সু‌হিতা সুলতানার কবিতা

share on:
সু‌হিতা সুলতানার কবিতা

সু‌হিতা সুলতানা কবিতার ভেতর দিয়ে তুলে আনেন এক আলাদা জগৎ। কবিতার প্রতি পক্ষপাত, কবিতা নিয়ে নিরীক্ষাপ্রবণতা তাকে স্বতন্ত্রভাবে পরিচিত করেছে পাঠকের কাছে।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

 

বোধ

‌বোধহীন মানুষ ক্রমাগত

গিলে খায় পথ ও চৌহদ্দী

বহু রঙের বিবর্ণতা ঘিরে

ফেলেছে নদী ও পল্ল‌বিত

‌মোহনা! খাদকের চোখ‌

যেন রক্ত‌পিপাসু আগুন

দ্বীপ। অরণ্য জ্বলে যায়

অন্তর পুড়ে খাক হয়ে যায়

চার‌দিকে কৃতঘ্ন বামনের

দল লোভের কলস উপুড়

করে জিরাফের মতো

বা‌ড়িয়ে দিয়েছে গলা

আশ্চর্য পৃ‌থিবীর কাছে

এক‌দিন বোধহীন মানুষেরা

চিন্তার দাসত্ব ফে‌রি করে

চন্দ্রভুক পাহাড় ও নদীর

গল্পে প‌রিনত হবে। নৈকট্য

বলতে অকৃতজ্ঞ মানুষের ঢল

চেয়ে দে‌খি হাতপাতা

লোভীরা কড়চা সা‌জিয়ে

বসেছে সময়স্রোতের মুখে—

অমলধবল চাক‌রি বলে কথা

অষ্টপ্রহর হৃদয় বিদীর্ণ করে

ধৃষ্ট কালের মানুষের এই বিবর্ণ

পতন দেখে যেতে হলো

মহামা‌রির এই কালেও

মানুষের বোধ হলো না।

 

রক্তবর্ণ ক্ষত

সূর্য নয় রাতের রক্তবর্ণ ক্ষত ছুঁয়ে দ্যাখো

মেঘমুখী ফুল দূরতর দ্বী‌পের নির্জনতা ও

আকা‌শের ওপ‌া‌রে তিলোত্তমা অন্ধকারে

অক্লান্ত আগুন ও আলোর মগ্নতা নিঝুম

রা‌ত্রির তরঙ্গে গভীরতর ক্ষয় রূঢ় উল্লাস

আর অনন্ত স্বপ্ন ও সথ্যের মুখোমুখি য‌দি

একবার আবেগের স্তূপ নিয়ে ক্রমশ স্নিগ্ধ

কলরবে তোমার মুখোমু‌খি বসে তাহলে

শুধু সত্য নয় অপেক্ষা ও প্রেমের পৃষ্ঠা

উল্টে দ্যাখো মধু ও মৌমা‌ছির মধ্যে বিস্তর

পার্থক্য রয়েছে; ঠিক যেমন দুরন্ত ও দূরত্ব

আমাদের দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহের মধ্যে

যুক্ত হতে শুরু করেছে।মহামা‌রির এইকালে

মিথ্যা ও ভ্রা‌ন্তির বড় কদর বেড়েছে চেয়ে দে‌খি

অস্তগামী সন্ধ্যায় বিস্ময়ের দীর্ঘ আয়োজনে

খল নায়কের ধূ‌লিময় মুখ অসত্যের বে‌দিতে

বসে স্বা‌র্থের নগ্নতম ভীড়ে ক্রমশ আসক্ত

হতে থাকে।‌ অমীমাং‌সিত দিন ও রা‌ত্রির

মুখোমু‌খি ভুলের কড়চা সা‌জিয়ে বসেছে এক

বেওকুব । আশ্চর্য দিনের শেষে অগ্নির মানে

হয়ত চক্রবালে জলে ভেসে যাবে! কিছুই

থাকেনা না জীবন না প্রেম না অপেক্ষা না

তু‌মি না আমি না সে ! এ বড় বিস্ময় অনন্ত—

কাল শূন্যতা ও অগ্নির মুখোমু‌খি বসে থাকা।

 

