জহির রায়হান : চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও জীবন

share on:
জহির রায়হান

জহির রায়হান বাংলাদেশের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক, সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার। তাকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ‘কালচারাল আইকন’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯৫৯ সালে জহির রায়হান ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এককভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। এ  চলচ্চিত্রে নিম্ন মধ্যবিত্তের দুঃখ কষ্ট এবং সংকট চিত্রিত হয়েছে। একদিকে সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্তের দুঃখকষ্ট অন্যদিকে খামখেয়ালী উচ্চবিত্তের বিকৃত জীবনবোধ।

কখনো আসেনি’র পর জহির রায়হান কলিম শরাফীর সাথে যৌথভাবে তৈরি করলেন ‘সোনার কাজল’ ছবিটি। সোনার কাজল নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের না পাওয়ার বেদনার ছবি। এ পাওয়াটা নিশ্চিতভাবে সমাজে বাস করার নিশ্চয়তা। জীর্ণ গৃহ থেকে সুন্দর এক ছিমছাম বাড়ীতে আজীবন বাস করার বাসনা। ছবির কাহিনীটি আবর্তিত হয় জীবনযুদ্ধে অসফল মানুষ ভূঁইয়া সাহেব এবং তার কাছে আশ্রয় পাওয়া শওকতকে কেন্দ্র করে। শওকত চাকুরী করে; প্রচুর পরিশ্রম করে জীবনে সমৃদ্ধি আনার জন্য। দেওয়ালের ক্যালেন্ডারে একটি সুন্দর বাড়ীর ছবি দেখার পর তার মাথায় সব সময় দোলা দিতে থাকে কিভাবে সে এমন একটি বাড়ীর মালিক হবে।

এরপর নির্মাণ করেন ‘কাঁচের দেয়াল’। এ ছবিতেও নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজের আর্থিক সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। একজন অসহায় মেয়েকে কেন্দ্র করে এ ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়। কাঁচের দেয়াল ছবিটি পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার ১৯৬৬ এ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ১৯৭১ সালে ছবিটি জার্মানীর ফ্রাংকফুট চলচ্চিত্র উৎসবে সার্টিফিকেট অব মেরিট সম্মাননা পায়।

কখনো আসেনি এবং কাঁচের দেয়াল বোদ্ধা মহলে প্রশংসিত হলেও ছবি দুটি বক্স অফিস হিট করতে পারেনি। ফলে এবার জহির রায়হান বিনোদনধর্মী ছবিতে হাত দিলেন এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্র বাড়ানোর জন্য তিনি ছবিটি হিন্দীতে করবেন বলে মনস্থির করলেন। বাংলা ভাষার সোচ্চার কণ্ঠ জহির রায়হান হিন্দীতে ছবি নির্মাণ করতে যাচ্ছেন শুনে সেদিন তিনি অনেকের কাছ থেকেই সমালোচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে সঙ্গম নামের এই ছবিটির শ্যুটিং শুরু হয়। সঙ্গম পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি।

সঙ্গম ছবির অসাধারণ সাফল্যের পর জহির রায়হান বাহানা নামে আরেকটি উর্দু ছবি নির্মাণে হাতে দেন। ছবিটি সিনেমাস্কোপে নির্মিত হবে বলে ঘোষিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, বাহানা সিনেমাস্কোপে নির্মিত পাকিস্তানের প্রথম ছবি। বাহানা’র কাহিনী গড়ে উঠেছে পাকিস্তানের সর্বাধুনিক ও বৃহত্তম নগরী করাচীকে কেন্দ্র করে।

এরপর জহির রায়হান তৈরি করেন হিন্দু পুরাণভিত্তিক লোকগাথা বেহুলা-লখিন্দর এর কাহিনী অবলম্বনে বেহুলা ছবিটি। বেহুলা ছবির কাহিনীটি গড়ে ওঠে নিছনীপুরের সাই সওদাগরের কন্যা বেহুলাকে কেন্দ্র করে।

সংস্কৃতি ডটকম

সাহিত্যিক চলচ্চিকার জহির রায়হানের আরেক সৃষ্টি নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন রচিত আনোয়ারা উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ। ছবিটি ১৯৬৭ সালে তৈরি হয়। মুসলিম পরিবার, জীবন ও সমাজের রূপ ফুটে উঠেছে এই ছবিটিতে। ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন সুচন্দা।

জহির রহমানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি জীবন থেকে নেয়া ছবিটি। এই ছবিতে রূপকের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি তুলে ধরেন। বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের মনোভাব কেমন এই বিষয়টি উঠে এসেছে এক পরিবারকে উপস্থাপনার মাধ্যমে।

‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে প্রতীকী কাহিনীর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে চিত্রিত করা হয় এবং জনগণকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উদ্বুদ্ধ করা হয়। জহির রায়হান ‘এ-খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’ গানটি চলচ্চিত্রে সংযোজন করে পরিচালক হিসেবে তাঁর সুনিপুণ পরিচালনার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি যেভাবে বাঙালির শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলনে উত্সাহিত করেছিলেন তার তুলনা বিরল। বাঙালি যখন স্বাধিকার আন্দোলনে তৈরি হচ্ছিল তখন জহির রায়হান ‘জীবন থেকে নেওয়া’ বাংলা চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করে যে মেধার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তা মানুষ মনে রাখবে চিরদিন।

চলচ্চিত্রটি দেখার পর এক চিঠিতে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘জহির ভাই সমস্ত দর্শক এক মন এক প্রাণ হয়ে গেছে তোমার ছবির সঙ্গে। তারা কখনো হাসছে, কখনো কাঁদছে, কখনো রাগে ফুঁসে উঠেছে। ….. এ ছবি করে তুমি শুধু বীরের সম্মান রাখোনি, শিল্প আর শিল্পীরও সম্মান রক্ষা করেছো।’

সত্যজিৎ রায় ছবিটি দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ছেলেটি এখনো ঢাকা পড়ে আছে কেন? ওর জায়গাতো অনেক ওপরে।’

তিনি লেট দেয়ার বি লাইট নামে একটি ইংরেজি ছবি নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি তা শেষ করতে পারেন নি।

জহির রায়হান মূলত নাগরিক লেখক, নগরকেন্দ্রিক ঘটনাবলী তাঁর উপন্যাসের বিষয়। সাতটি উপন্যাসের মধ্যে কেবলমাত্র ‘হাজার বছর ধরে’ ছাড়া অন্য সবের পটভূমি শহর বা নগর। জহির রায়হানের উপন্যাসসমগ্রকে তিনটি পর্বে ভাগ করলে এর চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যগুলো সহজেই পাঠসীমায় আনা যায়।
১. আরেক ফাল্গুন ও আর কতদিন
২. হাজার বছর ধরে
৩. শেষ বিকেলের মেয়ে, বরফ গলা নদী, তৃষ্ণা ও কয়েকটি মৃত্যু।

আরেক ফাল্গুন ও আর কতদিন উপন্যাস দু’টিতে ইতিহাস, রাজনীতি, আনত্মর্জাতিকতা, যুদ্ধবিরোধিতা, সংগ্রামী জীবন এবং আগামীদিনে একটি শোষণ-বঞ্চনামুক্ত নতুন পৃথিবী গড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত হয়েছে।  ‘আরেক ফাগুন’ এদেশের ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। আজ পর্যন্ত যত ভাষা আন্দোলন অবলম্বনে উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে জহির রায়হানের ‘আরেক ফাগুন’ মহৎ ও সার্থক উপন্যাস।

পৃথিবীর নির্যাতিত, নিগৃহীত মানুষের সরব উচ্চারণ ‘আর কতদিন’ উপন্যাস। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উন্মত্ততা যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষকে করেছে বিপর্যস্ত, দিশেহারা, ধর্মের নামে, বর্ণের নামে, জাতীয়তার নামে, সংস্কৃতির নামে মানুষ আত্মহুতি দিয়েছে বার বার। এই নির্মম আত্মহুতির বিরম্নদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে সুস্থ মানবতা, এর মধ্যেই বাঁচার বীজমন্ত্র খুঁজেছেন জহির রায়হন, প্রশ্ন করেছেন সুস্থ বিবেককে_ আর কতদিন চলবে এই সবের পুনরাবৃত্তি? অন্ধকার থেকে আলোতে আসার পথ তৈরি করতে চেয়েছেন জহির রায়হান।

‘হাজার বছর ধরে’ জহির রায়হানের সাতটি উপন্যাসের মধ্যে এই একটি গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত। এই উপন্যাসে বিশেষ এক এলাকার মানুষের সহজ-সরল জীবনধারা ফুটে উঠেছে।

‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস, যাতে নগরপ্রধান মধ্যবিত্ত জীবনের প্রেম ও মনোবিকলন স্থান পেয়েছে।  জহির রায়হান এই উপন্যাসে মানুষের বাঁচার আকাঙ্খাকে বেগবতী নদীর মত রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

‘কয়েকটি মৃত্যু’ উপন্যাসে কোন মৃত্যু নেই, সেখানে কারো মৃত্যু হয় না, কিন্তু মৃত্যুভয় আছে, ভয়টি পাথরের মত চেপে বসে বুকে। মৃত্যুকে কি এড়ানো যায়, এড়াতে পেরেছে কেউ_ এ উপলব্ধি আসে এই উপন্যাসের বয়স্ক চরিত্র বাবা আহমদ আলীর মধ্যে।

‘তৃষ্ণা’ শহরকেন্দ্রিক উপন্যাস। এই উপন্যাসে জহির রায়হান ডিটেলসের আশ্রয় নিয়েছেন, যে ডিটেলস-এ তখনকার শহুরে মানুষের জীবনযাপনের নিখুঁত চিত্র উঠে আসে। বিচিত্র সব মানুষের সংগ্রামরত জীবনের ছবি, যা মূলত বাঁচারই তৃষ্ণা, এ উপন্যাসে ডিটেলস-এর সাহায্যে তুলে এনেছেন জহির রায়হান।

জহির রায়হানের গল্পের সংখ্যা একুশ। তার গল্পে মধ্যবিত্তের জীবনের যাপনটাই মূর্ত হয়েছে। গ্রামের সামন্তপ্রভুর খবরদারির গল্পও যেমন উঠে এসেছে, তেমনই এসেছে নাগরিক মধ্যবিত্তের আবেগ-অনুভূতি, ব্যক্ত-অব্যক্ত আনন্দ-বেদনা। তবে, নাগরিক মধ্যবিত্তই কেন্দ্রে ছিল। সমালোচকরা বলেন, তার ছোটগল্পের দুনিয়া ‘নাগরিক মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর হৃদয়রহস্য নিয়ে গড়ে উঠেছে’। বিভিন্ন আন্দোলন যেমন- পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন তার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাত্র একটা গল্পই লিখতে পেরেছিলেন তিনি, ‘সময়ের প্রয়োজনে’ নামে।

তার গল্পের কেন্দ্রে আছে মধ্যবিত্তের জীবন, সে জীবনের আকুতি-মিনতি। তিনি খুব সার্থকভাবে দেখাতে পেরেছেন যে, মধ্যবিত্তের মানসিক টানাপোড়ন তার আর্থ-সামাজিক টানাপোড়নের মধ্যেই নিহিত। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বাংলাদেশের এক বিশেষ সময়ের মধ্যবিত্তের বিচিত্র কর্মকাণ্ড ও নানান চরিত্র। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে জহিরের সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণেই তার বিভিন্ন গল্পে ঘুরেফিরে এসেছে আন্দোলন-সংগ্রাম। সেই আন্দোলনে মধ্যবিত্তের শুভ-অশুভ, বিদ্রোহী-আপোসকামী বিপরীতধর্মী দুই বৈশিষ্ট্যই হাজির হয়েছে।

মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ও সৈয়দা সুফিয়া খাতুন দম্পতির সন্তান জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ছেলেবেলায় ডাকা হতো জাফর নামে। তার বড় ভাই সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার।

নিজ পরিবারেই জহির রায়হানের পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়। শৈশব-কৈশোর ও স্কুলজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে কলকাতায়। ১৯৪০ সালে কলকাতা মডেল স্কুলে ভর্তি হন। তার বাবা তখন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। মডেল স্কুলে তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর মিত্র ইনস্টিটিউশন (মেইন) থেকে সপ্তম শ্রেণী পাস করে আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্শিয়ান বিভাগে ভর্তি হন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বাবার সঙ্গে মজুপুর গ্রামে চলে আসেন। গ্রামের আমিরাবাদ হাইস্কুল থেকে ১৯৫০ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। ঢাকা কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর এক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ে বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৮ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে অনার্স পাস করেন। এরপর এমএ ক্লাসে ভর্তি হন।

সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ‘খাপছাড়া’ পত্রিকায়। বড় বোনের স্বামী এমএ কবীর ও ড. আলিম চৌধুরী সম্পাদিত ‘যাত্রিক’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে ‘প্রবাহ’ নামক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকার কার্যকরী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ‘সমকাল’, ‘চিত্রালী’, ‘সচিত্র সন্ধানী’, ‘সিনেমা’, ‘যুগের দাবী’ প্রভৃতি পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি ‘চিত্রালী’-তে ‘প্রবেশ নিষেধ’ শিরোনামে কিছুদিন একটি ধারাবাহিক ফিচার লিখেছিলেন।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি সালাউদ্দীনের ‘যে নদী মরুপথে’ ছবিতেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন।

তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’য়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন।

কলকাতায় ‘জীবন থেকে নেওয়া’র বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটকের মতো বিখ্যাত নির্মাতারা প্রশংসা করেন। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন। তিনি বুদ্ধিজীবীদের বাংলাদেশ মুক্তি পরিষদ (Bangladesh Liberation council of Intelligentsia)-এর সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ‘স্টপ জেনোসাইড’-র মতো কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এ ছাড়া অন্যান্য পরিচালকের কাজের তত্ত্বাবধানও করেন।

সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। উল্লেখযোগ্য হলো- আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৪, হাজার বছর ধরে), নিগার (কাঁচের দেয়াল, শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭১, সাহিত্য: মরণোত্তর, ১৯৭২ সালে ঘোষিত), একুশে পদক (১৯৭৭, চলচ্চিত্র : মরণোত্তর) ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯২, সাহিত্য : মরণোত্তর)।

জহির রায়হান দুবার বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী অভিনেত্রী সুমিতা দেবী। প্রয়াত এই অভিনেত্রীর দুই ছেলে- বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান। দুজনেই নাট্য নির্মাতা। দ্বিতীয় স্ত্রী অভিনেত্রী সুচন্দার ছোট ছেলে তপু রায়হানও অভিনেতা।

জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার নিখোঁজ ভাইকে খুঁজতে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি। বলা হয়ে থাকে বিহারি ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : আমি : জহির রায়হান

Facebook Comments
share on: