আহমদ ছফা

আহমদ ছফাঃ চিন্তা-সাহিত্য-প্রাসঙ্গিকতা

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক জগতে আহমদ ছফা (১৯৪৩–২০০১) এক অনন্য, প্রথাবিরোধী এবং প্রমেথিউসীয় চরিত্র। তিনি কেবল একজন প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক বা কবি ছিলেন না; বরং ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ-গঠন ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক নির্ভীক তাত্ত্বিক।

তাঁর চিন্তা ও দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘মানুষ’, ‘সমাজ’ এবং ‘স্বদেশ’। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে রাষ্ট্র, রাজনীতি, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল।

ফলে আহমদ ছফাকে কেবল একজন প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক বা কবি হিসেবে পাঠ করলে তাঁর সামগ্রিক অবয়বটি অধরাই থেকে যায়। তিনি ছিলেন মূলত একাধারে সমাজ-প্রত্নতাত্ত্বিক, উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রের প্রধানতম ‘আইকনোক্লাস্ট’ বা প্রতিমা-চূর্ণকারী।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ববঙ্গের যে রূপান্তর—ঔপনিবেশিকতা থেকে পাকিস্তানের ধর্মীয় রাষ্ট্রকাঠামো থেকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়—সেই রূপান্তরের প্রতিটি বাঁককে ছফা ব্যবচ্ছেদ করেছেন অত্যন্ত নিরাসক্ত ও নির্মমভাবে।

তাঁর চিন্তা-দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল এক ধরনের ‘র‍্যাডিকাল হিউম্যানিজম’ এবং মননের অবউপনিবেশায়ন (Decolonization of the Mind)। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসের প্রান্তিক স্তরগুলোকে উন্মোচন করেছেন, তা উত্তর-colonial তত্ত্বে ফ্রান্তজ ফানো বা এডওয়ার্ড সাঈদের ঘরানার সমান্তরাল। আহমদ ছফা বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের বাঙালি মননবিশ্বের এক প্রমেথিউসীয় চরিত্র, যিনি একই সাথে দ্রোহ ও সৃজনের সমান্তরাল রেখায় নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন।

তাঁর চিন্তা ও দর্শন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইশতেহার বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দাসত্ব করেনি; তিনি আমৃত্যু লৌকিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক ধরনের স্থায়ী বিরোধী অবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন। ছফার গভীর সমাজদর্শন এবং সাহিত্যকীর্তিকে বুঝতে হলে তাঁর সময়কাল, অর্থাৎ দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ক্রান্তিকালকে অনুধাবন করা জরুরি। তিনি কেবল সমাজের উপরিভাগের ক্ষতগুলোকে চিহ্নিত করেননি, বরং ঔপনিবেশিক হ্যাংওভার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্বকে অত্যন্ত নির্মমভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন।

আহমদ ছফার তাত্ত্বিক প্রজ্ঞার সবচেয়ে প্রস্ফুটিত রূপ দেখা যায় ১৯৭২ সালে প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী মনোগ্রাফ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’-এ। স্বাধীনতার ঠিক পরপরই, যখন চারদিকে এক ধরনের কৃত্রিম উল্লাস এবং ক্ষমতার স্তাবকতা তৈরি হচ্ছে, ছফা তখন বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সুবিধাবাদিতার দিকে আঙুল তোলেন।

মিশেল ফুকোর ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান’ (Power/Knowledge)-এর যে আন্তঃসম্পর্ক, ছফা যেন তার এক স্থানীয় রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন এই গ্রন্থে। তিনি দেখান যে, ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি আমলে যে বুদ্ধিজীবীরা আইয়ুব খানের ‘রাইটার্স গিল্ড’-এর সুবিধাভোগী ছিলেন, তারাই খোলস বদলে স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার নতুন ভাগাভাগিতে লিপ্ত হয়েছেন।

ছফার বিখ্যাত সেই থিসিস ছিল—‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলেন তা বিশ্বাস করেন না, আর যা বিশ্বাস করেন তা মুখে বলেন না।’ এটি কেবল কোনো চটুল উক্তি নয়, এটি মূলত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ‘শ্রেণিগত দ্বিচারিতা’(Class Hypocrisy)-র একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক। ছফা মনে করতেন, একটি সমাজ যখনই তার স্বাধীন চিন্তা ও সৎ সমালোচনা করার ক্ষমতা হারায় এবং বুদ্ধিজীবীরা যখন শাসকের ‘হেজেমনি’ (Hegemony) বা আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেই সমাজের পতন অনিবার্য। এই তীব্র ও ক্ষুরধার বিশ্লেষণ ছফাকে তৎকালীন অনেক প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীর চক্ষুশূলে পরিণত করেছিল, কিন্তু তিনি নিজের সত্য উচ্চারণে কখনো আপস করেননি।

এই আপসহীনতার সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক প্রকাশ ঘটে যখন তিনি লেখক শিবির পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমি প্রদত্ত সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। এর পেছনের যুক্তি ছিল গভীরভাবে আদর্শগত: তিনি মনে করতেন এই পুরস্কারগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বাধীন চিন্তাভাবনার প্রকাশ সীমাবদ্ধ করে, এবং বিশ্বাস করতেন যে একজন লেখকের সাহিত্যকর্মই তাঁর সর্বোচ্চ পুরস্কার, যা কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির উপর নির্ভরশীল নয়। এই সিদ্ধান্ত আজকের প্রেক্ষাপটেও তাৎপর্যপূর্ণ— এক এমন সময়ে যখন স্বীকৃতি ও পুরস্কারের পেছনে দৌড়ানোটাই স্বাভাবিক বলে গণ্য হয়, ছফার এই অবস্থান এক ব্যতিক্রমী নৈতিক দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

“বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” গ্রন্থে তিনি লিখেছেন: “আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন রক্ত দিয়েই চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছি। চারদিকে এত অন্যায়, অবিচার, এত মূঢ়তা ও কাপুরুষতা ওঁৎ পেতে আছে যে, এ ধরনের পরিবেশে নিতান্ত সহজে বোঝা যায় এমন সহজ কথাও চেঁচিয়ে না বললে কেউ কানে তোলে না।”এই কথাগুলো লেখা হয়েছিল চল্লিশের দশকের সেই রুদ্ধশ্বাস সময়ের প্রেক্ষাপটে, যখন দারিদ্র্যের সঙ্গে আজীবন লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে।

সলিমুল্লাহ খান ছফার ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭২) গ্রন্থটিকে বাংলা রাজনৈতিক সাহিত্যের একটি মোড়ঘোরানো কাজ বলে মনে করেন। খানের মতে, ছফা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের যে সমালোচনা করেছিলেন, তা কোনো সাময়িক ক্ষোভ ছিল না, তা ছিল এক গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। সলিমুল্লাহ খান বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ছফা কীভাবে ধরে ফেলেছিলেন যে এ দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা বুদ্ধিজীবী শ্রেণি আসলে এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ জন্ম দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে না বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চাটুকারিতা করে নিজের আখের গোছায়।

তাঁর এই চিন্তার পরিপূরক গ্রন্থ ছিল ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ (১৯৮১)। এখানে তিনি বাঙালি মুসলমানের এক হাজার বছরের মনস্তাত্ত্বিক জড়তা ও পরিচয়-সংকটকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকেই বিশ্লেষণ করেছেন। এই রচনায় তিনি বাঙালি মুসলমানের হাজার বছরের আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেন— বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, সাংস্কৃতিক দ্বিধা এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের পথ ধরে এই পরিচয়ের রূপান্তরের কাহিনি।

ছফা দেখিয়েছেন, এই সমাজ একদিকে হিন্দু জমিদারদের প্রতি ক্ষোভ থেকে নিজেদের কাল্পনিক ‘আরব-ইরানি’ বংশোদ্ভূত ভাবার চেষ্টা করেছে, আবার অন্যদিকে নিজের আসল ভূমিজ আত্মপরিচয়ও পুরোপুরি নির্মাণ করতে পারেনি। ছফা এই মনস্তাত্ত্বিক বৃত্তায়ন থেকে মুক্তির জন্য একটি অসাম্প্রদায়িক, ইহজাগতিক ও বিজ্ঞানমনস্ক বাঙালি সত্তার বিকাশের Gregorian বা ইহজাগতিক রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সৌন্দর্যকে অন্তরে ধারণ করেও একটি সমাজ সম্পূর্ণ আধুনিক ও মানবিক হতে পারে, যদি তা কুসংস্কার ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধর্মের ব্যবহারকে বর্জন করতে শেখে।

বাঙালি মুসলমানের হাজার বছরের আত্মপরিচয়ের সংকট-র এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কখনোই নিছক একাডেমিক প্রশ্ন ছিল না। ভাষা দিয়ে বাঙালি, ধর্ম দিয়ে মুসলমান— এই দ্বৈত পরিচয়ের ভেতরের টানাপোড়েন বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, এমনকি রাষ্ট্রনির্মাণের গোটা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। ছফা কোনো সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রবন্ধ লেখেননি; বরং তিনি দেখতে চেয়েছিলেন কেন বাঙালি মুসলমানের মননশীলতায় এক ধরনের ঐতিহাসিক জড়তা বা স্থবিরতা রয়ে গেছে। ছফা এই অনগ্রসরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শোষণ এবং নিজস্ব আত্মপরিচয়হীনতাকে।

ছফা এই জটিল প্রশ্নটিকে সরাসরি মোকাবিলা করেছিলেন, কোনো সরলীকরণ ছাড়াই। এই প্রবন্ধেই তাঁর একটি বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়: “শিল্প-সাহিত্যে কেউ বাইরে থেকে ঘরে ফেরার সাধনা করে, কেউ ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার, যার যতদূর যাত্রা হয়, ততদূর সফলতা।” এই একটি বাক্যেই তিনি শিল্পের সৃষ্টিশীলতা ও আত্মঅনুসন্ধানের গোটা দ্বান্দ্বিকতাকে ধরে ফেলেছেন।

গ্রন্থটি প্রকাশের পর ব্যাপক বিতর্ক ও আলোড়ন সৃষ্টি করে, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল তাঁর আরেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” (১৯৭২)-এর ক্ষেত্রেও, যেখানে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের সময়ে তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের একটি মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। এই দুটি গ্রন্থ একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়— ছফা শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজবিশ্লেষক, যিনি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তা নির্মমভাবে যাচাই করতে চেয়েছিলেন।

আহমদ ছফার রাজনৈতিক চিন্তার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য। তিনি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েই ভাবেননি, বরং ভারত ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের এক দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণ তৈরি করেছিলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের প্রতি ছফার গভীর শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু তিনি অত্যন্ত দ্রুত অনুধাবন করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘মহত্ত্ব’ বলে কিছু নেই—সবই স্বার্থের সমীকরণ। তিনি ভারতের ‘বিগ ব্রাদার সিনড্রোম’ বা দাদাগিরি সংস্কৃতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। ছফা তাঁর বিভিন্ন কলাম ও রাজনৈতিক প্রবন্ধে সতর্ক করেছিলেন যে, বাংলাদেশ যদি ভারতের প্রতি অন্ধ ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে, তবে তা দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করবে।

তিনি মনে করতেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার এবং পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দিল্লির নব্য-ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ ছিল সর্বদা সোচ্চার।

একইভাবে, পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও তাদের শোষণের বিরুদ্ধে ছফা কলম ধরলেও পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর পতনের পর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হাজির করেন। ছফার মতে, পাকিস্তান নামক ভৌগোলিক রাষ্ট্রটি মরে গেলেও, তার ‘মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো’ বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিতে বেঁচে আছে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার যে পাকিস্তানি প্রবণতা, তা স্বাধীন বাংলাদেশেও ভিন্নরূপে আবির্ভূত হতে পারে—এই শঙ্কা তিনি আগেই করেছিলেন।

ছফা বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন এক জায়গায়, যেখানে তাকে টিকে থাকতে হলে ভারত ও চীন—দুই পরাশক্তির মাঝখানে একটি সুদূরপ্রসারী ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রগুলোর সাথে বাংলাদেশের এক ধরনের কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক মৈত্রী গড়ে তোলার পক্ষে ছিলেন, যাতে এই অঞ্চলে কোনো একক দেশের একাধিপত্য তৈরি না হতে পারে।

ছফা মুক্তিযুদ্ধকে উল্লেখ করেছিলেন বিপ্লব হিসেবে। আবার তিনি এটিও উল্লেখ করেছেন, ‘সেই বিপ্লব বেহাত হয়েছে’।

ছফার সামাজিক দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল সংস্কৃতি ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ। তিনি লিখেছেন: “একটি সমাজের সর্বাঙ্গীন গতির নাম রাজনীতি এবং সংস্কৃতি রাজনীতির রস-রক্ত, এই বোধে কোন রাজনৈতিক দল কিংবা লোকমান্য নেতার মন সিঞ্চিত হয়েছে, তেমন কোন দল বা ব্যক্তিত্বের নাম আজও জানা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কৃতিবিমুখতা, কর্মীদের চেতনাহীনতা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিকে দু’টি আলাদা আলাদা ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত করল।”

এই পর্যবেক্ষণে তিনি ফরাসি লেখক আলফোঁস দোদের একটি গল্পের দৃষ্টান্ত টেনে আনেন— যেখানে যুদ্ধে পরাজিত এক হতাশ মানুষকে ফরাসি সাহিত্য পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ সাহিত্যের ভেতরে এমন কিছু “প্রাণদায়িনী উপকরণ” থাকে যা পরাজয়ের হতাশা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। ছফা এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন— একটি জাতির রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য শুধু ক্ষমতার লড়াই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গভীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি। যে রাজনীতি সংস্কৃতিবিমুখ, সেই রাজনীতি জাতিকে প্রকৃত মুক্তির পথে নিয়ে যেতে পারে না— এই সতর্কবার্তা আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।

ছফা ধর্মকে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন না— বরং একে এক ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতেন, যা মানুষের জীবনের অংশ। এই ব্যক্তিগত সহিষ্ণুতাকে যদি তাঁর “বাঙালি মুসলমানের মন” প্রবন্ধে প্রকাশিত পরিচয়ের জটিল রাজনীতির বিশ্লেষণের সঙ্গে একত্রে পড়া যায়, তাহলে স্পষ্ট হয়— ছফা ধর্মকে নিছক সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানের বিষয় হিসেবে দেখেননি, বরং বুঝতে চেয়েছিলেন এটি কীভাবে একটি জাতির আত্মপরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে।

ছফার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি। তিনি সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও, বৈশ্বিক কোনো অন্ধ ফ্রেমওয়ার্ক বাংলার মাটিতে চাপিয়ে দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে ‘সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস’ কিংবা ‘মওলানা ভাসানী: একটি জীবন, একটি সমাজব্যবস্থা’র মতো লেখায়।

তিনি মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা মহান চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের মতো ব্যক্তিত্বদের মূল্যায়ন করেছেন মাটির গভীর থেকে, কোনো তাত্ত্বিক সংকীর্ণতা ছাড়া। ছফা মনে করতেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ কেবল একটি নতুন মানচিত্র বা পতাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি না তা সাধারণ কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। তাঁর এই গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক অনন্য জাতীয় চিন্তকের আসনে বসিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ‘সেকুলারিজম’ (ধর্মনিরপেক্ষতা) এবং ‘কমিউনালিজম’ (সাম্প্রদায়িকতা)-এর যে কৃত্রিম ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন রয়েছে, ছফা তা ভেঙে দিয়েছিলেন— ছফা অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছিলেন যে এই অঞ্চলের এলিট বা উচ্চবিত্তের ‘সেকুলারিজম’ অনেক সময় কতটা গণবিচ্ছিন্ন ও সুবিধাবাদী। আবার অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের ভেতর ধর্মের যে লোকায়ত, সুফিবাদী ও মানবিক রূপ রয়েছে, ছফা তাকে সম্মান করতেন। সলিমুল্লাহ খানের মূল্যায়নে, ছফা ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করার বিরুদ্ধে যেমন খড়্গহস্ত ছিলেন, তেমনি ধর্মের নামে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করার এলিট মানসিকতারও বিরোধী ছিলেন।

সাহিত্যিক অভিযাত্রায় ছফা যে অবিনাশী কীর্তি রেখে গেছেন, তা মূলত তাঁর দর্শনেরই এক নান্দনিক ও শৈল্পিক রূপান্তর। তিনি উপন্যাসকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম বা নিছক আখ্যান হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে বানিয়েছেন ইতিহাসের দলিল ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদের ল্যাবরেটরি। তাঁর কথাসাহিত্য আকারে হ্রস্ব হলেও এর ক্যানভাস ও আবেদন মহাকাব্যিক।

১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’ গ্রামীণ সমাজের ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক মানবিক জেহাদ, যেখানে তিনি মানবিক বোধের জয়গান গেয়েছেন। কিন্তু ছফার কথাসাহিত্যের শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে ১৯৭৫ সালে রচিত ‘ওঙ্কার’ উপন্যাসে। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য রূপক।

উপন্যাসের বোবা চরিত্রটি মূলত শোষিত, অবদমিত পূর্ববঙ্গের জনগণের প্রতীক। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মিছিলে যখন সেই বোবা মেয়েটি তার সমস্ত শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও রক্তবমি উপেক্ষা করে ‘বা-ঙ-লা’ শব্দ উচ্চারণ করে, তখন তা আর কোনো একক মানুষের কণ্ঠ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি গোটা জাতির স্বাধীনতা, আত্মজাগরণ এবং স্বাধিকার আন্দোলনের উদগ্র আকাঙ্ক্ষার রূপক।

পরবর্তীকালে আশির দশকে রচিত ‘মরণবিলাস’ উপন্যাসে ছফা মানুষের অন্তর্নিহিত পাপ, অপরাধবোধ এবং ক্ষমতার অসারতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক ক্ষমতাধর মন্ত্রীর দীর্ঘ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনীতি মানুষের মানবিক সত্তাকে ধ্বংস করে দেয়। মৃত্যুশয্যায় মানুষের সমস্ত জাগতিক ক্ষমতা কীভাবে অর্থহীন হয়ে পড়ে, তার এক দার্শনিক নির্যাস এই উপন্যাস।

অন্যদিকে, ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম ব্যঙ্গাত্মক বা স্যাটায়ারধর্মী উপন্যাসগুলোর একটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নির্বাচন, শিক্ষক রাজনীতির নির্লজ্জ দলাদলি, নৈতিক স্খলন এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়কে তিনি যেভাবে এই উপন্যাসে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তা আলবের কামুর ‘অ্যাবসার্ডিটি’র ধারণাকে মনে করিয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণ কীভাবে ক্ষমতার লোভে গোয়ালঘরে রূপান্তরিত হতে পারে, ছফা তা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে দেখিয়েছেন।

আহমদ ছফার মেধা ও বৈশ্বিক মননের আরেকটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ জার্মান মহাকবি গ্যেটের মহাকাব্য ‘ফাউস্ট’-এর কাব্যিক অনুবাদ। প্রায় দীর্ঘ তিন দশক ধরে তিনি এই অনুবাদ কর্মে নিমগ্ন ছিলেন, যা তাঁর অসামান্য অধ্যবসায় ও বিশ্বসাহিত্যের অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করার ব্যাকুলতার প্রমাণ দেয়। ফাউস্টের জ্ঞানতৃষ্ণা এবং মেফিস্টোফিলিসের সাথে তার চুক্তির যে দার্শনিক দ্বন্দ্ব, তা ছফা বাংলার পাঠকসমাজের কাছে অত্যন্ত সাবলীল ও জীবন্ত করে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর নিজস্ব কাব্যগ্রন্থ ‘জল্লাদ সময়’ বা ‘একটি প্রবীণ বকের কাহিনী’-তেও সমকালীন রাজনীতি ও মানবিক সংকটের তীব্র ক্ষোভ ও আর্তি প্রকাশ পেয়েছে।

আহমদ ছফা তাঁর জীবদ্দশাতেই যেমন কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন, তেমনি তাঁর তীব্র ও স্পষ্টভাষী স্বভাবের কারণে বহু বিতর্ক ও সমালোচনার মুখোমুখিও হয়েছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ একবাক্যে স্বীকার করেছে যে, ছফার মতো স্বাধীনচেতা মানুষ এ দেশে বিরল। বাংলাদেশের প্রধানতম চিন্তাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আহমদ ছফাকে অত্যন্ত উঁচুদরে মূল্যায়ন করে বলেছিলেন যে, ছফার চিন্তার মধ্যে একটা মৌলিকত্ব আছে এবং ও যা ভাবে, তা ধার করা চিন্তা নয়, একদম মাটির ভেতর থেকে তোলা।

বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছফার সৃষ্টিশীলতা ও সাহস সম্পর্কে লিখেছিলেন যে, আহমদ ছফা হলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি সমাজকে তোলপাড় করতে পারেন এবং তাঁর লেখার ভেতরের সততা অনেক সময় আমাদের চেনা আরামদায়ক জগতটাকে কাঁপিয়ে দেয়।

কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার ছফার দার্শনিক অবস্থানকে চিহ্নিত করতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে, আহমদ ছফা ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানতম ‘ডিসিডেন্ট’ বা প্রথাবিরোধী বুদ্ধিজীবী, যার রাষ্ট্র ও সমাজের সাথে বোঝাপড়া কোনো সস্তা দলীয় রাজনীতির অংশ ছিল না, তা ছিল এক গভীর দার্শনিক লড়াই।

ছফাকে এই গভীর তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে বিন্যস্ত করার এবং তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমকালীন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ সলিমুল্লাহ খানের বিশ্লেষণ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সলিমুল্লাহ খান তাঁর ‘আহমদ ছফা সন্জীবনী’ গ্রন্থে ছফাকে কেবল একজন লেখক হিসেবে নন, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের আদি ও অকৃত্রিম ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

সলিমুল্লাহ খানের মতে, ছফা ছিলেন আমাদের তথাকথিত ‘অকালপক্ব আধুনিকতা’ বা ধার করা রেনেসাঁর প্রধানতম সমালোচক, যিনি অনুধাবন করেছিলেন যে ইউরোপীয় আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ বাংলার মাটির লোকায়ত সংস্কৃতির সাথে মেলে না।

সলিমুল্লাহ খান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন যে, ছফার ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ কোনো সাময়িক ক্ষোভ ছিল না, বরং তা ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ বিরুদ্ধে এক অসামান্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। তিনি আরও মনে করেন, ছফার ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটি এডওয়ার্ড সাঈদের ‘অরিয়েন্টালিজম’ বা ফ্রান্তজ ফানোর উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের সমতুল্য, যা এই অঞ্চলের মানুষের ঐতিহাসিক জড়তা ও পরিচয়হীনতার মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করেছে।

সলিমুল্লাহ খান অত্যন্ত দুঃখের সাথে আহমদ ছফার জীবন ও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক একাকীত্বকে একটি ‘জাতীয় ট্র্যাজেডি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, ছফা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠীর তল্পিবাহক না হওয়ায় সমকালীন রাষ্ট্র, সমাজ ও অ্যাকাডেমিয়া তাঁকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি, বরং তাকে কেবল একজন ‘উন্মাদ’ বা ‘প্রথাবিরোধী খ্যাপাটে’ মানুষ হিসেবে দেগে দিয়ে তাঁর ভেতরের খাঁটি রাষ্ট্রচিন্তককে আড়াল করতে চেয়েছে।

আহমদ ছফার চিন্তা ও সাহিত্যকর্মকে একসঙ্গে পড়লে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো একজন মানুষের, যিনি কখনো সহজ উত্তরে সন্তুষ্ট থাকেননি। তিনি জাতির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বুদ্ধিজীবীদের আত্মতুষ্টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনীতি ও সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এমনকি নিজের জীবনের অর্থ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রশ্ন তোলার সাহসই তাঁকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

আহমদ ছফা কোনো নিছক আবেগপ্রবণ সাহিত্যিক বা খবরের কাগজের কলামিস্ট ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের আদি ও অকৃত্রিম “পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল” (Public Intellectual), যিনি সমাজকে জাগিয়ে তুলতে নিজের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন। তাঁর চিন্তার মূল উত্তরাধিকার হলো—কোনো তত্ত্ব বা ক্ষমতাকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করা, সবসময় প্রশ্ন তোলা।

আজকের একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-সত্য (Post-truth) এবং কর্পোরেট পুঁজিবাদের যুগে, যখন বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব বিশ্বজুড়ে এক নতুন রূপ নিয়েছে, সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে এবং চিন্তার স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, তখন আহমদ ছফার দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের শিকড়ে পা রেখে বিশ্বকে দেখতে হয়, কীভাবে রাষ্ট্রের সমস্ত দমনপীড়নের সামনে দাঁড়িয়েও সত্য উচ্চারণ করতে হয়। আহমদ ছফা কোনো সুদূর অতীতের ঐতিহাসিক চরিত্র নন; তিনি সমকালীন ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের এক অবিনাশী বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বাতিঘর।

বাংলাদেশ যখন আজও তার আত্মপরিচয়, ইতিহাস, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বন্দ্বে জর্জরিত, তখন আহমদ ছফার লেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সহজ উত্তর খোঁজা নয়, কঠিন প্রশ্ন তোলাই বুদ্ধিজীবীর প্রকৃত দায়িত্ব। তাঁর “বাঙালি মুসলমানের মন”, “যদ্যপি আমার গুরু”, এবং “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস”-এর মতো গ্রন্থ তাই শুধু সাহিত্যিক দলিল নয়, বরং বাংলাদেশকে বোঝার এক অপরিহার্য মানচিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *