কাজী নজরুল ইসলাম : চির-উন্নত শির

share on:
কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের এক দরিদ্র পরিবারের দুখু মিয়া হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৫শে মে।

আর মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি। মাঝে ৭৭ বছর জুড়ে ছিল সৃষ্টি ও সৃজনশীলতার এক বিশাল ইতিহাস। কাজী নজরুল ইসলাম যার গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবন সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে।

দাসত্বের শৃঙ্খলে বদ্ধ জাতিকে শোষণ ও উৎপীড়ন থেকে মুক্ত হবার ডাক দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘বল বীর বল উন্নত মম শির,…যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না -বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত!’

কাজী নজরুল ইসলাম সব ধর্মের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তাঁর একটি কবিতার বিখ্যাত একটি লাইন ছিল – ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’

বাবা ছিলেন কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহিদা খাতুন। বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাযারের খাদেম। দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করা নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মভিত্তিক। তাঁর ভবঘুরে বাল্যকাল আর তাঁর স্কুল শিক্ষা নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে।

মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯০৮ সালে তিনি পিতৃহারা হন। অল্প বয়স থেকেই তিনি লোকসঙ্গীত রচনা শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে- চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান।

অল্প বয়সে স্থানীয় মসজিদে তিনি মুয়াজ্জিনের কাজ করেছিলেন। কৈশোরে ভ্রাম্যমাণ নাটক দলের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে সাহিত্য, কবিতা ও নাটকের সঙ্গে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে বাল্যকালে খানসামা ও চায়ের দোকানে রুটি বানানোর কাজ করেছেন।

তরুণ বয়সে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন নজরুল । ১৯১৭ সালের শেষভাগ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত কর্মজীবনের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক কর্পোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদারের পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

“করাচিতে গিয়েছিলেন ১৯১৭ সালে। স্বাধীনতা সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি যখন কলকাতা ফিরে গেলেন, তখন কিন্তু তাঁর মূল স্বপ্নই ছিল ভারতকে স্বাধীন করা। তিনি বহু লেখায় বলেছেন সশস্ত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে হবে।” বলেছেন নজরুল গবেষক জিয়াদ আলি।

করাচি সেনানিবাসে বসেই নজরুল যে রচনাগুলো লেখেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী, মুক্তি, হেনা, ব্যথার দান, মেহের নিগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধি ইত্যাদি। যুদ্ধ শেষে কলকাতায় এসে তিনি সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু করেন। তৎকালীন বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত কবির বাঁধনহারা, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, কোরবানি, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম সাহিত্যকর্মগুলো ব্যাপক সমাদৃত হয়। ১৯২১ সালের অক্টোবরে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেনাবাহিনীর কাজ শেষ করে কলকাতায় ফেরার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ১৯২২ সালে প্রকাশ করেন ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘ভাঙার গানের’ মতো কবিতা এবং ধূমকেতুর মতো সাময়িকী।

রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ১৯২২ সালে পত্রিকাটির ৮ নভেম্বরের সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একইদিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নেয়া হয়।

১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে জবানবন্দি দেন। তার এ জবানবন্দি বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ নামে বিশেষ সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

জাতীয়তবাদী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার জন্য বহুবার কারাবন্দী হয়েছিলেন নজরুল ইসলাম। জেলে বসেও ক্রমাগত লিখেছেন তিনি তাঁর এই সময়ের সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল প্রকট। সাংবাদিকতার মাধ্যমে এবং পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যকর্মে নজরুল শোষণের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

চুরুলিয়ায় কবি নজরুল ইসলামের জন্মভিটা যা এখন নজরুল অ্যাকাডেমি, তার পাশেই এই অনুষ্ঠান তৈরির সময় থাকতেন কবির এক ভ্রাতুষ্পুত্র কাজী মাজহার হোসেন, যিনি সেসময় ছিলেন অ্যাকাডেমির সাধারণ সম্পাদক।

“নজরুল ছিলেন সব ধর্মীয় চেতনার ঊর্ধ্বে। অন্তরে তিনি না ছিলেন হিন্দু না ছিলেন মুসলিম। তাঁর একটি কথাতেই এটা ছিল পরিষ্কার- ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া’। তিনি সবার ঊর্ধ্বে ছিলেন মানবতার কবি। গোটা ভারতবর্ষেই তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।”

তবে নজরুল ইসলামের নাতি সাগর কাজী বলেছিলেন, তার বন্ধুবান্ধবরা নজরুল ইসলামকে মনের মন্দিরে বসিয়ে রেখেছেন। তারা মনে করেন নজরুল তাদের জন্য একজন পথের দিশারী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী নজরুল ইসলামকে বর্ণনা করেছিলেন ‘ছন্দ সরস্বতীর বরপুত্র’ হিসাবে। অনেক বিশ্লেষক বলেন তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে অমর করে রেখেছে।

নজরুলের প্রতিভার যে দিকটা ছিল অনন্য সেটা হল তাঁর বিদ্রোহী চেতনার বহি:প্রকাশ- সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি সব কিছুর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহে তিনি সোচ্চার হয়েছেন তাঁর সাহিত্যকর্ম ও সঙ্গীতে।

গবেষক জিয়াদ আলি বলেছেন, তিনি কিন্তু শুধু কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার, গল্পকার, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক কর্মীও।

“কখনও তিনি গান গাইছেন, কখনও পত্রিকা সম্পাদনা করছেন, কখনও রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করছেন। নজরুল সম্ভবত ওই সময়ের প্রথম বাঙালি, যিনি বাংলার নবজাগরণের যে ঐতিহ্য সেটা ধারণ করেছিলেন এবং তার মধ্যে দিয়ে তিনি বাঙালিকে একটা শক্ত, সবল নতুন চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।”

কলকাতায় অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত জীবন তাঁর সাহিত্যে বড়ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।

“নজরুল উঠে এসেছিলেন সমাজের অতি পেছিয়ে থাকা শ্রেণি থেকে। শুধু দারিদ্রই নয়, শিক্ষার অভাবের মধ্যে দিয়ে তিনি বড় হয়েছিলেন- প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে থেকে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাঁর জীবন কেটেছিল।”

নজরুল সম্পর্কে একাধিক গ্রন্থের লেখক অধ্যাপক মুস্তফা নুরুল ইসলাম বলেন, প্রতিকূলতায় ভরা ওই জীবনের মধ্যে দিয়েই তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল।

“তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ ছিলেন নজরুল। যে পথ দিয়ে তিনি গেছেন, যে প্রকৃতিতে তিনি লালিত হয়েছেন, যে পারিপার্শ্বিকতায় তিনি বেড়ে উঠেছেন, সেগুলো তাঁর অজান্তেই তাঁর ওপরে ছাপ ফেলে গেছে। তারই বহি:প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর গানে ও কবিতায়।”

গবেষক জিয়াদ আলী বলেন: ”কথিত আছে কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটে হ্যারিসন রোডের মুখে একটা রিক্সাওয়ালাকে তিনি একদিন রাত বারোটায় গিয়ে বলেছিলেন – এ্যাই তুই তো অনেককেই নিয়ে যাস্ রিক্সায় টেনে। ঠিক আছে আজ তুই রিক্সায় বোস্ আর আমি তোকে টেনে নিয়ে যাই।”

তাঁর সাহিত্যকর্মেও প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের প্রতি তাঁর অসীম ভালবাসা আর মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

নজরুল জীবনীকার অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, নজরুল তাঁর ধূমকেতু পত্রিকায় কংগ্রেস স্বাধীনতা দাবি করার আগেই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেছিলেন।

“সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথাও তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন।”

রফিকুল ইসলাম মনে করেন ”বাঙালি ঐতিহ্যের প্রধান যে দুটি ধারা হিন্দু এবং মুসলিম, তার সমান্তরাল উপস্থিতি এবং মিশ্রণ ঘটেছিল নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মে, সঙ্গীত সৃষ্টিতে এবং জীবনাচরণে, যা আর কোন কবি সাহিত্যিকের মধ্যে আমি দেখিনি।”

অধ্যাপক মুস্তফা নুরুল ইসলাম বলেন, “নজরুল যখন যুদ্ধ ফেরত কলকাতা শহরে এলেন, তখন তার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিল ভারতীয় উপমহাদেশে সেসময় আসা নতুন এক সাম্যবাদী চিন্তাচেতনার জোয়ার। সেই চিন্তাধারার মধ্যে ছিল নিচের তলার মানুষকে আপনজন ভাবতে শেখা। সাহিত্য যে শুধু এলিট বা শিক্ষিতদের জন্যই নয়, সেটা তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন।”

”সেই যুগে একটা ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়েছিল- যেটা হল দেশের স্বাধীনতার সঙ্গে সমাজ বিপ্লবকে মেলানো। স্বদেশী আন্দোলনে যারা যুক্ত ছিলেন তারা সমাজ বিপ্লবের কথা ভাবতেন না। কিন্তু এই বিপ্লব ছিল নজরুলের রক্তে,” বলেছেন অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায়।

অধ্যাপক মুস্তফা নুরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নজরুল চেয়েছিলেন।

“কিন্তু তিনি মনে করতেন এর পথে প্রধান বাধা সাম্প্রদায়িক সংঘাত। সেইজন্য তিনি দুর্গম গিরি কান্তার মরু গানে বলেছিলেন – হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন? কাণ্ডারী বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার। উপমহাদেশের রাজনৈতিক নেতারা, প্রধান যে সমস্যা- সাম্প্রদায়িক সমস্যা সেইদিকে মনোনিবেশ করেননি বলেই ভারত টুকরো হয়েছে।”

নবযুগ নামে একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এ.কে. ফজলুল হক। এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল ইসলাম নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন।

যে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে একটা নতুন যুগের জন্ম দিয়েছিলেন বলে বলা হয়, সেই রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই নজরুল বাংলা সাহিত্যে আরেকটা যুগের সূচনা করেছিলেন।

শিবনারায়ণ রায়ের মূল্যায়নে যারা সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়তে চাইছে তাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল নজরুল ইসলামের জ্বালাময়ী কবিতা – বিদ্রোহী।

“সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়ার চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল এই রচনায়। সেই কবিতা রাতারাতি তাঁকে একেবারে কেন্দ্রে বসিয়ে দিয়েছিল। তার পরবর্তী আট দশ বছর ধরে তিনি যে সাম্যের গান গাইলেন, নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বললেন, কৃষক মজুরের দুঃখের কথা বললেন, কৃষক শ্রমিক পার্টির হয়ে কাজ করলেন- এ সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়ে তাঁর যে মন প্রকাশ পেল তা ছিল একেবারে আলাদা। এর মধ্যে কোন আভিজাত্য নেই। একেবারে নিচ থেকে ওঠা মানুষের গান। তাদের কথা। যারা দলিত, যারা অত্যাচারিত যাদের ভাষা ছিল না, নজরুলের কলমে তারা ভাষা খুঁজে পেল।”

তিনি গল্প, উপন্যাস, নাটকও রচনা করেছিলেন। বাংলা ভাষায় একটা নতুন প্রাণ নতুন তারুণ্য নিয়ে এসেছিলেন। সৃষ্টি করেছিলেন একটা নিজস্ব ভাষার, যে ভাষার মধ্যে তিনি দেশজ বাংলার সঙ্গে সফলভাবে ঘটিয়েছিলেন বহু আরবি ও ফারসি শব্দের সংমিশ্রণ।

নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা করেছিলেন এবং অধিকাংশ গানে নিজেই সুরারোপ করেছিলেন যেগুলো এখন “নজরুল গীতি” নামে বিশেষ জনপ্রিয়। গজল, রাগপ্রধান, কাব্যগীতি, উদ্দীপক গান, শ্যামাসঙ্গীত, ইসলামী গান বহু বিচিত্রধরনের গান তিনি রচনা করেছেন।

রফিকুল ইসলামের মতে: “তিনি যেভাবে উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীত এবং বাংলার লোকোসঙ্গীতকে মেলালেন, এর আগে যথার্থ অর্থে সেভাবে বাংলা গান রাগসঙ্গীতকে অনুসরণ করেনি। তার ছিল এই মিশ্রণের অসামান্য প্রতিভা- সাহিত্যে, সঙ্গীতে, রাজনীতিতে, সমাজনীতিতে সর্বত্র তিনি এই সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন।”

“এক হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যে তাঁর মত অসাম্প্রদায়িক কবি আর দেখা যায়নি। তাঁর পরিচয় ছিল মানুষ হিসাবে,” বলেছেন অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায়।

“ওঁনার লেখার মধ্যে কখনই তিনি হিন্দু না মুসলমান তা প্রবল হয়ে দেখা দেয়নি। বাংলা ভাষায় আমার জানা মতে তিনিই একমাত্র কবি যিনি সমানভাবে হিন্দু ও মুসলমানদের বিশ্বাসের কথা, তাদের জীবনাচরণের পদ্ধতির কথা, তাঁর কাব্য ও সাহিত্যের মধ্যে তুলে ধরেছিলেন।”

মধ্যবয়সে এক দুরারোগ্য রোগে কবি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। ১৯৭২ সালে ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এ সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। যদিও মৃত্যুর ৪৪ বছর পরেও কাজী নজরুল ইসলামের জাতীয় কবির স্বীকৃতি সরকারি গেজেটে না আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কবি পরিবারের সদস্যরা।

কবির নাতনী খিলখিল কাজী বলেছেন, এভাবে চললে কয়েক যুগ পর নব প্রজন্ম জাতীয় কবিকে বিস্মৃত হতে পারে। সে কারণেই সরকারি গেজেটের মাধ্যমে জাতীয় কবির স্বীকৃতি হওয়া উচিৎ। ১৫ -১৬ বছর হয়ে গেছে এটা নিয়ে (সরকারি গেজেট) কথা বলছি। সরকারিভাবে এটা এখনও করা হয়নি। আমার বক্তব্য, তিনি জাতীয় কবি, সরকারিভাবে গেজেট করা দরকার, আমি তা মনে করি। আমাদের পরিবারের দাবি এটা।

নজরুল সংগীত শিল্পী ফেরদৌস আরার কথায়ও জাতীয় কবির সরকারি স্বীকৃতির প্রসঙ্গটি আসে। তিনি বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় কবি, তা আমাদের মেধায় আছে, মননে আছে। কিন্তু তা কোনো সরকারি গেজেটে নেই। অনেকের কথা থাকে- লিখিত রাখার কি দরকার আছে? আমরা তো জানিই যে তিনি জাতীয় কবি। সে কথাই যদি হত, তাহলে কোথাও কোনো স্বীকৃতির প্রয়োজন হত না। কোথাও কোনো কাগজে লিখতে হত না। স্বাক্ষর-সিলের কোনো দরকার ছিল না। কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় কবি সে হিসেবেই স্বীকৃতি হওয়া উচিৎ। স্বাধীনতার এত বছর পরেও, আজকে তার ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী, এত দিনেও আমরা তাকে স্বীকৃতি দিতে পারিনি, এ লজ্জা আমাদের সবার।”

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, “অসুস্থ হবার আগে ৪০এর দশকে তিনি যখন জাতীয়তাবাদী মুসলিম পত্রিকা দৈনিক নবযুগের প্রধান সম্পাদক ছিলেন তখন একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘বাঙালির বাংলা’। সেখানে তিনি লিখেছিলেন বাংলার সব শিশুকে, বালককে এই শিক্ষা দাও- এই মন্ত্র দাও যে বাংলা হচ্ছে বাঙালির- এখান থেকে রামাদের আর গামাদের অর্থাৎ মাড়োয়াড়ি আর পাঞ্জাবিদের বহিষ্কার করতে হবে এবং বলো -জয় বাংলার জয়।

“সাম্প্রদায়িকতার দিনে, যুদ্ধের দিনে, দ্বিজাতি তত্ত্বের দিনে তিনি যেভাবে বাংলার জয়গান করে গেছেন এর কোন তুলনা বাংলা সাহিত্যে বিরল।”

নজরুলের সাহিত্য যেমন বিদ্রোহ, শান্তি, সাম্যবাদ সর্বহারার সাহিত্য তেমনি বিশ্ব বেদনার সাহিত্যও। তাঁর সাহিত্যসৃজনের সূচনা যেমন প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে; সমাপ্তি তেমনি তৃপ্তি-অতৃপ্তির আস্বাদনের ভেতর দিয়ে। সমকালীন শোষিত-মজলুম মানুষের স্বপক্ষে তাঁর কলম বেদনামথিত হয়েই উচ্চকিত। সময়ের যোগ্য দায়িত্ব তিনিই কর্মীকবি হিসেবে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এ জন্য তাঁর কবিতায় করুণরসের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ-শান্তি, স্বাধীনতা, সর্বহারা-সাম্যবাদ প্রাধান্য পেয়েছে। উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত মানুষের শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবির প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল পূর্ণ-স্বাধীনতার প্রতি।

এ জন্য জীবনানন্দ দাশ বলেছেন- ‘তাঁর জনপ্রেম, দেশপ্রেম ঊনিশ শতকের বৃহৎ ধারার সঙ্গে একাত্ম। জন ও জনতার বন্ধু দেশপ্রেমিক কবি নজরুলকে তিনি চিহ্নিত করেছেন ঊনিশ শতকের ইতিহাস প্রান্তিক শেষ নিঃসংশয়তাবাদী কবি হিসেবে। বাংলার মাটি থেকে জেগে, এ মৃত্তিকাকে প্রকৃতপক্ষে ভালোবেসেছিলেন নজরুল এবং তাঁর বিদ্রোহ তাঁকে মানুষের আশা ভরসার ভারকেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছে। জনমানস এই কবির মধ্যেই তাদের প্রার্থিত স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পেয়েছিল। এ জন্য নতুন সময় ও যুগের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কবিদের মর্ম ভিন্নতর হলেও দেশ ও দেশীয়দের বন্ধুকবি হিসেবে নজরুল আজও অদ্বিতীয়।’

সমসাময়িক প্রাবন্ধিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন ১৯২৭ সালেই লিখেছেন, ‘নজরুল ইসলাম বেদনার কবি। তাঁহার প্রায় সমস্ত রচনাই বেদনার সুরে ভরপুর। আর্ত-ব্যথিত-উৎপীড়িত মানবমনের ব্যথাকেই তাঁহার রচনার মধ্য দিয়া তিনি ফুটাইয়া তুলিতেছেন। বেদনা ব্যক্তিগত মনের অভিব্যক্তি হইলেও ইহার অনুভূতি বিশ্ববাসীর মনেই খেলা করে। সুতরাং বেদনা একটা বিশ্বজনীন অনুভূতি। কাব্যকার যখন ব্যক্তিগত বেদনার কথা ভুলিয়া বিশ্ববাসীর মনে একটা সহানুভূতির তরঙ্গ তুলিতে পারেন, তাহার রচনার ইন্দ্রজালে যখন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত বেদনার কথা ভুলিয়া সমগ্র বিশ্বমনের বেদনাবোধের সহিত নিজ মনের যোগ সাধন করিতে পারে, তখনি কাব্যকারের রচনা সফল হয়- তখনি তাহার রচনা বিশ্বসাহিত্যে স্থান লাভের যোগ্য হয়। নজরুলের কাব্যে বেদনার এই বিশ্বরূপ আছে বলিয়াই তাঁহার কাব্যকে আমরা বিশ্বসাহিত্য বলিয়া অভিনন্দন করি।’

১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয় এবং ‘একুশে পদক’ দেয়া হয়। ১৯৭৬ সালে ২৯শে অগাস্ট ((১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র) ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবির জীবনাবসান হয়।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : চেতনায় নজরুল । ফকির আলমগীর।

Facebook Comments Box
share on: