ধারাকে এক ঝটকায় বদলে দেন। তিনি প্রথম থেকেই চেয়েছিলেন সিনেমাকে নিছক বিনোদনের মাধ্যম না বানিয়ে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করলেও খুব অল্প সময়েই তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ ও দূরদর্শী নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত ছবি ‘কাঁচের দেয়াল’। সমাজ ও পরিবারের ভেতরে বন্দি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে তৈরি এই ছবিটি সমকালীন ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেছিল। এরপর তিনি একের পর এক সাহসী পদক্ষেপ নিতে থাকেন। ১৯৬৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’। ১৯৬৫ সালে তৈরি করেন প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে তিনি তৎকালীন সময়ে পুরো উপমহাদেশে এক বিরল মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এছাড়া বাংলার চিরায়ত লোকগাথা নিয়ে তিনি তৈরি করেন ‘বেহুলা’। এই ছবির মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন নায়করাজ রাজ্জাককে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠা করেন, অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষকে নিজের লোকজ সংস্কৃতির প্রতি নতুন করে ভালোবাসতে শেখান।

তবে জহির রায়হানের চলচ্চিত্র জীবনের সবচেয়ে বড় এবং কালজয়ী সৃষ্টি হলো ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জীবন থেকে নেয়া’। এটি কোনো সাধারণ সিনেমা ছিল না; এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সেলুলয়েডের পর্দায় এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ। ছবিতে তিনি রূপক হিসেবে একটি পরিবারের গল্প দেখান, যেখানে একজন কর্তৃত্বপরায়ণ ও অহংকারী বড় বোনের কড়া শাসনে পুরো পরিবার বন্দি থাকে। সেই পরিবারের সদস্যরা যেভাবে একে একে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, তা আসলে ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের জেগে ওঠার এক নিখুঁত রাজনৈতিক প্রতীক।

‘জীবন থেকে নেয়া’র আরও বড় তাৎপর্য তার চলচ্চিত্রভাষায়। বাস্তব রাজনৈতিক ফুটেজ, পোস্টার, আন্দোলনের দৃশ্য, গান ও কল্পকাহিনিকে পাশাপাশি রেখে জহির এমন একটি চলচ্চিত্রভুবন তৈরি করেন, যেখানে বাস্তবতা ও রূপক একে অন্যকে ছাপিয়ে যায়। দর্শক একদিকে একটি পরিবারের গল্প দেখছে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে নিজের রাষ্ট্রকে চিনে ফেলছে। এই জায়গায় জহির শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি; চলচ্চিত্রের ফর্মকেই রাজনৈতিক করে তুলেছিলেন।

এই কারণেই তাঁকে চলচ্চিত্র-চিন্তক হিসেবেও পড়তে হয়। চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর লেখায় শিল্প, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, পুঁজি এবং সামাজিক দায়ের প্রশ্ন উঠে আসে। তিনি বুঝেছিলেন চলচ্চিত্র শুধু ক্যামেরা ও গল্পের সমষ্টি নয়; চলচ্চিত্র একটি শিল্প-ব্যবস্থা, যার সঙ্গে অর্থ ও ক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। যে সমাজে চলচ্চিত্র তৈরি হয়, তার শ্রেণি-সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিবেশ চলচ্চিত্রের ভাষাকেও প্রভাবিত করে। ফলে চলচ্চিত্রের প্রশ্ন তাঁর কাছে ছিল কেবল ‘কী দেখাব’ নয়; বরং ‘কার চোখ দিয়ে দেখাব’, ‘কাকে দেখাব’, ‘কেন দেখাব’—এই প্রশ্নও।

এই জায়গায় জহির তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক আধুনিক। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, চলচ্চিত্র মানুষের চোখকে শুধু আনন্দ দেয় না, মানুষের চোখকে প্রশিক্ষিতও করে। চলচ্চিত্র মানুষকে যা দেখায়, তার চেয়ে কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ—চলচ্চিত্র মানুষকে কীভাবে দেখতে শেখায়।

তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার ভিতরেও এই জটিলতা ছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ তাঁর কাছে ছিল ইতিহাসের একটি অপরিহার্য শক্তি। ভাষা, সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার প্রশ্ন তাঁর শিল্পে ক্রমে গভীর হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর মধ্যে ছিল সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও শ্রেণিসচেতনতা। ফলে জাতীয় মুক্তি তাঁর কাছে মানুষের চূড়ান্ত মুক্তির সমার্থক ছিল না; বরং বৃহত্তর সামাজিক মুক্তির পথে একটি অপরিহার্য ধাপ। তিনি বুঝেছিলেন পাকিস্তানি রাষ্ট্র থেকে মুক্ত হওয়া দরকার, কিন্তু রাষ্ট্র বদলালেই মানুষের সমস্ত দুঃখের অবসান হবে না। দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ, ক্ষমতার অসমতা—এসবও মানুষের মুক্তির প্রশ্ন।

এই দ্বৈততাই জহিরের রাজনৈতিক কল্পনাকে আকর্ষণীয় করে। তাঁকে শুধু জাতীয়তাবাদী বললে তাঁর সমাজচিন্তা হারিয়ে যায়, আবার শুধু বামপন্থী বললেও তাঁর বাঙালি জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ছোট করা হয়। বরং বলা যায়, তিনি জাতীয় মুক্তিকে সামাজিক মুক্তির বৃহত্তর স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন।

‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি রাজনৈতিকভাবে এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পাকিস্তানি সেন্সর বোর্ড ছবিটি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জনগণের তীব্র চাপের মুখে তারা ছবিটি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এই ছবিটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান হলো, এর মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় সাধারণ মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, যা পরে আমাদের স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীতে রূপ নেয়। এছাড়া ছবিতে কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানের দৃশ্যটি যখন প্রেক্ষাগৃহে বাজত, তখন দর্শকেরা আবেগে ফেটে পড়তেন এবং সিনেমা হলগুলো যেন এক একটি আন্দোলনের দুর্গে পরিণত হতো। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরিতে এই ছবিটি এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করে, তখন জহির রায়হান চুপচাপ বসে থাকতে পারেননি। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে কলকাতায় চলে যান। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, রণাঙ্গনে যেমন মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে লড়াই করছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত তৈরি করাও সমান জরুরি। কলকাতায় চরম আর্থিক সংকট এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও তিনি কাঁধে তুলে নেন তাঁর ক্যামেরা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করতে হলে চাক্ষুষ দলিলের কোনো বিকল্প নেই।

সেই তাগিদ থেকেই তিনি নির্মাণ করেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ (Stop Genocide)। মাত্র বিশ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে তিনি কোনো বাড়তি আবেগ বা নাটুকেপনা দেখাননি; তিনি সরাসরি ক্যামেরায় তুলে ধরেছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা, নিরীহ মানুষের গলিত লাশ, শিশুদের আর্তনাদ এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া কোটি শরণার্থীর অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট। এর সাথে তিনি বিশ্ব ইতিহাসের হিটলারের নাৎসি নির্যাতন এবং লেনিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন, যা সারা বিশ্বের মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

‘স্টপ জেনোসাইড’ দেখার পর আন্তর্জাতিক মহল বুঝতে পেরেছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো সাধারণ গণ্ডগোল হচ্ছে না, সেখানে রীতিমতো একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য গণহত্যা চালানো হচ্ছে। এই তথ্যচিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত তৈরিতে এক বিরাট ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। এর পাশাপাশি তিনি ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ সহ আরও কিছু তথ্যচিত্র তৈরি ও প্রযোজনা করেন, যা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলড়াইয়ের অমূল্য দলিল হয়ে রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি চলচ্চিত্রশিল্পী ও কলাকুশলীদের সংগঠিত করেন এবং স্বাধীন বাংলা চলচ্চিত্র পর্ষদ গঠন করে তহবিল সংগ্রহের কাজ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি হবে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অবশেষে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। লাল-সবুজের পতাকা উড়ল আকাশে। কিন্তু স্বাধীনতার এই বাঁধভাঙা আনন্দের দিনেও জহির রায়হানের মনে ছিল এক গভীর ক্ষত ও রক্তক্ষরণ। বিজয়ের ঠিক দুদিন আগে, ১৪ই ডিসেম্বর, পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশীয় দোসর আলবদর ও রাজাকাররা তাঁর অত্যন্ত প্রিয় অগ্রজ, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও লেখক শহীদুল্লা কায়সারকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা ফিরে জহির রায়হান ভাইসহ নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের খুঁজতে পাগলপ্রায় হয়ে ওঠেন।

তিনি নিজ উদ্যোগে গঠন করেন ‘বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিটি’। তিনি রায়েরবাজার, মিরপুরসহ ঢাকার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বধ্যভূমিতে ছুটে যেতেন, গলিত লাশের স্তূপে খুঁজে বেড়াতেন বড় ভাইয়ের মুখটি। একই সাথে তিনি প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যারা এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল এবং যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি পাকিস্তানিদের দালালি করেছিল, তাদের সবার মুখোশ ও তথ্যপ্রমাণ তিনি জাতির সামনে উন্মোচন করবেন।

১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি সকালে একটি রহস্যময় টেলিফোন আসে তাঁর কাছে। তাঁকে জানানো হয়, তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সার মিরপুরের কোনো এক ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায় বেঁচে আছেন। সেই খবর পাওয়া মাত্রই জহির রায়হান কোনো নিরাপত্তা বা দ্বিধা ছাড়াই অগ্রজের সন্ধানে মিরপুরের উদ্দেশ্যে ছুটে যান। তখনো মিরপুর এলাকাটি পুরোপুরি মুক্ত ছিল না; সেখানে সশস্ত্র বিহারি ও পাকিস্তানি দোসররা লুকিয়ে ছিল। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে ভারতীয় সেনা ও বাংলাদেশ পুলিশের সাথে জহির রায়হান মিরপুরের ভেতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু এরপর আর তিনি কখনো ফিরে আসেননি। মিরপুরের মাটিতেই চিরতরে মিলিয়ে যান বাঙালির এই প্রিয় স্রষ্টা।

জহির রায়হানের এই নিখোঁজ হওয়া এবং রহস্যময় অন্তর্ধান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপূরণীয় ক্ষতি। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া মানে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক জগতের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া। তিনি যদি স্বাধীন বাংলাদেশে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তবে আমাদের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের চেহারা আজ হয়তো আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের হতো।

জহির রায়হানের সামগ্রিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি যা বিশ্বাস করতেন, নিজের কাজের মধ্য দিয়ে ঠিক সেটাই প্রকাশ করতেন। তিনি কোনো ভণ্ডামি বা আপসের ধার ধারতেন না। তাঁর রাজনীতি ছিল সরাসরি মানুষের মুক্তির জন্য, তাঁর উপন্যাস ছিল দেশের মানুষের যন্ত্রণাকে ভাষা দেওয়ার জন্য, আর তাঁর সিনেমা ছিল শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য।

আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেও যখন আমরা কোনো অন্যায়, অনিয়ম বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখোমুখি হই, তখন জহির রায়হানের আদর্শ ও সৃষ্টিকর্ম আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তাঁর ‘আরেক ফাল্গুন’-এর সেই অদম্য সাহস কিংবা ‘জীবন থেকে নেয়া’-র সেই অনমনীয় সুর আজও প্রতিটি সচেতন মানুষের মনে অনুরণিত হয়।

জহির রায়হান কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নন; তিনি বেঁচে আছেন আমাদের ভাষার দাবিতে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে এবং এই দেশের প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের অন্তরে—এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা ও অনন্ত ফাল্গুনের পথিক হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *