
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তারেক মাসুদের আবির্ভাবকে শুধু একজন মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে দেখলে তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তা ও শিল্পীসত্তার গভীরতা সামগ্রিকভাবে বোঝা যাবে না। তিনি এমন এক সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে এসেছিলেন, যখন বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গেলে বাণিজ্যিক সাফল্য, তারকা, গান কিংবা বিনোদনের প্রচলিত কাঠামোই সামনে আসত; এই ভূখণ্ডের ইতিহাস, মানুষের বিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি, রাজনৈতিক স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়ের জটিলতা নিয়ে চলচ্চিত্রের একটি স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণের কাজ কেউ শুরু করেনি।
তারেক মাসুদ সেই ভাষার সন্ধান করেছিলেন। তাঁর কাছে চলচ্চিত্র ছিল নিজের দেশকে বাইরে থেকে দেখার কোনো আয়না নয়, বরং নিজের ভেতরের শিল্পবোধ ও সংস্কৃতির দিকে তাকানোর একটি জানালা। তাই তাঁর চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ কোনো মানচিত্রের নাম নয়; বাংলাদেশ হয়ে ওঠে মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, স্মৃতি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, ধর্ম, মাটি ও ইতিহাসের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা। তাঁর কাজের দিকে ধারাবাহিকভাবে তাকালে দেখা যায়, আদম সুরত থেকে মুক্তির গান, মুক্তির কথা, মাটির ময়না এবং রানওয়ে পর্যন্ত তিনি আসলে একটি প্রশ্নেরই নানা উত্তর খুঁজেছেন—এই দেশের মানুষ তার সময় ও ইতিহাসের দ্বারা কীভাবে নির্মিত হয় এবং নিজের পরিচয়কে সে কীভাবে বুঝতে শেখে?
তারেক মাসুদের নন্দনতাত্ত্বিক ও চলচ্চিত্র যাত্রার প্রাথমিক ভিত রচিত হয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি মানবজীবন ও শিল্পের মেলবন্ধনকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবন, শিল্পকর্ম ও দর্শনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সাত বছর ধরে নির্মিত ‘আদম সুরত’ (১৯৮৯) ছিল তার চলচ্চিত্রচিন্তার প্রথম মাইলফলক। এই চিত্রে তিনি কেবল একজন শিল্পীকে তুলে ধরেননি, বরং সুলতানের ক্যানভাসের মতোই বাংলার কৃষিজীবী মেহনতি মানুষের শরীরের পেশীবহুল সক্ষমতা, আত্মমর্যাদা এবং লোকায়ত রূপকে ক্যামেরার ফ্রেমে উন্মোচন করেছিলেন।
একজন শিল্পীর সঙ্গে তাঁর মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির সম্পর্ককে আবিষ্কার করেছেন। সুলতানের চিত্রকলায় কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের যে শক্তিমান শরীর, তা তারেক মাসুদের কাছে কেবল একটি নান্দনিক বিষয় ছিল না; এর মধ্যে তিনি বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অস্তিত্বের এক গভীর সত্য দেখতে পেয়েছিলেন। সুলতানের মতোই তারেক মাসুদও বাংলাদেশের মানুষকে তার বাস্তব ভূগোল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। তাঁর চলচ্চিত্রে মানুষ কখনো ভাসমান চরিত্র নয়; সে কোনো না কোনো মাটি, সমাজ, ধর্ম, ভাষা ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সন্তান। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তী সময়ে তাঁর চলচ্চিত্রের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এর পরপরই ১৯৯১ সালে তিনি পরিবেশ ও নারী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেন ‘উৎস’ (The Unison)। তবে তার ইতিহাস-পুনর্গঠনের চলচ্চিত্রে তাত্ত্বিক সাফল্য পূর্ণতা পায় মার্কিন চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনের ১৯৭১ সালে ধারণ করা ফুটেজ উদ্ধার করে ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫)-এর মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রে একদল ট্রাভেলিং কালচারাল ট্রুপ বা সাংস্কৃতিক দলের ট্রাকে করে মুক্তাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে গান গাওয়ার ঐতিহাসিক দৃশ্য ব্যবহার করে মাসুদ দেখান—শিল্পকলা কীভাবে কোনো সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্টলাইন হয়ে উঠতে পারে।
‘মুক্তির গান’-এর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর তিনি থেমে থাকেননি; তিনি অনুধাবন করেন যে ইতিহাস কেবল বীরদের গল্প নয়, সাধারণ মানুষের অনুভূতির সংমিশ্রণ। এই ভাবনা থেকে তিনি নির্মাণ করেন ‘মুক্তির কথা’ (১৯৯৯), যেখানে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কাছে ‘মুক্তির গান’ প্রদর্শনের মুহূর্ত এবং তাদের নিজেদের মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা রেকর্ড করা হয়। এটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য ‘মাইক্রো-হিস্ট্রি’ বা ক্ষুদ্র-ইতিহাসের জন্ম দেয়, যা মূলধারার রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের যাপিত যুদ্ধের ইতিহাসকে নথিভুক্ত করেছিল।
বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি নিয়ে তারেক মাসুদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীরভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। তিনি সংস্কৃতিকে কেবল লোকগান, গ্রামীণ পোশাক বা উৎসবের বাহ্যিক উপকরণ হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সংস্কৃতি মানুষের জীবনযাপনের ভিতরকার এক অদৃশ্য কাঠামো—মানুষ কীভাবে ভালোবাসে, কীভাবে শোক করে, কীভাবে ধর্ম পালন করে, সন্তানকে কীভাবে বড় করে, কোন বিষয়কে পবিত্র মনে করে, কোন বিষয়কে ভয় পায় এবং নিজের দেশ ও সমাজকে কীভাবে কল্পনা করে। ফলে তাঁর চলচ্চিত্রে লোকসংস্কৃতি কোনো অলংকার নয়; তা চরিত্রের জীবনবোধের অংশ। তাঁর চলচ্চিত্রের গান, ভাষা, প্রকৃতি, গ্রামীণ পরিবেশ কিংবা ধর্মীয় অনুষঙ্গকে আলাদা করে দেখলে তাঁর শিল্পের মূল জায়গাটি ধরা যাবে না। এগুলো তাঁর চরিত্রগুলোর অস্তিত্বের ভেতরে মিশে আছে। বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র নির্মাতা এভাবে চলচ্চিত্রিক বাংলাদেশের ছবি আঁকার চেষ্টা করেনি।
তারেক মাসুদের মুন্সিয়ানা ও তাৎপর্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আরেকটি কারণে। তার এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মভাবনাও গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়; তা পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিকতা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তারেক মাসুদ এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেননি। বরং ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে তাঁর নিজের বিশ্বাসের ভেতর থেকেই বোঝার চেষ্টা করেছেন।
মাটির ময়না-র কাজী সাহেব চরিত্রটি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কাজী সাহেবের ধর্মীয় বিশ্বাস আন্তরিক; কিন্তু সেই বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় কঠোরতা, ভয় এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। তারেক মাসুদের কৃতিত্ব হলো, তিনি কাজী সাহেবকে কেবল ধর্মান্ধতার প্রতীক বানাননি। তাঁর মধ্যে একজন পিতা, একজন বিশ্বাসী মানুষ এবং একজন ভীত, অসহায় মানুষের অস্তিত্বও রেখেছেন। ফলে ধর্মকে তিনি বিচার করার আগে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এই মানবিক জটিলতাই তাঁর চলচ্চিত্রকে কোনো সরল ধর্মবিরোধী বা অন্ধ ধর্মসমর্থক বক্তব্যে পরিণত হতে দেয়নি।
মুক্তির গান এবং মুক্তির কথা-য় তারেক মাসুদের এই মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসের দিকে প্রসারিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কাছে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার ঘটনা নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, স্বপ্ন, সংস্কৃতি ও সম্মিলিত আত্মপরিচয়ের এক বিরাট রূপান্তর। মুক্তির গান-এ যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গান এখানে বিনোদন নয়, প্রতিরোধের ভাষা। একজন শিল্পী কিংবা সংস্কৃতিকর্মীর হাতে গান তখন অস্ত্রেরই অন্য রূপ। এই জায়গায় তারেক মাসুদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হিসেবেও পাঠ করেন। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা শুধু রাজনৈতিক নেতাদের ভাষণে ছিল না; তা ছিল দেশের আপামর মানুষের গান, মিছিল, ভয়, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার মধ্যেও।
এখানে তাঁর ইতিহাসবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। তিনি ইতিহাসকে ওপর থেকে নিচে নামিয়ে আনেননি; বরং নিচ থেকে ইতিহাসকে দেখতে চেয়েছেন। রাষ্ট্রের ইতিহাসে যে মানুষটি হয়তো কেবল একটি সংখ্যা, তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে সে হয়ে ওঠে একটি মুখ, একটি কণ্ঠ, একটি স্মৃতি। মুক্তির কথা-য় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তাই কোনো জাদুঘরের স্থির ছবি নয়; মানুষের জীবনে বেঁচে থাকা একটি অভিজ্ঞতা। তাঁর কাছে জাতীয় ইতিহাস তখনই অর্থপূর্ণ, যখন তা ব্যক্তির জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। এই কারণে তাঁর চলচ্চিত্রকে এক ধরনের স্মৃতির রাজনীতি হিসেবেও পড়া যায়—যেখানে রাষ্ট্রীয় বয়ানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্মৃতি ও অনুভূতিও ইতিহাসের বৈধ অংশ হয়ে ওঠে।
এই ইতিহাসবোধই মাটির ময়না-য় এসে সবচেয়ে গভীর ও শিল্পসম্মত রূপ পায়।
তার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বহুল আলোচিত ও সর্বকালের অন্যতম সেরা সৃষ্টি ‘মাটির ময়না’ (The Clay Bird)। ২০০২ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফিপ্রেসি’ (FIPRESCI) আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার বিজয়ী এই ছবিটি তার নিজের শৈশবের স্মৃতি, মাদ্রাসার জীবন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পূর্ববর্তী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জটিল আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষিতের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। এই চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কঠোর অনুশাসনের বিপরীতে বাংলার লোকজ সুফি দর্শনের সর্বজনীন ও মানবিক রূপকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।
চলচ্চিত্রে কাজী সাহেবের একমুখী ধর্মীয় অনুশাসনের সমান্তরালে সুফি গান ও মেঠো সুর কেবল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; বরং তা ছবির একটি প্রধান তাত্ত্বিক চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ‘মাটির ময়না’ বা খাঁচায় বন্দি মাটির পাখির রূপক দিয়ে তিনি একদিকে যেমন বালক অনুর অন্তর্জগতের খাঁচাবদ্ধতা ও মুক্তির আকুলতা ফুটিয়ে তুলেছেন, অন্যদিকে তৎকালীন জাতির ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বন্দ্বকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উন্মোচন করেছেন।
কিন্তু মাটির ময়না-কে কেবল মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বলা হলে এর প্রকৃত তাৎপর্য কমে যায়। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রে আসলে রয়েছে একটি শিশুর বেড়ে ওঠা এবং সেই বেড়ে ওঠার ভেতর দিয়ে একটি সমাজের পরিবর্তনকে অনুভব করা। আনু ইতিহাস বোঝে না, রাজনীতি বোঝে না; সে তার চারপাশের মানুষ ও ঘটনাকে অনুভব করে। তার চোখ দিয়ে দর্শকও একটি সমাজের ভেতরকার পরিবর্তন দেখতে পায়। ধর্মীয় অনুশাসন, মায়ের মানবিকতা, পিতার কঠোরতা, মাদ্রাসার পরিবেশ, গ্রামীণ জীবন এবং ক্রমশ ঘনিয়ে আসা রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি শিশুর ব্যক্তিগত পৃথিবী ধীরে ধীরে বৃহত্তর জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়। এখানেই তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রচিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবয়বটি পাওয়া যায়: বড় ইতিহাসকে তিনি ছোট মানুষের জীবনের মধ্যে খুঁজে নেন।
বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাসের প্রশ্নটি মাটির ময়না-য় তাই রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন নয়। এই ভূখণ্ডের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন বাস্তব, তেমনি তার লোকায়ত সংস্কৃতি, পারিবারিক আবেগ ও সামাজিক সম্পর্কও বাস্তব। তারেক মাসুদ এই দুইয়ের মধ্যে কোনো কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করেননি। তাঁর বাংলাদেশে মসজিদ যেমন আছে, তেমনি আছে নদী, গান, গ্রামীণ জীবন, পারিবারিক মায়া, মেলা, পূজা এবং লোকজ স্মৃতি। এই বহুত্বকে তিনি কোনো স্লোগানে প্রকাশ করেননি; চরিত্রের জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন। ফলে তাঁর চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের সংস্কৃতি কোনো একক পরিচয়ের সংস্কৃতি নয়। বরং ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকায়ত ঐতিহ্য, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, পাকিস্তানি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বাঙালি সাংস্কৃতিক চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠা একটি জটিল সাংস্কৃতিক ভূগোল। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষকে ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতাকে পাঠ করা যায়।
‘মাটির ময়না’-র সাফল্যের পর তারেক মাসুদ মানুষের শিকড় খোঁজা ও ভৌগোলিক পরিচয় সংকটের গভীর সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেন। ২০০৪ সালে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধামালী’-তে তিনি সিলেটের বাউল ঐতিহ্য ও বৈবাহিক লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন। এরপর ২০০৬ সালে মুক্তি পায় তার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অন্তর্যাত্রা’ (Inner Journey)। এই চলচ্চিত্রে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালি তরুণ প্রজন্ম ও তাদের মা-বাবার মধ্যকার আত্মপরিচয়ের সংকট, শিকড়ে ফেরার আকুলতা এবং দুটি ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যবর্তী মানসিক দূরত্বকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেন।
এই জায়গায় তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রচিন্তা জাতীয়তাবাদের প্রচলিত ধারণা থেকেও কিছুটা আলাদা। তিনি দেশপ্রেমকে শুধু জাতীয় পতাকা, ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্যে আবদ্ধ করেননি। তাঁর কাছে দেশকে ভালোবাসা মানে তার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করা। একজন কৃষকের জীবন, একজন শিশুর ভয়, একজন মায়ের অপেক্ষা, একজন ধর্মবিশ্বাসী পিতার সংকট কিংবা একজন বেকার তরুণের হতাশা—এসবও দেশের ইতিহাসের অংশ। ফলে তাঁর জাতীয়তাবোধ আবেগনির্ভর হলেও অন্ধ নয়; এর মধ্যে আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। নিজের সমাজকে ভালোবাসার অর্থ তার দুর্বলতা ও সংকটকে আড়াল করা নয়, বরং সেগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানো।
রানওয়ে-তে এসে এই চলচ্চিত্রচিন্তা অতীত থেকে বর্তমানের দিকে অগ্রসর হয়। এখানে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি স্মৃতি নেই; আছে বিশ্বায়নের বাংলাদেশ, শহরের প্রান্তিকতা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ধর্মীয় উগ্রতার আকর্ষণ। কিন্তু চলচ্চিত্রটি মাটির ময়না থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। দুটি চলচ্চিত্রেই মানুষ তার চারপাশের বিশ্বাসব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। আনু যেমন ধর্মীয় ও পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে নিজের পৃথিবী আবিষ্কার করে, রানওয়ে-র তরুণও তেমনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি অর্থপূর্ণ পরিচয় খুঁজতে থাকে। পার্থক্য হলো, একটির পটভূমি একটি জাতির জন্মের পূর্বমুহূর্ত, অন্যটির পটভূমি বিশ্বায়িত বাংলাদেশের নতুন সংকট। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্নটি একই—একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে তার সময়ের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং তার নিজের পথটি কীভাবে খুঁজে নেয়?
ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে সংলগ্ন বস্তি ও কলোনির বাস্তব লোকেশনে ধারণ করা এই ছবিতে তিনি অনিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়ন, গ্রামীণ দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং এর প্রভাবে উদভ্রান্ত তরুণ সমাজের ধর্মীয় উগ্রপন্থা ও জঙ্গিবাদের ফাঁদে পা দেওয়ার সমাজতাত্ত্বিক কারণ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেন। রানওয়েতে উড়োজাহাজের আসা-যাওয়া যেমন বিশ্বায়নের বাহ্যিক চটক তুলে ধরে, তেমনি রানওয়ের নিচের বস্তি ও দারিদ্র্য প্রকাশ করে প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত করুণ চিত্র।
রানওয়ে-র এই দিকটি তারেক মাসুদের মানবিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। তিনি উগ্রবাদকে সমর্থন করেন না, কিন্তু একজন তরুণ কেন উগ্রতার দিকে আকৃষ্ট হয়, সেই প্রশ্নটি করেন। অর্থাৎ তিনি শুধু অপরাধের দিকে তাকান না; অপরাধের সামাজিক উৎপত্তির দিকে তাকান। বেকারত্ব, প্রান্তিকতা, পারিবারিক অসহায়ত্ব এবং অর্থহীনতার অনুভূতি কীভাবে একজন মানুষকে একটি কঠোর মতাদর্শের আশ্রয় নিতে বাধ্য করতে পারে, তিনি সেই জটিলতাটি বোঝার চেষ্টা করেন। এখানেও তাঁর চলচ্চিত্রের কেন্দ্র মানুষ, মতাদর্শ নয়। এখানে তিনি আরেকটি বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন- ধর্ম, ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে না দিলে বরং উগ্রবাদের জন্ম হতে পারে।
তারেক মাসুদের অসমাপ্ত কাগজের ফুল তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে আনে। মাটির ময়না-র পটভূমিকে আরও পেছনে নিয়ে গিয়ে দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্মপরিচয় গড়ে ওঠার ইতিহাসের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল এই চলচ্চিত্রে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, তাঁর কাছে ১৯৭১ কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না; এর পেছনে ছিল দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। বাঙালির পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, ভাষার পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের দ্বন্দ্ব বহুদিন ধরে জমা হয়েছিল। এই দীর্ঘ ইতিহাসের ভেতর দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তৈরি হয়েছিল। তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি ছিল সম্ভবত এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা। কিন্তু একটি দূর্ঘটনা তার এই বিশাল চিন্তার কাজকে বাঁধাগ্রস্থ করে তোলে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অপূরণীয় একটি ক্ষতি করে দেয়।
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে তাই ‘বাংলাদেশি সংস্কৃতি’ কোনো একরৈখিক ধারণা নয়। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের মানুষ একই সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসী এবং লোকজ সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী, একই সঙ্গে বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের সদস্য, একই সঙ্গে গ্রামীণ স্মৃতির উত্তরাধিকারী এবং আধুনিক নগরজীবনের অংশ। এই বহুত্বের মধ্যেই বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় গড়ে উঠেছে। তাঁর চলচ্চিত্র এই জটিলতাকে সরল করে না; বরং তার ভেতরেই মানুষের সত্যকে খুঁজে নেয়।
এই কারণেই তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যায়। জাতীয় চলচ্চিত্র মানে শুধু জাতীয় বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ নয়; বরং একটি দেশের মানুষ পৃথিবীকে কীভাবে দেখে, নিজেকে কীভাবে বোঝে এবং নিজের অতীতকে কীভাবে স্মরণ করে—তার একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণ করা। তারেক মাসুদ সেই ভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের প্রকৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্মীয় বিশ্বাস; মুক্তিযুদ্ধ যেমন আছে, তেমনি আছে তার পূর্ববর্তী সামাজিক ইতিহাস; লোকসংস্কৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে আধুনিকতার সংকট। এই সমন্বয়ই তাঁর চলচ্চিত্রকে দেশজ করে এবং একই সঙ্গে বিশ্বজনীন করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রচিন্তার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানুষের প্রতি আস্থা। তিনি কোনো মানুষকে শুধু তার পরিচয় দিয়ে বিচার করেননি। ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে শুধু ধর্ম দিয়ে, দরিদ্র মানুষকে শুধু দারিদ্র্য দিয়ে, তরুণকে শুধু তার রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের মানুষকে শুধু তার জাতীয় পরিচয় দিয়ে বোঝেননি। তিনি মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, ভয়, দুর্বলতা ও আকাঙ্ক্ষাকে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর সিনেমায় বাংলাদেশ তাই কোনো নিখুঁত দেশ নয়; এটি তার সব সৌন্দর্য, সংকট, বিশ্বাস, বিভ্রান্তি ও স্মৃতি নিয়ে একটি জীবন্ত সমাজ।
এই কারণেই তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের গুরুত্ব শুধু মাটির ময়না-র আন্তর্জাতিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। আদম সুরত-এ তিনি মানুষের শরীর ও মাটির সম্পর্ক দেখেছেন; মুক্তির গান-এ সংস্কৃতিকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার ভাষা করেছেন; মুক্তির কথা-য় স্মৃতিকে ইতিহাসের জীবন্ত ধারক হিসেবে দেখেছেন; মাটির ময়না-য় শিশুর চোখে একটি জাতির অন্তর্গত পরিবর্তন আবিষ্কার করেছেন; রানওয়ে-তে সমকালীন তরুণের সংকটের মধ্যে বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে ধরেছেন। আর কাগজের ফুল অসমাপ্ত থেকেও তাঁর ইতিহাসের আরও গভীরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার সাক্ষ্য হয়ে আছে।
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের ভাষা সবসময়ই ছিল ‘প্রামাণ্য বাস্তবতাবাদ’ -এ বিশ্বাসী। তিনি স্টুডিওর কৃত্রিম সেট, অতিরিক্ত মেকআপ কিংবা আড়ম্বরপূর্ণ কৃত্রিম আলোর বদলে বাস্তব লোকেশন, প্রাকৃতিক আলো এবং পেশাদার অভিনেতাদের পাশাপাশি অ-পেশাদার স্থানীয় মানুষদের কাস্টিং করে চলচ্চিত্রে জীবনের আসল সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও নদীর জীবনকে কেন্দ্র করে ‘কাগজের ফুল’ নামে একটি মহাকাব্যিক প্রাক-প্রস্তুতিকালে ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় তার আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণ ঘটে। তার এই অকালপ্রস্থান বাংলাদেশের বিকল্প ধারার সিনেমা আন্দোলনের জন্য এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করলেও, তার রেখে যাওয়া কাজগুলো আজও অমলিন।
তারেক মাসুদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো এই যে, তিনি বাংলাদেশের মানুষকে ‘বিষয়’ হিসেবে ব্যবহার করেননি; তাঁদের জীবনকে চলচ্চিত্রের ভাষা করে তুলেছেন। তাঁর সিনেমা আমাদের শেখায়, একটি দেশের সংস্কৃতি তার উৎসবের দৃশ্যের চেয়ে অনেক গভীর; তার বিশ্বাস তার ধর্মীয় আচার থেকে বড়; তার ইতিহাস তারিখের চেয়ে দীর্ঘ; আর তার পরিচয় কোনো একক শব্দে ধরা যায় না। মানুষের জীবন, মাটি, স্মৃতি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির এই বহুস্বরের মধ্যেই বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যায়। তারেক মাসুদ সেই বহুস্বরকে চলচ্চিত্রে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর চলচ্চিত্রের দিকে ফিরে তাকানো মানে শুধু একজন প্রয়াত নির্মাতার কাজ স্মরণ করা নয়; বরং আমরা যে সমাজ থেকে এসেছি, যে বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠেছি এবং যে ইতিহাস আমাদের তৈরি করেছে—সেই সামগ্রিক অস্তিত্বের দিকে নতুন করে তাকানো।
তারেক মাসুদ প্রমাণ করে গেছেন যে, আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক সিনেমার উচ্চতায় পৌঁছাতে হলে নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শিকড়কে ভুলে যেতে হয় না; বরং তাকে দৃশ্যভাষায় সফলভাবে অনুবাদ করতে পারলেই চলচ্চিত্র কেবল সাময়িক বিনোদন না হয়ে একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার ও বৈশ্বিক দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সবচেয়ে শক্ত মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতারা সেই পথে হাঁটছেন কি?
