
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক বিস্ময়কর প্রতিভা ।
তাঁকে আমরা বিদ্রোহী কবি বলি, কিন্তু তাঁর বিদ্রোহের ভেতরে ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তাঁকে সাম্যের কবি বলি, কিন্তু তাঁর সাম্যের স্বপ্ন ছিল কেবল রাজনৈতিক সমতার স্বপ্ন নয়—তা ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তাঁকে প্রেমের কবি বলি, কিন্তু তাঁর প্রেম শুধু নর-নারীর আকর্ষণে সীমাবদ্ধ নয়; সেখানে আছে প্রকৃতি, দেশ, সৃষ্টিকর্তা এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি এক অনির্বচনীয় টান।
আবার তাঁকে সংগীতের মানুষ বললেও তাঁর পরিচয় শেষ হয় না, কারণ তাঁর সুরের ভুবন এতটাই বিস্তৃত যে সেখানে মসজিদের আজানের ধ্বনি, মন্দিরের ঘণ্টা, শ্যামাসংগীতের আবেগ, গজলের ব্যাকুলতা, রাগসংগীতের গাম্ভীর্য এবং লোকজ জীবনের সহজ সুর একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।
তিনি ছিলেন কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, সুরকার ও সংগীতস্রষ্টা—সর্বোপরি মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার কণ্ঠস্বর। তাঁর কলমে যেমন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অগ্নি জ্বলে উঠেছে, তেমনি তাঁর গানে ধ্বনিত হয়েছে প্রেম, ভক্তি, সাম্য ও মানবতার সুর। ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজের নানা বিভাজন অতিক্রম করে তিনি নির্মাণ করেছেন এক অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার শিল্পভুবন। তাই কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বাংলা সাহিত্যের একজন মহান স্রষ্টা নন; তিনি বাঙালির সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনিবার্য নাম।
তিনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেননি, কিন্তু বাংলাদেশের আত্মিক ইতিহাসে তাঁর অবস্থান এমন গভীরে যে তাঁকে বাদ দিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় কিংবা মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না। নজরুল তাই শুধু একজন কবি নন; তিনি বাংলাদেশের চেতনার এক প্রাচীন অথচ আজও জাগ্রত উৎস।
নজরুলের জন্ম ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে, এমন এক সময়ে যখন উপমহাদেশের মানুষের জীবন ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক বৈষম্যের ভারে আক্রান্ত। তাঁর শৈশবের দারিদ্র্য এবং পরবর্তী জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁকে বইয়ের পাতার বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন সমাজের উঁচু-নিচু বিভাজন, দেখেছিলেন ক্ষমতার সামনে মানুষের অসহায়তা। ফলে তাঁর সাহিত্য কোনো নির্জন কল্পলোক থেকে জন্ম নেয়নি; জন্ম নিয়েছে জীবনের উত্তাপ থেকে। এই বাস্তববোধই তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে এত গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ ইতিহাস। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে শুরু করে ভাষার অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং অবশেষে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—এই ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে রয়েছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। নজরুলের সাহিত্যেও সেই আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে উপস্থিত। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের সময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি, কিন্তু যে আত্মমর্যাদাবোধ পরবর্তীকালে বাঙালিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শক্তি দিয়েছে, তার সাহিত্যিক প্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী রূপ আমরা নজরুলের মধ্যে পাই।
নজরুলের বিদ্রোহ ছিল কোনো একক শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষণিকের ক্রোধ নয়। তাঁর বিদ্রোহের লক্ষ্য ছিল মানুষের ওপর প্রতিষ্ঠিত সব ধরনের অন্যায় ও দাসত্ব। ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় ভণ্ডামি কিংবা মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্য—সবকিছুর বিরুদ্ধেই তাঁর কলম ছিল উচ্চকণ্ঠ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই চেতনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুধু ভূখণ্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতিগত মর্যাদার প্রশ্ন। নজরুলের সাহিত্য সেই মর্যাদাবোধকে বহু আগেই ভাষা দিয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছিল যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিচয়ও মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন। নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতের সঙ্গে এই চেতনার একটি গভীর মিল রয়েছে। তিনি বাংলা ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে আরবি-ফারসি, সংস্কৃত, দেশজ ও লোকভাষার শব্দ মিলেমিশে এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক জগৎ সৃষ্টি করেছে। তাঁর ভাষা কোনো সংকীর্ণ শুদ্ধতার কারাগারে বন্দী ছিল না। তিনি বাংলা ভাষার ভেতরে বহুস্বরের সম্ভাবনা দেখেছিলেন।
এই দৃষ্টিতে নজরুলের ভাষা-ব্যবহার বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি প্রতীক। বাংলাদেশে বাঙালি সংস্কৃতি কখনো একরৈখিক ছিল না। নদী, মাটি, কৃষিজীবন, সুফি-সাধক, বৈষ্ণব ঐতিহ্য, ইসলামি সংস্কৃতি, লোকসংগীত, মঙ্গলকাব্য, বাউল এবং আধুনিকতার নানা প্রবাহ মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই ভূখণ্ডের সংস্কৃতি। নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতেও এই বহুত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি একই সৃষ্টিশীল সত্তায় গজল এবং শ্যামাসংগীতকে ধারণ করেছেন; ইসলামী ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণকে ব্যবহার করেছেন; শাস্ত্রীয় রাগসংগীতের পাশাপাশি লোকজ সুরকেও গ্রহণ করেছেন। তাঁর শিল্প তাই এক ধরনের সাংস্কৃতিক মিলনভূমি।
বাংলাদেশের সমাজে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। কিন্তু এই ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে উপমহাদেশের ইতিহাসে বহু বিভাজনও তৈরি হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উদাহরণ। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হলেও মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা যে কেবল ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, পূর্ববাংলার ইতিহাস তার প্রমাণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলার মানুষ ক্রমে উপলব্ধি করেছিল যে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রাজনৈতিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ।
নজরুলের সাহিত্য এই জাতীয়তাবাদকে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নির্মাণ করেনি, কিন্তু তাঁর মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা পরবর্তী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তির সঙ্গে গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি হিন্দু-মুসলমানকে দুই বিপরীত শিবির হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বৃহত্তর। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর প্রতি নিবেদন যেমন আছে, তেমনি আছে কালী ও শ্যামার প্রতি ভক্তি। এই দ্বৈত নয়, বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ই বাংলাদেশের লোকজ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
নজরুলের গানকে বাংলাদেশের ইতিহাসের আলোকে পড়লে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—সংগীত এখানে শুধু বিনোদন নয়, সংগ্রামের ভাষাও। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গান মানুষের চেতনাকে সংগঠিত করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গান মানুষের ভয়কে সাহসে, বিচ্ছিন্নতাকে ঐক্যে এবং বেদনাকে প্রতিরোধে রূপান্তরিত করেছে। এই ঐতিহাসিক ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি নজরুলের সংগ্রামী সংগীত।
তাঁর ‘চল্ চল্ চল্’ গানটি বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যেও রয়েছে এক গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। গানটির আহ্বান কেবল এগিয়ে যাওয়ার নয়; এটি স্থবিরতার বিরুদ্ধে মানুষের যাত্রার আহ্বান। বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা আন্দোলন ও সংগ্রামের সঙ্গে এই গতিময়তার এক স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। নজরুলের গান তাই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই এমন এক মানসিক ভূমি প্রস্তুত করেছিল, যেখানে স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, মানুষের অস্তিত্বের দাবি।
তবে নজরুলের সংগীতের গুরুত্ব শুধু দেশাত্মবোধক গানে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁর প্রেমের গান, গজল, ইসলামী সংগীত, শ্যামাসংগীত ও রাগাশ্রিত গান একটি বিস্তৃত সংগীতভুবন সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি নজরুলসংগীত বাঙালির আধুনিক সংগীতচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাঁর গানে একদিকে আছে শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিশীলন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অনুভূতির সহজ ভাষা।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে নজরুলের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এই যে, তিনি সংস্কৃতিকে কোনো একটি মাত্র পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ হতে দেননি। তাঁর শিল্পে ধর্ম আছে, কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামি নেই; দেশপ্রেম আছে, কিন্তু অন্য জাতির প্রতি বিদ্বেষ নেই; বিদ্রোহ আছে, কিন্তু মানবতার প্রতি আস্থা হারিয়ে যায় না। তাঁর এই ভারসাম্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চিন্তার জন্য আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬০-এর দশকে পূর্ববাংলায় যখন বাঙালি সংস্কৃতির ওপর নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাপ তৈরি হচ্ছিল, তখন রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলও হয়ে ওঠেন বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা গান, কবিতা, নাটক ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাঙালি তার স্বতন্ত্র সত্তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের পেছনে যে সাহিত্যিক উত্তরাধিকার কাজ করেছিল, নজরুল তার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিনিধি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড়। একটি জাতি তখন অস্ত্র হাতে যেমন যুদ্ধ করেছে, তেমনি গান, কবিতা ও শিল্পের মধ্য দিয়েও নিজের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছে। নজরুল সেই সময় শারীরিকভাবে সক্রিয় সৃষ্টিশীলতার অবস্থায় ছিলেন না, কিন্তু তাঁর বিদ্রোহী চেতনা এবং স্বাধীনতার গান মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মিশে গিয়েছিল। তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার যেন বহু আগে থেকেই বাঙালিকে শিখিয়েছিল—অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে নিজের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালে তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা ছিল শুধু একজন অসুস্থ কবিকে সম্মান জানানোর ঘটনা নয়; এর মধ্যে ছিল নতুন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণেরও একটি প্রতীকী অর্থ। যে রাষ্ট্র ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে, তার জাতীয় কবি হিসেবে নজরুলের প্রতিষ্ঠা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কিন্তু নজরুলকে শুধু রাষ্ট্রের জাতীয় কবির আসনে বসিয়ে স্মরণ করলেই তাঁর পাঠ সম্পূর্ণ হয় না। তাঁকে ফিরে ফিরে পড়তে হয় বর্তমানের প্রশ্ন নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন গণতন্ত্র, সাম্য, মানুষের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ওঠে, তখন নজরুলের সাহিত্য নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। সমাজে যখন ধর্মের নামে বিভাজন দেখা দেয়, তখন তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের প্রশ্ন করে। যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে, তখন তাঁর সর্বহারার প্রতি সহমর্মিতা আমাদের সামনে ফিরে আসে। আর যখন মানুষের কণ্ঠস্বর দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন তাঁর বিদ্রোহী কবিসত্তা আবারও উচ্চারণ করে মানুষের স্বাধীনতার কথা।
নজরুল বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হয়েছিলেন এক প্রবল অভিঘাতের মতো। তাঁর আগমনের সময় বাংলা কবিতা ইতিমধ্যেই রবীন্দ্রনাথের বিশাল সৃষ্টিশক্তির আলোয় উদ্ভাসিত। কিন্তু সেই আলোয় নিজস্ব কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। নজরুল সেই সহজ পথ নেননি। তিনি এসেছিলেন নিজের ভাষা, নিজের ছন্দ, নিজের আবেগ এবং নিজের সময়ের অস্থিরতা নিয়ে। তাঁর কবিতায় ছিল গতি, সংঘর্ষ, বিস্ফোরণ ও উচ্ছ্বাস। তিনি বাংলা কবিতার শান্ত জলের ওপর যেন হঠাৎ এক ঝঞ্ঝার জন্ম দিয়েছিলেন।
নজরুলের সাহিত্যিক শক্তির মূলেও রয়েছে তাঁর অসাধারণ বৈচিত্র্য। তিনি কবিতা লিখেছেন, কিন্তু শুধু কবি নন; তিনি গল্প লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন এবং বিপুলসংখ্যক গান সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সাহিত্যিক জীবন যেন একটি বহমান নদী, যার বিভিন্ন মোহনা বিভিন্ন শিল্পধারায় গিয়ে মিশেছে। ‘অগ্নিবীণা’ থেকে ‘বিষের বাঁশী’, ‘সাম্যবাদী’ থেকে প্রেমের কবিতা—প্রতিটি পর্যায়ে আমরা নতুন এক নজরুলকে পাই।
তাঁর ভাষাও ছিল তাঁর বিদ্রোহের অংশ। বাংলা সাহিত্যকে তিনি শব্দের নতুন ভাণ্ডার দিয়েছেন। আরবি-ফারসি শব্দের শক্তিশালী ব্যবহার, সংস্কৃত শব্দের গাম্ভীর্য এবং দেশজ শব্দের প্রাণবন্ততা—সব মিলিয়ে তিনি এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় শব্দ কখনো তরবারির মতো ঝলসে ওঠে, কখনো বাঁশির সুরের মতো কোমল হয়ে যায়। এই ভাষিক বৈচিত্র্য বাংলাদেশের বাংলা ভাষার বহুমাত্রিক চরিত্রের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
নজরুলসংগীত বাংলা গানের জগতে একটি স্বতন্ত্র মহাদেশ। এখানে প্রেমের গান আছে, দেশাত্মবোধক গান আছে, গজল আছে, শ্যামাসংগীত আছে, ভক্তিগীতি আছে, রাগাশ্রিত সংগীত আছে, লোকসুরের ব্যবহার আছে। তিনি বাংলা গানকে শুধু বিষয়বৈচিত্র্য দেননি, সুরের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে গেছেন।
নজরুলের সংগীতপ্রতিভির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর গ্রহণক্ষমতা। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ-রাগিণী ব্যবহার করেছেন, আবার সেই সুরকে বাঙালির ভাষা ও অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্যের সংগীতধারার প্রভাব গ্রহণ করে বাংলা গজলকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। আবার বাংলার লোকজ সুর থেকেও গ্রহণ করেছেন সহজাত প্রাণ। ফলে তাঁর গান একই সঙ্গে শাস্ত্রীয়, আধুনিক ও লোকজ অনুভূতির মিলনক্ষেত্র।
তাঁর গানের ভাষাও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নজরুল শব্দকে শুধু অর্থ প্রকাশের জন্য ব্যবহার করেননি; শব্দের মধ্যেও তিনি সুর খুঁজেছেন। তাঁর গানের পঙ্ক্তিগুলো পড়লেও অনেক সময় মনে হয়, সুর যেন শব্দের মধ্যেই ঘুমিয়ে আছে। কোথাও শব্দ দ্রুত ছুটে চলে, কোথাও থেমে যায়, কোথাও দীর্ঘশ্বাসের মতো প্রসারিত হয়। তাঁর সংগীতের এই ভাষাশৈলী তাঁকে বাংলা গানের অন্যতম প্রধান কবি করে তুলেছে।
নজরুলকে বোঝার জন্য তাঁর প্রেমের সাহিত্যকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ বিদ্রোহী মানুষের হৃদয়ে প্রেম না থাকলে সেই বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত কেবল ধ্বংসের ভাষা হয়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। তাঁর বিদ্রোহের কেন্দ্রে ছিল মানুষকে ভালোবাসার শক্তি। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছেন কারণ তিনি মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর প্রেম তাই ব্যক্তিগত আবেগ থেকে মানবিক আদর্শ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই অর্থে নজরুলের সমগ্র সাহিত্যকে একটি শব্দে ধরতে হলে হয়তো বলতে হয়—মুক্তি। তাঁর কবিতায় মুক্তি আছে রাজনৈতিক শাসন থেকে, তাঁর সাম্যবাদী চেতনায় মুক্তি আছে সামাজিক বৈষম্য থেকে, তাঁর প্রেমে মুক্তি আছে হৃদয়ের সংকীর্ণতা থেকে, তাঁর সংগীতে মুক্তি আছে সংস্কৃতির সীমারেখা থেকে এবং তাঁর মানবতাবাদে মুক্তি আছে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন থেকে।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে নজরুলকে নতুনভাবে পাঠ করার প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ একটি জাতি কেবল তার অতীত স্মরণ করে টিকে থাকে না; সে অতীতের আদর্শকে বর্তমানের প্রশ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। নজরুল আমাদের শেখান প্রতিবাদ করতে, কিন্তু ঘৃণা করতে শেখান না। তিনি সাম্যের কথা বলেন, কিন্তু মানুষের স্বতন্ত্রতাকে অস্বীকার করেন না। তিনি ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করেন, কিন্তু ধর্মের নামে মানুষের বিভাজনকে সমর্থন করেন না। তিনি দেশকে ভালোবাসেন, কিন্তু তাঁর মানবতা দেশের সীমানায় থেমে থাকে না।
কাজী নজরুল ইসলাম তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রান্তে রাখা কোনো স্মারক নন। তিনি এই দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার চলমান অংশ। ভাষা আন্দোলনের আত্মমর্যাদা, স্বাধিকার সংগ্রামের প্রতিবাদ, মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন—সবকিছুর সঙ্গে তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
নজরুলকে পড়া মানে তাই কেবল অতীতের এক মহান কবিকে স্মরণ করা নয়। নজরুলকে পড়া মানে বাংলাদেশের ইতিহাসকে তার সাংস্কৃতিক গভীরতায় পড়া; তার রাজনীতিকে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে পড়া; তার সমাজকে সাম্য ও বৈচিত্র্যের আলোয় পড়া। তাঁর অগ্নিবীণা এখনো আমাদের সময়ের দরজায় কড়া নাড়ে। কখনো সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রধ্বনি হয়ে ওঠে, কখনো প্রেমের গান হয়ে হৃদয় স্পর্শ করে, কখনো ধর্মের বিভাজন অতিক্রম করে মানুষের কাছে মানুষকে ফিরিয়ে দেয়।
এই কারণেই কাজী নজরুল ইসলাম কোনো একটি যুগের কবি নন। তিনি বাংলাদেশের অতীতেরও, বর্তমানেরও—এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেরও কবি। তাঁর কণ্ঠ যতবার শোনা হবে, বাঙালি ততবার নিজের ইতিহাস, নিজের সংস্কৃতি এবং নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়াবে।
সময়ের পর সময় পেরিয়ে গেছে, সমাজ বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে, মানুষের ভাষা ও জীবনযাপন বদলেছে। কিন্তু নজরুলের প্রশ্নগুলো এখনো শেষ হয়ে যায়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠ কি যথেষ্ট শক্তিশালী? ধর্মের নামে বিভেদ কি সত্যিই শেষ হয়েছে? মানুষ কি সত্যিই মানুষের মর্যাদা পেয়েছে? প্রেম কি এখনো আমাদের বিভাজনের চেয়ে শক্তিশালী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা আবার নজরুলের কাছে ফিরে আসি। কারণ নজরুল কোনো অতীতের স্মৃতিস্তম্ভ নন। তিনি আজও এক জীবন্ত প্রশ্ন, এক জাগ্রত বিবেক, এক অনন্ত সুর। তাঁর হাতে ধরা অগ্নিবীণা এখনো আমাদের সময়ের অন্ধকারে বাজে—কখনো বিদ্রোহের বজ্রধ্বনিতে, কখনো প্রেমের মৃদু গুঞ্জনে, কখনো মানুষের মুক্তির অমর আহ্বানে।
