সালমান শাহ : বাংলা চলচ্চিত্রের ‘শেষ নায়ক’

share on:
সালমান শাহ

সালমান শাহ যে সময়টিতে অভিনয়ে এসেছিলেন, তখন ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পালাবদলের সময়। চলে যাওয়ার দুই যুগ পরেও বাংলাদেশের অন্যতম সেরা নায়ক সালমান শাহ।

সালমান শাহ প্রয়াত হওয়ার পরের সিনেমাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, সালমান শাহর যে ইমেজ তা থেকে কেউ বের হতে পারে নি, নানান অভিনেতাদের দিয়ে চেষ্টা চলেছে, কিন্তু কেউ সালমানের ধারে কাছেও কিছু করতে পারেন নাই।

অশ্লীল যুগের সিনেমা যখন আসলো তখন আসলে আমাদের আর কিছুই থাকলো না, স্মৃতিচারণের জন্য রইলো বাকী সালমান শাহ। তার মতো স্টাইল, ফ্যাশন, রুচিশীল একটা নায়ক আর পেল না আমাদের সিনেমার জগত। সালমান শাহ বেঁচে রইলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘শেষ নায়ক’ হয়ে।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

১৯৯২ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন সালমান শাহ। জনপ্রিয় একটি হিন্দি সিনেমার অফিসিয়াল রিমেক ছিল ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। এ সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেন সালমান। পর্দায় তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, সংলাপ বলার ধরন, অভিনয়-দক্ষতা – সবকিছু মিলিয়ে দর্শকের মনে স্থান করে নিতে সময় লাগেনি এ নায়কের। বাংলাদেশের সিনেমায় তিনি ‘রোমান্টিক হিরো’ হিসেবে পরিচিত পান।

অভিনয় দক্ষতা, সংলাপে সাবলীলতা, সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়া স্টাইল, ফ্যাশন দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে যিনি আসন গেড়ে বসেছিলেন, ক্রমেই বাংলা সিনেমাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন নতুন উচ্চতায়।একঘেয়ে অভিনয় আর স্টাইল দেখতে দেখতে ক্লান্ত দর্শকদের সামনে তিনি হয়ে আসেন নতুনের আবাহন হিসেবে। তার রোমান্টিক, মেলোড্রামা, ফ্যামিলি ড্রামা, অ্যাকশন, প্রতিবাদ সব চরিত্রেই ছিলো নতুত্বের স্বাদ। তার কাউবয় হ্যাট, গগলস, লং কোটে ডিটেকটিভ লুক, হুডি শার্ট, ব্যাক ব্রাশ করা চুল, কানে দুল, ফেড জিন্স, মাথার স্কার্ফ, ফ্যাশন সেন্স- সবকিছু মিলিয়ে এক অদেখা জোনের মধ্যে দর্শকেরা পড়ে গিয়েছিলো। ফলে তিনি হয়ে ওঠেছিলেন তারুণ্যের স্টাইল আইকন।

মাত্র চার বছরে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করে ১৯৯০’র দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলোড়ন তুলেছিলেন নায়ক সালমান শাহ। সাতাশটি সিনেমার বেশিরভাগই ছিল আলোচিত এবং ব্যবসা সফল। সালমান শাহ’র অভিনয়ের মধ্যে দর্শক একটা ভিন্নধারা খুঁজে পেয়েছিল। অনেকে আবার সালমান শাহ’র মধ্যে বলিউড নায়কদের ছায়াও খুঁজে পেয়েছিলেন। মাত্র চার বছরের সিনেমা ক্যারিয়ারে সালমান শাহ বাংলা সিনেমার অভিনয় জগতে নিজের এমন একটি স্থানটি করে নিয়েছিলেন যে তাঁর অভাব এখনো অনুভব করেন দর্শক, পরিচালক, প্রযোজক – সবাই।

সালমান শাহ নামটি ছিল সিনেমার জন্য। তবে তার প্রকৃত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। ১৯৭০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী।

সালমান শাহ ক্যারিয়ারের শুরুতে কাজ করেছেন ছোট পর্দায়, বিটিভিতে, ১৯৮৫ সালে। হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় ‘কথার কথা’ নামক একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হতো তখন। সে অনুষ্ঠানের একটি গানে মাদকাসক্ত এক তরুণের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। যে গানটি গেয়েছিলেন স্বয়ং হানিফ সংকেত। ১৯৮৫ সালে বিটিভির আকাশ ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে তার অভিষেক হয় টিভি নাটকে। এরপর পরে দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), সৈকতে সারস (১৯৮৮), নয়ন (১৯৯৫), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬) নাটকেও অভিনয় করেন। ‘নয়ন’ নাটকটি সে বছর শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে। এছাড়া তিনি ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘পাথর সময়’ ও ১৯৯৪ সালে ‘ইতিকথা’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন। প্রেমযুদ্ধ ও ঋণশোধ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকও করেন তিনি। মিল্ক ভিটা, জাগুয়ার কেডস, ইস্পাহানি গোল্ড, স্টার টি, কোকাকোলা, ফানটাসহ কয়েকটি পণ্যের বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয়ও করেছেন।

সালমান শাহ অভিনীত সিনেমাগুলো হলো- ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ (বিপরীতে মৌসুমী), তুমি আমার (শাবনূর), অন্তরে অন্তরে (মৌসুমী), কন্যাদান (লিমা), জীবন সংসার (শাবনূর), চাওয়া থেকে পাওয়া (শাবনূর), সুজন সখী (শাবনূর), বুকের ভেতর আগুন (শাবনূর), এই ঘর এই সংসার (বৃষ্টি), স্নেহ (মৌসুমী), বিচার হবে (শাবনূর), প্রেমযুদ্ধ (লিমা), মহা মিলন (শাবনূর), তোমাকে চাই (শাবনূর), বিক্ষোভ (শাবনূর), আশা ভালোবাসা (শাবনাজ), মায়ের অধিকার (শাবনাজ), আঞ্জুমান (শাবনাজ), আনন্দ অশ্রু (শাবনূর), প্রেম পিয়াসী (শাবনূর), সত্যের মৃত্যু নেই (শাহনাজ), প্রিয়জন (শিল্পী), শুধু তুমি (শ্যামা), স্বপ্নের পৃথিবী (শাবনূর), স্বপ্নের নায়ক (শাবনূর), দেন মোহর (শাবনূর) ও স্বপ্নের ঠিকানা (শাবনূর)।

‘বুকের ভেতর আগুন’ ছিল সালমান অভিনীত শেষ সিনেমা। তার সঙ্গে জুটি বেঁধে সবচেয়ে বেশি ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেন শাবনূর। কবরী-রাজ্জাক জুটির পর সালমান-শাবনুর জুটিটাই এদেশের দর্শকদের পছন্দের শীর্ষে এখনও রয়ে গেছে। শাবনুর ছাড়াও মৌসুমী, শাহনাজ, লিমা, কাঞ্চি, শাবনাজ, বৃষ্টিসহ কয়েকজন নায়িকার সাথে জুটি বেঁধেছেন। রোমান্টিক ও মেলোড্রামায় বেশি কাজ কারলেও তার চরিত্রগুলোতে বৈচিত্র ছিলো দেখার মতো। কখনও ছাত্রনেতা, কখনও প্রতিবাদী যুবক, কখনও গ্রামের ছেলে, কখনও প্রেমের জন্য ঘরছাড়া তরুণের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

সালমানের সিনেমায় শুধু অভিনয় আর ফ্যাশন নয়, গানও ছিলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। তার প্রতিটি সিনেমাই ছিলো দারুণ সব গানে ভরপুর। অনেক গানই কালজয়ীতে রূপ নিয়েছে ইতিমধ্যেই। তরুণ শিল্পীরা এখন চলচ্চিত্রের গান গাইতে গেলেই সালমান অভিনীত সিনেমার গানগুলোই বেশি গেয়ে থাকেন। সালমান শাহ কতটা জনপ্রিয় সেটা এই সময়ের অভিনেতাদের জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে এখন যারা কাজ করছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা সবাই বলেন সালমান তাদের আইডল, তাকেই অনুসরণ করেন তারা।

১৯৯৬ সালে নিজ ঘরে সালমান শাহ’কে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। শুরুতে বিষয়টি আত্মহত্যা বলা হয়। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তার মা নীলা চৌধুরী।

অবশ্য ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার জানান ‘ বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন। তদন্তে সালমানকে হত্যা করার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ঘটনার তদন্তে ৪৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছে পিবিআই।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, “সালমান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ছিলেন। মাত্রাতিরিক্ত আবেগপ্রবণতার কারণে তিনি বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এছাড়াও চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে তার অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সালমান শাহের আত্মহত্যার অন্যতম কারণ।”

তবে, সালমান শাহের মা সবসময় দাবি করে আসছেন যে হত্যা করা হয়েছে তার ছেলেকে।

আরও পড়ুন : জিম জারমুশ : সিনেমা নির্মাণে পাঁচ পরামর্শ।

Facebook Comments
share on: