নেপালের বন্যা-ট্র্যাজেডি: ২০ বছর আগের সতর্কবার্তা উপেক্ষিত

নেপালের বন্যা-ট্র্যাজেডি: ২০ বছর আগের সতর্কবার্তা উপেক্ষিত

২০০৭ সালের এপ্রিল। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে আইপিসিসি—Intergovernmental Panel on Climate Change—এর মূল্যায়ন প্রতিবেদন নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসেছিল। সে সময় আমি একটি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের প্রতিনিধিদলের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় সহায়তা করতে সেখানে অংশ নিয়েছিলাম।

বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি ও প্রতিবেদন প্রণয়নকারীরা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং নীতিগত প্রভাবের কথা বিবেচনা করে প্রতিবেদনের প্রতিটি বাক্য—কখনও কখনও একটি শব্দ—নিয়েও তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে পড়তেন।

আপাতদৃষ্টিতে দেখলে হয়তো মনে হতে পারত, কয়েকটি শব্দের এত গুরুত্ব কেন? কিন্তু সেই কক্ষের ভেতরে বসে বোঝা যেত—একটি শব্দের সঙ্গে কখনও কখনও জড়িয়ে থাকে একটি দেশের ভবিষ্যৎ, একটি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, কিংবা কোটি মানুষের জীবনের ঝুঁকি।

সবচেয়ে স্মরণীয় বিতর্কটি ছিল হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া এবং তার ফলে বন্যার ঝুঁকি নিয়ে—যাকে অনেকে ‘গ্লেশিয়াল সুনামি’ বলে উল্লেখ করেন।

হিমালয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী ভুটানি প্রতিনিধিদল জোর দিয়ে বলেছিল, প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত যে হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে নিম্নাঞ্চলে বন্যা ও প্লাবনজনিত ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।

নেপালি প্রতিনিধিদলও তাদের এই দাবিকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিল। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ক্ষতির মুখে সবচেয়ে আগে পড়া ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই বাক্যটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এই তাগিদের পেছনে শুধু বৈজ্ঞানিক বিতর্ক ছিল না; ছিল বাস্তবতার চাপ।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ক্ষতির মুখে সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে সরাসরি পড়া দেশগুলোর জন্য এমন একটি বাক্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা আদায়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের কাছে এটি কেবল প্রতিবেদনের ভাষা নয়—সহায়তা, প্রস্তুতি এবং টিকে থাকার প্রশ্ন।

Yoo Ga-young
ইউ গা-ইয়ং, পরিবেশ বিজ্ঞান ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক, কিয়ং হি বিশ্ববিদ্যালয়।

তবে মার্কিন প্রতিনিধিদল প্রশ্ন তুলেছিল—হিমবাহ গলে যাওয়ার সঙ্গে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্পর্ক কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব? সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন-লেখক জবাবে বলেন, এটি কোনো প্রতিষ্ঠিত কারণ-ও-ফল সম্পর্ক নয়; বরং গবেষণা ও মডেলের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে করা একটি পূর্বাভাস।

শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদনের সারাংশে এমন একটি বাক্যই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যার অর্থ ছিল: “হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে বন্যা বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।” সেখানে বলা হয়নি, “বন্যা বেড়েছে”; বলা হয়েছিল, “বন্যা বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।”

পার্থক্য মাত্র কয়েকটি শব্দের। কিন্তু সেই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই ছিল একটি বড় প্রশ্ন—বৈজ্ঞানিক কঠোরতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, নাকি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি বাস্তবতাকে? এই বিতর্ক এড়ানো সম্ভব ছিল না।

উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক, প্রমাণের আগে বিজ্ঞান কথা বলতে পারে না। আবার অনিশ্চয়তার কারণে বিজ্ঞান পুরোপুরি নীরবও থাকতে পারে না। সে সময় আমার উদ্বেগ ছিল, বিজ্ঞানের এই সতর্ক ভাষা হয়তো নীতিগত নিষ্ক্রিয়তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

প্রায় ২০ বছর পর, এ বছরের আগস্টে, সেই উদ্বেগ যেন বাস্তবে রূপ নিল। নেপালের হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহ ও শিলাধসের ফলে ব্যাপক বন্যা এবং ধ্বংসাবশেষের স্রোত সৃষ্টি হয়। নিম্নাঞ্চলের গ্রাম, সড়ক এবং জলবিদ্যুৎ স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।

অবশ্য এই দুর্যোগকে সরাসরি এবং এককভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে ঘোষণা করার আগে আরও গভীর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। প্রতিটি দুর্যোগেরই নিজস্ব ভূতাত্ত্বিক, আবহাওয়াগত ও স্থানীয় কারণ থাকে।

তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: ২০০৭ সালের প্রতিবেদনে যদি কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা না বলে আসন্ন বিপদের ব্যাপারে আরও জোরালো ও জরুরি সতর্কবার্তা দেওয়া হতো, তাহলে কি আজকের এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব ছিল?

হয়তো প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়। হয়তো কোনো একটি প্রতিবেদনের একটি বাক্য বদলে গেলেই ইতিহাসের গতিপথ বদলে যেত না।

কিন্তু আমরা অন্য প্রশ্নগুলো করতে পারতাম।

আমরা তো জানতাম, হিমালয়ের হিমবাহগুলো ক্রমে পিছিয়ে যাচ্ছে এবং ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। তাহলে উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনার সময় কি আমাদের আরও কিছু ভিন্ন প্রশ্ন করা উচিত ছিল না?

এই এলাকায় বৃহৎ আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল? প্রয়োজন হলেও, নকশা তৈরির ক্ষেত্রে শুধু অতীতের বন্যার তথ্যের ওপর নির্ভর করাই কি যথেষ্ট ছিল?

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং নদীর বন্যা কি আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবেই ঘটবে? নাকি একটি বিপর্যয় আরেকটিকে ডেকে আনতে পারে?

আজ আমরা যাকে ‘ক্যাসকেডিং রিস্ক’ বা ধারাবাহিক ও পরস্পর-সংযুক্ত ঝুঁকি বলি, সেই সম্ভাবনা কি প্রকল্প পরিকল্পনার সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল?

এই প্রশ্নগুলো কেবল নেপাল বা হিমালয়ের জন্য নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এগুলো উন্নয়নের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের জন্য প্রযোজ্য।

এতদিন পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মূল প্রশ্ন ছিল—একটি প্রকল্প পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?

এখন আমাদের আরও এক ধাপ এগোতে হবে।

প্রশ্ন করতে হবে—পরিবর্তিত জলবায়ু ও পরিবেশ এই প্রকল্পটির জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে?

এই পার্থক্যটি ছোট নয়।

প্রথম প্রশ্নটি প্রকল্পের পরিবেশের ওপর প্রভাব নিয়ে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি ভবিষ্যতের পরিবেশের প্রকল্পের ওপর প্রভাব নিয়ে।

এই কারণেই ভবিষ্যতের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। এতদিন পরিবেশগত মূল্যায়নের মূল প্রশ্ন ছিল—“একটি প্রকল্প পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?” এখন আমাদের আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করতে হবে—“পরিবর্তিত জলবায়ু ও পরিবেশ প্রকল্পটির জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে?”

বন্যা, ভূমিধস এবং চরম বৃষ্টিপাতের মতো ভবিষ্যৎ ঝুঁকিগুলো একটি প্রকল্পকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তা বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। সেই মূল্যায়নের ফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনে প্রকল্পের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে, নকশার মান আরও শক্তিশালী করতে হবে, এমনকি প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়ন করা উচিত কি না, সেটিও পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সমস্যাটি হয়তো আইপিসিসি প্রতিবেদনে “বন্যা বাড়ছে” না বলে “বন্যা বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে” বলার মধ্যে ছিল না। সে সময় যতটুকু প্রমাণ ছিল, তার সীমার মধ্যেই বিজ্ঞান যথাসম্ভব সতর্কতার সঙ্গে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা সেই “পূর্বাভাস” শব্দটির গুরুত্ব কতটা উপলব্ধি করেছিলাম।

বিজ্ঞানকে শব্দ ব্যবহারে সতর্ক ও সংযত হতে হয়। কিন্তু সরকারি নীতিনির্ধারণে সেই সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের অন্তর্নিহিত গুরুত্ব ও ওজন বুঝতে হবে।

‘পূর্বাভাস’ শব্দটি আমাদের কাছে কি কেবল ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি অনিশ্চিত অনুমান ছিল? নাকি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার একটি যথেষ্ট শক্তিশালী সতর্কবার্তা?

বিজ্ঞানকে শব্দ ব্যবহারে সংযত হতে হয়। বিশেষ করে ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে তাকে প্রমাণের সীমারেখা অতিক্রম করার সুযোগ নেই।

কিন্তু নীতিনির্ধারণের ভাষা বিজ্ঞানের ভাষা হতে পারে না।

বিজ্ঞান হয়তো বলবে, ‘সম্ভাবনা আছে’।

বিজ্ঞান হয়তো বলবে, ‘বৃদ্ধি পেতে পারে’।

বিজ্ঞান হয়তো বলবে, ‘পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে’।

কিন্তু সরকারের কাজ শুধু এই শব্দগুলোর ব্যাকরণ বোঝা নয়। সরকারের কাজ হলো—এই সতর্ক শব্দগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকির ওজন বোঝা এবং সময় থাকতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বিজ্ঞানকে তাই ক্রিয়াপদ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হয়।

কিন্তু নীতিকে সেই সতর্ক ক্রিয়াপদের মধ্যেও ভবিষ্যতের বিপদের ভাষা পড়তে জানতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *