আব্বাস কিয়ারোস্তামি

আব্বাস কিয়ারোস্তামি: নীরবতার মগ্নতায় সিনেমার দর্শন

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নির্মাতা আছেন, যাঁরা শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন না; তাঁরা চলচ্চিত্র নামের শিল্পমাধ্যমটিকে নতুন করে ভাবতে শেখান। আব্বাস কিয়ারোস্তামি তেমনই একজন নির্মাতা।

তিনি সিনেমাকে গল্প বলার একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং দেখেছেন মানুষের অস্তিত্ব, সত্য, স্মৃতি, সময় ও অনুভূতির অনুসন্ধানের একটি দার্শনিক ক্ষেত্র হিসেবে। তাঁর সিনেমা আমাদের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দেয় না, বরং প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্যগুলো অনেক সময় উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

আপাতসাধারণ গ্রামীণ দৃশ্যপট, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, কিংবা গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপারে জমে থাকা নীরবতার মধ্য দিয়েই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন অস্তিত্ব, সত্য ও মানবচেতনার গভীর রহস্য।

কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্রচিন্তার কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন—সিনেমা আসলে কী? এটি কি বাস্তবতার অনুকরণ, নাকি বাস্তবতাকে নতুনভাবে আবিষ্কারের একটি উপায়? তাঁর চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কখনো বাস্তবতাকে সরাসরি ধারণ করতে চাননি; বরং বাস্তবতার ভেতরে থাকা অদৃশ্য স্তরগুলোকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে সিনেমা ছিল মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে আবার দেখার একটি প্রক্রিয়া।

কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্র ভাবনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—বাস্তব ও কল্পনার সীমানা মুছে ফেলা। তাঁর বিখ্যাত ‘কোকার ট্রিলজি’ (Where Is the Friend’s House?, And Life Goes On, Through the Olive Trees) কিংবা মাস্টারপিস Close-Up-এর দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি জীবনকে যেমন দেখেছেন, ঠিক তেমনই ক্যামেরা বন্দী করেছেন। কোনো কৃত্রিম সেটিং বা জটিল মেলোড্রামার আশ্রয় না নিয়েই তিনি জীবনের ভেতর থেকে নাটকীয়তা বের করে এনেছেন।

তাঁর কাছে সিনেমা ছিল এমন এক সত্য, যা সম্পূর্ণ প্রকাশ পায় না—বরং যা কিছু অলিখিত বা অদেখা থাকে, তার ভেতরেই সবচেয়ে বড় সত্য লুকিয়ে থাকে। Close-Up ছবিতে বাস্তব জীবনের অপরাধী আর বাস্তব চরিত্রদের দিয়েই পুনর্নির্মাণ করিয়েছেন ঘটনাকে। সেখানে দর্শক কেবল একটি অপরাধের গল্প দেখে না, বরং সত্য ও অভিনয়, পরিচয় ও বিভ্রান্তির ভেতরের সুক্ষ্ম সীমান্তরেখা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়।

প্রচলিত সিনেমা সাধারণত সংঘাত, নাটকীয়তা ও পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু কিয়ারোস্তামি জীবনের অন্য এক ছন্দ আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, মানুষের জীবন আসলে বড় বড় ঘটনার সমষ্টি নয়; বরং অসংখ্য ছোট মুহূর্ত, ক্ষুদ্র অনুভূতি, অপ্রকাশিত চিন্তা ও নীরব অভিজ্ঞতার সমাহার। একটি শিশুর হারানো খাতা খোঁজা, একজন মানুষের একাকী গাড়ি চালানো, একটি পাহাড়ি রাস্তা ধরে হাঁটা—এই সাধারণ ঘটনাগুলোর মধ্যেই তিনি মানুষের নৈতিকতা, আকাঙ্ক্ষা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন খুঁজে পেয়েছেন।

এই কারণেই তাঁর সিনেমাকে অনেক সময় “সরলতার দর্শন” বলা হয়। কিন্তু এই সরলতা কখনো সরলীকরণ নয়। বরং এটি গভীর পর্যবেক্ষণের ফল। তিনি জানতেন, জীবনের জটিলতাকে প্রকাশ করতে সবসময় জটিল কাঠামোর প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি দীর্ঘ নীরব শট, একটি মুখের অভিব্যক্তি কিংবা একটি অসমাপ্ত কথোপকথন মানুষের অন্তর্জগতকে অনেক বেশি প্রকাশ করতে পারে।

