টি এস এলিয়টের সাক্ষাৎকার ‘কবিতার শিল্পরূপ’

share on:
টি এস এলিয়টের সাক্ষাৎকার

টি এস এলিয়টের সাক্ষাৎকার ‘কবিতার শিল্পরূপ’ শিরোনামে দা প্যারিস রিভিউ ২১তম (বসন্ত-গ্রীষ্ম, ১৯৫৯) সংখ্যায় প্রকাশ করে। ডোনাল্ড হল-এর নেয়া এলিয়টের এই সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন নাজিব ওয়াদুদ।

সংস্কৃতি ডটকম বিশ্বের সেরা সাহিত্যিকদের জীবনী, সাক্ষাৎকার ও সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে ইচ্ছুক। যাতে একজন সাহিত্যিককে সামগ্রিকভাবে চেনা যায়।

টি এস এলিয়ট, ১৮৮৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মিসৌরির সেইন্ট লুইস-এ জন্মগ্রহণ করেন। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত এলাকার স্মিথ একাডেমি, পরে বস্টনের বাইরে মিল্টন একাডেমি এবং শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন তিনি।

কবিতা লেখা শুরু চৌদ্দ বছর বয়সে, ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ রুবাইয়াত অফ ওমর খৈয়্যাম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে। তাঁর প্রথম প্রদর্শিত কবিতা প্রকাশিত হয়, প্রথমে স্মিথ একাডেমি রেকর্ড, এবং পরে দ্য হার্ভার্ড অ্যাডভোকেট-এ। ১৯০৯-১০ কালপর্বে তিনি কবি হিসেবে নিজস্ব কণ্ঠস্বর আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন।

১৯১০ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে তিনি তাঁর প্রাথমিক দিককার বিখ্যাত কবিতাগুলো, যেমন ‘দ্য লাভ সংস অফ জে. আলফ্রেড প্রুফক’, ‘পোর্ট্রেট অফ এ লেডি’, ‘প্রিলিউড্স’ এবং ‘র‌্যাপ্সডি অন এ উইন্ডি নাইট’ লিখে ফেলেন। ১৯৪৮ সালে পান নোবেল পুরস্কার। ১৯৪৭ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বার্ন্ট নর্টন’ রচনা করেন।

সেটা কাব্যগ্রন্থ কালেক্টেড পোয়েমস ১৯০৯-১৯৩৫ (১৯৩৬)-এর শেষ কবিতা হিসেবে সংকলিত হয়। এই কবিতাটি এলিয়টকে পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত প্রধান কবির আধিপত্য দান করে।

১৯৬৫ সালের ৪ জানুয়ারিতে এলিয়ট মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর এলিয়টকে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ইস্ট কোকার-এর সেইন্ট মাইকেল চার্চে সমাহিত করা হয়।

তাঁর সমাধিতে তাঁর স্বনির্বাচিত এই বাণী (ফোর কোয়ার্টেটস থেকে নেওয়া) খোদিত করা হয়- ‘আমার সূচনাতেই নিহিত আমার শেষ, আমার সমাপ্তিতেই নিহিত আমার শুরু।’

সংস্কৃতি ডটকম

আমার সম্ভবত শুরু থেকেই আরম্ভ করা দরকার। শৈশবে সেইন্ট লুইসে থাকার সময় আপনি কোন পরিস্থিতির চাপে কবিতা লিখতে শুরু করেন, মনে পড়ে কি?

আমি শুরু করেছিলাম, আমার মনে হয়, চৌদ্দ বছর বয়সে, ফিটজেরাল্ডের ওমর খৈয়্যাম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে; লিখেছিলাম বেশ কিছু বিষণ্ন, এবং নাস্তিকতা ও নৈরাশ্যবাদী চতুষ্পদী শ্লোক, সৌভাগ্যবশত আমি সেগুলোকে সম্পূর্ণ গোপন রাখতে পেরেছিলাম- এতটাই পুরোপুরি যে সেগুলোর আর অস্তিত্বই নেই। ওগুলো আমি কখনও কাউকে দেখাইনি।

প্রথম প্রদর্শিত কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রথমে স্মিথ একাডেমি রেকর্ড, এবং পরে দ্য হার্ভার্ড অ্যাডভোকেট-এ; সেটা লিখেছিলাম আমার ইংলিশ শিক্ষকের অনুশীলন হিসেবে, বেন জনসনের অনুকৃতি ছিল সেটা। তিনি সেটাকে পনর-ষোল বছরের একটা বালকের জন্য খুব ভালো হিসেবে গণ্য করেছিলেন। তারপর কিছু লিখি হার্ভার্ড-এ, দ্য হার্ভার্ড অ্যাডভোকেট-এর সম্পাদকগিরির নির্বাচনে জেতার জন্য, সেটা আমি খুব উপভোগ করেছিলাম।

তারপর জুনিয়র এবং সিনিয়র ক্লাসের দিনগুলোয় বিস্ফোরণ ঘটার মতো অবস্থা হয়েছিল। আমি খুব বেশি লিখছিলাম, প্রথমে বোদলেয়র এবং পরে জুল লাফর্জ-এর প্রভাবে, তারা হার্ভার্ড-এ আমার জুনিয়র ক্লাসের সময়কার আবিষ্কার।

বিশেষভাবে কেউ কি আপনাকে ফরাশি কবিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল? আরভিং ব্যাবিট নয়, আমার ধারণা।

না, ব্যাবিট সর্বশেষ ব্যক্তি হতে পারেন! প্রশংসা করার জন্য যে একটি কবিতাকে ব্যাবিট ওপরে তুলে ধরেন তা হলো গ্রে-র এলিজি। সেটা একটা সুন্দর কবিতা, কিন্তু আমি মনে করি সেটা ব্যাবিটের একটা সীমাবদ্ধতার পরিচায়ক, খোদা তাকে শান্তি দিন। আমার মনে হয় আমি আমার উৎসের কথা জানিয়েছি; সেটা হচ্ছে ফরাশি কবিতার ওপর লেখা আর্থার সিমন্সের বই, হার্ভার্ড ইউনিয়নে পেয়েছিলাম।

সে সময় হার্ভার্ড ইউনিয়ন এমন একটা মিলনস্থল ছিল যেখানে যে কোনো আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র ইচ্ছে করলে তার সদস্য হতে পারত। সেখানে খুব সুন্দর ছোট্ট একটা লাইব্রেরি ছিল, এখন যেমন হার্ভার্ডের অনেক জায়গায় দেখা যায়। তার উদ্ধৃতিগুলো আমার পছন্দ হয়েছিল এবং আমি বস্টনের একটা বিদেশি বইয়ের দোকানে (আমি তার নাম ভুলে গেছি এবং জানি না সেটা আজো টিকে আছে কিনা) গিয়েছিলাম; সেটা বিশেষভাবে ফরাশি, জার্মানি এবং অন্য সব ভাষার বইয়ের জন্য বিখ্যাত ছিল, সেখানে লাফর্জ এবং অনান্য কবির বই পেলাম। আমি ভেবে পাই না সেই দোকানে লাফর্জের মতো গুটিকয়েক কবির বই কেন পড়ে ছিল। খোদাই জানেন কতদিন ধরে সেগুলো ওখানে জমে ছিল বা তাদের আর কোনো চাহিদা ছিল কিনা।

আপনি যখন আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র তখন আপনি কি কোনো প্রবীণ কবির প্রভাব অনুভব করতেন? আজকালকার তরুণ কবিরা এলিয়ট, পাউন্ড এবং স্টিভেন্স যুগের কবিতা লিখছে। আপনি কি সাহিত্যিক কাল সম্পর্কে আপনার নিজস্ব ধারণার কথা স্মরণ করতে পারেন? আপনার অবস্থা একেবারে ভিন্ন ছিল কিনা আমার জানতে ইচ্ছে হয়।

আমি মনে করি ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় এমন কোনো জীবিত কবি না থাকা বরং সুবিধার যার প্রতি কাউকে বিশেষ আগ্রহ দেখাতে হয়। আমি জানি না এ রকম হলে কী হতো কিন্তু আমি মনে করি এ রকম প্রভাবশীলদের উপস্থিতি বরং কষ্টকর চিত্তবিক্ষেপের কারণ হতো। সৌভাগ্যক্রমে আমরা কেউ কারো জন্য উদ্বেগের কারণ ছিলাম না।

 হার্ডি বা রবিনসনের মতো লোকদের ব্যাপারে আপনি কি আদৌ সতর্ক ছিলেন?

আমি রবিনসন সম্পর্কে কিছুটা জেনেছিলাম, কারণ আমি দ্য আটলান্টিক মান্থ্লিতে তার সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম যেখানে তার কবিতার কিছু উদ্ধৃতি ছিল; কিন্তু সেগুলো আদৌ আমার কাপের চা ছিল না। হার্ডি সে সময় কবি হিসেবে তেমন পরিচিত ছিলেন না। লোকে তার উপন্যাস পড়ত, তার কবিতা প্রকৃতপক্ষে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মের সময়। তখন ইয়েটস ছিলেন কিন্তু সেটা তার প্রাথমিক কাল। আমার কাছে তাকে খুব বেশি কেল্টিক চরিত্রের বলে মনে হতো। প্রকৃতপক্ষে আর কেউ ছিল না নব্বইয়ের লোকগুলো ছাড়া, যারা মদ্যপান অথবা আত্মহত্যা বা এটা-সেটা করে মারা যান।

আপনি এবং কনরাড আইকেন যখন অ্যাডভোকেট-এর যৌথ সম্পাদক তখন আপনারা কি কবিতা লিখতে পরস্পরকে সাহায্য করেছেন?

আমরা বন্ধু ছিলাম কিন্তু আমার মনে হয় না যে আমরা কেউ কাউকে প্রভাবিত করেছি। বিদেশি লেখকদের প্রসঙ্গ যখন এল তখন দেখা গেল সে ইতালীয় এবং স্পেনীয়দের প্রতি আগ্রহী আর আমার সমস্ত উৎসাহ ফরাশিদের ঘিরে।

আপনার আর কোনো বন্ধু ছিল কি যারা আপনার কবিতা পড়ত এবং আপনাকে পরামর্শ দিত?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার ভাইয়ের এক বন্ধু ছিল, তার নাম টমাস এইচ. টমাস, কেমব্রিজে বাস করত; সে দ্য হার্ভার্ড অ্যাডভোকেট-এ আমার কিছু কবিতা দেখেছিল। সে আমাকে একটা খুব উৎসাহব্যঞ্জক চিঠি লিখেছিল এবং আমাকে আনন্দিত করেছিল। আমার এখনও তার চিঠি পেতে ইচ্ছে করে। আমাকে ওই উৎসাহ দেয়ার জন্য আমি তার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ।

আমি জানি কনরাড আইকেনই আপনাকে এবং আপনার কাজকে পাউন্ডের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।

হ্যাঁ, সে-ই। আইকেন খুব উদার হৃদয়ের বন্ধু ছিল। সে আমার কিছু কবিতা লন্ডনে চালানোর চেষ্টা করে, হ্যারল্ড মনরো এবং অন্যদের কাছে। কেউ সেগুলো ছাপতে রাজি হয়নি। সে ওগুলো আমার কাছে ফেরত আনে। তারপর ১৯১৪ সালে, আমার মনে পড়ে, আমরা উভয়ে গ্রীষ্মকালে লন্ডনে গিয়েছিলাম। সে বলল, ‘পাউন্ডের কাছে যাও। তাকে তোমার কবিতা দেখাও।’ সে ভেবেছিল পাউন্ডের সেগুলো পছন্দ হবে। আইকেন আমার কবিতা পছন্দ করত যদিও তার থেকে আমার কবিতা ছিল একেবারে আলাদা।

পাউন্ডের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের ঘটনা আপনার মনে আছে?

আমার মনে হয় আমিই প্রথমে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। কেনসিংটনে তার ছোট্ট ত্রিকোণাকার বসার ঘরে আমি একটা ভালো ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছিলাম। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে তোমার কবিতা পাঠাও।’ তিনি ফেরত চিঠিতে লিখলেন, ‘এ যাবৎ আমি যা কিছু দেখেছি তার মতোই সুন্দর এগুলো। আমার কাছে এস, আমরা এগুলো নিয়ে আলাপ করব।’ কিছুদিন পর তিনি ওগুলো হ্যারিয়েট মনরোর কাছে পাঠিয়ে দেন।

আপনার ষাটতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত বইতে আপনার অ্যাডভোকে-কালীন দিনগুলো নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধে আইকেন আপনার একটা চিঠি উদ্ধৃত করেছেন। ইংল্যান্ড থেকে লেখা সেই চিঠিতে আপনি পাউন্ডের কবিতাকে বলেছেন ‘মর্মস্পর্শী রকমের দুর্বল’। কখন আপনার মন পরিবর্তন হলো?

হাহ-হা-হা! সেটা কিছুটা হঠকারী মন্তব্য, তাই না? দ্য হার্ভার্ড অ্যাডভোকেট-এর একজন সম্পাদক, ডব্লিউ. জি. টিংকম-ফার্নান্দেজ, সে আমার, কনরাড আইকেন এবং তখনকার অন্যসব সিগনেট গ্রুপের কবিদের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল, সে-ই প্রথম আমাকে পাউন্ডের কবিতা দেখায়। সে আমাকে এলকিন ম্যাথ্যুজের ক্ষুদ্র রচনা এক্সাল্টেশন্স এবং পারসোনিও দেখিয়েছিল। সে বলেছিল, ‘এ হচ্ছে তোমার পথের যাত্রী; তোমার এটা পছন্দ হবে।’

তবে আমার পছন্দ হয়নি, সত্যিই। আমার কাছে এটা বরং অসংযত, পুরনো কেতার, রোম্যান্টিক, যান্ত্রিক ধরনের লেখা মনে হয়। আমাকে খুব একটা আকর্ষণ করতে পারেনি। যখন আমি পাউন্ডের সঙ্গে দেখা করতে যাই, তখন আমি বিশেষরূপে তার কাজের গুণগ্রাহী ছিলাম না, এবং যদিও আমি এখন তার সেই কাজগুলোকে খুব রুচিসম্পন্ন বিবেচনা করি, তবু এটা নিশ্চিত যে তার পরের কাজগুলোতেই উৎকর্ষ বেশি।

আপনি লিখিতভাবে উল্লেখ করেছেন যে পাউন্ড আপনার দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডকে কেটে অনেক বড় কবিতা থেকে বর্তমান আকারে নিয়ে এসেছেন। সাধারণভাবে তার সমালোচনার দ্বারা আপনি কি লাভবান হয়েছেন?

হ্যাঁ। সেই সময়ে। তিনি চমৎকার একজন সমালোচক, কারণ তিনি আপনাকে তার মতো বানানোর চেষ্টা করেন না। আপনি কী করতে চেয়েছেন সেটাই তিনি দেখতে চেষ্টা করেন।

আপনি কি আপনার কোনো বন্ধুকে তার কবিতা পুনর্লিখনে সাহায্য করেছেন? যেমন, উদাহরণ হিসেবে, এজরা পাউন্ডের?

কোনো উদাহরণের কথা আমি মনে করতে পারছি না। অবশ্য গত পঁচিশ বছর বা এই রকম সময় ধরে আমি তরুণ কবিদের অসংখ্য পরামর্শ দিয়েছি।

ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর মূল, অসংশোধিত পাণ্ডুলিপি আপনার কাছে আছে?

সে কথা জিজ্ঞেস করবেন না। সেটা আমি জানি না। এটা একটা অমীমাংসিত রহস্য। আমি সেটা জন কুইন-এর কাছে বিক্রি করেছিলাম। আমি তাকে আমার একটা অপ্রকাশিত কবিতার নোটবুকও দিয়েছিলাম, কারণ তিনি আমার বিভিন্ন কাজে খুব সহযোগিতা করেছেন। পরে তিনি মারা যান, সেগুলো আর বাজারে আসেনি।

পাউন্ড দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড থেকে কী ধরনের জিনিস বাদ দিয়েছেন? কোনো পুরো অধ্যায় কেটে দিয়েছেন কি?

পুরো অধ্যায়? হ্যাঁ। জাহাজডুবি নিয়ে একটা দীর্ঘ অধ্যায় ছিল। আমি জানি না সেটার কী প্রয়োজনীয়তা ছিল, সেটা, আমার মনে হয়, দ্য ইনফার্নো-এর ইউলিসিস সর্গের অনুপ্রেরণার ফল। আর একটা পরিচ্ছেদ ছিল যেটা রেপ অফ দ্য লক-এর অনুকরণে লেখা। পাউন্ড বলেছিলেন, ‘এমন কিছু করার কোনো মানে নেই যা অন্য কেউ করেছে, তা যদি তার চেয়ে ভালো করা না যায়। তার চেয়ে করো আলাদা কিছু।’

এই অস্ত্রোপচার কি কবিতার বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর কোনো পরিবর্তন ঘটিয়েছে?

না। আমার মনে হয় এটা দীর্ঘ আকৃতিতে যে রকম কাঠামোহীন ছিল সে রকমই রয়েছে, কেবল কিছুটা নিরর্থকভাবে।

এই কবিতা নিয়ে আমার একটা প্রশ্ন আছে, সেটা তার সংগঠন বিষয়ে। সমালোচকরা বলেছেন, আপনি দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এ ‘একটা প্রজন্মের মোহমুক্তি’র কথা প্রকাশ করেছেন বা এটা যে আপনার পরিকল্পিত সে কথা আপনি অস্বীকার করেছেন। আপনি আপনার থটস আফটার ল্যাম্বেথ-এ সমালোচকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এখন এফ. আর. লেভিস, আমার বিশ্বাস, বলছেন যে এই কবিতায় কোনো ক্রমোন্নতি দেখানো হয়নি; তাছাড়াও, অন্যদিকে, আরো সাম্প্রতিক সমালোচকরা আপনার পরবর্তীকালের কবিতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডকে খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত করছেন। আমার জানতে ইচ্ছে করে এটা আপনার পরিকল্পিত কিনা।

না, এটা আমার সচেতন পরিকল্পনার অংশ নয়। আমি মনে করি যে থটস আফটার ল্যাম্বেথ-এ আমি যে পরিকল্পনার কথা বলেছি তা ইতিবাচকতার চেয়ে নেতিবাচক অর্থে বেশি বলেছি, কী আমার পরিকল্পনা ছিল না সেকথা বলার জন্য। আমি জানতে উৎসুক ‘পরিকল্পনা’ বলতে কী বোঝায়! একজন চাচ্ছে তার বুকের মধ্যে যা আছে তা বের করতে। অথচ সে পুরোপুরি জানে না তার বুকের মধ্যে থেকে সে কী বের করতে চায়, যতক্ষণ না তা বের হচ্ছে। তবে আমি ‘পরিকল্পনা’ শব্দটিকে আমার কবিতার ক্ষেত্রে বা কোনো কবিতার ক্ষেত্রেই, ইতিবাচক অর্থে প্রয়োগ করতে পারিনি।

আপনি এবং পাউন্ড এবং আপনার প্রথম জীবন সম্পর্কে আমার আর একটা প্রশ্ন আছে। আমি কোথাও এক জায়গায় পড়েছি যে, আপনি এবং পাউন্ড, আপনাদের টিন-এজের শেষ দিকে, চতুষ্পদি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কারণ মুক্তছন্দ নিয়ে অনেক হয়েছে।

আমার মনে হয় পাউন্ড সে রকম কিছু একটা বলেছিলেন। চতুষ্পদী রচনার পরামর্শ তারই। তিনি আমাকে এমঁক্স এত্ কামিস-এর (থিয়োফিল গোতিয়ের-এর কবিতা) দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।

আমার জানতে ইচ্ছে করছে আঙিক এবং বিষয়ের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারে আপনার ধারণা কী। আপনি কি তাহলে কী লিখতে যাচ্ছেন সেটা পুরোপুরি জানার আগেই আঙিক বাছাই করবেন?

হ্যাঁ, একদিক থেকে তা-ই। একজন মূলটা পড়েছে। আমরা গোতিয়ের-এর কবিতাগুলো পড়লাম এবং ভাবলাম, ‘আমি কি এমন কিছু বলতে চাই যা এই আঙিকের জন্য উপযুক্ত?’ আমরা পরীক্ষা করলাম। আঙিকটা কথ্যবস্তুকে শক্তি জোগাল।

আপনি আপনার প্রথম দিককার কবিতায় মুক্তছন্দকে আঙিক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কেন?

আমার প্রথম দিককার কবিতায় মুক্তছন্দের ব্যবহার শুরু হয়েছিল লাফর্জের আঙিক অনুশীলনের প্রচেষ্টা হিসেবে। এর অর্থ ছিল অনিয়মিত দৈর্ঘ্যরে মিলযুক্ত পঙক্তি এবং যত্রতত্র মিলযুক্ত শব্দের ব্যবহার। এটা ঠিক পুরোপুরি মুক্তছন্দ ছিল না, বিশেষ করে যে ধরনকে এজরা ‘অ্যামিগিজম’ বলেন (এমি লাওয়েল প্রসঙ্গে)। তারপর অবশ্য, পরবর্তী পর্যায়টা ছিল অনেক বেশি মুক্ত, যেমন ‘র‌্যাপ্সডি অন এ উইন্ডি নাইট’। আমি জানি না এটা করার সময় আমার মনের সামনে কোনো রকম মডেল বা অনুশীলন ছিল কিনা। এটা এইভাবে এসে গেছে আরকি।

আপনার কি মনে হতো যে, সম্ভবত, আপনি কোনো কিছুর বিরুদ্ধে লিখছিলেন, যা কোনো মডেল থেকেও বেশি কিছু? সম্ভত কোনো প্রতিষ্ঠিত কবির বিরুদ্ধে গিয়ে?

না, না, না। আমি মনে করি না কেউ অবিরাম প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা চালিয়ে যাবে, বরং তার জন্য সঠিক কোনটা তার সন্ধান করতে হবে। কেউ কেউ সত্যি-সত্যিই রবার্ট ব্রিজেস-এর মতো কবি-ব্যক্তিত্বদের অবজ্ঞা করতে চেয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না কতকগুলো প্রতিষ্ঠিত আঙিককে ছুড়ে ফেলার রাজনৈতিক প্রয়াস কোনো ভালো কবিতার জন্ম দিতে পারে।

আমি মনে করি এটা কেবল অবস্থান বদল। লোকেরা তাদের নিজেদের কথা বলার জন্য উপায় খোঁজে। ‘আমি বলতে পারি না এটা সেই পথ, আমি সেই পথ খুঁজছি যেটা আমার কাজে লাগবে।’ প্রচলিত রীতি নিয়ে কারো প্রকৃতপক্ষেই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়।

আমার মনে হয় ‘প্রুফ্রক’-এর পরে এবং ‘জেরোনটিওন’-এর আগে আপনি ফরাশি ভাষায় কিছু কবিতা লিখেছিলেন, সেগুলো আপনার কালেক্টেড পোয়েমস-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমার জানতে ইচ্ছে হয় কী কারণে আপনাকে ওগুলো লিখতে হয়েছিল। তারপর কি আর লিখেছেন?

না, এবং আর কখনো লিখব না। সেটা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার যার কোনো ব্যাখ্যা আমি দিতে পারি না। সেই সময় আমি চিন্তা করেছিলাম আমি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছি। আমি কিছুকাল কিছুই লিখিনি এবং হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ফরাশি ভাষায় লিখতে শুরু করলাম এবং দেখলাম আমি পারি, সেই সময়।

আমার মনে হয় আমি যখন ফরাশি ভাষায় লিখছিলাম তখন কবিতাকে ততটা গুরুত্ব দেইনি, এবং গুরুত্বের সঙ্গে না নেয়ার কারণে, আমি যে লিখতে পারছিলাম না সেজন্য ততটা উদ্বিগ্ন হইনি। আমি এসব করেছিলাম আমি যে পারি সেটা দেখার জন্য এক ধরনের দুঃসাহসিক অভিযাত্রা হিসেবে। কয়েক মাস এটা চলে।

তার মধ্যে সবচেয়ে ভালোগুলো ছাপা হয়েছে। আমাকে অবশ্যই বলতে হবে যে এজরা পাউন্ড সেগুলো পড়েছেন এবং এডমন্ড ডুলাক, আমাদের পরিচিত লন্ডনবাসী ফরাশি, এ ব্যাপারে কিছু সাহায্য করেছেন।

কিছু কিছু আমরা বাদ দিয়েছি, সেগুলো মনে হয় সম্পূর্ণরূপে লুপ্ত হয়েছে। তারপর হঠাৎ আমি আবার ইংলিশে লিখতে শুরু করি এবং ফরাশি ভাষায় লেখার সকল উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। আমার মনে হয় কোনো কিছু আমাকে আবার লেখা শুরু করতে সাহায্য করে থাকবে।

আরও পড়ুন : অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক : শিক্ষকদের শিক্ষক।

T. S. Eliot, The Art of Poetry No. 1

Facebook Comments Box
share on:
নাজিব ওয়াদুদ

নাজিব ওয়াদুদ

নাজিব ওয়াদুদ, বিশিষ্ট কথাশিল্পী, অনুবাদক, সাংবাদিক ও চিকিৎসাবিদ। তিনি ১৯৬১ সালের ২০ জুলাই রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ শ্যামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখালেখির পাশাপাশি সাহিত্যে ছোটকাগজ পরিলেখ ও নন্দন সম্পাদনা করেন।