সৌভিক বন্দোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার । রঙ্গিত মিত্র

share on:
সৌভিক বন্দোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

সৌভিক বন্দোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি রঙ্গিত মিত্র। শুন্যদশকের একটি অতি পরিচিত নাম কবি সৌভিক বন্দোপাধ্যায়।

তাঁর লেখা কলকাতার হারিয়ে যাওয়া ট্রামলাইনের গড়িয়াহাটার মোড় কিংবা এখনকার ক্যাফেকফিডেতে ভেসে যাওয়া ঋতু-পরিবর্তনের কথা বলে। তিনি একাধারে যেমন জীবনের কথা লিখেছেন, তেমনি অন্যদিকে বলেছেন বিচ্ছেদের কথাও। এক কথায় তাঁর জার্নিপথ হয়ে ওঠে তার অক্ষরগুলো। সেখানে প্রেমিক কবি কখনও রাগি যুবক, কখনোবা দাদার মতো পাশে এসে নিয়ে যায় কবিতা-গ্যালাক্সির কাছে। তাই সৌভিক তাঁর দীর্ঘ বিবর্তনমূলক ভ্রমণপথ একজন সৎ কবি হিসেবে এঁকে চলেছেন, সৌন্দর্য্যকে।  আমাদের মনে ভিতর যার সুখস্মৃতি বেজে ওঠে…আজীবন…।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

কবিতা কেনো লিখলে? মানে অন্য কিছু তো লিখতে পারতে…কবিতা তোমাকে কেনো টানলো?

এই প্রশ্নের জবাবটা অত সহজে দেওয়া যাবে না বোধহয়! আমি কবিতা লিখতে এসেছি অনেক পরে, মানে আমার যারা সমবয়সি কবি, যেমন- বিনায়ক, অংশুমান, শ্রীজাত- এরা অন্তত আমার ১৫ বছর আগে থেকে লিখছে, মানে ওদের কবিতা আমরা পড়ছি। সেখানে আমি লিখতে এসেছি শূন্যদশকের মাঝা-মাঝি বা শেষের দিক থেকে। আমার প্রথম বই বেরোয় ২০০৯ সালে। কেনই বা কবিতা লিখতে এলাম? একটা সময় আসলে এসেছিলো , যখন মাথায় জমে ওঠা কথা, চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কারও কাছে পৌছতে পারছিলাম না, মানে কমিউনিকেট করতে পারছিলাম না, তাই ভাবলাম লিখে প্রকাশ করি।

অনেক ছোট থেকেই আমি কবিতার প্রতি অনুরক্ত ছিলাম, সুতরাং মনে মনে কবিতা লেখার প্রস্তুতি হয়তো ছিলোই….অন্য কিছু তো লেখাই যেতো, লিখেওছি এদিক-ওদিক ছোট গল্প আর গদ্য। কিন্তু কবিতা লেখার পেছনে একটা অদ্ভুদ তাগিদ কাজ করে, একটা রহস্যময় ইঙ্গিত যেনো কোথাও থেকে আসে কবিতার বেলায়, কবিতাই লিখতে হবে। তাছাড়া কথ কথায় বেশি বলতে পারার লোভ তো থাকেই! কয়েকটি পঙতির মাধ্যমে যদি একটি ব্যাপ্তিময়তাকে ছুয়ে ফেলা যায় তাহলে তো আর পাতার পর পাতা লিখে যেত হয় না।

এটা কিছুটা হলেও আমার মনে-ই হয় কবিদের কাছে একটা সুপ্ত স্যাটিসফ্যাকশন, ক্রিয়েটিভ অহংকারের জায়গা। আমার সময়ও কম, কর্মসূত্রে ব্যস্ত থাকি, গদ্য লেখার তেমন সময়ই নেই। আর গদ্য লেখা ব্যাপারটায় সত্যি বলতে কি কুড়েমিও আসে আমার। তবে একটা কথা – আমি বিশ্বাস করি কবিতা ব্যাপারটা সবার জন্য নয়, মানে অনেকেই ঝরঝরে ভাষায়, ওয়েল-রিসার্চড গদ্য, গল্প বা উপন্যাস লিখতে পারেন, কিন্তু ভেতরে কবিতা না থাকলে কিছুতেই কবিতা লেখা যায় না। ওই যে বলা হয় না যে, ‘Poetry is the highest form of Art’,  এটা আমি বিশ্বাস করি। তাই যারা কবিতা লেখেন না, কিন্তু লেখক, তারা মনে মনে কবিদের ঠিক যেনো মনে হয় পছন্দ করেন না!

এই সময়ের কবিতা সমন্ধে তোমার কি ধারণা? ‘পুনরাধুনিক’ সমন্ধে তোমার কি ভাবনা?

আমি আগেই বললাম যে, আমি যদিও লিখতে এসেছি শূন্য দশকে, কিন্তু আমার হওয়ার কথা ছিলো ৯০-র দশকের কবিতা লেখক। তাই আমার কবিতা নব্বই থেকে আজ ২০১৫ অবধি বিস্তৃত। মানে আমার কবিতা দু-নৌকায় পা দিয়ে চলা লোক! বিশ্বায়ন পরবর্তী ভারতবর্ষ-কলকাতা, আর আজকের শপিং মল আক্রান্ত কলকাতা , আমার কবিতায় সবাই ধরা পরে। এটাই স্বাভাবিক, কারণ আমি যে সময়টায় বড়ো হয়ে উঠে আজ এই বয়সটায় পৌছলাম, তারমধ্যে দেশে বিদেশে ঘটে গেছে টেকনোলজির বিস্ফোরণ- এই সমস্ত কিছু নিয়েই আমার কবিতার সময়। তবে এটা আমার কথা।

আজকে যারা লিখছে, মানে ধর তোরা, যারা আমার থেকে বছর দশেক ছোট- যারা বড়োই হয়েছে শূন্য দশকে, প্রেম করার প্রথম দিন থেকেই ব্যবহার করছে মোবাইল, ছোটবেলায় তেমন ঘুড়ি উড়ায় নি, নিউ এম্পায়ারের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেনি কারও জন্যে সেভাবে, তাদের কবিতায় আমার মনে হয়, টানাপড়েন-ভাঙচূর একটু কম এবং এটাই ন্যাচারাল। তবে কবিতা তো অনেক রকম, দুনিয়া ও সমাজ বদলের প্রতিফলন যে কবিতায় পড়তেই হবে তার কোনো মানে নেই। তবে চারপাশে যা কিছু ঘটছে তার একটা প্রভাব তো মনে হয় পড়বেই। এই সময়ের কবিতা , এবং আমিও এই সময়েই লিখছি- আমার মনে হয় খুব হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, ক্ষোভের কথা বলছে বিভিন্নভাবে। দুনিয়া এবং দেশে আয়ের ব্যবধান, প্রযুক্তির সুফলের ব্যবধান বাড়ছে।

বিশ্বায়ন তো এখনও সমান অধিকার-র এক হাজার মাইল অবধি মানুষকে পৌছে দিতে পারে নি, আর পারবেও না। হানা-হানি, অপরাধ, ফ্রাস্টেশন, ধর্মীয় মৌলবাদ মানুষকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাচ্ছে। এই যন্ত্রণার দিনলিপিই হচ্ছে বর্তমান সময়ের কবিতা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে ফুল-মেঘ-পাখি নিয়ে তো আর লেখা যাবে না।  আর আমার মনে হয় এই সময়ের কবিতা বেশ কম কথা বলে। আশি বা নব্বয়ের কবিতার যে কিছুটা হলেও হাই ভোল্টেজ ইমোশন, সেটা এই সময়ের কবিতায় তেমন নেই, এবং সেটা ভালো, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আরও চুপচাপ হয়ে যায়। কম কথায় নিজের অন্তর্লীন চিন্তা-ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দিতে চায়। বাংলা কবিতাও এটা দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে অনেক চুপচাপ, স্তিতধী হয়েছে, প্রতিবাদ রয়েছে, তীর্য কথা রয়েছে, সঙ্গে একটা ‘কি এসে যায়’ ভাব ও এসে গিয়েছে।

এই নির্লিপ্ততা জমে থাকা রাগ-অভিমান থেকে আসতে পারে, সমাজ বদলের ভেঙ্গে পড়া মানুষের স্বপ্ন থেকে, মানুষের প্রতি বাড়তে থাকা অবিশ্বাস থেকে আসতে পারে। আবার এই নির্লিপ্ততা ঝড়ের পূর্বাভাসও হতে পারে। হয়তো বাংলা কবিতায় অদূর ভবিষ্যতে একটা ঝড় আসতে চলেছে, সব স্টাকচার একদম ভেঙ্গে-গুড়িয়ে দেবার মতো একটা ঝড়, আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। আর একটা ব্যাপার, এই সময়ের কবিতায় ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে, বা অন্তমিল গুঁজে গুঁজে লেখার প্রবণতা কমেছে, এটা খুব ভালো ব্যাপার। কবিতার নিজস্ব একটা অন্তরীণ ছন্দ থাকে, সেটাই যথেষ্ঠ। সারা পৃথিবীতে আর ছন্দের খাঁচার মধ্যে বেঁধে রেখে কবিতা লেখা হয় না। সেটার প্রয়োজনও নেই। আল্টিমেটলি ব্যাপারটা কবিতা হতে হবে।

‘পূনরাধুনিক’ ব্যাপারটা ঠিক কি জিনিস, আমি জানি না। মানে পোস্ট-মর্ডানিজম বাংলা কবিতায় যদি ধরে নেই , কিছুটা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ পত্রিকা এবং বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার হাত ধরে এসেছিলো, তাহলে পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় বাংলা কবিতার সব ধারণা এবং স্ট্রাকচার-কে ভেঙ্গে দিয়ে এক নতুন কবিতা পথের সন্ধান দিয়েছিলো ‘কৃত্তিবাস’। তার পরেও এসেছে ‘কৌরব’-র মতো ছকভাঙ্গা, কাল্ট পত্রিকা। তারপর বহমান বাংলা কবিতার ধারায় কবিতার ভাষা নিজেকে পাল্টে নিয়েছে, এখনও নিচ্ছে এবং নিবে। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?

চারপাশের ভাঙচূর সাহিত্যকে প্রভাবিত করে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে যদি কেই ষাটের ভাষায় কবিতা লেখেন, সেটা একধরণের বোকামী, তাহলে তিনি নিজেকে এবয় পাঠককে ঠকাচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে কবিতা যে পাল্টাচ্ছে এবং পাল্টাবে, এই পাল্টানোর প্রসেস-টাকে কোনো দশকের গ-ি বা কোনো নামকরণ দিয়ে ধরাটা আমার একটা এজেন্ডা মনে-ই হয়। এটার কোনো প্রয়োজন নেই। এই সময়ের কবিতা, এই সময়ের কবিতা, ব্যস। আর পূনরাধুনিক মানে যদি পূনরায়আধুনিক হয়ে থাকে, তাহলে কি আমার ত্রিশের দশকের বাংলা কবিতায় ফিরে যাবার কথা বলছি? বুদ্ধদেব বসুর পূর্ববর্তী সময়ের কবিতায়! জানি না। রঙ্গিত মিত্র যদি ২০২০ সালে তার নিজের কবিতাকে নাম দিয়ে দেয় ‘অত্যাধুনিক’ তাহলে সে সময়ের কবিতাকে  কি ঠিক ভাবে ধরা যাবে? আমার মনে হয় ২০১৫ এর কবিতা, ২০১৫-র কবিতা, ২০২৫ এর কবিতা ২০২৫-র কবিতা। ব্যস।

চারপাশের খবর..যেমন রাজনীতি, অর্থনীতি তোমাকে কিভাবে ভাবায়? আর তোমার কাছে কবিতার বিষয় কি?

কবিতার কোনো বিষয় নেই আমার কাছে, আবার বিষয় আছে। চারপাশে চা দেখছি, তারপ্রতিফলন তো কবিতাতে ঘটবেই। তবে কবিতা তো আর রিপোর্টেজ নয় যে, আজকে খবরের কাগজে যা হেডলাইন দেখলাম-তাই নিয়েই লিখে ফেললাম। আমি যখন লিখতে বসি তখন কোনো বিষয় মাথায় থাকে না। তবে হ্যাঁ, অর্থনীতির ছাত্র ও অর্থনীতি নিয়ে কাজ করবার সুবাদে আমার কবিতায় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি আসেই। বিশ্বায়ন, নাগরিক যন্ত্রণা, অস্থিরতা, বিষণœতা-আসে। স্মৃতিকাতরতা খুব বেশি আসে। ইদানিংকালে মৃত্যুপরবর্তী চিন্তা-ভাবনা আসে বেশি করে।

কবিতার রাজনীতি ও ভাষারূপ নিয়ে তোমার কি চিন্তাভাবনা?

কবিতার রাজনীতি ছিলো , আছে এবং থাকবে। কারণ কবিতা বিভিন্ন ধরণের, কবিরা বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের, পাঠক নানান স্বাদের, এতো বহুমুখিতা থাকলে তাতে রাজনীতি তো থাকবেই। তবে মতবাদ, ভালো লাগা-না লাগা থাকুক, সঙ্গে কবিতার ডেমোওক্রসিটাও তো রাখতে হবে, নইলে সামগ্রিকভাবে বাংলা কবিতা-ই পিছিয়ে পড়বে। আমার মনে হয় এখন ইন্টারনেটের যুগে সামগ্রিকভাবে কবিতার রাজনীতি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। এক যায়গায় ছাপা না হলে আরেক যায়গায় ছাপা হবেই। তাও না হলে বিভিন্ন সোসাল মিডিয়ায় দেওয়া যায়, অনেক মানুষ পড়েও। আর ভালো কবিতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবেই, কেউ আটকাতে পারবে না। তাছাড়া ডিজিটাল রেভুলেশনের কারণে শহর-গ্রামের ব্যবধান আর নেই, শহুরের কবিদের সঙ্গে গ্রামের কবিদের মধ্যে আদান-প্রদান অনেক বেড়েছে। তাছাড়া এখন তো কলকাতার বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলো যতটা না বাছচিয়ে রেখেছে তার চেয়ে অনেক বেশি বাঁচিয়ে রেখেছে মফস্বলের পত্রিকাগুলো।

আর কবিতার ভাষারূপ….বিভিন্ন কবির কবিতার ভাষা আলাদা। ব্যক্তিগতভাবে আমি, কিছুটা ছক ভাঙ্গা, অ্যান্টি পোয়েটট্রি, তির্যকতা ও ব্লাক হিউমার পছন্দ করি।

কবিতা লিখতে গেলে নেশা, যৌনতা করতে হবে?

এটা নিয়ে আমার তেমন বক্তব্য বা ভ্যালু জাজমেন্ট নেই। প্রথম কথা , না, কবিতা লেখার জন্য এগুলোর দরকার নেই। তবে নেশা বা যৌনতা কোনো কবি করবেন কিনা-বা করলে তিনি ভালো কবিতা লিখতে পারবেন বা পারছেন কিনা- এটা একদমই ব্যক্তিগত পছন্দ ও সিদ্ধান্ত। তবে হ্যাঁ, নেশা বা যৌনতা – একটি বোহেমিয়ান বা লারজার দেন লাইফের ইমেজ ক্রিয়েট করে, কোনো কবি যদি এই ইমেজ তার কবিতায় নিয়ে আসতে চান, তবে তিনি তা করতেই পারেন। তবে যাই করুন না ক্যানো একজন কবির হাতে কবিতাটা থাকতে হবে। মদ খেলেই যদি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা ঋত্বিক ঘটক হওয়া যেতো-তাহলে পাড়ার মাতালটা সবচেয়ে বড়ো শিল্পী হতো।

ছন্দ, আবেগ, রোমান্টিকতা, অলঙ্কার ইত্যাদির কি প্রয়োজনীয়তা?

ব্যক্তিগতভাবে আমার ছন্দ আর ভালো লাগে না কবিতায়। আমি বরং অলঙ্কারহীন কবিতার নগ্ন সৌন্দর্য্যকেই বেশি ভালোবাসি। আবেগ আর রোমান্টিকতা তো থাকবেই। কবিতায় যে আবেগ থাকে আমার মনে হয় হৃদয় এবং মস্তিস্কের যৌথ সন্তান।

তোমার কবিতা লেখার দর্শন কি?

বলতে গেলে তেমন দর্শন নাই। মানে আমি আর বিশ্বাস করি না যে কবিতা লিখে সমাজ পাল্টে দেওয়া যাবে। বরং ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ ব্যাপারটাই ঠিক মনে হয়।  নিজের বক্তব্য, বিশ্বাস ও স্বপ্নকে আর সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই কবিতা লিখি। কেউ কেউ আমার মতো ভাবছেন বুঝলে, আনন্দ পাই। লেখার ৫০-১০০ বছর পরে একটা কবিতা কোথায় যায়? কালোতীর্ণ হলে হয়তো লোকমুখে বা সংকলনের পাতায় স্থান পায়, কিন্তু সেটা হয়েই বা কি হয়? এর উত্তর আমার জানা নেই।

কবিতা ছাড়া, শিল্পের অন্য যে মাধ্যম আছে যেমন নাটক সিনেমা প্রভৃতি, এদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?

আমার মনে হয় এই সময়ে পারফর্মিং আর্টস বা ভিজুয়াল আর্টসের গুরুত্ব অনেক বেশি, সবসময়েই বেশি ছিলো অবশ্য। কবিতা দিয়ে একটি সমাজের মানুষের চিন্তাধারা-ভাবনায় নাড়া দেওয়াটা বেশ শক্ত, সেই তুলনায় নাটক বা সিনেমার এই ক্ষমতাটা অনেক বেশি। বাংলায় এখন বেশ ভালো সিনেমা বা নাটক হচ্ছে। আমার বন্ধু সৃজিত মুখোপাধ্যায়, তার মেধাবী নির্মাণে বাংলা ছবির দর্শকদের ফিরিয়ে এনেছে। আসলে এমন ছবি করতে হবে যা আমাদের ভাবায়, নিজেদের সঙ্গে কথা বলায় , কিছুটা হলেও একটা পথ দেখায়। তবে এখন চলচ্চিত্রে এন্টারটেইনমেন্টের যত রকম যোগান, তাতে শিল্পবোধসম্পন্ন চলচ্চিত্রগুলোর লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে।

তবে একটা ব্যাপারে আমার আফসোস আছে- বাংলা কবিতার লোকজনদের সাথে সিনেমা বা নাটকের লোকজনদের আদান-প্রদান বিশেষ নাই। তবে এই সময়ে দাঁড়িয়ে একজন কবি কি ভাবছেন বা অন্য মাধ্যমের শিল্পীরা কি ভাবছেন তার আদান-প্রদান হওয়াটা শিল্পের জন্য খুবই জরুরী। কারণ সামগ্রিক এক সমাজচেতনা বা শিল্পভাবনা থেকেই উঠে আসে পৃথিবীর কিংবা একটা দেশের শিল্পের গতিপথ।

কবিতার আন্দোলন ব্যাপারটা সম্বন্ধে তুমি কি মনে করো?

শুধু কবিতার না, প্রতিটা আন্দোলনই শুরু হয়-একটা সমবেত বিশ্বাস , ধ্যান-ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এবং কালের নিয়মে, সময় এবং সমাজের বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটা আন্দোলনই ধীরে ধীরে ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে কবিতার আন্দোলনগুলো বাংলা কবিতাকে যে টানাপড়েন, ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেছে, তা খুব জরুরী ছিলো। আজকের বাংলা কবিতার আঙ্গিক এবং ভাষা উঠে এসেছে বিভিন্ন দশকের বিভিন্ন কবিতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এমনকি সারা পৃথিবীর কোনো কবিতা আন্দোলর্নে ভূমিকার কথাই অস্বীকার করা যায় না।

কবিতা লিখতে গেলে কি খুব শিক্ষিত হতে হয় ? পঠন-পাঠন প্রসেস কি করে প্রভাবিত করে লেখাকে?

শিক্ষা, শিক্ষিত- এগুলো আপেক্ষিক খুব। প্রথাগতভাবে তেমন শিক্ষিত নন, কিন্তু অসাধারণ, কালজয়ী কবি – এমন অনেক উদাহরণ আছে। আসলে কবি হওয়াটা বোধহয় কোনো ডিগ্রি বা প্রথাগত শিক্ষার ওপর নির্ভর করে না। ভেতরে কবিতা থাকলে হয়, নইলে হয় না। এর মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। কাউকে ছোট করার জন্য বলছি না, যদি বেশি বড়ো ডিগ্রি থাকলেই কবি হওয়া যেতো, তাহলে সাহিত্যে পিএইচডি ধারী অধ্যাপকেরা সবচেয়ে বড়ো কবি হয়ে যেতেন!

তবে হ্যাঁ, আমি এটা মানি যে- শিক্ষা, পড়াশোনা মানুষের জীববোধকে আরো উন্নত করে তুলতে পারে, সেই আলো থেকে জন্ম নিতে পারে উত্তীর্ণ কবিতা।

কবিতার জন্য পাঠক কতটা জরুরী? কতটা দরকার প্রচার এবং ফেসবুকের?

পাঠক-ই তো ঈশ্বর। পাঠক ছাড়া কবিতার কি হবে? আর কবিতার পাঠক ধীরে ধীরে বাড়ছে বলেই আমার ধারণা, নইলে প্রতিদিন এতো নতুন নতুন কবিতার পত্রিকা বেরুতো না। তাছাড়া পাঠক বৃদ্ধিতে কবি ও প্রকাশকদের আরও একটু সচেতন হতে হবে।

এক্ষত্রে আমার মনে হয় ইন্টারনেট একটা বিরাট ভূমিকা পালন করছে। বাংলা কবিতার প্রচার ও প্রচারে ফেসবুকের যে ভূমিকা এখনও অবধি তা অভাবনীয়। এছাড়া বিভিন্ন অনলাইন ম্যাগাজিনগুলো বাংলা কবিতাকে পৌছে দিচ্ছে সারাবিশ্বের বাংলা ভাষাভাষিদের কাছে।

পাঠক তো তখনই তৈরি হবে-যখন কবিতা কয়েকজন বোদ্ধার আলোচনার বিষয়বস্তু না হয়ে থেকে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা হবে। আমার কবিতা ভালো লাগে কিনা, আমি কবিতার পাঠক হয়ে উঠতে পাবো কিনা, তা বোঝার জন্য তো আগে আমাকে কবিতার কাছাকাছি যেতে হবে।

আর এ কাজটি করতে পারেন কবিরা আর প্রকাশকরা। আর এজন্য ফেসবুক ও অনলাইন ম্যাগাজিনগুলো খুবই জরুরী।

আর ইন্টারনেটের কারণে আজ কবিতা ভৌগলিক সীমারেখাকে অতিক্রম করতে পেরেছে। আমার মনে হয়, হয়তো একদিন আসবে যেদিন কবিতা ছাপার অক্ষরে আর দেখা যাবে না, ইন্টারনেটে ভেসে বেড়াবে। আর সেটা ভালো হবে নাকি খারাপ হবে তা এই মূহুর্তে ঠিক বলা যাবে না।

এই যে গেলো গেলো রব শুনতে পাচ্ছি । কেউ নাকি বাংলা বই পড়ছে না, অনেকে আবার বলছে বাংলা ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তোমার কি ভাবনা?

বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে না একটিই কারণে – বাংলাদেশ!

তবে একথা সত্যি এবং লজ্জার যে, ভারবর্ষে বা পশ্চিমবঙ্গে, বলা ভালো কলকাতায় অনেকেই আজ আর বাংলা বই পড়েন না। মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত বাড়ির যে ছেলেটি ইংরেজি স্কুলে পড়ে, সে কি বাড়িতে শরবিন্দু-বিভূতিভূষণ পড়ে বড়ো হয়ে উঠছে, নাকি শুধুই ইংরেজি বই পড়ছে। মা-বাবাদের দায়িত্ব ছেলে-মেয়েদের বাংলা বই পড়ানোর, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সম্বন্ধে একটা ধ্যান-ধারণা গড়ে দেওয়া। নইলে আর থাকলো কি?

গ্লোবাল সিটিজেন  হবার মানে এই নয় যে, নিজের শিকড় ভুরে যেতে হবে। মাতৃভাষাকে অস্বীকার করা মানে তো নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। বাংলা বলতে বা পড়তে না পারা কখনই গর্বের বিষয় হতে পারে না, সেটা আজকের দক্ষিণ কলকাতার মা-বাবাদের বুঝতে হবে।

বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিকতা নিয়ে কি ভাবো এবং তার সাথে বাংলা কবির আন্তর্জাতিকতা সম্বন্ধে তোমার চিন্তা ভাবনা কি?

বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিকত শুরু হয়েছিলো যদি বলি সুনিল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পরে, খুব কি ভুল বলা হবে? জানি না। আমার তো তাই মনে হয়। আন্তর্জাতিক কবিতার সমস্ত উপকরণ-হাওয়া নিয়ে এসে সুনিল পড়েছিলেন বাংলা কবিতার বুকে। সেখান থেকেই শুরু বোধহয়। আজকের অনেক বাঙালী কবি-ই দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ান, তাদের ভ্রমণ ও যাপনের নানা উপাদান বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিকতাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে বলেই আমার মনে হয়।

আর বাঙালী কবি বা সাহিত্যিকের আন্তর্জাতিকতা? রবীন্দ্রনাথের মতো আন্তর্জাতিক বাঙালী কবি আর কেই বা আছেন? উনি-ই পথপ্রদর্শক।

জাপান থেকে আর্জেন্টিনা- বিমান পরিষেবাহীন এক পৃথিবীতে উনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অতিমানবের মতো ভেসে বেড়িয়েছেন।

অ্যাবস্ট্রাক্ট আর অ্যাবসার্ড নিয়ে কি ভাবো?

আপেক্ষিক ব্যাপার।  একজনের কাছে যা অ্যাবসার্ড, অন্যজনের কাছে তাই অ্যাবস্ট্রাক্ট মনে হতে পারে। মানে মৃত্যুর পরে কি হবে, কোথায় যায়? এই ব্যপারটাই ধরো। যারা বিশ্বাস করেন মৃত্যুর পরে কিছুই থাকে না, তারা মৃত্যুর পরের ধারণাকে অ্যাবসার্ড বলেন। আর যারা মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস করেন, এই অ্যাবসার্ডিটির মধ্যে কোথাও কোনো একটা ছায়া, একটা সঙ্কেত অনুভব করতে পারেন, যা দৃশ্যমান নয়-তাকেই কোথাও একটা কোনোভাবে ছুতে পারেস, তারা হয়তো বলবেন ‘মৃত্যুপরবর্তী জীবন’ অ্যাবসার্ড নয়, একটা ভাষা ভাষা অ্যাবস্ট্রাক্ট বিষয়। আমার মনে হয় অ্যাবসার্ডকে অ্যাবস্ট্রাক্ট করে নিতে পারার ক্ষমতাটা একজন প্রকৃত কবির থাকে।

স্বপ্ন দেখো? যদি দেখো , তাহলে কি দেখো?

হ্যাঁ এবং না। ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণের ব্যাপারটা ধীরে ধীরে প্রাধান্য হারাচ্ছে কিছুটা হলেও। আর দিন বদলের স্বপ্ন দেখে খুব একটা কিছু যে হবে না বা লাভ নেই তা বুঝাই গেছে! তবু এখনও স্বপ্ন কিছু আছে – যেমন লম্বা একটা বিশ্ব ভ্রমণের-আর এটা করে ফেলতেই হবে।

আরও পড়ুন :  রঙ্গীত মিত্রের কবিতা।

* আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন parthibrashed@ymail.com এ।

Facebook Comments
share on:
রঙ্গীত মিত্র

রঙ্গীত মিত্র

রঙ্গিত মিত্র কলকাতার একজন জনপ্রিয় কবি। রঙ্গীত মিত্রের কবিতায় যুগপৎ নানান বিপন্নতা, বিদ্রূপ প্রতিবাদ ইত্যাদির সৃষ্টিশীল চলমানতা দেখতে পাওয়া যায়।