অধিকাংশ চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রেমে কী দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন; কিয়ারোস্তামি ছিলেন ভিন্ন। তিনি গুরুত্ব দিতেন—ফ্রেমে কী দেখা যাচ্ছে না, কিংবা কী বলা হচ্ছে না। তাঁর সিনেমায় দীর্ঘ নীরবতা, গাড়ির ইঞ্জিনের একঘেয়ে শব্দ, বাতাসে গাছের পাতার দোল খাওয়া কিংবা উইন্ডশিল্ড ওয়াইপারের ওঠানামা এক বিশেষ ধরনের কবিতার জন্ম দেয়।

Taste of Cherry (১৯৯৭) চলচ্চিত্রের কথা ধরা যাক। আত্মহত্যা করতে চাওয়া এক ব্যক্তি সারা দিন গাড়িতে করে এমন একজনকে খোঁজে, যে তার মৃত্যুর পর তাকে মাটিতে চাপা দেবে। এই বিষণ্ন যাত্রায় দীর্ঘ সংলাপের চেয়ে বেশি কথা বলে চরিত্রের দীর্ঘ নীরবতা এবং তেহরানের রুক্ষ, শুষ্ক প্রান্তর। জীবন ও মৃত্যুর এই দার্শনিক দ্বন্দ্বে তিনি শেষ পর্যন্ত কোনো সমাপ্তি টেনে দেন না।

কিয়ারোস্তামি বিশ্বাস করতেন, “একজন ভালো সিনেমা নির্মাতার কাজ দর্শককে উত্তর দেওয়া নয়, বরং সঠিক প্রশ্ন করার মুখোমুখি দাঁড় করানো।”

“সিনেমা যদি কেবল পর্দায় যা ঘটছে তা-ই দেখায়, তবে তা একটি অসম্পূর্ণ কাজ। আসল সিনেমা তৈরি হয় দর্শকের নিজের কল্পনায়, ফ্রেমের বাইরের নীরবতায়।”

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

কিয়ারোস্তামির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা ছিল—বাস্তবতা কখনো একক নয়। মানুষের প্রত্যেকের নিজস্ব বাস্তবতা রয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্র Close-Up-এ তিনি এই ধারণাকে অসাধারণভাবে অনুসন্ধান করেছেন। একজন সাধারণ মানুষ একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতার পরিচয় গ্রহণ করেন। বাহ্যিকভাবে এটি প্রতারণা, কিন্তু কিয়ারোস্তামি সেখানে শুধু অপরাধ দেখেননি; তিনি দেখেছেন একজন মানুষের স্বপ্ন, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের অস্তিত্বকে অন্যভাবে অনুভব করার চেষ্টা। তাঁর সিনেমা তাই বিচার করে না, বরং বোঝার চেষ্টা করে।

কিয়ারোস্তামির কাছে মানুষ ছিল কোনো চরিত্র নয়, বরং একটি রহস্য। তিনি চরিত্রগুলোকে ব্যাখ্যা করেননি; তিনি তাদের অস্তিত্বকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর চলচ্চিত্রকে গভীর মানবিকতা দিয়েছে। তাঁর ক্যামেরা কখনো মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে না; বরং মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে শেখে।

কিয়ারোস্তামির নান্দনিকতা সম্পূর্ণভাবে ‘মিনিমালিজম’ বা পরিমিতিবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পেশাদার অভিনেতা ব্যবহারের চেয়ে অপেশাদার স্থানীয় মানুষকে দিয়ে অভিনয় করানো, কৃত্রিম আলোর বদলে প্রাকৃতিক আলোর ওপর নির্ভর করা এবং প্রথাগত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বর্জন করা—এ সবই ছিল তাঁর নিজস্ব শৈলী।

তিনি জোর করে দর্শকের আবেগ কাড়তে চাননি। সুরের মূর্ছনা দিয়ে কান্না বা উত্তেজনার আবহ তৈরি না করে তিনি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক দৈনন্দিনতাকে স্থান দিয়েছেন। এই সাধারণতার ভেতরেই তিনি উন্মোচন করেছেন জীবনের সর্বজনীন সত্যকে—জীবনের প্রতি মমতা, মৃত্যুকে অতিক্রম করে টিকে থাকার স্পৃহা এবং মানবিক সহমর্মিতা।

শিশুদের নিয়ে নির্মিত তাঁর চলচ্চিত্রগুলো এই মানবিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। Where Is the Friend’s Home?-এ একটি শিশুর বন্ধুর খাতা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা একটি সাধারণ গল্প। কিন্তু কিয়ারোস্তামির হাতে এই সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে দায়িত্ব, বন্ধুত্ব এবং নৈতিকতার এক গভীর অনুসন্ধান। শিশুর চোখ দিয়ে তিনি দেখান, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নৈতিক প্রশ্নগুলো অনেক সময় সবচেয়ে ছোট মানুষের মধ্যেই উপস্থিত থাকে।

কিয়ারোস্তামির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো দর্শকের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর ধারণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সিনেমা দর্শককে সবকিছু বুঝিয়ে দেবে—এমন কোনো প্রয়োজন নেই। বরং দর্শকের কল্পনা ও চিন্তার জন্য জায়গা তৈরি করাই একজন নির্মাতার দায়িত্ব। তাঁর চলচ্চিত্রের অসম্পূর্ণতা আসলে দুর্বলতা নয়; এটি একটি সচেতন শিল্পকৌশল। তিনি গল্প শেষ করেন, কিন্তু চিন্তার সমাপ্তি ঘটান না।

Taste of Cherry তার একটি অসাধারণ উদাহরণ। একজন মানুষ জীবনের প্রতি তার সম্পর্ক হারিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু চলচ্চিত্রটি আত্মহত্যা বা জীবনের পক্ষে কোনো সরল বক্তব্য দেয় না। বরং এটি দর্শককে জীবন নামের রহস্যের সামনে দাঁড় করায়। কিয়ারোস্তামি জানতেন, কিছু প্রশ্নের উত্তর শিল্পীর হাতে নেই; সেই প্রশ্নগুলো মানুষের নিজের ভেতরেই বেঁচে থাকে।

তাঁর চলচ্চিত্রে গাড়ি, রাস্তা ও যাত্রা বারবার ফিরে আসে। কারণ তাঁর কাছে জীবন নিজেই একটি যাত্রা। মানুষ কোথাও পৌঁছানোর জন্য পথ চললেও প্রকৃত অর্থে সে নিজের ভেতরের একটি পথ অতিক্রম করে। Ten-এ গাড়ির ভেতরের কথোপকথনকে কেন্দ্র করে তিনি দেখিয়েছেন, একটি ছোট জায়গাও মানুষের বিশাল মানসিক জগতের প্রতিচ্ছবি হতে পারে।

কিয়ারোস্তামির সিনেমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকৃতির ব্যবহার। তাঁর কাছে প্রকৃতি কোনো সাজসজ্জা নয়। একটি রাস্তা, একটি গাছ, একটি পাহাড় কিংবা একটি শূন্য প্রান্তর মানুষের অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে। প্রকৃতির নীরবতার সঙ্গে মানুষের একাকিত্ব ও আশার সম্পর্ক তিনি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বিশ্ব চলচ্চিত্রে কিয়ারোস্তামির সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এই যে, তিনি সিনেমাকে আবার ধীর হতে শিখিয়েছেন। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির যুগে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন—সিনেমার আসল শক্তি ক্যামেরার ক্ষমতায় নয়, বরং দেখার ক্ষমতায়। একজন নির্মাতা কত বড় দৃশ্য তৈরি করতে পারেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি পৃথিবীকে কত গভীরভাবে দেখতে পারেন।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি আমাদের শিখিয়েছেন, সিনেমা শুধু চোখের শিল্প নয়; এটি মন ও চেতনার শিল্প। তাঁর চলচ্চিত্রে কোনো চিৎকার নেই, কিন্তু গভীর প্রতিধ্বনি আছে। তাঁর দৃশ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কিন্তু সময়ের গভীর অনুভব আছে। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, জীবনের সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্তগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে অসাধারণ সত্য।

তাই কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্র শুধু চলচ্চিত্র নয়; এটি এক ধরনের ধ্যান। তাঁর ক্যামেরা আমাদের বাইরের পৃথিবী দেখায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের ভেতরে। আর এখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য—তিনি সিনেমাকে শুধু দেখার বিষয় থেকে চিন্তার বিষয়ে পরিণত করেছেন।

আব্বাস কিয়ারোস্তামির সেলুলয়েড দর্শন মূলত এক ধরনের আহ্বান। তিনি চলচ্চিত্রকে কোনো তৈরি করা গল্প হিসেবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেননি; বরং দর্শককে বানিয়েছেন তাঁর সহ-স্রষ্টা। পর্দা যেখানে শেষ হয়, সেখানে শুরু হয় দর্শকের নিজস্ব চিন্তার বিস্তার।

কোলাহলপূর্ণ আধুনিক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের যুগে দাঁড়িয়ে কিয়ারোস্তামি আমাদের শেখান কীভাবে থমকে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়, কীভাবে শুনতে হয় নীরবতার ভাষা। তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সিনেমার মূল শক্তি কোলাহলে নয়, বরং জীবনকে গভীর মগ্নতায় অনুধাবন করার নীরব দর্শনেই নিহিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *