সৈয়দ মুজতবা আলী

share on:
সৈয়দ মুজতবা আলী

সৈয়দ মুজতবা আলী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান গদ্যশিল্পী। আজন্ম জ্ঞানপিপাসু মননশীল সাহিত্যধারার অন্যতম স্বাতন্ত্র্যদীপ্ত সাহিত্যব্যক্তিত্ব সৈয়দ মুজতবা আলী। তুখোড় রসবোধসম্পন্ন লেখার জন্য তিনি বিখ্যাত।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

সৈয়দ মুজতবা আলী শিল্প-সাহিত্য ও রূপে-গুণে ছিলেন সব্যসাচী। আড্ডাপ্রিয়, ‘মনস্বী ও মজলিসি’ সৈয়দ আলীর ডাকনাম ছিল ‘সিতা’ বা ‘সিতারা’। সাহিত্য এবং লেখালেখির জগতে তাঁর রয়েছে অনেক ছদ্মনাম। বাংলা সাহিত্যে বোধ হয় আর অন্য কোনো লেখক এত ছদ্মনাম ব্যবহার করেননি। সেগুলো হচ্ছে— সত্যপীর, টেকচাঁদ, রায় পিথৌরা, সিতু মিঞা, ওমর খৈয়াম, বিষ্ণু শর্মা, দারাশিকো, গোলাম মৌলা, প্রিয়দর্শী।

বিবিধ ভাষা থেকে শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।

সৈয়দ মুজতবা আলী দেশে-বিদেশে গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে প্রথম প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। গ্রন্থখানি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পাঠক মনে নাড়া দিতে সক্ষম হন। কাবুলে অবস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অন্তরঙ্গ উপলব্ধির ফসল এ গ্রন্থখানি। বইটিতে লেখক ভূগোল ও প্রকৃতির বিবরণ, জীবন ও সংস্কৃতির বিশেষণ এবং মানবগতির বিচিত্র স্বভাবের যে অনুপুঙ্খ, হৃদয়গ্রাহী ও আনন্দঘন উপস্থাপনা করেছেন, তাতে তার চিন্তা এবং পরিবেশনশৈলীর নৈপুণ্যে পাঠক বিস্মিত না হয়ে পারে না।

সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সিলেটের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহ্য বহনকারী ব্যক্তিত্ব খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দর আলী (১৮৬৫-১৯৩৯) ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলীর পিতা। আর মা আয়তুন মান্নান খাতুন ছিলেন বাহাদুরপুর পরগনার জমিদার মহসীন চৌধুরীর কন্যা।

সৈয়দ মুজতবা আলীর পাঠশালা জীবন শুরু ১৯০৮-১৯০৯ সালে সুনামগঞ্জ শহরে। ১৯১৫ সালে পিতার বদলির সুবাদে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরে ১৯১৮ সালে সিলেট গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। ১৯১৯ সালে তাঁর জীবনে নতুন পথের সঞ্চার হয়। সঞ্চালক ছিলেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ওই সময়কালে রবীন্দ্রনাথ সিলেট পরিভ্রমণকালে মুরারিচাঁদ কলেজে ‘আকাঙ্ক্ষা’ বিষয়ক বক্তৃতা করেন। ওই অনুষ্ঠানে ড. আলী ছিলেন নীরব একনিষ্ঠ শ্রোতা। রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা মুজতবার মনে গভীর উন্মাদনার সঞ্চার করে।

‘আকাঙ্ক্ষা’ কিভাবে বড় করতে হয়, সেই বিষয়ে একটি চিঠিও লেখেন রবি ঠাকুর বরাবর শান্তিনিকেতনের বারান্দায়। জবাবটাও পেলেন শিগগিরই। অনুসন্ধিৎসু মুজতবা আলী চলে গেলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাদপীঠ শান্তিনিকেতনে, ১৯২১ সালে। স্বয়ং কবিগুরুর সান্নিধ্যে তিনি পাণ্ডিত্য লাভ করলেন বিদেশি ভাষায়। পাঁচ বছর শান্তিনিকেতনে পড়াশোনার পর বিশ্বভারতীয় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেন।

ওই সময়ে তিনি সংস্কৃতি, হিন্দি, গুজরাটি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষায় পারদর্শী হন। ১৯২৭ সালে বিশ্বভারতীর প্রথম সমাবর্তন উৎসবে স্নাতকের সনদপত্র অর্জন করেন সৈয়দ মুজতবা আলী। এর পর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। দর্শনশাস্ত্র পড়ার জন্য বৃত্তি নিয়ে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান।  আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে ১৯২৭-১৯২৯ সালে মুজতবা আলী কাবুল সরকারের শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক নির্বাচিত হন।  সেখানে ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষা পড়াতেন।

বহুমাত্রিক বিরল প্রতিভার অধিকারী প্রাতিস্বিক চেতনার প্রাগ্রসর মনীষী সৈয়দ মুজতবা আলী নান্দনিক শিল্পমাত্রায় ছিলেন প্রতিষ্ঠিত কথাকার। তাঁর কথনবিশ্ব এবং মজলিসি সাহিত্যকৃতির দূরদর্শিতার পুরস্কারস্বরূপ ওই সময়কালে (১৯২৯-১৯৩২) জার্মান ভাষাবিজ্ঞানী ‘হুমবলট’ বৃত্তি পেয়ে জার্মানিতে যান। প্রথমে বার্লিন, পরে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে গবেষণার জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৩২ সালে। ১৯৩৪-১৯৩৫ সালে মিসরে কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন।  ভূগোল, দর্শন, ধর্ম, ইতিহাস, সর্বোপরি সাহিত্য-শিল্পের সব শাখায় তাঁর বিচরণ ছিল সমান তালে।

১৯৩৫ সালে বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানে আট বছর কাটান। এর পর দিল্লীর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। পরবর্তীকালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খণ্ডকালীন প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন। পঞ্চাশের দশকে পাটনা, কটক, কলকাতা ও দিল্লীতে আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সালে শান্তিনিকেতনে ফিরে বিশ্বভারতীর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন বইপড়ুয়া এবং ভ্রমণপাগল। এর প্রমাণ পাওয়া যাবে তাঁর পঞ্চতন্ত্রের (১৯৫২) ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে। সৈয়দ মুজতবা আলী কোন বিষয় নিয়ে লেখেননি— সব বিষয়েই বাগ্বৈদগ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সর্বমোট প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৯টি। তাঁর চারটি মৌলিক উপন্যাস— ‘অবিশ্বাস্য’ (১৯৫৩), ‘শবনম’ (১৯৬০), ‘শহরইয়ার’ (১৯৬৯) ও ‘তুলনাহীনা’ (১৯৫২)। ভ্রমণকাহিনীর মধ্যে রয়েছে- দেশে বিদেশে (১৯৪৯) ও জলে ডাঙ্গায় (১৯৬০)। ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে- চাচা কাহিনী (১৯৫২) ও টুনি মেম (১৯৬৪)। রম্যরচনার মধ্যে রয়েছে- পঞ্চতন্ত্র (১৯৫২) ও ময়ূরকণ্ঠী (১৯৫২)।

শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় সেখানকার বিশ্বভারতী নামের হাতে লেখা ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন। পরবর্তী সময়ে ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে তখনকার শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেন।

লেখালেখির জন্য তিনি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নরসিং দাস পুরস্কার (১৯৪৯), আনন্দ পুরস্কার (১৯৬১) ও একুশে পদক (২০০৫)।

আদ্যোপান্ত রবীন্দ্রভক্ত সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সোমবার, বেলা ১১টায় ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় আজিমপুরে ভাষাশহীদ বরকত ও সালামের পাশে।

* আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন parthibrashed@ymail.com এ।

আরও পড়ুন : দ্রৌপদীর দুনিয়া দর্শন : গাজী তানজিয়ার গল্প।

Facebook Comments
share on: