
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প বর্তমানে এক গভীর কাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও নান্দনিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা ঘুরেফিরে কয়েকটি একই সমস্যার কথা বলি—সিনেমা হল কমে যাচ্ছে, দর্শক হলে যাচ্ছে না, ভালো সিনেমা হচ্ছে না, প্রযোজক বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন, সরকারি অনুদানের সিনেমা দর্শক পাচ্ছে না, বিকল্পধারার চলচ্চিত্রও একটি স্থায়ী দর্শকভিত্তি তৈরি করতে পারছে না।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব সমস্যাকে আমরা নিজস্ব অবস্থানের পারস্পেকটিভ থেকে বিচ্ছিন্ন একেকটি সমস্যা হিসেবে দেখি এবং এজন্য পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকি। কিন্তু এসব সমস্যাকে আলাদা আলাদা করে দেখলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রকৃত সংকটটি বোঝা মুশকিল। কারণ সমস্যাগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো একটি ভেঙে পড়া চলচ্চিত্র-ব্যবস্থার বিভিন্ন উপসর্গ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সংকট তাই কেবল ‘ভালো সিনেমা হচ্ছে না’—এই সরল উত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে একটি দুর্বল প্রযোজনা কাঠামো, অনির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ, ভঙ্গুর বিতরণব্যবস্থা, সংকুচিত প্রদর্শন অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত বিপণন সিস্টেম, দুর্বল পেশাদার প্রতিষ্ঠান এবং সবচেয়ে বড় কথা—একটি সুস্থ চলচ্চিত্র-ইকোসিস্টেমের অনুপস্থিতি।
বাংলাদেশে দুই ধরণের চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা আছে। একদিকে থিওডোর অ্যাডর্নো ও ম্যাক্স হর্কহাইমারের সংজ্ঞায়িত ‘সংস্কৃতি শিল্প’ (Culture Industry)-এর অবিকল অনুকরণে তৈরি হওয়া দেশীয় মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র, যা বহুলাংশে ফর্মুলাভিত্তিক স্থূলতা, ড্রয়িংরুম মেলোড্রামা ও মেধার শূন্যতায় আক্রান্ত; অন্যদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদী নন্দনতত্ত্বের ছায়ায় গড়ে ওঠা সমান্তরাল বা বিকল্প ধারা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় দর্শক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।
এই দ্বিমেরু কাঠামোর টানাপড়েনে বাংলা চলচ্চিত্রের নিজস্ব শৈল্পিক ভাষা ও টেকসই বাস্তুতন্ত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াটি বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। চলচ্চিত্র একই সাথে নান্দনিক শিল্পমাধ্যম এবং জটিল শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়া—এই দ্বৈত চরিত্র অনুধাবনে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই বাংলাদেশে কোনো সুসংহত ফিল্ম ইকোনমি, ফিল্ম কালচার, ইকোসিস্টেম বা শক্তিশালী সিনেমাটিক ডিসকোর্স গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র একসময় একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। পেশাদার প্রযোজক ছিলেন, পরিচালক ছিলেন, তারকা ছিলেন, স্টুডিও ছিল, পরিবেশক ছিলেন, হল ছিল এবং নিয়মিত দর্শকও ছিল। সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ধারাবাহিকতা। একটি সিনেমা ব্যর্থ হলেও পরের সিনেমা তৈরি হতো; একটি হল বন্ধ হলেও অন্য হলগুলো ব্যবসা করত; একজন পরিচালক একটি সিনেমার পর আরেকটি সিনেমায় কাজ করতেন; শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্যও কাজের ধারাবাহিকতা ছিল।
আজ নানান কারণে সেই ধারাবাহিকতাই ভেঙে গেছে। ফলে একটি সিনেমা এখন আর একটি বৃহত্তর শিল্পপ্রক্রিয়ার অংশ নয়; বরং প্রায় প্রতিটি সিনেমাই এক একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প। ফলে একজন পরিচালককে প্রতিবার নতুন করে প্রযোজক খুঁজতে হয়, প্রযোজককে নতুন করে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে হয়, সিনেমা শেষ হওয়ার পর নির্মাতাকে নতুন করে হল ও দর্শক খুঁজতে হয়। এই বিচ্ছিন্নতা কোনো শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
বাণিজ্যিক ধারার ক্ষয়িষ্ণু বাস্তুতন্ত্র মূলত মৌলিক ভাবনা ও প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্বের চরম সংকটে নিমজ্জিত। গত কয়েক দশক ধরে এ দেশের মূলধারা গল্প বলা ও নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাতে পারেনি; বরং নব্বই দশকের চর্বিতচর্বণ ফর্মুলা, অপেশাদার অভিনয় এবং সস্তা বিনোদনের ভেতর বন্দি থেকেছে। বিশেষ করে হিন্দি ও দক্ষিণী সিনেমার লোয়ার ভার্সন নির্মাণে ব্যস্ত থেকেছে বেশিরভাগ পরিচালক। সেই সঙ্গে নিম্নশ্রেণীর দর্শকের জন্য সিনেমার সঙ্গে কাটপিস জুড়ে দেওয়া, অশ্লীল গল্প বলার প্রবণতা সংকটকে ত্বরাণ্বিত করেছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও চলচ্চিত্র শিল্পটির বিকশিত হওয়ার পথে বাঁধা হয়ে থেকেছে বরাবরই।
সাথে যুক্ত হয়েছে প্রদর্শনী অবকাঠামোর ভয়াবহ ধস। একক পর্দার সিনেমা হলের দ্রুত বিলুপ্তি সাধারণ প্রান্তিক দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহবিমুখ করেছে, আর মুষ্টিমেয় মাল্টিপ্লেক্স মধ্যবিত্তের নির্দিষ্ট অংশের ভেতর সীমাবদ্ধ থেকে সামগ্রিক চলচ্চিত্র অর্থনীতির পরিপূরক হতে পারছে না। চিত্রনাট্য উন্নয়ন ও প্রি-প্রোডাকশনে সময় বা অর্থের বিনিয়োগ না করে কেবল তারকা-কেন্দ্রিকতার ওপর ভরসা করার ফলে বাণিজ্যিক সিনেমা তার বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও নান্দনিক প্রাসঙ্গিকতা দুটোই হারিয়েছে।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সংকটটি এই জায়গাতেই সবচেয়ে স্পষ্ট। আমরা ‘বাণিজ্যিক সিনেমা’ বলতে অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু উপাদান—তারকা, গান, অ্যাকশন, ঈদে মুক্তি কিংবা বড় বাজেট—বোঝাতে অভ্যস্ত। কিন্তু বাণিজ্যিক সিনেমার প্রকৃত অর্থ এগুলোর কোনোটিই নয়। বাণিজ্যিক সিনেমা হলো এমন চলচ্চিত্র, যার নির্দিষ্ট দর্শক আছে, যার জন্য বিনিয়োগের যুক্তি আছে, যার বাজার নির্ধারণ করা যায় এবং যা দর্শককে তার অর্থের বিনিময়ে একটি প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা দিতে পারে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র মানে কেবল জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা নয়; এটি একটি পেশাদার ব্যবসায়িক কাঠামোর অংশ।
বাংলাদেশে সেই কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়েছে। একটি বড় তারকা, একটি উৎসবকেন্দ্রিক মুক্তি এবং সীমিত সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চলচ্চিত্র ব্যবসাকে অস্বাভাবিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এর ফলে প্রযোজক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বদলে দ্রুত ফেরত আসার সম্ভাবনা খোঁজেন, পরিচালক নিরাপদ সূত্রের বাইরে যেতে ভয় পান এবং নতুন ধরনের গল্প, নতুন নির্মাতা কিংবা নতুন অভিনয়শিল্পীর জন্য জায়গা সংকুচিত হয়।
একটি শিল্পে যদি বিনিয়োগের বড় অংশ কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট তারকা ও উৎসবের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেখানে নিয়মিত চলচ্চিত্র তৈরি হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয় না। অথচ সাম্প্রতিক সময়ের কিছু সাফল্য আমাদের অন্য কথাও বলে। বাংলাদেশি দর্শক সিনেমা দেখতে চান না—এই ধারণা সঠিক নয়। ভালোভাবে নির্মিত, দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম সিনেমা এলে দর্শক এখনও অর্থ খরচ করে হলে যেতে প্রস্তুত। অর্থাৎ সংকটটি দর্শকের অস্তিত্বে নয়; সংকটটি নিয়মিতভাবে দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে এমন চলচ্চিত্র তৈরির সক্ষমতায়।
অন্যদিকে বিকল্পধারার চলচ্চিত্রের সংকটটি আরও জটিল। এই ধারায় বাংলাদেশ অসাধারণ কিছু নির্মাতা ও গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র পেয়েছে। আন্তর্জাতিক উৎসবে স্বীকৃতি, সমালোচকদের প্রশংসা কিংবা নান্দনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে বাংলাদেশের বিকল্পধারার চলচ্চিত্রের অর্জন কম নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সিনেমাগুলোর একটি স্থায়ী দর্শক ও বাজার কোথায়?
একটি সিনেমা যদি কয়েকটি উৎসবে প্রদর্শিত হয়, কিছু পুরস্কার পায়, চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশংসিত হয় এবং তারপর বৃহত্তর দর্শকের কাছে আর পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম হতে পারে; কিন্তু তা একটি শক্তিশালী চলচ্চিত্রশিল্প তৈরি করে না।
বিকল্পধারার চলচ্চিত্রেরও প্রযোজনা, বিপণন ও বিতরণের পেশাদার ব্যবস্থা প্রয়োজন। ‘বিকল্প’ মানেই দর্শকবিমুখ হওয়া নয়। বরং একটি সুস্থ চলচ্চিত্রশিল্পে একই সঙ্গে বড় বাজেটের জনপ্রিয় সিনেমা, মাঝারি বাজেটের genre film, ছোট বাজেটের পরীক্ষামূলক সিনেমা এবং স্বাধীন নির্মাতাদের চলচ্চিত্রের জায়গা থাকতে পারে।
বিকল্প ধারাও কাঠামোগতভাবে আত্মতুষ্টি ও বিচ্ছিন্নতার শিকার। বিকল্প ধারার বহু কাজ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নির্দিষ্ট কিউরেটরিয়াল এজেন্ডা কিংবা তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য ও ট্র্যাজেডি বিক্রির ফর্মুলায় আটকে গিয়ে স্থানীয় জনসংস্কৃতির সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। স্থানীয় সমাজবাস্তবতা, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আধুনিক ভিজ্যুয়াল ভাষায় রূপান্তরের যে সক্ষমতা ‘থার্ড সিনেমা’ আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল, তা এখানে অনুপস্থিত। অধিকন্তু, বিকল্প ধারার নির্মাতারা প্রায়ই চলচ্চিত্রকে একান্তই একজন পরিচালকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন, যার ফলে সুনির্দিষ্ট অডিয়েন্স সেগমেন্টেশন, বিপণন কৌশল এবং পরিবেশনার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-অর্থনৈতিক দিকগুলো পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যায়।
তার সঙ্গে আমাদের মধ্যে রয়েছে একটি পুরোনো এবং ক্ষতিকর দ্বন্দ্ব —বাণিজ্যিক সিনেমা বনাম শিল্পের সিনেমা। যেন বাজারের সিনেমা মানেই নিম্নমানের এবং বিকল্প সিনেমা মানেই উচ্চমানের—এই ধারণা যেমন ভুল, তেমনি দর্শকপ্রিয় সিনেমাকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা না করাও ভুল। পৃথিবীর প্রায় সব পরিণত চলচ্চিত্রশিল্পেই শিল্প ও বাজার পাশাপাশি কাজ করে। একটি বড় বাজেটের জনপ্রিয় সিনেমা যেমন দর্শক ও অর্থ তৈরি করে, তেমনি ছোট বাজেটের একটি পরীক্ষামূলক সিনেমা ভাষা ও চিন্তার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। মাঝখানে থাকে অসংখ্য সিনেমা, যেগুলো না পুরোপুরি mass entertainment, না পুরোপুরি festival cinema। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎও এই বৈচিত্র্যময় মধ্যবর্তী ক্ষেত্রটি তৈরি করার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।
এই জায়গায় সরকারি অনুদানের প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে আসে। চলচ্চিত্রে রাষ্ট্রীয় অনুদানের প্রয়োজন রয়েছে এবং তা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। সব গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা বাজারের অর্থ দিয়ে তৈরি হবে না। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, প্রান্তিক মানুষের জীবন, পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রভাষা কিংবা নতুন নির্মাতার প্রথম সিনেমা—এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একটি মৌলিক ভুল আমরা প্রায়ই করি: মনে করি, সিনেমা বানানোর জন্য টাকা দিলেই রাষ্ট্র চলচ্চিত্রের দায়িত্ব পালন করেছে। আসলে অনুদান একটি চলচ্চিত্রের কেবল একটি ধাপকে অর্থায়ন করে; সিনেমার জীবন শুরু হয় তার পরে।
একটি চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান দেওয়া হলো, সিনেমাটি কোনোভাবে নির্মিত হলো—তারপর কী? কে সেটির প্রচার করবে? কে দর্শক নির্ধারণ করবে? কে trailer, poster, publicity ও digital campaign করবে? কে সিনেমাটিকে দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছে দেবে? কে আন্তর্জাতিক উৎসবে পাঠাবে? কে OTT, television বা আন্তর্জাতিক বিক্রির সম্ভাবনা খুঁজবে? কে subtitle তৈরি করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে অনুদানের অর্থে একটি সিনেমা তৈরি হতে পারে, কিন্তু একটি চলচ্চিত্রের জীবন তৈরি হয় না। এ কারণেই সরকারি অনুদানকে ‘production subsidy’ হিসেবে দেখার বদলে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র-উন্নয়ন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
অনুদান ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। কোন প্রকল্প কেন নির্বাচিত হলো, নির্বাচকদের সঙ্গে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো স্বার্থের সংঘাত আছে কি না, প্রকল্পের বাজেট বাস্তবসম্মত কি না, পরিচালক বা প্রযোজকের আগের কাজের ইতিহাস কী—এসব বিষয়কে একটি পেশাদার চলচ্চিত্র তহবিলের মতো বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে শুধু চিত্রনাট্য নির্বাচন করলেই হবে না; development, production, post-production এবং distribution—প্রতিটি ধাপে পেশাদার মূল্যায়ন প্রয়োজন। অনুদানের সিনেমা সময়মতো শেষ হচ্ছে কি না, বাজেট অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, সিনেমাটি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—এসবও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত। অনুদান কাউকে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থে সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল ঝুঁকিতে বিনিয়োগ।
এই কারণে অনুদান ব্যবস্থাকে তিনটি স্তরে ভাগ করার কথা ভাবা যেতে পারে। প্রথম স্তরে থাকবে development fund—গল্প, গবেষণা, চিত্রনাট্য ও screenplay development-এর জন্য। দ্বিতীয় স্তরে থাকবে production fund—চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত প্রকল্পের নির্মাণের জন্য। তৃতীয় স্তরে থাকবে distribution এবং audience development fund—সিনেমাটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এতে নির্মাতাকে শুরু থেকেই ভাবতে হবে সিনেমাটি কাদের জন্য এবং কীভাবে তাদের কাছে পৌঁছাবে। এই পরিবর্তনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘সিনেমা বানানো’কে লক্ষ্য হিসেবে দেখেছি; এখন ‘সিনেমাকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া’কেও চলচ্চিত্র নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
এখানে আরেকটি সত্য স্বীকার করা জরুরি—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সমস্ত দায় রাষ্ট্রের নয়। সরকার নীতি তৈরি করতে পারে, অনুদান দিতে পারে, অবকাঠামো তৈরি করতে পারে, কর কাঠামো সংস্কার করতে পারে, কপিরাইট রক্ষা করতে পারে, প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক করতে পারে। কিন্তু সরকার নিজে একটি প্রাণবন্ত চলচ্চিত্রশিল্প তৈরি করতে পারে না। চলচ্চিত্র শেষ পর্যন্ত একটি creative industry, এবং এই শিল্পকে দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোক্তা, প্রযোজক, পরিচালক, লেখক, বিপণনকর্মী, পরিবেশক, আইনজীবী, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপক ও প্রযুক্তিবিদ—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
আমার মনে হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পুনর্গঠনের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত জায়গাটি এখানেই। আমাদের অপেক্ষা করা উচিত নয় যে কোনো একদিন সরকার সব সমস্যার সমাধান করবে কিংবা কোনো একজন অসাধারণ পরিচালক এসে পুরো চলচ্চিত্রশিল্প বদলে দেবেন। বরং চলচ্চিত্রের ভেতরের কয়েকজন মানুষকেই নিজেদের মধ্যে নতুন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। কয়েকজন প্রযোজক, কয়েকজন পরিচালক, কয়েকজন চিত্রনাট্যকার এবং marketing ও distribution-এ দক্ষ কিছু পেশাজীবী একসঙ্গে বসে একাধিক পেশাদার production house তৈরি করতে পারেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য হবে বছরে একটি সিনেমা বানিয়ে হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে বছরে একাধিক প্রকল্প develop, produce, market এবং distribute করা।
এই মডেলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে ব্যক্তিনির্ভর চলচ্চিত্র থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর চলচ্চিত্রে যাওয়া। একজন পরিচালককে একই সঙ্গে প্রযোজক, production manager, marketing executive, distributor এবং accountant হওয়ার প্রয়োজন নেই। একজন পরিচালক তার সৃজনশীল কাজ করবেন; একজন creative producer প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন দেখবেন; production team বাজেট ও শুটিং পরিচালনা করবে; marketing team দর্শক তৈরি করবে; distribution team সিনেমাকে বাজারে নিয়ে যাবে। এভাবে কাজ ভাগ হয়ে গেলে পেশাদারিত্ব বাড়বে এবং একই সঙ্গে একজন নির্মাতার ওপর অযৌক্তিক চাপ কমবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি production house একটির পর একটি বিচ্ছিন্ন সিনেমা না বানিয়ে একটি ‘pipeline’ তৈরি করবে। বছরে হয়তো চারটি প্রকল্প development-এ থাকবে, তার মধ্যে দুটি production-এ যাবে। একটি হতে পারে বড় পরিসরের commercial film, অন্যটি মাঝারি বাজেটের genre film; একই প্রতিষ্ঠানের portfolio-তে আবার ছোট বাজেটের experimental কিংবা alternative film-ও থাকতে পারে। এতে ঝুঁকি ভাগ হয়ে যায়। একটি সিনেমা ব্যর্থ হলে পুরো প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয় না, আবার একটি সিনেমা সফল হলে তার আয় দিয়ে পরবর্তী প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যায়। এভাবেই একটি চলচ্চিত্র কোম্পানি ধীরে ধীরে নিজস্ব intellectual property, audience base এবং creative talent pool তৈরি করতে পারে।
এই কাঠামোর সঙ্গে marketing ও distribution-কে শুরু থেকেই যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে marketing অনেক সময় মুক্তির কয়েক সপ্তাহ আগে শুরু হয়, যখন সিনেমা তৈরির প্রায় সব সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। আধুনিক চলচ্চিত্র ব্যবসায় এটি যথেষ্ট নয়। একটি সিনেমা কার জন্য তৈরি হচ্ছে, তার দর্শক কারা, কোন platform-এ তারা থাকে, কোন ধরনের trailer তাদের আগ্রহী করবে, কোন তারকা বা নির্মাতা audience pull তৈরি করতে পারবেন—এসব প্রশ্ন screenplay development-এর সময় থেকেই ভাবতে হবে। Marketing সিনেমার শেষ ধাপ নয়; এটি সিনেমার development-এরই অংশ।
একইভাবে distribution-কে কেবল হল বুকিং হিসেবে দেখা যাবে না। একটি আধুনিক চলচ্চিত্রের theatrical release-এর পাশাপাশি OTT, television, international festival, diaspora market, airline entertainment এবং international sales—বিভিন্ন window থাকতে পারে। কোনো সিনেমা হয়তো ১০০টি হলে মুক্তি পাওয়ার মতো নয়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সিনেমাটির দর্শক নেই। সঠিক segmentation এবং distribution strategy থাকলে ছোট একটি চলচ্চিত্রও নিজের জন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে আমরা এই বহুমাত্রিক distribution model কত দ্রুত তৈরি করতে পারি তার ওপর।
সিনেমা হলের সংকটও তাই নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু পুরোনো হল ভেঙে নতুন হল বানানো বা বড় multiplex তৈরি করা যথেষ্ট নয়। প্রদর্শন ব্যবসাকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে হবে। বড় শহরের multiplex-এর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছোট, আধুনিক, কম খরচের screening venue তৈরি করা যেতে পারে। ১০০০ আসনের পুরোনো single-screen model-এর পাশাপাশি ১০০–২০০ আসনের ছোট venue তৈরি করা সম্ভব, যেখানে সিনেমা প্রদর্শনের পাশাপাশি film festival, cultural event, live performance কিংবা অন্যান্য entertainment activity করা যায়। অর্থাৎ exhibition business-কে শুধু ‘সিনেমা দেখানোর ব্যবসা’ না ভেবে একটি পূর্ণাঙ্গ entertainment ecosystem হিসেবে ভাবতে হবে।
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রে অবশ্যই দর্শককে রাখতে হবে। ‘বাংলাদেশের দর্শক ভালো সিনেমা বোঝে না’—এই ধারণা আমাদের চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম ক্ষতিকর আত্মপক্ষসমর্থন। দর্শক যদি কোরিয়ান সিনেমা, ইরানি সিনেমা, হলিউড কিংবা ভারতীয় সিনেমার ভাষা বুঝতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের ভালো সিনেমার ভাষাও বুঝতে পারবে। প্রশ্ন হলো, আমরা দর্শকের সঙ্গে কতটা ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করেছি। দর্শক তৈরি করা একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, film club, film society, campus screening এবং জেলা পর্যায়ের চলচ্চিত্র-আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সিনেমা দেখার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। আজকের কিশোর দর্শকই আগামী দিনের চলচ্চিত্রের বাজার।
সবশেষে ফিরে আসতে হয় পরিবর্তনের প্রশ্নে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পুনরুত্থান কোনো একক অনুদান, কোনো নতুন সিনেমা হল, কোনো একজন পরিচালক কিংবা কোনো একজন তারকার মাধ্যমে সম্ভব হবে না। একটি শিল্প তখনই পুনরুজ্জীবিত হয়, যখন তার ভেতরে নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন বিনিয়োগ, নতুন দর্শক এবং নতুন কাজের সংস্কৃতি তৈরি হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর নীতিগত পরিবেশ তৈরি করা; আর চলচ্চিত্রের মানুষের দায়িত্ব হলো সেই পরিবেশের ভেতর পেশাদার প্রতিষ্ঠান ও বাজার তৈরি করা।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সংকট তাই হয়তো অর্থের সংকট নয়, প্রতিভার সংকটও নয়; এটি আস্থার সংকট। প্রযোজক বিশ্বাস করেন না যে তার বিনিয়োগ ফেরত আসবে। পরিচালক জানেন না পরের সিনেমাটি কে প্রযোজনা করবে। চিত্রনাট্যকার জানেন না তার গল্পের জন্য বাজার আছে কি না। হল মালিক জানেন না দর্শক আসবে কি না। দর্শক জানেন না নতুন সিনেমাটি তার সময় ও অর্থের মূল্য দেবে কি না। এই পারস্পরিক অনাস্থার চক্র ভাঙাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
এই চক্র ভাঙতে হলে আমাদের ‘একটি ভালো সিনেমা’ নয়, ‘ভালো সিনেমা তৈরির ব্যবস্থা’ তৈরি করতে হবে। কয়েকজন প্রযোজক, কয়েকজন পরিচালক, কয়েকজন লেখক, কয়েকজন বিপণন ও বিতরণ পেশাজীবী এবং কিছু নতুন বিনিয়োগকারী যদি নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করে কয়েকটি পেশাদার production house দাঁড় করাতে পারেন, তবে সেখান থেকেই পরিবর্তনের বাস্তব সূচনা হতে পারে। হয়তো প্রথম কয়েক বছর বড় মুনাফা আসবে না। কিন্তু যদি একটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সিনেমা তৈরি করে, নতুন নির্মাতাকে সুযোগ দেয়, crew তৈরি করে, দর্শক তৈরি করে এবং নিজের distribution network গড়ে তোলে, তাহলে সেটিই হবে একটি সত্যিকারের শিল্পের ভিত্তি।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে কেউ বাইরে থেকে এসে বাঁচিয়ে দেবে—এই অপেক্ষা অর্থহীন। সরকারকে তার কাজ করতে হবে, অনুদান ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে হবে, হল ও অবকাঠামো উন্নত করতে হবে; কিন্তু চলচ্চিত্রের মানুষদের নিজেদেরও বদলাতে হবে। কারণ কোনো শিল্পের পুনর্জাগরণ প্রথমে নীতিমালায় ঘটে না, ঘটে মানুষের কাজের পদ্ধতিতে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ তাই নতুন কোনো ‘ম্যাজিক’ সমাধানের অপেক্ষায় নয়। ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কবে ব্যক্তিগত উদ্যোগের বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে পেশাদার প্রতিষ্ঠান, ধারাবাহিক প্রযোজনা, কার্যকর distribution এবং দীর্ঘমেয়াদি দর্শক তৈরির দিকে যেতে পারি তার ওপর।
বাংলাদেশের সিনেমাকে বাঁচাতে আমাদের আরও বেশি সিনেমা বানানোর আগে আরও ভালোভাবে সিনেমা বানানোর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। কারণ একটি চলচ্চিত্রশিল্প কোনো একক সিনেমা দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় এমন একটি পরিবেশ দিয়ে, যেখানে ভালো সিনেমা বানানো, বাজারে নেওয়া এবং দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া—তিনটিই স্বাভাবিক, পেশাদার এবং পুনরাবৃত্তিযোগ্য প্রক্রিয়া। সেই পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।
এই প্রক্রিয়ার টেকসই ধারাবাহিকতার জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক ধারার বিপরীতে কর্পোরেট ও স্বাধীন প্রোডাকশন হাউসের যৌথ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোডাকশন হাউসে স্ক্রিপ্ট ডক্টরদের সমন্বয়ে গঠিত স্ক্রিপ্ট ল্যাব থাকবে, যা শুটিং ফ্লোরে যাওয়ার আগেই চিত্রনাট্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে এবং প্রি-প্রোডাকশনের মাধ্যমে বাজেটের অপচয় কমিয়ে আনবে।
পাশাপাশি চিরাচরিত পরিবেশনা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে বিকল্প ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে; যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে জেলা পর্যায়ের কমিউনিটি হল, বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়াম, সিনে-ক্লাব নেটওয়ার্ক এবং ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রমকারী নিজস্ব ওটিটি প্ল্যাটফর্ম।
বাহিরের অনুদান বা রাষ্ট্রীয় করুণার অপেক্ষায় নিষ্ক্রিয় না থেকে যখন একদল প্রতিশ্রুতিশীল চলচ্চিত্রকর্মী যৌথ মালিকানা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে নিজেদের বিজনেস মডেল ও নান্দনিক প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করাবেন, তখনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অভ্যন্তরীণভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।