শূন্য

‌চেয়ে দে‌খি অন্যের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে

বসে আছে এক উলঙ্গ শঠ ! দিকশূন্য স্বপ্ন

ও নদীর কিনারে আগুনপা‌খি হয়ে বাতাসে

ভেসে যাচ্ছে ধূর্ত জাদুকর। কালো মেঘের

অন্তর ছুঁয়ে ক্রমশ আঁধার হয়ে আসে মন

রংধনু রঙ মেখে উড়ে আসে শঙ্খ‌চিল আর

সহজ জলের মতো বৃক্ষযাপন ঋতুচক্রে

ভাঙা চাঁদ।

 

ডানার ঘ্রাণ

নিঃসঙ্গ অন্ধকারে স্বপ্নহীন সমুদ্রের ঢেউ

ডানার ঘ্রাণ নিয়ে আসে! জলের আবেগ

চন্দ্রভুক রাতের নিষিদ্ধ আলো শিকারীর

চোখের ভেতরে বিস্মৃতির আগুন ছড়িয়ে

দেয়। অরণ্যের লিরিক অন্তহীন ক্লান্তির

নীরবতা ঘাস হয়ে অবিরল নক্ষত্রের বনে

গান হয়ে জেগে থাকে হৃদয়ের কাছাকাছি

একদিন প্রশান্তির মোহে খল—নায়কের

ছেঁড়া খোঁড়া অদ্ভুত এলোমেলো গল্প

অ্যাভিনিউ জুড়ে ভূতের কেচছায় রূপ

নিয়েছিল বটে ! আজ জিজ্ঞাসার মুখো—

মুখি ঘৃণা ও অবক্ষয় আর মু‌খো‌শে ঢাকা

অচেনা মু‌খের ফুটন্ত আভা!

 

নীল ঢেউয়ের অপরাহৃ

তোমার জন্য কলঙ্ক রটে গিয়েছিল সারা মহল্লায়

তখন বিকেল পাঁচটা হবে ,ঠিক পাঁচটা !

ফ্রেমে বাঁধা ছিল সে মুখ

ভাঙা আয়নায় উড়ছিল মেয়েটির রেশমী স্কার্ফ

তখনো ডিভানে শুয়েছিল তোমার এলানো দেহ

ঠাণ্ডা ব্রাণ্ডি আর শূকুরের ফ্রাই

অপেক্ষাকে আরও উসকে দিয়েছিল বটে

হাওয়ায় উড়ছিল নীল ঢেউয়ের অপরাহৃ

কিন্ত মেয়েটির আসবার কথা ছিল গোধূলিলগ্নে

মেঘাচছন্ন ছলনার জাল আছড়ে পড়ছিল শাদা ঢেউয়ের

ওপর । সেদিন মেয়েটি কি তোমাকে একচোখা দানব

বলে সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে উধাও হয়েছিল?

জেনেছি ,মেয়েটি আর কখনো ফিরে আসেনি

ঠিক বিকেল পাঁচটায় !

এখনো মৃত্যু আয়নায় সে মেয়েটিকে দ্যাখে এবং

অপেক্ষায় থাকে।

* আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন parthibrashed@ymail.com এ।

আরও পড়ুন : সৈয়দ মুজতবা আলী।

Facebook Comments
share on:
সুহিতা সুলতানা

সুহিতা সুলতানা

সুহিতা সুলতানা, দু’বাংলার জনপ্রিয় কবি। আশির দশকের কবি সুহিতা সুলতানার কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও সমান দক্ষতা। তবে কবি হিসেবে খ্যাতিই তাকে পরিচিত করেছে পাঠকের কাছে। কবিতার প্রতি পক্ষপাত, কবিতা নিয়ে নিরীক্ষাপ্রবণতা তাকে নিজের দশকে তো বটেই, দশকের বাইরেও দিয়েছে সুখ্যাতি দিয়েছে। তার কবিতা সুখপাঠ্য। কবিতার ভেতর দিয়ে তিনি তুলে আনেন এক আলাদা জগৎ। যা তাকে বরাবারই পাঠকের কাছে উপস্থিত করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ (অনার্স), এমএ। বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উপপ‌রিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রিয় ভাষা বাংলা ভাষা। চর্চা করেন নরওজিয়ান, রুশ ও হিন্দী।