উত্তম কুমার : ফ্লপ মাস্টার জেনারেল থেকে মহানায়ক

share on:
উত্তম কুমার

উত্তম কুমার বাংলা চলচ্চিত্রে সর্বকালের সেরা অভিনেতাদের একজন হিসেবেই মহানায়কের সম্মান পেয়েছিলেন । চল্লিশের দশকের একেবারে শেষভাগে অভিনয় শুরু করা এই অভিনেতা পরবর্তী প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময়জুড়ে অনেকটা সামনের সারিতে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন জনপ্রিয় বহু চরিত্র চিত্রনে।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ১৯৪৮ সালে, দৃষ্টিদান। তাঁর অভিনীত পরপর গোটা পাঁচেক সিনেমা ফ্লপ হয়। তবুও ছেলেটি স্টুডিওপাড়ায় একটা রোলের জন্য ঘুরে বেড়ায়। ছেলেটিকে দেখলে সবাই রংতামাশা করে। ফ্লপ মাস্টার জেনারেল বলে হাসাহাসি করে। ছেলেটির চোয়াল ক্রমশ শক্ত হতে থাকে। মনে মনে আরও কঠিন প্রতিজ্ঞা করে সে। কিন্তু করলেই তো হবে না। সুযোগ পেতে হবে। কিন্তু কে দেবে সুযোগ?

কেউ না জানলেও একজন জানতেন, এই ছেলেটি পারবে। তিনি হলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। প্রায় দিন তিনি ছেলেটিকে লক্ষ করেন। কিন্তু কোনো কথা বলেন না। ঠিক এমন সময় নির্মল দে তাঁর নতুন ছবি ‘বসু পরিবার’ করার জন্য নায়ক হিসেবে ঠিক করলেন কালী ব্যানার্জিকে। কালী ব্যানার্জি তখন বিখ্যাত নায়ক। কিন্তু নির্মল দে কালী ব্যানার্জির ডেট পেলেন না। নিজের ঘরে বসে ভাবছেন, এখন তাহলে কী করা! এমন সময়ে ঘরে এলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। পাহাড়ী স্যান্যালকে সব খুলে বললেন। পাহাড়ী স্যান্যাল অল্প হেসে বললেন, ‘দূর, এত চিন্তা করছ কেন? হাতের কাছেই নায়ক রয়েছে।’

নির্মল দে লাফিয়ে উঠলেন,‘কে?’ তারপর নায়কের নাম শুনে ধপ করে বসে পড়লেন। বললেন, ‘পাহাড়ীদা আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন? ওকে নিলে হলে ঢিল পড়বে, কে সামলাবে বলুন?’

পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘নামটা পাল্টে দাও, কেউ জানতে পারবে না। আমি কথা দিচ্ছি, ওকে নিয়ে ঠকবে না। এখন ও ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে উঠেছে। শুধু অস্ত্র তৈরি করার অপেক্ষা।’

নির্মল দে কি মনে করে, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘বাপু, বাপের দেওয়া নামের মায়া কি ছাড়তে পারবে? তাহলে একটা সুযোগ আছে।’

ছেলেটি আস্তে আস্তে মাথা নাড়াল। পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘অন্য নাম আছে তোমার?’

ছেলেটি একটু থেমে বলল, ‘দাদু আমাকে উত্তম বলে ডাকতেন।’

লাফিয়ে উঠলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। বললেন, ‘নির্মল, দেরি করো না। উত্তম নামটা লাগিয়ে দাও। লেগে যাবে।’

তা-ই হলো। লেগে গেল। হিট হলো বসু পরিবার। বাঙালি পেয়ে গেল এক নতুন নায়ক—উত্তম কুমার। [তথ্যসূত্র: এক এবং অদ্বিতীয়, ডিসেম্বর, ২০১২ সংখ্যা, সাইন ইন্ডিয়া সিনেভিশন অ্যান্ড মিডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা]

‘বসু পরিবার’ থেকে সাফল্যের শুরু। ১৯৫৩ সালের কথা, মুক্তি পেল নির্মল দের ছবি ‘সাড়ে ৭৪’। মুক্তির পর কমেডি ছবিটি নিয়ে সবার কী উল্লাস। ছবিতে নামি সব তারকা_ কে নেই! চারদিকে কথা হচ্ছিল, ছবিটির মাধ্যমে কী এক নতুন জুটি এসেছে পর্দায়। বয়স্করা মজেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী আর মলিনা দেবীতে। তাদের দাবি, হিরো-হিরোইন তো তুলসী-মলিনা। নতুন জুটি তো সাইড রোলে! ছবিটি বক্স অফিস কাঁপিয়ে দিল ৷ টানা আট সপ্তাহ চলল এই ছবি ৷ সাদা-কালো ‘সাড়ে ৭৪’-এর মাধ্যমে নতুন জুটির যে ইনিংস পত্তন হয়েছিল তাতেই হল রঙিন ইতিহাস। উত্তম পেলেন কালজয়ী সাফল্য, সৃষ্টি করলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন যুগ। তিন দশক ধরে দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে পৌঁছে গেলেন অনন্য উচ্চতায়। ১৯৭০-এর পর নায়ক উত্তম থেকে হয়ে গেলেন মহানায়ক। অনাবিল হাসি, অকৃত্রিম চাহনি আর অভিনয় গুণে কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে আজও বাঙালির চেতনায় উত্তম জীবন্ত।

উত্তম কুমারের জন্ম উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায়। মামাবাড়িতে। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। তিনি সাউথ সুবারবন স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করে গোয়েঙ্কা কলেজে ভর্তি হন। তবে কলকাতা পোর্টে কেরাণীর চাকরিতে ঢুকে পড়ার কারণে পড়াশোনা আর এগিয়ে নিতে পারেননি উত্তম কুমার। মূলত প্রথম জীবনে অপেশাদারী মঞ্চে অভিনয় করেই উত্তমের অভিনয় জীবনের শুরু। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন বলে চলচ্চিত্রজগতে প্রতিষ্ঠা পেতে অনেক পরিশ্রম, ধৈর্য ও একাগ্রতার পরিচয় দিতে হয়েছে তাকে।

রূপালী পর্দায় উত্তম কুমারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে নীতিন বসুর ‘মায়াডোর’ ছবির মাধ্যমে। কিন্তু এই ছবিটি মুক্তি না পাওয়ায় একই বছরে কাজ করা ‘দৃষ্টিদান’ চলচ্চিত্রটিই হয়ে যায় উত্তমের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। প্রথম দিকে উত্তম অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হলেও ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ চলচ্চিত্রটির জনপ্রিয়তার সুবাদে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন উত্তম। আর একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সঞ্জীবনী’ চলচ্চিত্রেই প্রথমবারের মতো উত্তম কুমার নামটি ব্যবহার করেন তিনি।

১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে প্রথমবারের মতো সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন উত্তম। আর উত্তমের সঙ্গে সুচিত্রার এই জুটিই পরবর্তী কয়েক দশক ধরে একচেটিয়া শাসন করে বাংলা চলচ্চিত্রকে। উত্তম-সুচিত্রা রোমান্টিক জুটি একে একে দর্শককে উপহার দিতে থাকে ‘শাপমোচন’, ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘সাগরিকা’ ইত্যাদি দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র। এছাড়া নানা সময়ে উত্তম জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন সুপ্রিয়া চৌধুরী, মাধবী মুখারজি, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, অপর্ণা সেন, শর্মিলা ঠাকুর প্রমুখ শীর্ষ নায়িকাদের সাথে।

১৯৬৭ সালে ‘এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন উত্তম। অবশ্য এর আগে ১৯৫৭ সালে অজয় কর পরিচালিত ‘হারানো সুর’ ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছিলেন গোটা ভারতবর্ষে। সেই বছর ‘হারানো সুর’ পেয়েছিল রাষ্ট্রপতির ‘সার্টিফিকেট অফ মেরিট’। কমেডি চরিত্রেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। ‘দেয়া নেয়া’ ছবিতে হৃদয়হরণ চরিত্রে অভিনয় করে সেই প্রতিভার স্বাক্ষরও রেখে গেছেন।

১৯৬৬ সাল থেকে উত্তম কুমার রোমান্টিক চরিত্রের পাশাপাশি একটু অন্য রকম চরিত্রেও অভিনয় শুরু করেন। আর তখনই বিশ্বখ্যাত পরিচালক সত্যজিত রায়ের ‘নায়ক’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ডাক পান তিনি। চলচ্চিত্র জগতে দীর্ঘ উজ্জ্বল পদচারণায় অভিনয়ের পাশাপাশি বেশ কিছু ছবি প্রযোজনা, পরিচালনা , সংগীত পরিচালনা এবং নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর ভূমিকাও পালন করেছেন উত্তম।

এছাড়া নানা সময়ে উত্তম কুমারের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অর্জনের তালিকায় রয়েছে একাধিকবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার, ভরত পুরস্কার এবং হিন্দি চলচ্চিত্র ‘অমানুষ’-এ কাজের জন্য সর্বভারতীয় অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ। রোমান্টিক নায়ক ছাড়াও অন্যান্য চরিত্রেও উত্তম ছিলেন অবিস্মরণীয়। সেই সাথে মঞ্চের প্রতিও ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। এ কারণে পঞ্চাশের দশকে উত্তম যখন সুপারহিরো, সেই সময় রূপালি পর্দার ব্যস্ততাকে এক পাশে রেখে তিনি ‘শ্যামলী’ শিরোনামের একটি নাটকে মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন।

অন্যদিকে বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র ছাড়াও নানা সময়ে উত্তম অভিনীত যে হিন্দি চলচ্চিত্রগুলো দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল, তার মধ্যে ‘ছোটিসি মুলাকাত’ (১৯৬৭), ‘দেশপ্রেমী’ (১৯৮২) এবং ‘মেরা করম মেরা ধরম’ (১৯৮৭) অন্যতম। উত্তমকুমার পরিচালক হিসেবেও সফল। ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ (১৯৮১), ‘বনপলাশীর পদাবলী’ (১৯৭৩) ও ‘শুধু একটি বছর’ (১৯৬৬) ছবির সাফল্য তাই-ই প্রমাণ করে।

সংগীতের প্রতিও ছিল তার অসীম ভালবাসা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা মান্না দে’র গানেই সবচেয়ে বেশি ঠোঁট মিলিয়েছেন উত্তম। ছবির গান রেকর্ডিংয়ের সময় শিল্পীর পাশে বসে তার অনুভূতি উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন। এমনকি গানপ্রেমী উত্তম ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির সবগুলো গানের সুরারোপও করেছিলেন- যেটি ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায়।

উত্তম কুমারের অভিনয়ের মূল্যায়ন করেছেন তাঁর সহকর্মীরা। নানাভাবে, নানা বিশেষণে। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম দিকপাল সত্যজিৎ রায় তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন ঠিক এভাবে, ‘বাংলা ফিল্মে উত্তম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ওঁর মতো কেউ ছিল না, ভবিষ্যতেও আসবে না।’

অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের ভাষায়, ‘এককথায় বলতে গেলে তাঁর মতো শিল্পী পাওয়া খুব কঠিন। তবে আমার এটাও মনে হয়, তাঁকে কেউ ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেনি।’

আর নিজের অভিনয় সম্পর্কে মূল্যায়ন শুনুন উত্তম কুমারের নিজের মুখে, ‘ধরাবাঁধা ছকে অথবা সাজানো কণ্ঠে অভিনয় করার ইচ্ছা আমার কোনো দিনই ছিল না। আমি তাই নিজস্ব ধারায় সহজ অভিনয় করতাম। আমরা যেমন করে কথা বলি, রাগ করি, ঠিক তেমনি সহজ অভিনয়। অভিনয় নয়, ভাবেই চরিত্র রূপায়ণ।’ [তথ্যসূত্র: আমার আমি, অনুলেখক: গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষ, দেশ পাবলিশিং, কলকাতা, নভেম্বর, ১৯৮৮]

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে হার্ট এটাকে উত্তম কুমারের জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন : অস্তমিত উত্তম। সত্যজিৎ রায়

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র।

Facebook Comments Box
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।