জাফর ইকবাল : বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ নায়ক

share on:
জাফর ইকবাল

জাফর ইকবাল বাংলা চলচ্চিত্রের স্টাইলিশ নায়কদের মধ্যে অন্যতম। ফ্যাশনে, শরীরী ভাষায় তাঁর সময়ের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ নায়ক হিসেবে তিনি পরিচিত।

নায়ক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও সংগীতশিল্পী হিসেবেই নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এই চিরসবুজ তারকা। চলচ্চিত্রে যখন প্রবেশ করেন, সেই সময়টাও খুব একটা অনুকূলে ছিল না। অনেক নামকরা নায়ক তখন ঢাকার চলচ্চিত্র বাজারে। প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিজের একটি আলাদা পরিচয় তিনি গড়ে তুলেছিলেন জাফর ইকবাল।

সত্তর ও আশি দশকে পর্দায় রাগী, রোমান্টিক, জীবন-যন্ত্রণায় পীড়িত তরুণের চরিত্রে তিনি ছিলেন পরিচালকদের আস্থা। সামাজিক প্রেমকাহিনি ‘মাস্তান’–এর নায়ক জাফর ইকবাল রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। ‘নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রে এক গ্রামীণ তরুণের চরিত্রেও দর্শক তাঁকে গ্রহণ করেন।

১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকার গুলশানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ একজন সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজও বিখ্যাত সংগীত পরিচালক। এসব সূত্রে জাফর ইকবাল প্রথমে গায়ক হিসেবেই পরিচিতি পান।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯৬৬ সালে তিনি নিজের একটি ব্যান্ড গড়ে তোলেন। বন্ধু ফারুক, তোতা ও মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ব্যান্ড দল ‘রোলিং স্টোন’। ভালো গিটার বাজাতেন, কলেজের যেকোনো অনুষ্ঠানেই গিটার বাজিয়ে গাইতেন প্রিয় শিল্পী এলভিস প্রিসলির গান। ‘পিচ ঢালা পথ’ ছিল ব্যান্ড গড়ে তোলার পর তাঁর প্রথম গাওয়া গান।

 

ভাই আনোয়ার পারভেজের সুরে নায়করাজ রাজ্জাক অভিনীত ‘বদনাম’ ছবিতে প্রথম গান করেন ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও/আমি তো এখন আর নই কারও’। প্রথম প্লেব্যাকেই ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান এই অভিনেতা। এরপর সুরকার আলাউদ্দিন আলী তাঁকে দিয়ে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করিয়েছিলেন। তাঁর জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি’, ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’, ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ অন্যতম।

নিজের কণ্ঠে ‘কেন তুমি কাঁদালে’ শিরোনামে একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের যুগে ‘সুখে থাকো নন্দিনী’ গানটি গেয়ে দারুণ সাড়া ফেলেছিলেন। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর উদযাপন বিশেষ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন ‘এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে’ গানটি। পরে শিল্পী রফিকুল আলমও গেয়েছিলেন।

গান গেয়েই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং অভিনেতা খান আতাউর রহমানের সঙ্গে। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আপন পর’। খান আতাউর রহমান পরিচালিত এ চলচ্চিত্রে তাঁর সঙ্গে ছিলেন কবরী।

এরপর দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন জাফর ইকবাল। ‘সূর্যগ্রহণ’ ও এর সিকুয়েল ‘সূর্য সংগ্রাম’ চলচ্চিত্রে ববিতার বিপরীতে অভিনয় করেন। ১৯৭৫ সালে ‘মাস্তান’ চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় শুরু হয় নতুন যাত্রা।

তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘দিনের পর দিন’, ‘সূর্য সংগ্রাম’, ‘বেদ্বীন’, ‘অংশীদার’, ‘আশীর্বাদ’, ‘অপমান’, ‘পরিবর্তন’, ‘সিআইডি’, ‘গৃহলক্ষ্মী’, ‘ওগো বিদেশিনী’, ‘ফুলের মালা’, ‘মর্যাদা’, ‘সন্ধি’, ‘ছোবল’, ‘প্রেম বিরহ’, ‘বন্ধু আমার’, ‘গর্জন’, ‘অবুঝ হৃদয়’ ‘নয়নের আলো’, অন্যতম।

ববিতার সঙ্গে তাঁর জুটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল ঢাকাই চলচ্চিত্র অঙ্গনে।  জাফর ইকবাল-ববিতা জুটি ৩০টির মত চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করেছেন। সে সময়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে জাফর ইকবাল আর ববিতার সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা যেত।  চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই বলেন, ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনী’ গানটি জাফর ইকবাল ববিতার জন্যই গেয়েছিলেন।

তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় হতাশ হয়েই জাফর ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছিল। ‘অবুঝ হৃদয়’ ছবিতে জাফর ইকবাল ও ববিতার রোমান্টিক দৃশ্যগুলো সেই গুঞ্জনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও প্রেমের বিষয়ে ববিতা বা জাফর ইকবাল কেউ-ই কখনো মুখ খোলেননি।

প্রায় দেড় শ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। শহরের রোমান্টিক এবং রাগী যুবক চরিত্রে তাঁর সাবলীল অভিনয় দর্শকজনপ্রিয়তা পায়, যদিও সব ধরনের চরিত্রেই ছিল তাঁর সমান বিচরণ।

জীবিতকালে শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল ‘লক্ষ্মীর সংসার’। যে চলচ্চিত্রে একটি দৃশ্য ছিল জাফর ইকবাল গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে নতুন এসেছেন এবং ঢাকার আজিমপুর যাওয়ার রাস্তা খুঁজছিলেন। এই চলচ্চিত্রের ‘ভাই আজিমপুর যাব কীভাবে’ সংলাপটি প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

এই চলচ্চিত্রের মুক্তির ১ মাসের মাথায় ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি মারা যান তিনি। আজিমপুর কবরস্থানই হয় তার শেষ ঠিকানা।

আরও পড়ুন : সুমিতা দেবী : বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ‘ফার্স্ট লেডি’।

Facebook Comments Box
share on: