
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কোনো সুনির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করে সনদ বিতরণের যান্ত্রিক কারখানা নয়; বরং এটি মানবসভ্যতার জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) দিগন্ত সম্প্রসারণ করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
উনিশ শতকের শুরুতে জার্মান শিক্ষাবিদ উইলহেম ভন হুমবোল্ট (Wilhelm von Humboldt) উচ্চশিক্ষার যে আধুনিক দর্শন (Humboldtian Model) প্রবর্তন করেন, তার মূল ভিত্তি ছিল দুটি: Lehrfreiheit (শিক্ষাদানের স্বাধীনতা) এবং Lernfreiheit (শিক্ষার্জনের স্বাধীনতা)। হুমবোল্টের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে রাষ্ট্র ও বাজারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপমুক্ত এমন এক চত্বর, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যৌথভাবে ‘সত্যের নিরন্তর অনুসন্ধান’ এবং ‘নতুন জ্ঞান সৃষ্টি’ করবেন।
পরবর্তীতে জন হেনরি নিউম্যান তাঁর The Idea of a University গ্রন্থে যোগ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিশেষ পেশাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, বরং এটি উদার শিক্ষার (Liberal Education) মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধনের স্থান, যা তাকে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাস্তবতায় এডুয়ার্ড শীলস (Edward Shils) এবং ফিলিপ অলবাখের (Philip Altbach) মতো শিক্ষাবিদদের মতে, সমকালীন শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত ‘গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়’ (Research-intensive Universities), যা বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি’ বা নলেজ ইকোনমির (Knowledge Economy) মূল চালিকাশক্তি।
এই বৈশ্বিক ও তাত্ত্বিক মানদণ্ডের আলোকেই যখন আমরা ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থানকে মূল্যায়ন করি, তখন একটি বড় ধরনের কাঠামোগত ও গুণগত ব্যবধান বা অবক্ষয় দৃশ্যমান হয়।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর—যেমন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT), যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ, এবং এশিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS) কিংবা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়—সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি তাদের কাঠামোগত এবং পদ্ধতিগত উৎকর্ষের ফল।
শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল শক্তি তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। হার্ভার্ড বা ইয়েলের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ‘অ্যান্ডাউমেন্ট ফান্ড’ রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া তারা করপোরেট ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বিলিয়ন ডলারের গবেষণা অনুদান (Research Grants) পায়।
পক্ষান্তরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। এই পরনির্ভরশীলতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক স্বায়ত্তশাসনকে সংকুচিত করে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অ্যাকাডেমিক অবক্ষয় এবং বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে (Times Higher Education বা QS Ranking) ১০০০-এর নিচে অবস্থানের পেছনে গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট কারণ রয়েছে। । প্রথমত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশই ব্যয় হয় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, পেনশন এবং প্রশাসনিক রক্ষণাবেক্ষণে।
গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকে মোট বাজেটের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। যেখানে এমআইটি বা স্ট্যানফোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানে গবেষণাই মূল চালিকাশক্তি, সেখানে ঢাবিতে গবেষণা একটি প্রান্তিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। দ্বিতীয়ত, ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসেরের ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস’ (ISA) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমীকরণ যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করে, তখন তার অ্যাকাডেমিক স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ণ হয়।
পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। সেখানে একজন পিএইচডি বা পোস্ট-ডক সম্পন্নকারীকে প্রথমে ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর’ হিসেবে ‘টেনিয়র-ট্র্যাক’ বা নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রবেশনারি পিরিয়ডে যোগ দিতে হয়। ৫-৭ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে (যেমন Nature, Science) নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশনা এবং গবেষণার সাইটেশন (h-index, i10-index) দেখাতে না পারলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও দলীয় আনুগত্যের কারণে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক পদায়নে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো কড়া ‘টেনিয়র-ট্র্যাক’ (Tenure-track) পদ্ধতি বা আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে সাইটেশনের কঠোর মূল্যায়ন না থাকায় এখানে পদোন্নতি মূলত সময়ের আবর্তনে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে।
অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের শিক্ষার প্রাণ হলো তাদের ‘টিউটোরিয়াল সিস্টেম’ (Tutorial System), যেখানে প্রতি সপ্তাহে একজন বা দুজন শিক্ষার্থীর সাথে একজন অধ্যাপক সরাসরি বসেন এবং শিক্ষার্থীর লেখা প্রবন্ধের ওপর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় শিক্ষাদান পদ্ধতিটি মূলত ‘গণ-বক্তৃতা’ (Mass Lecturing) ফর্মে রূপ নিয়েছে, যেখানে শিক্ষকের পক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের দিকে নজর দেওয়া অসম্ভব।
পাশাপাশি হলের আবাসন সংকট এবং তথাকথিত ‘গেস্টরুম’ সংস্কৃতির মতো নেতিবাচক পরিবেশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও স্বাধীন চিন্তাভাবনাকে শুরুতেই অঙ্কুরিত হতে বাধা দেয়। ফলস্বরূপ, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে যখন বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সের দিকে ঝুঁকছে, তখন আমাদের কারিকুলাম ও গবেষণার মান অনেকাংশেই স্থবির হয়ে পড়েছে।
আলজেরীয় দার্শনিক ফ্রান্তজ ফানো বা এডওয়ার্ড সাঈদের ‘উত্তর-উপনিবেশবাদ’ (Post-colonialism) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এখনো ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র তৈরির ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে বের হতে পারেনি। কারিকুলামগুলো মূলত তথ্য মুখস্থকরণ এবং সরকারি চাকরির (যেমন বিসিএস) উপযোগী করে তৈরি, যা স্বাধীন চিন্তাভাবনা বা নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে না।
হলের সিট বণ্টনের ওপর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য এক ধরনের ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’ (Lumpen Proletariat) বা সুবিধাবাদী সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক জোর-জুলুম এবং মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন তাদের সৃজনশীলতা ও অ্যাকাডেমিক সম্ভাবনাকে শুরুতেই অঙ্কুরিত হতে বাধা দেয়।
এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পড়াশোনার মানে সেরা করে তুলতে হলে আমূল এবং সাহসী কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
সর্বাগ্রে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, পিএইচডি, পিয়ার-রিভিউড এবং স্কোপাস (Scopus) ইনডেক্সড জার্নালে উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভারতের ‘ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন’ (UGC) বা বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো একটি স্বাধীন, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘অ্যাকাডেমিক রিক্রুটমেন্ট বোর্ড’ গঠন করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট অবিলম্বে মোট বাজেটের ন্যূনতম ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। হেনরি এটজকোভিচের ‘ট্রিপল হেলিক্স মডেল’ (Triple Helix Model) অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত-সরকার কোলাবোরেশন প্রয়োগ করে দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সেক্টরের সাথে যৌথ অর্থায়নে ফলিত গবেষণা (Applied Research) পরিচালনা করতে হবে এবং গবেষণার বাজেট ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করতে হবে।
আবাসিক হলগুলোর ওপর থেকে সমস্ত রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের অবৈধ নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে শতভাগ মেধা, দূরত্ব এবং অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার ভিত্তিতে হলের সিট বরাদ্দ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনকে নিতে হবে। ক্রমান্বয়ে শতভাগ আবাসিক সমস্যা দূর করার চেষ্টা করতে হবে।
বর্তমানের জেনারেলাইজড বা মুখস্থ-নির্ভর সিলেবাস পরিবর্তন করে আন্তঃবিভাগীয় (Interdisciplinary) শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো যুগোপযোগী বিষয়গুলোকে প্রতিটি অনুষদে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
একই সাথে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির আধুনিকায়ন ও ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গবেষণার উপযোগী করে যুগোপযোগী করতে হবে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব ডিজিটাল আর্কাইভ, লাইব্রেরি এবং ই-জার্নালের (যেমন: JSTOR, ScienceDirect, IEEE) প্রাতিষ্ঠানিক সাবস্ক্রিপশন প্রতিটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে।
একটি দেশের টেকসই সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক মুক্তির পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অপরিসীম। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থিংক-ট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করে এবং নীতি নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ দেয়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মূল দায়িত্ব হলো জার্মান দর্শনের ‘বিলডুং’ (Bildung) ধারণার মতো কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও আত্মিক বিকাশ ঘটানো।
শিক্ষার্থীদের নিজেদের কেবল চাকুরির সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে ক্রিটিক্যাল থিংকিং, প্রবলেম সলভিং স্কিল এবং বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তারা ক্যাম্পাসকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে এবং প্রশাসনকে কোনো দলীয় এজেন্ডা ছাড়াই সম্পূর্ণ অ্যাকাডেমিক জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।
অ্যাকাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উচিত বৈশ্বিক দক্ষতা যেমন—প্রযুক্তিগত জ্ঞান, ভাষাগত দক্ষতা এবং বিভিন্ন সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের (ডিবেটিং, সায়েন্স ক্লাব, লিডারশিপ ট্রেনিং) মাধ্যমে নিজেদের বহুমুখী করে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়কে সমৃদ্ধ করতে তাদের অবদান হওয়া উচিত সৃজনশীলতা, প্রশ্ন করার মানসিকতা এবং গবেষণাগার ও লাইব্রেরির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি চমৎকার অ্যাকাডেমিক কালচার বা পাঠ-সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল স্নাতক তৈরি করবে না, এটি হবে রাষ্ট্রের পলিসি-মেকিং বা নীতি নির্ধারণের প্রধান উৎস। দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের বৃত্ত থেকে বের করে হাই-টেক ও নলেজ-বেসড ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তর করা যায়, তার রোডম্যাপ তৈরি করবে বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং অতিসম্প্রতি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব বা জুলাই আন্দোলনের ভূমিকা অনন্য ও অবিস্মরণীয়। এই আন্দোলনগুলো নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও নাগরিক অধিকার আদায়ের পরম গৌরবের স্মারক। তবে প্রশ্ন ওঠে, রাজনৈতিক আন্দোলনে রাজপথে নামা কি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মূল কাজ?
এই প্রশ্নটি বিশ্বজুড়ে সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত।
ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসের (Louis Althusser) তাঁর ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস’ (ISA) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র যখন স্বৈরাচারী ও নিপীড়ক হয়ে ওঠে, তখন সে তার পুলিশ, সেনাবাহিনী বা বিচার বিভাগকে (Repressive State Apparatus) ব্যবহার করে নাগরিকদের কণ্ঠ রোধ করে। এই পরিস্থিতিতে যেখানে সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই হয়ে ওঠে একমাত্র স্পেস, যেখানে মুক্তচিন্তা ও প্রতিরোধ বেঁচে থাকে।
ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির (Antonio Gramsci) ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ (Organic Intellectual) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেবল ক্লাসরুমের পাঠক নয়, তারা সমাজের শোষিত ও অবদমিত শ্রেণির ভাষা। রাষ্ট্র যখন সংকটে পড়ে, ফ্যাসিবাদের অন্ধকার যখন সমাজকে গ্রাস করে, তখন সচেতন শিক্ষার্থীর প্রধান নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। অতএব, ক্রান্তিলগ্নে রাজপথের আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের পরিপন্থী নয়; বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বেরই (Social Accountability) অংশ।
তবে সংকটের ভিন্ন একটি দিকও রয়েছে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার (Max Weber) তাঁর বিখ্যাত Science as a Vocation এবং Politics as a Vocation প্রবন্ধে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, অ্যাকাডেমিক বুদ্ধিবৃত্তি এবং দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকা উচিত। আন্দোলন যখন শেষ হয় এবং রাষ্ট্র যখন একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে, তখন দীর্ঘমেয়াদী ‘লেজুড়ভিত্তিক দলীয় রাজনীতি’ বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে ধ্বংস করে। যখন ছাত্ররাজনীতি আদর্শহীন হয়ে কেবল চাঁদা টেন্ডারবাজি, হল দখল এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের হাতিয়ার হয়, তখন তা ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক গৌরবকে কলঙ্কিত করে।
ছাত্ররাজনীতি যখন আদর্শহীন হয়ে কেবল ক্ষমতা প্রদর্শন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের হাতিয়ার হয়, তখন তা ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক গৌরবকে কলঙ্কিত করে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, সাময়িক জাতীয় সংকটে রাজপথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যেমন শিক্ষার্থীর নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি স্বাভাবিক সময়ে জ্ঞানার্জন ও গবেষণার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়া তার প্রধান কর্তব্য।
রাজপথের প্রতিটি ঐতিহাসিক সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে আলোর পথ দেখিয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কেবল অতীতের রোমন্থন ও রাজপথের বীরত্ব যথেষ্ট নয়। এখন সময় এসেছে রাজপথের সেই অদম্য সাহস ও শক্তিকে ল্যাবরেটরি, ক্লাসরুম, লাইব্রেরি আর গবেষণার টেবিলে স্থানান্তরিত করার। কাঠামোগত সংস্কার, মেধার মূল্যায়ন এবং গবেষণামুখী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে বিশ্বমানচিত্রে একটি শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
