
বাংলাদেশে ফরহাদ মজহারকে নিয়ে কথা বলা মানে কেবল একজন মানুষকে নিয়ে কথা বলা নয়; বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের সাহিত্য, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা ও আত্মপরিচয়ের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে হাঁটা। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, মার্কসপাঠক, রাজনৈতিক চিন্তক, নয়াকৃষির প্রবক্তা, লালন-ভাবুক, রাষ্ট্রসমালোচক এবং একই সঙ্গে এক প্রবল বিতর্কিত জনবুদ্ধিজীবী।
কেউ তাঁকে বাংলাদেশের বিরল মৌলিক চিন্তকদের একজন মনে করেন; কেউ মনে করেন তিনি অসংলগ্ন, আত্মবিরোধী, এমনকি রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক ব্যক্তি। তাঁর অনুরাগীদের কাছে তিনি প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতার বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানো প্রবল শক্তিশালী মানুষ।
তাঁকে একেকজন দেখেছেনও একেকভাবে—কবি হিসেবে, বামপন্থী হিসেবে, ইসলামপন্থার সহযাত্রী হিসেবে, কৃষিচিন্তক হিসেবে, আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে কিংবা গণঅভ্যুত্থানের ভাষ্যকার হিসেবে। অথচ এই প্রতিটি পরিচয়ই তাঁকে আংশিকভাবে ধরে। পুরো ফরহাদ মজহারকে ধরতে গেলে এই বিচ্ছিন্ন মজহারদের একসঙ্গে দেখতে হবে।
ফরহাদ মজহারের শুরু হয় কবিতা দিয়ে। তাঁর কবিতার জগৎকে বাদ দিয়ে তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তা বোঝা মুশকিল। প্রস্তাব, সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্থান প্রসঙ্গে, রাজকুমারী হাসিনা, সাঁইজীর দৈন্য গান, ভাবান্দোলন, পুরুষতন্ত্র ও নারী, সংবিধান ও গণতন্ত্র—এই বইগুলো তুলে ধরে একজন কবি ধীরে ধীরে কীভাবে রাজনৈতিক অর্থনীতি, দর্শন, রাষ্ট্রতত্ত্ব, ধর্ম ও সংস্কৃতির দিকে বিস্তৃত হয়েছেন। তাঁর কবিতার বইয়ের তালিকাতে এবাদতনামা, সদরুদ্দীন, কবিতাসংগ্রহ, কবিতার বোনের সঙ্গে আবার ইত্যাদিও রয়েছে।
মজহারের কবিসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি কবিতাকে কখনো কেবল নান্দনিক অনুশীলন হিসেবে রাখেননি। তাঁর কাছে ভাষা নিজেই একটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক ক্ষেত্র।
এবং এই পরিচয়টি নিছক তাঁর জীবনের শুরুর অধ্যায় নয়; বরং পরবর্তী মজহারদের গভীরে কবির উপস্থিতি প্রবলভাবে থেকে গেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম, শরীর, মৃত্যু, ইতিহাস, নগর, প্রকৃতি, রাজনীতি ও মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন পাশাপাশি এসেছে। তাঁর কবিতা কখনো সরাসরি রাজনৈতিক, কখনো গভীরভাবে আত্মজৈবনিক, আবার কখনো এমন এক ভাষা নির্মাণ করে যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর ইতিহাস পরস্পরের মধ্যে মিশে যায়। ফলে তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভাষাকেও নিছক তাত্ত্বিক ভাষা হিসেবে পড়লে ভুল হবে। সেখানে কবির কল্পনা, উপমা, সংশয় এবং প্রতিষ্ঠিত অর্থের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী মনটি ক্রমাগত কাজ করে।
এই জায়গাটিই তাঁকে অনেক সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীর চেয়ে আলাদা করে। মজহার শুধু তত্ত্ব দিয়ে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে চাননি; ভাষা ও কল্পনার ভেতর দিয়েও তাকে পুনর্গঠন করতে চেয়েছেন। সাহিত্য তাঁর কাছে অলংকার নয়, জ্ঞান উৎপাদনেরও একটি পদ্ধতি। ফলে তাঁর কবিতা থেকে লালন, লালন থেকে কৃষি, কৃষি থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে গণশক্তি—এই যাত্রাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে তাঁর চিন্তার অন্তঃস্রোতটি ধরা পড়ে না।
মার্কসবাদ তাঁর চিন্তাকে প্রথম বড় রাজনৈতিক-দার্শনিক অভিঘাত দেয়। তার বেড়ে ওঠার সময়ের তরুণদের মতো শ্রেণি, পুঁজি, শোষণ ও রাষ্ট্রের প্রশ্ন তাঁকেও আকৃষ্ট করে। কিন্তু প্রচলিত মার্কসবাদের ভেতরে তিনি শেষ পর্যন্ত স্থির থাকেননি। তাঁর প্রশ্ন ক্রমে আরও গভীরে যায়: মানুষকে কি শুধু শ্রেণি দিয়ে বোঝা যায়? মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি, দেহ, স্মৃতি, স্থানীয় জ্ঞান, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক—এসব কি কেবল ‘উপরিকাঠামো’? এখানেই তাঁর চিন্তা ধীরে ধীরে ইউরোপীয় আধুনিকতার জ্ঞানতত্ত্বের সমালোচনার দিকে যায়।
এখানেই আসে ‘ভাব’ বা লালনের উপস্থিতি।
ভাবান্দোলন-এ তিনি যে কাজটি করতে চেয়েছেন, সেটি মূলত দেশজ জ্ঞানতত্ত্বের সন্ধান। লালন, চৈতন্য, ফকিরি ঐতিহ্য, মার্কস, আধুনিক দর্শন—এগুলোকে একটি দীর্ঘ কথোপকথনের মধ্যে নিয়ে আসা তাঁর প্রকল্পের অংশ।
এখানে তাঁর সঙ্গে হাইডেগারের একটি দূরবর্তী মিলও লক্ষ্য করা যায়। আধুনিকতার প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানতন্ত্রের বাইরে গিয়ে ‘অস্তিত্ব’কে অন্যভাবে ভাবার চেষ্টা—যদিও মজহারের প্রকল্প সম্পূর্ণ আলাদা এবং নিজস্ব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে নির্মিত।
লালন তাঁর কাছে লোকসংস্কৃতির কোনো নিরীহ প্রতীক বা সাংস্কৃতিক নস্টালজিয়া নন। লালন তাঁর কাছে একটি বিকল্প জ্ঞান ও অস্তিত্বচিন্তার সম্ভাবনা—‘মানুষ’, ‘দেহ’, ‘ভাব’, ‘সহজ’, ‘দৈন্য’-এর এমন এক জগৎ, যা আধুনিকতার প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানতন্ত্রকে প্রশ্ন করতে পারে।
এখানে তাঁর সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো—বাংলাদেশকে কেবল ইউরোপীয় ধারণার ভোক্তা হিসেবে না দেখে নিজের জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের মধ্য থেকেও চিন্তা করতে শেখানো। তাঁর কৃতিত্ব হলো, লালনকে তিনি কেবল গান ও লোকঐতিহ্যের পরিসর থেকে টেনে এনে দর্শন, রাজনীতি ও জ্ঞানের প্রশ্নের কেন্দ্রে বসিয়েছেন।
ইউরোপীয় আধুনিকতার জ্ঞানতত্ত্বের প্রতি তাঁর প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়:
জ্ঞান কি কেবল বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের তৈরি জ্ঞান? নাকি কৃষক, সাধক, ফকির, গ্রামীণ সমাজ এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনেও জ্ঞানের নিজস্ব রূপ আছে?
এই প্রশ্নই তাঁকে পরবর্তীতে নয়াকৃষির দিকে নিয়ে যায়।
কৃষি তাঁর কাছে কেবল উৎপাদন বাড়ানোর প্রযুক্তি নয়। কৃষি হলো মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, বীজের স্বাধীনতা, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় জ্ঞান, কৃষকের স্বায়ত্তশাসন এবং খাদ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
এখানে তাঁর পুঁজিবাদ-বিরোধিতা মার্কসীয় অর্থে যেমন আছে, তেমনি আধুনিক উন্নয়ন-চিন্তার সমালোচনাও আছে। কৃষককে ‘পিছিয়ে থাকা’ মানুষ হিসেবে দেখার বদলে তাঁর নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের মর্যাদা দেওয়া—এই জায়গাটি মজহারের চিন্তার সবচেয়ে সৃজনশীল দিকগুলোর একটি।
আধুনিক উন্নয়ন-চিন্তার বিপরীতে তিনি কৃষকের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের মর্যাদা দিতে চান। তাঁর তত্ত্বের এই জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বুদ্ধিজীবী মজহার মাঠের মানুষের সঙ্গে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পকে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু সাহিত্যিক ও দার্শনিক মজহার যখন রাজনৈতিক মজহারে পরিণত হন, তখনই শুরু হয় সবচেয়ে বড় বিতর্ক।
রাজকুমারী হাসিনা-র মজহার একসময় শেখ হাসিনার মধ্যে রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখেছিলেন। আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকল্প নিয়েও তাঁর প্রত্যাশা ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই মজহারই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী, শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই পরিবর্তনকে শুধু ‘মত পাল্টানো’ বললে তাঁর চিন্তার বিবর্তনের একটি বড় অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। কারণ এর সঙ্গে বদলেছে তাঁর রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জনগণ সম্পর্কে ধারণাও।
২০১৩ সালের শাহবাগ-হেফাজত পর্বে তাঁর অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের প্রচলিত প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে প্রায় সরাসরি সংঘাতে নিয়ে আসে, বিরোধ তৈরি করে। পরবর্তীতে এই বিরোধ কখনো তাত্ত্বিক, কখনো ব্যক্তিগত, কখনো রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।
মজহার মনে করেন, বাংলাদেশের বাম রাজনীতি এখনও ‘জনগণ’কে একটি বিমূর্ত শ্রেণি হিসেবে দেখে; বাস্তব মানুষ—তার ধর্ম, ভাষা, পরিবার, সংস্কৃতি, গ্রাম, দেহ, কৃষি—এসবকে রাজনৈতিক তত্ত্বের মধ্যে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।
শাহবাগের সমালোচনা এবং হেফাজতের প্রতি তাঁর সহানুভূতি অনেকের কাছে তাঁকে বাম থেকে ইসলামপন্থার দিকে সরে যাওয়া একজন চিন্তক করে তোলে। কিন্তু মজহারের নিজের যুক্তি ছিল—বাংলাদেশের বামপন্থা ধর্মকে বুঝতে পারেনি, মুসলমান জনগোষ্ঠীর সামাজিক বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করেছে এবং ইউরোপীয় সেক্যুলার আধুনিকতার ভাষাকে এ দেশের বাস্তবতার ওপর চাপিয়েছে।
এই সমালোচনায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে, তেমনি বিপদও আছে। ধর্মকে জনগণের জীবনের বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করা এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে গ্রহণ করা এক কথা নয়। মজহারের চিন্তার সবচেয়ে বিতর্কিত অঞ্চল সম্ভবত এই সীমারেখাটিই। ইসলাম তাঁর কাছে বিশ্বাসের পাশাপাশি ইতিহাস, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও জনগণের সামাজিক বাস্তবতার প্রশ্ন; কিন্তু ইসলামপন্থী দলীয় রাজনীতিকেও তিনি সবসময় নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করেননি।
বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে নিয়েও তাঁর অবস্থান সরল আনুগত্যের নয়। বিএনপির দলীয় রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কিংবা র্যাব গঠনের মতো সিদ্ধান্তের তিনি সমালোচনা করেছেন; আবার সাম্প্রতিক সময়ে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীনতা’কে আওয়ামী লীগবিরোধী দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। এমনকি তাঁকে গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক নেতাদের একজন হিসেবেও মূল্যায়ন করেছেন। অর্থাৎ মজহারের কাছে ব্যক্তি, দল ও রাজনৈতিক মুহূর্ত সবসময় একই জিনিস নয়।
এ কারণেই তাঁর রাজনৈতিক মানচিত্রে অদ্ভুত এক দৃশ্য তৈরি হয়। তিনি আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচক, অথচ একসময় শেখ হাসিনার সম্ভাবনায় বিশ্বাসী ছিলেন; বিএনপির সমালোচক, অথচ খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রশংসক; বামদের কঠোর সমালোচক, অথচ পুঁজিবাদ ও শোষণেরও বিরোধী; ইসলামকে সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করেন, অথচ ইসলামি দলীয় রাজনীতিকেও প্রশ্ন করেন। তাঁর অবস্থান বদলায়—কখনো ধীরে, কখনো নাটকীয়ভাবে। তাই তাঁর মধ্যে যেমন চিন্তার বিবর্তন আছে, তেমনি আছে রাজনৈতিক তাৎক্ষণিকতার ঝুঁকিও।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান তাঁর চিন্তাকে আবার নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। আন্দোলনের সময় তাঁর ভাষায় ছিল জনগণের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানোর কথা; আন্দোলনের পর প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—সরকার বদলালেই কি রাষ্ট্র বদলায়? তাঁর পুরোনো ‘গণশক্তি’র ধারণা এখানে নতুন অর্থ পায়। জনগণ কেবল ভোটার নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হওয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকতে হবে। কিন্তু এখানেই তাঁর তত্ত্বের কঠিন পরীক্ষাও শুরু হয়। পুরোনো ক্ষমতা ভেঙে নতুন ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে তৈরি হবে, প্রতিষ্ঠান কীভাবে বদলাবে, রাজনৈতিক দল কীভাবে জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে—এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর রাষ্ট্রসমালোচনার সমান শক্তিতে এখনও স্পষ্ট নয়।
মজহারের রাজনৈতিক বিবর্তন এসময় ব্যক্তিগত মতবদলের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে— ‘জাতি’, ‘রাষ্ট্র’, ‘ধর্ম’ ও ‘মানুষ’ ধারণার পুনর্গঠন।
ফরহাদ মজহারকে শুধু তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে পড়লে তাঁর চিন্তার একটি বড় অংশ অধরা থেকে যায়। তাঁর প্রবন্ধ ও বইগুলো পড়লে বোঝা যায়, তিনি মূলত একজন ‘সিস্টেম্যাটিক’ দার্শনিক নন; বরং প্রশ্ন থেকে প্রশ্নে এগোনো এক চিন্তক। তাঁর মোকাবিলা, ক্ষমতার বিকার ও গণশক্তির উদ্বোধন, সংবিধান ও গণতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, পুরুষতন্ত্র ও নারী, ভাবান্দোলন কিংবা মার্কস পাঠের ভূমিকা—এই বইগুলো আলাদা আলাদা বিষয়ের বই মনে হলেও গভীরে গিয়ে একই অনুসন্ধানের নানা পর্ব: মানুষ, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, জ্ঞান ও মুক্তির সম্পর্ক কী?
অর্থাৎ তাঁর সাহিত্য এবং তাঁর দর্শন পরস্পরের আলাদা ঘর নয়। কবিতায় যে মানুষ, দেহ, প্রেম, মৃত্যু, ভাষা ও ইতিহাসের প্রশ্ন আসে, প্রবন্ধে সেগুলোই অন্য ভাষায় ফিরে আসে। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যেও তাই কেবল রাজনৈতিক অর্থনীতি নেই; আছে একটি নন্দনতত্ত্ব এবং মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর কৌতূহল।
এই কারণেই ফরহাদ মজহারকে ‘দার্শনিক’ বলা হবে কি না—এই বিতর্কের চেয়ে তাঁর চিন্তার প্রকৃতি বোঝা বেশি জরুরি। তিনি একাডেমিক অর্থে কোনো পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক ব্যবস্থা নির্মাণ করেননি; তাঁর চিন্তা ধারাবাহিকভাবে বদলেছে, অনেক জায়গায় নিজেকেই অতিক্রম করেছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তিনি তৈরি করেছেন, যেখানে মার্কসকে লালনের পাশে, কৃষককে দর্শনের পাশে, ধর্মকে রাজনীতির পাশে, আর কবিতাকে জ্ঞানতত্ত্বের পাশে বসিয়ে দেখা যায়। তাঁর বইগুলোর প্রকৃত গুরুত্ব সম্ভবত এখানেই।
ফলে তাঁর রচনাসমগ্রকে এক সরল রেখায় পড়া যায় না। মার্কস পাঠের ভূমিকা থেকে ভাবান্দোলন, ক্ষমতার বিকার থেকে সংবিধান ও গণতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ থেকে নয়াকৃষি—প্রতিটি পর্বে তিনি আগের পর্যায়ের মজহারকে প্রশ্ন করেছেন। এই কারণেই তাঁর বইগুলো একসঙ্গে পড়লে একজন স্থির মতাদর্শের লেখককে পাওয়া যায় না; পাওয়া যায় নিজের চিন্তার সঙ্গে ক্রমাগত মোকাবিলা করা একজন মানুষকে।
সম্ভবত এটাই ফরহাদ মজহারের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্য: তিনি কোনো একটি তত্ত্বের শেষ কথা বলতে চান না; বরং তত্ত্বকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে চান, যেখানে আবার মানুষের কাছে ফিরে আসতে হয়।
ফরহাদ মজহারের গুরুত্ব তিনি সবসময় সঠিক বা পরিবর্তনশীল ছিলেন বলে নয়। তাঁর গুরুত্ব হলো, তিনি এমন কিছু প্রশ্ন সামনে আনেন যা বাংলাদেশের প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর প্রায়ই এড়িয়ে যায়। তিনি বামপন্থীকে জিজ্ঞেস করেন—ধর্মকে বাদ দিয়ে জনগণকে বোঝা যায় কি? সেক্যুলারকে জিজ্ঞেস করেন—তোমার সেক্যুলারিজমের ইতিহাস কোথা থেকে এসেছে? ইসলামপন্থীকে জিজ্ঞেস করেন—ধর্মের নামে নতুন কর্তৃত্ব তৈরি হবে না তো? জাতীয়তাবাদীকে জিজ্ঞেস করেন—জাতি মুক্তির ভাষা, নাকি আধিপত্যেরও? কৃষিবিদকে জিজ্ঞেস করেন—কৃষকের নিজের জ্ঞান কোথায়? আর রাষ্ট্রবাদীকে জিজ্ঞেস করেন—রাষ্ট্র আসলে কার?
