তারেক মাসুদের সাক্ষাৎকার : মাটির ময়না । মনিস রফিক

share on:

তারেক মাসুদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন চলচ্চিত্র গবেষক মনিস রফিক। তারেক মাসুদ বাংলাদেশের অন্যতম মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতা।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৮৫ সালে তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সোনার বেড়ি’ দিয়ে। এসএম সুলতানের উপরে নির্মিত ‘আদম সুরত’ প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন।

১৯৯৬ সালে নির্মিত ‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তিনি সারাদেশে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর একে একে নির্মাণ করেন মুক্তির কথা (১৯৯৯), নারীর কথা (২০০০), মাটির ময়না (২০০২), অন্তর্যাত্রা (২০০৬), নরসুন্দর (২০০৯) ও রানওয়ে (২০১০)। ‘মাটির ময়না’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্রিটিকস প্রাইজ অর্জন করে। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট নির্মাণাধীন ‘কাগজের ফুল’-এর লোকেশন খোঁজার পর ঢাকা ফেরার সময় মানিকগঞ্জে তারেক মাসুদ, ক্যামেরা সঞ্চালক আশফাক মুনীর মিশুকসহ পাঁচজন নিহত হন।

আপনার প্রথম কাহিনীচিত্র মাটির ময়না-র শুরুতেই আপনি দর্শকদের জানিয়ে দেন যে চলচ্চিত্রটিতে আপনার শৈশব জীবনের অভিজ্ঞতা চিত্রিত হয়েছে। মাটির ময়না-র কেন্দ্রীয় চরিত্র আনুর সাথে বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদের ছেলেবেলার মিল বা অমিল কোন কোন জায়গায়?

মিলের ব্যাপারটাতো মোটামুটি অনেকের জানা। তবে আমি সব সময় বলার চেষ্টা করি মাটির ময়না এক অর্থে আত্মজৈবনিক ছবি না, বলা যায় শৈশবের স্মৃতি-অভিজ্ঞতা ভিত্তিক ছবি। এখানে নির্মাতা তারেক মাসুদ ও বার-চৌদ্দ বছরের আনুর মধ্যে সম্পর্কটা হচ্ছে শৈশবের সাথে বয়োঃপ্রাপ্ত মানুষের বোঝাপড়া। এক ধরনের কামিং টার্মস্ উইথ চাইল্ডহুড ট্রমা। আমার শৈশবটা স্বাভাবিক শৈশব ছিল না। সেটা অবশ্য আমার মধ্যবিত্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে অস্বাভাবিক কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই ধরনের শৈশবের মধ্য দিয়ে অনেক শিশুই বেড়ে ওঠে। বাংলাদেশে অহরহ এখনো বা তখনো বোর্ডিং স্কুলের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে মাদ্রাসা ডর্মিটরিতে থাকার অভিজ্ঞতার স্বাদ অনেককেই নিতে হয়।

অমিলের ব্যাপারটা প্রথমেই বলি। আমার নিজের ব্যক্তি জীবনে শিশু হিসেবে যেসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমি গেছি সেটাকে ভিত্তি করে ছবিটি করলে আনু চরিত্রটি প্রোটাগোনিষ্ট, প্রধান চরিত্র হবার কথা অর্থাৎ সমস্ত ঘটনা তাকে ঘিরেই আবর্তিত হবার কথা। কিন্তু এখানে ছবিতে দেখা যায় আনু প্রোটাগোনিস্ট নয় ক্যাটালিস্ট একটি চরিত্র। অনেকটা মিরর চরিত্র অর্থাৎ সে সবকিছু দেখছে এবং দর্শক আনুর চোখ দিয়ে তার আশে পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী ও চরিত্রগুলো দেখছে। আনু নিজে প্রধান ঘটনাবহুল চরিত্র নয় বরং ভয়ার (voyeur); যে অনেকটা লেন্সের মত- যাকে দিয়ে দর্শকরা সবকিছু দেখতে পারছে। আনু যখন বিশ্বকর্মা নৌকা উৎসবে যাচ্ছে তখন আমরা নৌকা উৎসব দেখতে পাচ্ছি, আনু যখন মাদ্রাসায় যাচ্ছে তখন আমরা মাদ্রাসা দেখতে পাচ্ছি, সেই নিস্তরঙ্গ অচলায়তনের মধ্যেও যে বাতাস লাগছে, রাজনীতির হাওয়া লাগছে সেটা আমরা অনুভব করতে পারি। আবার সে যখন শহরে আসছে, বাজারে যাচ্ছে, সেখানে মিছিল মিটিং-এর সেই উত্তাল রাজনীতি, সেটা তাকে স্পর্শ করছে। যখন সে গ্রামে আসছে তার পরিবারে বাবা-মার সম্পর্কের মধ্যে যে টানা পোড়ন চলছে সেগুলো আনুর চোখ দিয়েই আমরা দেখি। আনুর চেয়ে আনুর বন্ধু রোকন এখানে অনেক নাটকীয় ও প্রধান চরিত্র। ফলে আমি আনুকে প্রধান চরিত্র বা প্রোটাগনিস্ট-এর চরিত্র না করে আমি সেটাকে একটা ক্যাটালিস্ট চরিত্র করেছি। ঐ অর্থে আনু বা আমি গল্পের কেন্দ্র বিন্দু নই।

আনু যেভাবে তার আশে পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী বা চরিত্রসমূহ দেখেছে আপনি কি শৈশবে ঐ ভাবে দেখেছেন?

হ্যাঁ, অনেকটাই আমি দেখেছি। কারণ ছবিতে আনুর যে বয়স, যাকে বলা হয় কামিং অব এইজ বা বয়ঃসন্ধিক্ষণ। ব্যক্তিজীবনেও আমি ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছিলাম এবং কাকতলীয়ভাবে এটা বাস্তব যে আমাদের জাতিও একটা যুগসন্ধিক্ষণ অথবা একটা ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছিলো। ওটাও একটা কামিং এইজ অব নেশ্ন; এই দুটোর একটা সমন্বয় ঘটছে। আমি যখন বড় হচ্ছি তখন একটি জাতির বিকাশোন্মুখ সময়; ঊনসত্তর, সত্তর, একাত্তর; যেটা আমার ছবির পটভূমি।

 তাহলে যদি বলি আনু সেই সময়ের বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে…

পূর্ব বাংলার প্রধানত মুসলমান মধ্যবিত্ত বাঙালির সেকুলার বিকাশের পিক টাইম ছিল এটা। আনুর নিজের জীবন ও তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা চারপাশের মধ্যে কিছুটা তার প্রতিফলন থাকতেই পারে।

নিউ বর্ণ বাংলাদেশ এর সাথে সিম্বলিজম করতে হলে কোন চরিত্রটি বেশী প্রাসঙ্গিক; আনু না রোকন?

আমি ছবিতে সচেতনভাবে প্রতীকায়ন পরিহার করার চেষ্টা করি। আনু এখানে আমাদের জাতির প্রতীক নয়। কিন্তু আনু যে সময়টা দেখছে সেটা আমাদের জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় এবং ঐ সময়টা ধারণ করার জন্য ওর যে বিকাশমান একটা বয়স তার মধ্যে একটা ইনোসেন্স এর ব্যাপার আছে, একটা সারল্য আছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হই তখন কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক স্বার্থ বুদ্ধি কাজ করে। চারিপাশে যা দেখি তা আমাদের নিজেদের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। ভেস্টেড ইন্টারেস্টগুলো ডেভলাপ করে যায়। কিন্তু ঐ বয়সে একটা ইনোসেন্ট কিউরিয়াস কোশ্চেনিং চোখ থেকে সবকিছু দেখা যায়। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি যে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অস্থির ও উত্তাল একটা সময়কে এক ধরনের নির্মোহ নির্লিপ্ত শিশু-কিশোরের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা। ফলে ঐ সরলতা এক ধরনের নির্বিকার চোখে দেখা আনু যেন রেকর্ডার, ওর নিজস্ব কোন পার্টিসিপেশন নেই। আমি নিজে তখন ঐ রকম চৌদ্দ-পনের বছর বয়সের। সবকিছূ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখার আমার সুযোগ হয়েছে।

 আমরা ছবিতে যে মাদ্রাসা দেখি আর আপনি যে মাদ্রাসায় পড়েছেন সেটা কি একই মাদ্রাসা?

আক্ষরিক অর্থে একই না। এখানে আমি সৃজনশীল স্বাধীনতার সুযোগ নিয়েছি। আমি যেমন বলেছি, আনুর চরিত্র এবং আমার চরিত্র হুবহু একই নয়। তেমনি মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও সেটা সত্য। আমি অনেকগুলো মাদ্রাসায় পড়েছি। এক বিচিত্র কারণে একই মাদ্রাসায় পড়ার আমার সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য হয়নি।

অনেকগুলো মাদ্রাসা বলতে কতটি?

অন্তত পাঁচ-ছয়টি। কোনটা ঢাকার লালবাগ। যে মাদ্রাসার সাথে মাটির ময়নায় ব্যবহৃত মাদ্রাসার অট্টালিকার অনেক মিল আছে। আবার কাকরাইল মাদ্রাসায় পড়েছি। যশোরের মধুমতি নদীর পাড়ের বাহিরদিয়া মাদ্রাসায় পড়েছি। আবার ফরিদপুরে ভাঙা যে অঞ্চলে আমার জন্ম ও বেড়ে উঠেছি, সেখানকার একটি মাদ্রাসায় পড়েছি। এমন বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়ার অভিজ্ঞতাকে আমি নির্বাচিতভাবে ব্যবহার করেছি। ছবির মাদ্রাসার একেকটা জিনিস আমি একেকটা জায়গা থেকে নিয়েছি। আমার প্রথম ভর্তি হওয়া ভাঙা-র মাদ্রাসা সংলগ্ন একটা বিরাট দীঘি ছিল যেটি আমরা ব্যবহার করতাম। আমি যখন প্রথম মাদ্রাসায় গেলাম সেদিন রাত তিনটা সাড়ে তিনটার দিকে আমাকে তুলে সেই ঘাটে নিয়ে যাওয়া হলো। কুয়াশার মধ্যে সামান্য আলো-আঁধারিতে দেখা যাচ্ছিলো সবাই মেস্ওয়াক করছে। আমাকেও মেস্ওয়াক করা শিখানো হলো। আসলে একটি শিশুর ঐ ধরনের অভিজ্ঞতা একরকম ইন্দ্রজালিক অভিজ্ঞতা। কুয়াশা ভরা সেই ভোর বেলায় সেই সিঁড়িটাকে আমার অনেক বড় মনে হয়েছিলো। ছোট বেলার সিঁড়ি স্মৃতিতে অনেক বড় মনে হয়। পরে দেখেছি, সিঁড়িটা অত বড় নয়। এটা কিন্তু আমার মাদ্রাসার প্রথম স্মৃতি। ফলে সেটা আমার স্মৃতিতে একেবারে গেঁথে গেছে। এই কারণে ছবিতে দেখবেন এ দৃশ্য দিয়েই ছবিটি শুরু হয়।

 ছবিতে কিন্তু আমরা বার বার সিঁড়িটা দেখি। এটা কি ইচ্ছাকৃত?

যেহেতু ওটা আমার স্মৃতিতে বিশেষ দাগ কেটেছে সেহেতু ওটার ইমেজ সব সময় জাজ্বল্যমান। আমার কাছে ওটার আর্কিটেক্চারাল ইম্প্যাক্টের পাশাপাশি একটা মনস্তাত্ত্বিক ইম্প্যাক্টও রয়েছে। একটা ইম্পোজিং বা চাপিয়ে দেয়া আর্কিটেকর্চা একটি শিশুর উপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। আপনি যখন একটা সমান জায়গায় থাকবেন, সেই জায়গায় আপনি নিজে ভার্টিক্যাল, ফলে সমান জায়গাটাকে আপনার নিয়ন্ত্রণে মনে হবে। যদি আপনি সমুদ্রে যান, তাহলে সমুদ্রের মধ্যে আপনি একটা প্রশান্তি খুঁজে পাবেন। কারণটা কী? বিস্তীর্ণ সমান্তরাল জায়গায় আপনি ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে ফলে সেই সমান্তরাল জায়গাটাকে মনে হয় আপনার পদানত। আপনি যখন পাহাড়ের পাশে এসে দাঁড়ান তখন পাহাড়াটা আপনাকে ডোমিনেট করে। আপনার নিজেকে মনে হয় পাহাড়ের একটা অংশ। সমুদ্রকে কিন্তু উল্টো আপনার অংশ মনে হয়। তেমনি সিঁড়ির মত সেই ইম্পোজিং আর্কিটেক্চার এর মধ্যে একজন শিশু নিজেকে দেখে ছোট এবং অন্য সব কিছু বড় বড়। বিল্ডিংটা বড়, সিঁড়িটা বড়, হুজুররা বড়। ফলে তার মধ্যে অসহায়ত্বটা আরো প্রমিন্যান্ট হয়ে পড়ে। ওটা আমি কাজে লাগিয়েছি। যা বলছিলাম, সিঁড়িটা নিয়েছি ছোট বেলার সেই মাদ্রাসা থেকে। বিল্ডিংটা হচ্ছে লালবাগ মাদ্রাসার বড় আর্কিটেকচারটা। আবার ব্যাক ইয়ার্ডটা নিয়েছি কাকরাইল মাদ্রাসার পিছন থেকে। ওখানকার একটা অংশে আমরা বিকেল বেলায় খেলতাম, যদিও সেখানে অনেক কিছুই নিষিদ্ধ ছিলো। নানান রকম নিয়ম নিগড়ে বাঁধা খেলা যা রীতিমত একটা টর্চার। এরকম প্রচুর লোকেশনের স্মৃতিকে আমি সমন্বয় করেছি যেন একটা মাদ্রাসাতেই সবকিছু। ঠিক রোকন চরিত্রটিও তেমন। চরিত্রটি আমার মাদ্রাসার তিনজন বন্ধুর সমন্বয়। একজন বন্ধু ছিল খুবই রুগ্ন ও দূর্বল এবং ম্যালনিউট্রিশ্ন্ এ ভুগতো। অন্য ছেলেরা সব সময় তাকে পেয়ে বসতো, র‌্যাগিং করতো। আরেকজন ছিল খুবই স্মার্ট; এমন স্মার্ট ও বাকপটু যে শিক্ষকদের কথার প্রত্যুত্তরে সে এমন সব কথা বলতো যে শিক্ষকরা বোকা বনে যেত। ফলে শিক্ষকরা তার উপর প্রায় ক্ষেপে যেতো এবং মারতো। আর একজন বন্ধু ছিলো যার আসলেই হয়ত সিজোফ্রেনিয়া ছিলো, অনেকটা পাগলের মত। ওর স্পেশাল একটা বন্ধু আছে বলে দাবি করতো। আমাকে সত্যি সত্যি ও মিষ্টি খাইয়েছিলো। সেই বোয়ালমারির বাহিরদিয়া মাদ্রাসার কয়েক মাইলের মধ্যে কোন মিষ্টির দোকান ছিল না। সেখানে সে কিভাবে মিষ্টি জোগাড় করতো আজও তা আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার। আমি ছবিতেও সেটা ব্যাখ্যা করিনি। ছবিতে যেমন দেখি একটি পরিত্যক্ত ঘরে রোকন তার নিজস্ব ভুবন তৈরি করেছে, আমার বন্ধুটিও তেমন করেছিল। তবে পরিত্যক্ত ঘরে নয় বোয়ালমারী রেল স্টেশনের দূরবর্তী জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা একটা রেলের বগিতে। যেটাতে ঘাস, পাতা, আগাছা জমেছিল, ওটার মধ্যে সে চমৎকার একটা বাসা বানিয়েছিল। আমার এই তিনজন বন্ধুর সমন্বয় করে আনুর বন্ধু রোকন তৈরি হয়েছে। এরকম ছবিতে যেসব চরিত্র চিত্রিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই বাস্তবে ছিল। এছাড়া যে লোক-সংস্কৃতি দেখতে পাই সেগুলোর মধ্যেই আমি বেড়ে উঠেছি। সেই যে পুঁথি, লোকগান, নৌকা বাইচ বা চৈত্র সংক্রান্তি মেলা এগুলোর মধ্যে দিয়েই আমি বেড়ে উঠেছি। ফলে বিষয়গুলো উপস্থাপন করার জন্য চিত্রনাট্যটা আমাকে বানাতে হয়নি, ইট ওয়াজ অল্ওয়েজ দেয়ার উইথ মি!

ছবিতে আমরা রোকনের যে সিজোফ্রেনিক্ সিম্টম দেখি, সেটা আপনার ঐ বন্ধুর মধ্যে সত্যিই ছিল?

তখন আমার এত বয়স অল্প ছিল যে অতটা বুঝে ওঠার বয়স হয়নি। তবে এখন আর সেটা আমি ওভাবে জাজমেন্ট করার পক্ষে না তার সিজোফ্রেনিয়া ছিল কিনা। তবে তার কানে সমস্যা ছিল। সে প্রায় কানে হাত দিত আর বলতো কানে কি যেন আওয়াজ হয়। হয়তো সেটা কানের কোন রোগ ছিল।

মনিস রফিক
মনিস রফিক, লেখক।

 কিন্তু ছবিতে কানের সমস্যাটা তখনই দেখি যখন বড় হুজুর জিহাদের কথা বলছে। জাতি বিদ্বেষের কথা বলছে। মনে হচ্ছে রোকন বড় হুজুরের উগ্রবাদী কথা তার কানে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।

এটার ব্যাখ্যা দর্শকদের উপরে। বাস্তবেও ঘটতে পারে, মেটাফোরিক প্রোটেষ্টও হতে পারে। এক ধরনের ডিনায়াল, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। যেমন তার স্পেশাল বন্ধু বা তার নিজের তৈরী করা স্পেশাল জায়গাকে কেউ তার সিজোফ্রেনিক আচরণের অংশ হিসেবে দেখতে পারে আবার কেউ ভাবতে পারে একটা অচলায়তনের মধ্যে একটা এতিম ছেলে তার বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজছে। যে নিজের একটা জগৎ তৈরী করে নিজেকে লুকোচ্ছে, আশ্রয় খুজঁছে এবং স্বপ্নের একটা জগৎ তৈরী করছে যাতে সে টিকে থেকে মনের বিকাশ ঘটাতে পারে এবং সুস্থ থাকতে পারে। সে অসুস্থ নয়, সুস্থ থাকার জন্য অসাধারণ মনোবল নিয়ে নিরন্তর বাঁচার জন্য সংগ্রাম করছে। ছোটবেলায় আমি যখন মাদ্রাসায় গেছি তখন কওমি মাদ্রাসায় সাধারণত মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে কাউকে পাঠানো হত না। এতিম ও গরীব ছেলেমেয়েদের যাদের পড়া লেখাতো দূরের কথা খাওয়া-পরার কোন নিশ্চয়তা নেই এমন ছেলেমেয়েদের পাঠানো হত। সেখানে আমাকে পাঠানোর ব্যাপারটা আমার জন্য খুবই কষ্টের হলেও অন্যান্যদের জন্য তেমনটি ছিল না। তাদের বাড়ীতে দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা ছিলনা সেখানে অন্তত খাওয়াটা জুটতো। আমার ক্ষেত্রে কিন্তু বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। আমি ঐ সময়ে আমার নিজের স্টোভে চা খাই। মাদ্রাসায় থাকার সময়েও মাদ্রাসার পাশের গ্রাম থেকে এক মহিলা আমাকে নিয়মিত দুধ দিয়ে যেতেন। আমার মা এমন ব্যবস্থা করেছিলেন। আমার এই দুধ খাওয়া দেখে আমার সহপাঠিরা বা রুমমেটরা আমাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতো, ঈর্ষা করতো। এরকম একটা জায়গায় আই ওয়াজ এ্য কাইন্ড অব লোনার, আউট্সাইডার। আর রোকনও কিন্তু এক ধরণের আউট্সাইডার, আন্ডার ডগ বলতে পারেন। আর ওদের তুলনায় আমি যেহেতু আপার ক্লাস থেকে এসেছি ফলে আমি আবার লেফট্ আউট। আমাকে সবাই অ্যাভোয়েড করে, ফলে রোকনের সাথে একটা অ্যালায়েন্স হয়ে যাওয়ারই কথা। ফলে ওর সাথে একধরনের অ্যালায়েন্স বা এক ধরনের বন্ধুত্ব হয়েছিল। ওখানে আমার অসহায়ত্ব, একাকিত্বকে এ্যাড্জাষ্ট করে র‌্যাগিং সহ্য করে টিকে থাকতে সরাসরি ওর কাছ থেকে ইনস্পেরেশ্ন্ পেয়েছি। ওর অবস্থা আমার চেয়ে হাজার গুণ খারাপ কিন্তু তারপরও সে মনোজগতে স্বপ্নের জগৎ তৈরী করে চমৎকারভাবে বেঁচে আছে। এটা আমার কাছে একটা মডেল ছিল। আমি মনে করি শুধু শৈশবের আনু নয় এখনকার আমিও রোকনের মধ্যে ঐ অশেষ অনুপ্রেরণা খুঁজে পাই। ওর মধ্যে সেই আন্ত:শক্তি রয়েছে, যে শক্তি সমস্ত বাধা প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার একটা স্বপ্নালোক তৈরী করে। আমি মনে করি, আমাদের এই বড় বয়সে আমরাও কিন্তু তাই করি। আমরাও আমাদের মনোজগতে একটা আশ্রয়স্থল তৈরী করে, একটা স্বপ্নের জগৎ তৈরী করে নিজেদের আড়াল করি। এই যে বাস্তব রূঢ় জীবন, মানুষের এ্যাডাল্ট লাইফ, জরা-মৃত্যু, স্ট্রাগল, কেরিয়ার, পারিবারিক সম্পর্ক, অস্তিত্বের সংকট সবকিছু মিলিয়ে যে চ্যালেঞ্জ এর মধ্যে যে বিষন্নতা – বিপন্নতা তার ভেতর দিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত পার হচ্ছি। এই জায়গায় একটা বয়স্ক মানুষ হিসেবেও আমারও কিন্তু একটা আশ্রয়ের দরকার হয়। আমি সেই আশ্রয় নিই আমার সৃষ্ট স্বপ্ন জগতের মধ্যে। সেটা কি? মাটির ময়নার মত একটা ফিক্শন। আমি এই ফিক্শন তৈরী করেছি, সিনেমা তৈরী করেছি- যার মধ্যে আমি নিজেকে লুকাই। আটপৌরে জীবনে একটি এ্যাডেড মিনিং তৈরি করতে চেষ্টা করছি। না হলে আমি টিকে থাকতে পারতাম না। তার মানে হচ্ছে, আমি আসলে রোকনকে অনুসরণ করছি। রোকনকে অনুপ্রেরণা হিসেবে আমি ব্যবহার করছি। আমি ওভাবেই বেঁচে আছি। ফলে রোকনকে আমি বড়দের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা মনে করি।

বড় হুজুরের মধ্যে ক্রুর ধর্মীয় গোঁড়ামী লক্ষ্য করি। রোকন কি এই ধর্মীয় উন্মত্ততার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে?

হ্যাঁ, কিন্তু সেই প্রতিবাদটা স্থূল নয়, প্রকট নয় আবার সরাসরিও নয়। রোকন কিন্তু বিপ্লব করছেনা, রিবেল করছে না। সে সারভাইব করছে।

 কিন্তু ঐ বয়সের অসহায় এতিম ছেলেটা যখন বড় হুজুরের উগ্র জিহাদী কথার সময়ে কানে হাত দিচ্ছে এবং মাদ্রাসার গোঁড়া পরিবেশের বাইরে নিজের মত করে বুদ্ধিবৃত্তিক একটা চেতনার জগৎ তৈরী করছে, যে চেতনাটা ইসলাম ধর্মের রিজিডিটি- র বিরুদ্ধে কথা বলছে।

অবশ্যই রোকন একটা বৃহত্তর আলোর জগতের কথা বলছে। মাদ্রাসার অচলায়তনের বাইরে অসীম এক জগতের সন্ধান দিচ্ছে আনুকে। একটা ইনফিনিট বিগ ওয়ার্ল্ড, যদিও রুমটা খুবই ছোট। কিন্তু সেই বিন্দুর মধ্যে একটা সিন্ধু আছে। মেটাফোরিক ভাবে এটার মধ্যে দিয়ে হয়তো সে একটা প্রতিবাদের কথাই বলছে। কিন্তু আমি মনে করি যে একটা পাথুরে জায়গার মধ্যেও কিন্তু লতা-পাতা-ঘাস ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে, কংক্রিটের মধ্যে দিয়েও একটা গাছ বের হয়ে আসে। কারণ প্রাণী-উদ্ভিদ জগতের নেচার-ই হচ্ছে সে বেরিয়ে পড়বে। মানুষের মধ্যেও সেই শক্তিটা রয়েছে। যত প্রতিকূলই হোক, যত নেতিবাচক পরিবেশই হোক মানুষ জীবনের বন্দনা গাইবে। রোকন অনেকটা তাই, সে স্বপ্ন ও জীবনের কথা বলে। সে সারভাইব করে।

 আমার মনে হয়েছে, মাদ্রাসার ছেলেদের মধ্যে শুধু রোকনের চোখকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন সে ভবিষ্যৎ-কে দেখছে।

এগ্জ্যাক্টলি, সাধারণ দর্শকরা মনে করে ছবিটা শুধুমাত্র মাদ্রাসা নিয়ে। কিন্তু রোকন যেভাবে তার প্রতিপার্শ্বকে মোকাবেলা করছে তাতে কি মনে হয় না পৃথিবীটাই একটা মাদ্রাসা? মানুষ যেভাবে এখানে ক্ষুধার বিরুদ্ধে, দারিদ্রের বিরুদ্ধে, জরার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে রোকনও তেমনি মাদ্রাসায় লড়াই করেছে। সেক্ষেত্রে পৃথিবীটা মাদ্রাসার মেটাফোর হতে পারে।

মাটির ময়না’তে আমরা মাদ্রাসায় আনু ও রোকনের আরো অনেক সহপাঠিদের দেখি। বিশেষ করে তারা যখন বিকেলে মাদ্রাসার বিশেষ কিছু খেলা খেলে এবং তাদের বিশেষ কিছু চালচলন দেখে মনে হয় ছেলেগুলো আসলেই মাদ্রাসার ছাত্র। আমি জানতে চাইছি, ওদেরকে কি আপনি বিশেষভাবে অভিনয় শিখিয়েছিলেন?

আসলে আমি দু-তিনটে মাদ্রাসা থেকে এদেরকে পেয়েছিলাম, এমনকি মোদারেস অর্থাৎ শিক্ষকদেরকেও পেয়েছিলাম। আমি নিজে মাদ্রাসার প্রাক্তন স্টুডেন্ট হিসেবে তাদের ভাষায় তাদের সাথে কমিউনিকেট করতে পেরেছি বলে তাদেরকে আমি রাজি করাতে পেরেছি। জানেনতো মাদ্রাসার হুজুরদের কাছে অভিনয় বেশরিয়তী কাজ। তারাতো কখনো অভিনয় করবে না। কিন্তু চার-পাঁচজন মাদ্রাসার হুজুর এ ছবির জন্য আমার সাথে কাজ করেছেন এবং প্রায় বিশ-ত্রিশ জন মাদ্রাসার ছাত্রকে তিনমাসের জন্য পড়াশুনা বন্ধ করে অভিনয়ের জন্য আমাকে দিয়েছেন। ওদের সাথে নন-মাদ্রাসার কিছু ছাত্রকে আমি মিশিয়েছি। যেমন আনু, রোকন। প্রধানত প্রকৃত মাদ্রাসার ছাত্রদের দিয়েই আমি মাদ্রাসার টিমটা করেছি। কারণ শ্রেণীগত, মাদ্রাসার ডর্মিটরির লাইফ, এবং আচার-আচরণের কারণে ওদের একধরনের বিশেষ লুক বা জেস্চার- পোস্চার রয়েছে। যেটা নন মাদ্রাসার স্টুডেন্টদের দিয়ে কাজ হতো না। সেজন্য ওদের আমি ব্যবহার করেছি। ওদের অভিনয়ের জন্য আমাকে খুব একটা পরিচালনা করতে হয়নি। আমি যখন ওদের খেলতে বলেছি তখন ওরা যা খেলে তাই খেলেছে। এক্ষেত্রে চিত্রনাট্যটা লিখতে আমাকে যেমন বেগ পেতে হয়নি, ঠিক তেমনি অভিনয়টাও আমাকে দেখাতে হয়নি। ওরা যখন রোকনের জ্বিন ছাড়ানোর প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছিলো তখন ওরা সবাই নিজেরাই ঝুঝতে পারছিল কি করতে হবে। সেটা একটা বাড়তি সুবিধা ছিল।

আপনি বললেন যে, আপনি পাঁচ-ছয়টা মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেছেন। যেগুলো কখনো ফরিদপুর কখনো ঢাকা আবার কখনো যশোর। এই যে বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ছুটোছুটি’টা কেন প্রয়োজন হয়েছিল?

এই ছুটোছুটি’র একটা নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। আমার বাবা তবলিগ করতেন, এখনো করেন। যদিও বয়স এখন প্রায় চুরানব্বই বছর, খুব একটা ছুটোছুটি করতে পারেন না। উনি আমার ব্যাপারে খুবই উচ্চাভিলাসী ছিলেন, আশা করতেন আমি একজন বড় আলেম হব। উনি আমাকে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় দিয়ে তিন চিল্লায় দেশের বাইরে চলে যেতেন এবং ফিরে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা মাদ্রাসায় আসতেন । এসে দেখতেন তার ছেলে ওখানে নেই। কারণ আমাদের বৃহত্তর পরিবারটা ছিল খুবই সেকিউল্যর এবং গান-বাজনা ও সংস্কৃতিমনা পরিবার। এ পরিবারে আমার বাবা-ই শুধু নাটকীয়ভাবে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আমার অন্যান্য চাচা এবং চাচাতো ভাইয়েরা সবাই ঢাকা থাকতেন। আমার বাবা যখন আমাকে মাদ্রাসায় দিয়ে চলে যেতেন তার একমাসের মধ্যেই ওরা আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসত। ফলে শেষের দিকে আমার বাবা বুঝতে পারলেন যে তাদের রেঞ্জ- এর বাইরে আমাকে রেখে আসতে হবে। সেজন্য আমাকে সেই দূরবর্তী যশোরের গোপেরডাঙার কোন এক মাদ্রাসায় অথবা বোয়ালমারির বাহিরদিয়া মাদ্রাসায় যেখানে কয়েক মাইলের মধ্যে কোন চায়ের দোকান পর্যন্ত ছিল না, যেখানে দীর্ঘপথ হেঁটে যেতে হত এরকম রিমোট জায়গায় আমাকে দিতে শুরু করলো। আমার বাবা কিন্তু তরুণ বয়সে গান করতেন, প্রগতিশীল রাজনীতি করতেন। নাটকীয়ভাবে তার জীবনের পরিবর্তন ঘটে।

মাটির ময়নার করিম মাঝির সংলাপের সূত্রে আমরা জানতে পারি কাজি সাহেব যৌবনে এরকম ধার্মিক ছিলেন না। আপনার বাবার বেলায়ও কি এটা সত্য?

আমার বাবার জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছিল। মানুষের জীবনেতো অনেকগুলো জিনিস কাজ করে। তারমধ্যে একটা নির্দিষ্ট ঘটনা ছিল যা তার জীবনের এই নাটকীয় পরিবর্তন ঘটায়। আমার নানী তার জামাইবাবু অর্থাৎ আমার বাবাকে খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু তার মনে খুব একটা দুঃখ ছিল যে তার জামাইবাবু শুধু গান করে না পাবলিকলি পারফর্মও করে। মুক্তির গানে’র বেনুর ডিরেক্ট মেন্টর হচ্ছে আমার বাবা (আর আমার মেন্টর হচ্ছেন বেনু)। বেনুর ডিরেক্ট মিউজিক টিচার, ক্লাসিক্যাল মিউজিক-এর সমস্ত তালিম কিন্তু আমার বাবার দেয়া। আমার বাবা অর্থাৎ বেনুর ছোট কাকা এখনো তাদের আদর্শ। আমার অনেক চাচাতো ভাই-বোন কিন্তু মাটির ময়না ছবিটা মেনে নেয়নি। তারা তাদের পরবর্তীতে উগ্র, গোঁড়া নব্য মুসলমান ছোট কাকার রূপ দেখেনি। এটি আমার মা দেখেছে এবং আমরা এর জন্য সাফার করেছি। তারা দেখেছে সেই ডিয়ার আকংলকে যিনি তাদের মিলনের মত মেলায় নিয়ে যায়, গান শোনায়, হৈ-চৈ করে। তাদের কাছে তাদের ছোট কাকার ঐ চিত্রটিই গাঁথা আছে। ফলে তারা মনে করে আমি নাকি তাদের ছোট কাকাকে ছোট করেছি।

যাই হোক, হঠাৎ করে আমার নানী মারা যাবার পর প্রথম কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ্যাডাল্ট বয়সে আমার বাবাকে দেখা যায়। জানাজার পরই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। পুরো একটা বিরাট বাড়ী যেখানে অল্প বয়সের আমাকে নিয়ে আমার মা পুরো একা। । আমার বাবা যে হারিয়ে গেলেন এরপর কয়েক মাস পর আলখাল্লা পরা লম্বা দাড়িওয়ালা অবস্থায় বাড়ীতে ফিরে আসলেন। কোথায় ছিলেন, কি করেছেন কেউ জানে না। তিনি ফিরে আসলেন একেবারে একজন গোঁড়া মুসলমান হয়ে। তার এই গোঁড়ামির শিকার হলেন প্রথমে আমার মা, পরে আমি। যে মা একসময় আমাদের পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যদের সাথে স্বাভাবিক কথা বলা বা গল্প করতেন, তাকে একেবারে পর্দার আড়ালে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হলো। আমার বাবার আরেকটি ইন্টারেস্টিং পরিবর্তন হয়েছে মুুক্তিযুদ্ধের পর যেটি তার তৃতীয় পরিবর্তন। প্রথমেতো উনি ছিলেন প্রগতিশীল, গান-বাজনা নিয়ে মেতে থাকতেন যেটাকে বলা যেতে পারে এটা তাঁর জীবনের থিসিস। আর এর এন্টি-থিসিস হচ্ছে গোঁড়া-ধার্মিক একটা মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসের মধ্য দিয়ে (মাটির ময়না’য় যার ইঙ্গিত আছে) তার দ্বিতীয় বিশ্বাসের জায়গা ভেঙ্গে-চুরে তছ্নছ্ হয়ে গেছে এবং ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে কোনকিছুই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না এটা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। যুদ্ধের পরে তার জীবনের যে পরিবর্তন ঘটে গেল তাকে সিন্থিসিস বলা যেতে পারে কারণ এ সময় তিনি কিন্তু অনেক বেশী মডারেট হয়ে গেলেন। তিনি নিজে তার ধর্ম প্র্যাকটিস্ করেন কিন্তু আমাকে বা অন্য কাউকে ধর্ম চর্চা করতে বলেন না। আমি কিন্তু মাদ্রাসা থেকে সাধারণ শিক্ষায় নিজের ইচ্ছায় বিদ্রোহী হয়ে আসিনি। আনু যেমন বিদ্রোহ করে না, বিপ্লব করে না, নির্বিকার অন্যরা তাকে যা বলে সে তাই করে, আমিও কিন্তু তেমনই ছিলাম। যুদ্ধের পর আমার বাবা-ই বলেছেন তুমি মাদ্রাসায় যাবে না। তুমি প্রাইভেটে সাধারণ শিক্ষায় ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিবে। এভাবেই আমি ১৯৭৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম।

তার পর কোন কলেজে ভর্তি হলেন?

আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। এটা একটা কো-এড কলেজ। মাদ্রাসা থেকে সরাসরি সাধারণ কোন কো-এড্ কলেজ না যেখানে সিক্সটি পারসেন্ট মেয়ে পড়াশুনা করে। যেহেতু অধিকাংশ আর্মি অফিসাররা নিজেদের ছেলেদের বা ছোট ভাইদের ক্যাডেট কলেজ এবং ও ধরনের অন্যান্য ভালো কলেজে পাঠিয়ে দিত আর মেয়েদের ক্যান্টনমেন্টের বাইরে পাঠাবে না বলে সাধারণত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াতো। ফলে আমি শুধু গ্রাম থেকে আসা নয় বরং মাদ্রাসা থেকে আসা একজন সাধারণ ছেলে রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্টের মতো মেয়ে প্রধান একটি কো-এড্ কলেজে পড়ছি। ফলে আমার জীবনে মাদ্রাসায় যে একটা কালচারাল শক্ হয়েছে অর্থাৎ আমাকে মাদ্রাসার মত বদ্ধ একটা জায়গায় যেখানে এতিম গরীব ছেলেদের সাথে শেয়ার করে থাকার যে এ্যাডাপ্টিব্লিটি ও এ্যাড্জাস্টমেন্ট করতে হয়েছে তার চেয়ে বেশী কঠিন ছিলো এই কো-এড্ কলেজে এ্যাড্জাস্ট করা। এটা আমার জন্যে অনেক বেশী কালচারাল শক্ ছিলো। আমার মনে হয় কলেজের নতুন প্রতিকূল শহুরে পরিবেশে টিকে থাকার মানসিক শক্তি আমি ডরমেটরিতে থাকার সময় অর্জন করেছি। এতে প্রতিকূল পরিবেশে মানুষ কিভাবে বড় হয় সেই শিক্ষা-দীক্ষাটা আমার অটোমেটিক তৈরী হয়ে গেছে। ডর্মিটরী থাকলেই বুঝা যায় যে মানুষ কত বিচিত্র হয়। ভাষা, অভ্যাস, রুচি, খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা, শোয়া-বসা সবকিছু সবার আলাদা। ফলে ডর্মিটরীতে যারা বড় হয় তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যকে মেনে নেওয়ার এক ধরনের এ্যাডাপটিব্লিটি গড়ে উঠে।

কলেজে পড়ার সময় আপনি কোথায় থাকতেন?

আমি আমার চাচাতো ভাই শহীদুর রহমান শহীদের বাসায় থাকতাম। উনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিভিলিয়ান হাই অফিসিয়াল ছিলেন। তার বাসায় থেকে আমি কলেজে পড়াশুনা করতাম। পরবর্তীতে আমি মগবাজারে আমার চাচার বাড়ীতে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়াশুনা করেছি।

আপনি বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হলেন কোন্ সালে?

এটাও বলার মত বিষয়। আমার জীবনে বেশ কিছু কাকতলীয় ঘটনা ঘটেছে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের কাছে আমার ব্যক্তিগত ঋণ বিশাল। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমার মুক্তি ঘটতো না। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে আমি মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে চলে আসলাম। অজুহাতেই হোক বা পরিস্থিতির কারণেই হোক তখন সবাই সব জায়গা থেকে মুক্তি পাচ্ছে। তখন জেলখানাও খুলে দেয়া হয়েছিলো। রাজনৈতিক বন্দীর সাথে চোর-ডাকাতরাও বের হয়ে পড়েছিলো। মাদ্রাসা থেকেও অনেকে আমরা বের হয়ে পড়েছিলাম। মাদ্রাসার অনেক ছাত্র আল্শামস, আলবদরও হয়েছে। সেই নয় মাসে চার দেয়ালে বন্দী আমার মা ও আমি আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় বার মাইল দূরে আমার নানা বাড়ীতে কাটিয়েছি যে বাড়ীর পাশেই মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিলো। আমরা এরকম মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই ক্যাম্পেই দিন কাটিয়েছিলাম ফলে কেবল আমার না আমার মায়ের-ও একটা মুক্তি ঘটেছিলো।

মাটির ময়না-র শেষ দৃশ্যে দেখা যায় আনুদের গ্রামে সেনাদের তান্ডব ছড়িয়ে পড়লে এবং আনুদের বাড়ী পাক সেনারা পুড়িয়ে দিলে আনু ও মা বাড়ী ছেড়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু আনু-র বাবা বাড়ীর ভগ্নস্তুপে থেকে গেলেন। বাস্তবে কি এমনটি-ই ঘটেছিলো?

বাস্তব জীবনে পরের দিন সকালে বাবাকে আমাদের সাথে পালাতে কন্ভিন্স করতে পেরেছিলাম। মাটির ময়নায় আমি ইচ্ছে করে তাকে ওখানে রেখে ছবি শেষ করেছিলাম যাতে তার প্রতি দর্শকদের অনুকম্পা আসে। লোকটা আসলে ভিতরে ভিতরে বুঝতে পারছে কিন্তু বাইরে নিজেকে পরিবর্তন করার অবস্থা তার নেই। ঐ চৌদ্দ-পনের বছর বয়সের কারো নয় মাস যুদ্ধের মধ্যে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনা, নয় মাসের অভিজ্ঞতাগুলো কনডেন্সড্ ভাবে আমাদের কাছে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ আমার মা’কে যেমন বৃহত্তর জগতের সন্ধান দিয়েছে, আমার বাবাকেও তেমনি কিন্তু আমাদের দলে আসতে হয়েছে। উনি যখন দেখেছেন ইসলামের নামে তার পিয়ারে পাকিস্তানের আর্মি নৃশংস কাজ করছে, তার চোখের সামনে দিয়ে লাশগুলো নদীতে ভেসে যাচ্ছে তখন আমার বাবার মুখ থেকে আমি বেরিয়ে আসতে শুনেছি আহা পাকিস্তানকে আর টিকিয়ে রাখা গেলো না। তিনি নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন এই গণহত্যা করার পর তার সাধের পাকিস্তানকে আর টিকিয়ে রাখা যাবে না। এখন এই যে অভিজ্ঞতাটা আমার বাবার মত মানুষের মধ্যেও একটা মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আগে আমি যে মানুষটা ছিলাম, নয় মাস পরে আমি অনেক বদলে গেছি। জাতির ক্ষেত্রেও কিন্তু একই হয়েছে। একটা জাতি ইন্টেন্সিটির দিক দিয়ে নয় মাসের মধ্যে কিন্তু নয় বছরের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হয়েছে।

আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন?

আমি বিশ্বাস করি।

তাহলে এত রক্তের মধ্য দিয়ে যে স্বপ্নকে সামনে রেখে যে জাতি স্বাধীন হল, সে জাতির স্বপ্নটা কেন এত দ্রুত হোঁচট খেলো?

তারেক মাসুদ: মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে নয় বছর এগিয়ে দিয়েছে বটে কিন্তু একটি জাতির বিকাশ অতি লম্বা প্রক্রিয়া। ইউরোপের দিকেও যদি তাকিয়ে দেখেন তাহলে তাদের যে কোন জাতির বেড়ে উঠাতেও কম পক্ষে পঞ্চাশ বছর লেগেছে। আমাদের জাতি কিন্তু একটা অ্যাডালেস্ন্ট নেশ্ন্। এই অ্যাডালেস্ন্স’টা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এবং সেই কারণে অস্থিরতা একটু বেশী। আমি মনে করি এটা একটা ট্রান্জিশনাল পিরিয়ড, ইচ্ নেশন অর এ্যান ইন্ডিভিজুয়াল হ্যাজ টু গো থ্রু। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমি মাদ্রাসা থেকে সাধারণ শিক্ষায় আসতে পারতাম না। সাধারণ শিক্ষার সূত্রে ঢাকা শহরেও কাকতলীয়ভাবে আসা। একই ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্র সংসদের সংস্পর্শে আসা।

 সালটা কত ছিলো?

উনিশ’শ চুয়াত্তর। তখন থেকেই আমি নিয়মিত চলচ্চিত্র সংসদের ছবি দেখা শুরু করেছি। পঁচাত্তর থেকে আমি সক্রিয়ভাবে চলচ্চিত্র সংসদের সাথে জড়িত। এ ক্ষেত্রে মুহম্মদ খসরুরও বিরাট অবদান রয়েছে। ছিয়াত্তর থেকে আমি চলচ্চিত্র ফেডারেশনের নির্বাহী সম্পাদক এবং ঐ সময় থেকে আমি নিজে একটি চলচ্চিত্র সংসদ পরিচালনা করতে থাকি। অতএব, আমি গ্রামের মাদ্রাসার ছেলে হিসাবে যেখানে আমার শৈশবের চৌদ্দ-পনের বছর বয়সে সিনেমা হলে সাধারণ বাণিজ্যিক ছবি দেখার সুযোগ পর্যন্ত পাইনি সেখানে হঠাৎ করে পথের পাঁচালী, লুজিয়ানা স্টোরি দেখছি। বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরজাটা হঠাৎ আমার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেল। আমি যেন জীবনের কয়েকটা ফেজ ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে সামনে এগিয়ে গেলাম। সবাই কিন্তু পথের পাঁচালী ছবিটি দেখার পূর্বে পথের পাঁচালী উপন্যাসটি আগে পড়েছে। আমি কিন্তু পথের পাঁচালী ছবিটিই প্রথম দেখেছি। আমাকে আগে বলা হয়েছে সিনেমা একটা বাজে জিনিস এটাতে শুধুমাত্র নাচ-গানই থাকে, জীবন থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী একটি জিনিস। কিন্তু পথের পাঁচালী দেখে উপলব্ধি করলাম, ওটা শুধু বাস্তব জীবনের সাথে মিলই নয়, আমার ব্যক্তি জীবনের সাথে ওটার হুবহু মিল। পথের পাঁচালী’র হরিহর একজন দায়িত্বহীন বাবা, আমার বাবাও ঠিক তাই। সর্বজয়া যে সংগ্রামী সর্বংসহা এক নারী, আমার মা তার হুবহু কপি। দূর্গা যেমন অপুর বড় বোন তেমনি আসমা আসলে আমার বড় বোন।

তাহলে কি আপনি মনে করেন মাটির ময়না ছবির কাহিনী নির্বাচনে পথের পাঁচালী’র প্রভাব আছে?

অবশ্যই। আমার মনে হয় বাঙালি অনেক চলচ্চিত্রকারের চলচ্চিত্র নির্মাণে পথের পাঁচালী’র প্রভাব রয়েছে। কিন্তু কাহিনীটার সাথে আমার জীবনের প্রচুর মিল। সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, অধিকাংশ পরিচালকই তাদের ছবির জন্য এমন কাহিনী নির্বাচন করেন যা তারা কখনও দেখেননি। এক ধরনের বানোয়াট কাহিনীর উপর ভিত্তি করে ছবি তৈরী করেন। সাধারণত নিজের জীবনের কাছে যাই না আমরা। গল্পের জন্য আমি উল্টো পথে গিয়েছিলাম; আমি নিজের জীবনের কাছে গিয়েছি। পথের পাঁচালী কিন্তু আমাকে এই ধারণাটা দিয়েছে। আমার জীবনেইতো সিনেমার উপজীব্য হতে পারে। অতএব, আমার জীবন নিয়েও যে চলচ্চিত্র হতে পারে তা দীর্ঘদিন আমার চেতন ও অবচেতন মনে কাজ করেছে। আপনারা পথের পাঁচালী’র সাথে মাটির ময়নার মিলটা জানেন এবং ডিপারচারটাও জানেন। পথের পাঁচালী হিন্দু নিম্ন মধ্যবিত্তের পাঁচালী ওখানে গোটা বাঙালি নিম্ন মধ্যবিত্তের পাঁচালীটা নেই, থাকা সম্ভবও নয়। বাকী বাংলার যে গল্প, বিশেষ করে মুসলমান বাঙালি নিম্নবিত্তের গল্প, সেই গল্পের খন্ডাংশ হলেও কিন্তু মাটির ময়না’য় উঠে এসেছে যেটা পথের পাঁচালী’র মধ্যে দর্শক পান না। অতএব, দুটোর মধ্যে একটা মিউচ্যুয়াল এক্সক্লুসিভ্নেস রয়েছে অর্থাৎ একটার মধ্যে যা নেই অন্যটার মধ্যে তা-ই আছে। অপুর লড়াই, অপুর সংগ্রাম টোটালি ভিন্ন। সেই জায়গাটায় একটি পরস্পর ভিন্নতা রয়েছে, কিন্তু দুটো মিলে যদি আপনি দেখেন তাহলে একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলার ছবি, বৃহত্তর বাংলার ছবি উঠে আসতে পারে। আমি যেটা বলছিলাম, এরকম কয়েকটা বিষয় অর্থাৎ পথের পাঁচালী দেখা, বিশ্ব চলচ্চিত্রের সুন্দর সুন্দর ছবিগুলো এত অল্প বয়সে দেখা, তার পরে আরো কিছু বিষয় ঘটে গেলো। আমি শিল্পী এস.এম.সুলতানে কেন এত বেশী আগ্রহী হলাম, এটার কিন্তু একটা নেগেটিভ ইনস্পিরেইশ্ন্ এ মাদ্রাসার সাথে সম্পর্কিত আছে। সাধারণত ঐ প্রজন্মে আমরা যখন বড় হচ্ছি তখন বিভিন্ন জনের বিভিন্ন স্বপ্ন থাকে। হয় কেউ ডাক্তার হবে, না হয় ইঞ্জিনিয়ার অথবা শিল্পী বা পাইলট। কিন্তু আমিতো ওভাবে বড়ই হয়নি যে আমি ওভাবে স্বপ্ন দেখতে পারব। চিত্র নির্মাতা হওয়ার স্বপ্নতো আমার থাকার কথাই না। কিন্তু আমি যখন মাদ্রাসায় পড়েছি তখন প্রতি পদে পদে আমাকে বলা হয়েছে ছবি আঁকা যাবে না, ছবি তোলা যাবে না, ছবি দেখা যাবে না। আমার বাবা আমাদের ছোটবেলায় কোন ছবি তুলতে দিতো না। ফলে ছোটবেলার আমার হার্ডলি কোন ছবি আছে। ছোটবেলায় আমি মাদ্রাসায় প্রজাপতির ছবি আঁকছি, হুজুর আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললো, তুমি এটা আঁকতে পারো না। তুমি কি এর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে পারো? সুতরাং এটা আল্লাহর সাথে পাল্লা দে’য়া এটা এক ধরণের ঔদ্ধত্য । সুতরাং এটা করা যাবে না। এই যে রিপ্রোডাক্টিভ ইমেজ বা ছবির প্রতি যে আকর্ষণ এটা কিন্তু আমার মাদ্রাসা থেকেই হয়ে যায়। যেহেতু বাধা দিলে বাধে লড়াই, সেহেতু আমার কিয়রিয়াসিটি বেড়ে গেছে। ফলে যদিও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়েছি কিন্তু আমার ভার্সিটি জীবনের পুরোটাই আর্ট কলেজে কেটেছে। আর্ট কলেজের অনেক জুনিয়র ছাত্রই মনে করতো আমি আর্ট কলেজেরই ছাত্র। কারণ আমি তাদের চেয়ে বেশী রেগুলার ছিলাম এবং অধিকাংশ ছাত্রই ছিল আমার বন্ধু। এটাও একটা কাকতলীয় যে আমি ভিজুয়াল আর্টের প্রতি আগ্রহী হবো, শিল্পী সুলতানের প্রতি আকৃষ্ট হবো এবং তার সাথে গ্রাম বাংলায় সাত বছর ঘুরে বেড়াবো। গ্রাম-বাংলাকে এস.এম সুলতানের ভিশন থেকে দেখা পুন:আবিষ্কার করার সুযোগ হবে, বিশেষ অভিজ্ঞতা হবে। মাটির ময়না’য় এই অভিজ্ঞতাগুলো কিন্তু কাজে লেগেছে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন :ফাদার গাস্তঁ রোবের্জের সাক্ষাৎকার । মাহবুব মোর্শেদ।

Facebook Comments
share on:
মনিস রফিক

মনিস রফিক

মনিস রফিকের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই রাজশাহী শহরে। ২০০৭ সাল থেকে চলচ্চিত্র ও আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা, পত্রিকা সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টোতে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কিছু বই হচ্ছে - ক্যামেরার পেছনের সারথি, চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা, তারেক মাসুদ : চলচ্চিত্রের আদম সুরত, সুবর্ণরেখা : প্রসঙ্গ ঋত্বিক ( সম্পাদনা), তিতাস একটি নদীর নাম ( সম্পাদনা)।