
আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের প্রাণকেন্দ্র, বাংলাদেশের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সুপরিচিত হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী এখানে আসেন, মানত করেন এবং মাজারের দানবাক্সগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই পবিত্র স্থানের দানকৃত অর্থ, জেলা প্রশাসনের তদারকি এবং অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন বিতর্ক। প্রশাসনের উদ্যোগ থেকে শুরু করে কর্মকর্তা প্রত্যাহার ও অর্থ লোপাটের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সিলেটে এখন এটিই সবচেয়ে বড় টক অব দ্য টাউন।
ডিসির বিশেষ উদ্যোগ ও দানবাক্স সীলগালাঃ
দীর্ঘদিন ধরেই শাহজালাল মাজারের দানবাক্সের টাকা সংগ্রহ, গণনা এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ছিল। মাজারের মোতাওয়াল্লী ও একটি নির্দিষ্ট কমিটির মাধ্যমে এই অর্থ পরিচালিত হলেও হিসাব-নিকাশে এক ধরণের ধোঁয়াশা রয়ে গিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাজারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি কঠোর ও নজিরবিহীন উদ্যোগ নেন। সরকারি প্রজ্ঞাপন ও আইনগত এখতিয়ারের ওপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারের সিন্দুক ও দানবাক্সগুলো সীলগালা করা হয় এবং প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতিতে টাকা গণনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বলা হয়, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একটি একাউন্ট খোলা হয়েছে এবং এখন থেকে মাজারের টাকা একটি ব্যাংক হিসেবে রাখা হবে।
ডিসির এই উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে, কারণ তারা আশা করেছিলেন এবার মাজারের টাকার প্রকৃত হিসাব ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
এসব ঘটনার মধ্যেই মাজারকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পক্ষ-বিপক্ষে নানা বক্তব্য আসছে। একপক্ষ বলছে, মাজারে আসা ‘বিপুল পরিমাণ দান’ কিছু ব্যক্তি ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
আবার মাজার ব্যবস্থাপনায় থাকা খাদেমরা বলছেন, এটি খাদেমদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ। ফলে তারাই আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা করেন এবং তারা মনে করেন প্রশাসনের এখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
কি পরিমাণ দান আসে মাজারেঃ
শাহজালালের মাজারে এবারই প্রথম দানের ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে গণনার আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন। সোমবার ২২শে জুন এই গণনায় প্রায় সাড়ে সতের লাখ টাকা আর কিছু বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে।
এর আগে ১৮ই জুন বৃহস্পতিবার মাজারে দানের জন্য ব্যবহৃত বড় তিনটি ডেগ বা পাতিল সিলগালা করে দেওয়া হয়, যাদের দানের টাকা বের করা না যায়। সেই সাথে নতুন দানবাক্স বসিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
ফলে চার দিনে সাড়ে সতের লাখ টাকা পাওয়ার পর মাজারে আসলে কী পরিমাণ অর্থ দান বা লোকজনের মানত থেকে আসে সেই আলোচনা জোরদার হয়ে ওঠে।
এসব আলোচনার মধ্যেই এ প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে যে, মাজারের টাকা আসলে যায় কোথায়?
কেরানীর বিরুদ্ধে টাকা লুটপাটের চাঞ্চল্যকর অভিযোগঃ
ডিসি প্রশাসনের এই কড়াকড়ির মধ্যেই মাজারের ভেতরের গোপন দুর্নীতির চিত্র সামনে চলে আসে। মাজারের দীর্ঘদিনের এক বিশ্বস্ত কেরানী (অফিস সহকারী)-র বিরুদ্ধে মাজারের তহবিল এবং দানবাক্সের টাকা পদ্ধতিগতভাবে লুটপাট ও আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগে জানা যায়, প্রশাসনের নজরদারির বাইরে বিভিন্ন সময়ে দানবাক্স থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সরিয়ে ফেলা হতো। ব্যাংকে জমা দেওয়ার নথিতে গরমিল এবং ভুয়া ভাউচার তৈরি করে বছরের পর বছর এই লুটপাট চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মাজারের সাধারণ ভক্ত এবং স্থানীয় জনতার মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কেরানীর এই বিপুল অর্থ লোপাটের পেছনে মাজার সংশ্লিষ্ট আরও প্রভাবশালী কারও হাত রয়েছে কি না, তা নিয়ে জোর তদন্তের দাবি ওঠে।
মাজারের ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত খাদেম এবং সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব শাহজালাল প্রায় সাতশ বছর আগে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সিলেটে এসে ধর্মপ্রচার করেছিলেন।
প্রচলিত রয়েছে যে, শাহজালাল অবিবাহিত ছিলেন কিন্তু তার সঙ্গীরা পরিবারসহই সেখানে বাস করতেন। ফলে তখন থেকেই অনেকে নানা উপঢৌকন নিয়ে দরগায় আসতো যা শাহজালাল এসব পরিবারের মধ্যে বিতরণ করতেন।
এসব পরিবারগুলোই মূলত শাহজালালের দরগার খাদেম বা সেবক হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে এসব পরিবারগুলো বড় বড় হতে এখন প্রায় তিনশ পরিবার রয়েছে।
মাজার কর্তৃপক্ষের প্রতিরোধ ও ‘ডিসি প্রত্যাহার’ নাটকীয়তাঃ
জেলা প্রশাসনের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং কেরানীর দুর্নীতির বিষয়গুলো সামনে আসায় মাজারের ঐতিহ্যবাহী কমিটি এবং একটি স্বার্থান্বেষী মহল তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাদের দাবি ছিল, মাজারের নিজস্ব সিনিয়রিটি ও মোতাওয়াল্লী প্রথার ওপর প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপ মাজারের স্বায়ত্তশাসন এবং শত বছরের ঐতিহ্যের পরিপন্থী।
যদিও মাজার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সরকার কিংবা সিটি কর্পোরেশন থেকেও বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয় করা হয়।
মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীটি প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ে লবিং শুরু করে। এই তীব্র প্রশাসনিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ও স্থানীয় উত্তেজনার মধ্যেই হঠাৎ করে সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি)-কে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে ‘নিয়মিত রদবদল’ বা ‘বদলি’ বলা হলেও, সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের ধারণা—মাজারের টাকার সুষম হিসাব ও দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ নেওয়ার কারণেই প্রভাবশালী মহলের চাপে ডিসিকে তড়িঘড়ি করে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও জনআকাঙ্ক্ষাঃ
ডিসি প্রত্যাহারের পর মাজারের টাকা গণনার সেই কঠোর উদ্যোগ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে এবং অভিযুক্ত কেরানীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া কতটা কঠোরভাবে এগোবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে।
সিলেটের সাধারণ মানুষের দাবি, ব্যক্তি বা প্রশাসন যে-ই আসুক না কেন, ওলি-আউলিয়ার পবিত্র ভূমিতে ভক্তদের দেওয়া দানের একটি টাকাও যেন কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা কমিটির পকেটে না যায়। শাহজালাল মাজারের তহবিলের একটি অডিট (হিসাব নিরীক্ষা) হওয়া এখন সময়ের দাবি।
উদ্যোগ, লোপাট আর প্রত্যাহারের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে মাজারের অর্থ যাতে এতিমখানা, লঙ্গরখানা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে স্বচ্ছতার সাথে ব্যয় হয়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ।
শাহজালাল মাজার তালিকাভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তি। ১৯১৩ সালের আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে যত মাজার, ইদগাহ, কবরস্থান, মসজিদ আছে সবই বাইডিফল্টট ওয়াক্ফ।
প্রসঙ্গত, সরকার ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ওয়াকফ প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। যিনি ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপনাকে মুতওয়াল্লি বলা হয়। তাঁকে মৌখিকভাবে কিংবা যে চুক্তি বা দলিল অনুযায়ী ওয়াক্ফ করা হয়েছে তার দ্বারা নিয়োগ দেওয়া হয়।
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ওয়াক্ফ এস্টেট সারাদেশে প্রায় ২২ হাজার। এগুলোর অধীনে জমি আছে চার লাখ ২৪ হাজার ৭৪ একর।