এই প্রশ্ন করার ক্ষমতার পেছনে যে মানুষটি আছেন, তিনি শুধু তাত্ত্বিক মজহার নন; কবি মজহারও। কবি বলেই হয়তো তিনি প্রতিষ্ঠিত ভাষায় সন্তুষ্ট হন না। কবি বলেই হয়তো একই বাস্তবতার ভেতর বহু অর্থ দেখতে পান। আর সেই কারণেই তাঁর চিন্তা কখনো সরলরৈখিক নয়—একটি বক্তব্যের ভেতর আরেকটি বক্তব্য, এক মজহারের ভেতর আরেক মজহার জন্ম নেয়।
তাঁর মধ্যে অসঙ্গতি আছে, অতিরঞ্জন আছে, রাজনৈতিক ভুল আছে, কখনো আত্মবিরোধও আছে। কিন্তু সেই আত্মবিরোধকে বাদ দিলে মজহারকে বোঝা যাবে না। কারণ তাঁর জীবনটাই যেন নিজের সঙ্গে নিজের বিতর্ক। একসময় যে জায়গায় দাঁড়িয়েছেন, পরে সেখান থেকে সরে গেছেন; আবার নতুন জায়গাটিকেও চূড়ান্ত সত্য হিসেবে স্থির করেননি।
তাই তাঁকে ভালোবাসা সহজ, ঘৃণা করাও সহজ। কঠিন হলো তাঁকে পড়া—কবি হিসেবে, চিন্তক হিসেবে, রাজনৈতিক মানুষ হিসেবে, এবং তাঁর নিজের সঙ্গে অবিরাম বিতর্কে থাকা একজন মানুষ হিসেবে।
ফলে ফরহাদ মজহারকে বাম, ডান, ইসলামপন্থী, মার্কসবাদী, লালনপন্থী কিংবা আওয়ামী লীগ-বিরোধী—কোনো একটি অভিধায় বন্দী করা যায় না। তিনি বরং বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্বগুলোর এক জীবন্ত সংকলন বা অভিযাত্রা। কবিতা থেকে রাজনীতি, মার্কস থেকে লালন, কৃষক থেকে রাষ্ট্র, ধর্ম থেকে আধুনিকতা, হাসিনা থেকে খালেদা, শাহবাগ থেকে হেফাজত, এবং শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ যাত্রা—সবকিছুর ভেতর দিয়ে তিনি একই প্রশ্নটিকে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ধরতে চেয়েছেন: মানুষ কীভাবে নিজের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর নিজের কর্তৃত্ব ফিরে পাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর তিনি সবসময় একভাবে দেননি। কখনো তাঁর উত্তর গভীর, কখনো দুর্বল, কখনো বিতর্কিত, কখনো পরস্পরবিরোধী। কিন্তু সেই বিরোধই তাঁকে আকর্ষণীয় করে। কারণ ফরহাদ মজহার শেষ পর্যন্ত কোনো স্থির মতাদর্শের নাম নন। তিনি এমন প্রশ্ন সামনে আনেন, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়া সহজ, কিন্তু একবার সামনে এলে আর সহজে সরিয়ে রাখা যায় না। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তাঁর উত্তর নয়, তাঁর অস্বস্তি তৈরি করার ক্ষমতা।
এইসব পরিচয় একসঙ্গে রাখলে যে মানুষটিকে পাওয়া যায়, তিনি সহজ মানুষ নন।
তিনি বরং বাংলাদেশের নিজস্ব সংকটের মতোই জটিল।
তিনি এক মানুষ, এক মজহার—কিন্তু তাঁর ভেতরে বহু মজহাব।
আর সেই বহু মজহাবের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই হয়তো বাংলাদেশের নিজের মুখটাও একটু একটু করে দেখা যায়।
