সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

share on:
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারটি তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তার অনেকগুলো সাক্ষাৎকার থেকে।

এই উপমহাদেশে যে ক’জন অভিনেতা মেধায় আর সাবলীলতায় অভিনয়কে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায় তাদের মধ্যে অন্যতম একজন চির তরুণ নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কবি ও নাট্যকার দ্বীজেন্দ্রলাল রায়ের শহর নদীয়ার কৃষ্ণনগরে তার জন্ম। ১৫ই নভেম্বর, ২০২০ তারিখে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন।

পাঁচটা প্রজন্মের পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন আপনি…

এ ভাবে তো ভেবে দেখিনি কখনও… কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ঠিকই বলছ। সত্যজিৎ রায় থেকে তপন সিংহ, এখন সুজয় ঘোষ…

পাঁচ প্রজন্মের যে পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তাঁদের এক এক জনের ধরন ছিল এক এক রকম। কী ভাবে তাঁদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন? 

প্রাথমিক স্তরে তেমন তফাত নেই। যাঁরা নিজেদের কাজ নিয়ে খুব সিরিয়াস, তাঁরা খুব ফোকাসড্। কিন্তু তাঁদের কাজের ভাষাটা আলাদা। তাই অভিনেতাদের তাঁরা একেক রকম ভাবে ট্রিট করেন। পরিচালক তপন সিংহের কথা যেমন মনে পড়ছে। উনি যখন কোনও নির্দেশ দিতেন, সেটা অভিনেতাদের অনুভূতিকে মাথায় রেখেই দিতেন। খেয়াল রাখতেন অভিনেতারা যেন বিরক্ত না হন। এখনকার পরিচালকেরা অভিনেতাদের বন্ধু হয়ে যান।

একদম ঠিক। কখনও কখনও তাঁরা আপনাকে সম্ভ্রম করলেও, বন্ধুত্বটা কিন্তু থেকেই যায়।

আমার কখনও কখনও মনে হয় ওরা একটু ভয়ও পায়। সে জন্যই আমি কাজের শুরুতেই পরিচালকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিই। সেটা না করলে আমিই অস্বস্তিতে পড়ে যাই। এতে কাজ শেষ হলেও বন্ধুত্বটা থেকেই যায়।

আপনার কি মনে হয় বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ ভাল কাজ বের করে আনতে পারে?

একে অপরকে প্রশংসা করাটা ভাল কাজের জন্য খুব দরকারি। ৫৫ বছরের কেরিয়ারে আমি তিনশোরও বেশি ছবি করেছি। মাত্র একবারই এক পরিচালক আমার কাজের প্রশংসা করেননি। খুব খারাপ লেগেছিল আমার। সেই ছবিটার কথা আজও ভুলতে পারিনি। আমিও পরিচালকদের ভাল দিকগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনদের সঙ্গে কাজ যে করেছি এই ভাবমূর্তিটা আমি কখনওই জাহির করি না। একজন পেশাদার অভিনেতার সব পরিচালকের সঙ্গেই সমান স্বচ্ছন্দ হওয়া উচিত।

 

এটা তো অবিশ্বাস্য! আপনি তো সে অর্থে এমন অনেক পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তা সত্ত্বেও আপনি চেষ্টা করেন তাঁদের সেরাটা খুঁজে নিতে।

এটা না করলে আমি টানা এত দিন ধরে কাজ করতে পারতাম না। একজন পেশাদার অভিনেতাকে খারাপ ছবিতেও অভিনয় করতে হয়।

সত্যিই সেটা অসাধারণ সৌমিত্রদা। ক্ষমা করবেন এটা বলার জন্য, কিন্তু এখন এমন অনেক অভিনেতার সঙ্গে আমরা কাজ করি যাঁরা মনে করেন তাঁদের জ্ঞান পরিচালকদের থেকে অনেক বেশি। অনেক নতুন অভিনেতা। কিন্তু তাঁদের কী ব্যাগেজ। আমার ধারণা কাজ করতে গেলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাটা খুব জরুরি। সত্যি এটা দারুণ বলেছেন! অভিনেতাদের এর থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা ছাড়া সিনেমা কখনও এত এক্সাইটিং হত না। একটা ছবি ঠিক যেন একটা জাহাজের মতো। আর পরিচালক হল সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন। অভিনেতারা হল অসাধারণ সব নাবিক।

৬২ বছর ধরে অভিনয় করছেন আপনি…

হ্যাঁ। আমি ১৯৫৮-তে প্রথম অভিনয় করি।

 উফ্, ভাবা যায় না। এখনও এত অনুপ্রেরণা কোথায় পান?

আমি একজন পেশাদার অভিনেতা আর সারাজীবন তা-ই হতে চেয়েছি। বাংলা থিয়েটারের কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ির সংস্পর্শে আসাটা আমার জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। তারপর জীবনে প্রথম সিনেমার ডাক পাই স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে। পরবর্তীতে এই সম্পর্কগুলো আমার খুব কাজে আসে। ক্যারিয়ারে সত্যজিৎ রায়ের অবদান আজীবন স্বীকার করে যাব। আর আসলে আমি খুব খুঁতখুঁতে। কিছুতেই সন্তুষ্ট হই না।

সত্যি? এই অতৃপ্তির কারণেই কি এত দিন চালিয়ে যাচ্ছেন?

হ্যাঁ অবশ্যই। এই অতৃপ্তি থেকেই যায়। আজও রাতে বাড়ি ফিরে ভাবি সারাদিন কী করলাম? ভাবি এই জায়গাটায় ভুল করেছি, বা আমার ওই ভাবে তাকানোটা ঠিক হয়নি।

 কী আশ্চর্য! এখনও রাতে ফিরে আপনি আপনার অভিনয়ের দৃশ্যের কথা ভাবেন?

কখনও মনে হয় এটাই ঠিক আছে। ইন্ডাস্ট্রি থেকে যতই পাই না কেন আমি কখনওই আমার জায়গা আঁকড়ে বসে থাকি না। ওটা করে আমি মোটেই পরিতৃপ্ত নই। অভিনেতা হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব থেকেই যায়। আমাকে কাজ করে যেতেই হবে। থেমে থাকলে চলবে না। ভাবনা থামিয়ে দিলে চলবে না। কাজ নিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা করে যেতে হবে। তবে যদি বলা হয় তিরিশ বছর আগে করা কোনও ছবিকে কি এখন করলে আরও ভাল করব আমার উত্তর হবে ‘না’।

এটাই আমার থিয়োরেটিক্যাল প্রোপোজিশন। তিরিশ বছর আগে আমার সমস্ত সত্তা দিয়েই আমি সেই ছবিতে অভিনয় করেছি। সেই সত্তাটা আমি আবার ফিরিয়ে আনতে পারব না। টেকনিক্যালি হয়তো তখন আরও ভাল অভিনয় করতে পারতাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার অভিনয় আরও পরিণত হয়েছে। তবু মনে হয়, আবার ‘অপুর সংসার’য়ে অভিনয় করতে পারব না।

এত অতৃপ্তির মধ্যেও কাজের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও যা করেছেন, তা নিয়ে সন্তুষ্টি রয়েছে।

ঠিক তৃপ্তি নয়। নিজের একটা অ্যাসেসমেন্ট। তিরিশ বছর আগে যা করেছি, আমার সেই সত্তাটা সেখানেই রয়েছে… আমি জীবন নিয়ে কী ভেবেছি, জীবনকে কী ভাবে দেখেছি, সেই সব অনুভূতিই আমার কাজের মধ্যে আছে। তোমার পাঁচ বছর আগের কোনও ছবি যদি দেখো, দেখবে তুমি তোমার এখনকার অভিজ্ঞতা আর পরিণত মন নিয়ে অভিনয় ক্ষমতাকে আরও ভাল কাজে লাগাতে পারতে। কিন্তু ওই ছবিটা করার সময় যে আবেগ তোমার ভেতর ছিল, সেটা কিন্তু আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

ইন্টারেস্টিং। এত বছরের অভিজ্ঞতার পরেও আপনি এ কথা বলছেন। অভিনেতারা এটা পড়ে স্বস্তি পাবেন। আমরা যে রিক্রিয়েট করতে পারি না তা জেনেও ভাল কাজ করার খিদেটা আমাদের মধ্যে সমান ভাবে রাখা যায়…

হ্যাঁ, খিদেটা থেকেই যায়। আমি মনে করি কোনও ব্যক্তি যদি সংস্কৃতি মনস্ক না হন, তা হলে তিনি নিজে থেকে কোনও সংস্কৃতি তৈরি করতে পারেন না।

মন খারাপ হলে কি নিজের পুরনো কোনও ছবি দেখেন?

সৌমিত্র: ‘চারুলতা’। ‘অশনি সংকেত’। শুধু মাত্র ‘অশনি সংকেত’য়ের ‘র’নেস-এর জন্যই দেখব। আসলে যে অঞ্চলকে ঘিরে ওই ছবির গল্পটা তৈরি হয়েছে, আমি সেই অঞ্চলের লোক। আমি দেখেছি মানিকদা কী চমৎকার ভাবে একইসঙ্গে মানুষের অসহায়তা, প্রেম দু’টোই দেখিয়েছেন।  তপন সিংহের শর্ট ফিল্ম ‘আদমি অউর অওরত’ বা মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’।

 আচ্ছা সৌমিত্রদা এমন কোনও চরিত্র আছে, যেটা করতে আলাদা করে নিজেকে তৈরি করতে হয়েছিল?

কখনও কখনও হয় যখন চরিত্রের প্রেক্ষাপট জানতে হয়, চরিত্র নিয়ে ভাবতে হয়। তবে সিনেমার থেকেও মঞ্চে অভিনয় করতে আমি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ পাই। যেমন কিছু বছর আগে কলকাতায় ‘কিং লিয়ার’য়ে অভিনয় করেছিলাম। খুব সফল হয়েছিল সেটা। দারুণ চ্যালেঞ্জিং। প্রত্যেকটা দৃশ্যেই আমাকে প্রয়োজন ছিল। ক্লান্তি আসাটাই স্বাভাবিক। এই বয়সে লম্ফঝম্প করে সিঁড়ি চড়া, মঞ্চজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো মোটেই সহজ নয়। ভয় ছিল যাতে আহত না হই। কিন্তু সত্যিকারের চ্যালেঞ্জটা ছিল মনের। মানুষের মন বোঝা। সেটাও তো কম ব্যাপার নয়। ওটা ছিল আমার প্রথম কোনও শেক্সপিয়রের নাটকে অভিনয়। হয়তো ওটাই আমার শেষ শেক্সপিয়র অভিনয়।

আমি নিশ্চিত, ওটাই আপনার শেক্সপিয়রের শেষ অভিনয় হবে না। এবং মঞ্চে আপনি শেক্সপিয়র নিয়ে আরও অভিনয় করবেন।

শুরুর দিকে ‘হ্যামলেট’ করার ইচ্ছে ছিল। অনেক কাজও করেছিলাম কাজটি নিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরিত্রটিকে নিয়ে মঞ্চে আসা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। আর এভাবেই একদিন উপলব্ধি করলাম যে, এই বয়সে ‘হ্যামলেট’ চরিত্রে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। খারাপ লেগেছিল খুব, শুধু মনে হচ্ছিল ‘আমি কি আর কখনো শেক্সপিয়ার নিয়ে মঞ্চে কাজ করতে পারবোনা?’ আর তখনই ‘কিং লেয়ার’ চরিত্রটি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই।

কোনও দিন যদি খুব কঠিন কোনও দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়, তখন কি নির্দিষ্ট কোনও রুটিন মেনে চলেন?

না, সে রকম কিছু নয়। আমি শরীরচর্চাটা কখনও বাদ দিই না। তুমি একজন অভিনেতা। তাই এটা তো মানবেই যে অভিনয় করতে গেলে প্রচুর এনার্জি দরকার। সেটা শরীরচর্চার মাধ্যমেই আসে। এখন অবশ্য অতটা শরীরচর্চা করতে পারি না। তার ছাপও পড়েছে চেহারায়। ছোট্ট একটা ভুঁড়িও হয়েছে।

আপনি কি কোনও ডায়েট মেনে চলেন?

এখন মেনে চলতে হয়। হার্টের আর অন্যান্য শারীরিক কিছু সমস্যাও দেখা দিয়েছে। যেমন আমার পাঁঠার মাংস খাওয়া উচিত নয়। আমি সেই সব নিরামিষাশিদের কথা ভাবি যাঁরা কখনওই পাঁঠার মাংস খাননি। যাই আমার জন্য ধার্য থাক, তা নিয়েই আমি খুশি।

একইসাথে আপনি একজন কবি, একজন লেখক, ছবি আঁকেন, এক্ষন নামে একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন… এত কিছু করার অনুপ্রেরণা পান কোত্থেকে?

শৈশব থেকেই সৃজনশীল কাজের প্রতি দুর্নিবার এক আকর্ষণ কাজ করত আমার মধ্যে। মোটামুটি সব কাজের কাজী কিন্তু কোনো কিছুতেই ওস্তাদ না- এরকম একটা অবস্থায় ছিলাম। তারপর ভেবে দেখলাম সবদিকে না ছুটে যে কাজগুলো করতে আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি সেদিকেই আরও মনোযোগী হওয়া উচিৎ। কাজেই থিয়েটার আর আবৃত্তি হয়ে দাঁড়াল আমার প্রধান নেশা। বাবা-মা’র কাছ থেকে আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি।

এই সুদীর্ঘ পথচলায় কোনো একটি ঘটনার কথা বলবেন যা আপনার মন ছুঁয়ে গিয়েছিল?

ক্যারিয়ারের পাঁচ দশকে হাজার হাজার দিন-রাত শ্যুটিং করেছি আমি। তবে প্রথমদিন ‘অপুর সংসারের’ সেটে হাজির হওয়ার কথাটা আমি কোনোদিন ভুলব না। দৃশ্যটা ছিল এমন- অপু চাকরির খোঁজে একটা লেবেলিং ফ্যাক্টরির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে ভেতরে সবাই রোবটের মতো কাজ করেই চলেছে। এই কাজ তার দ্বারা হবে না ভেবেই সে নার্ভাস হয়ে পড়ে।

ঋষিকেশ মুখার্জী, দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর… সবাই হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন, কিন্তু আপনি তা সবসময় এড়িয়ে গেছেন। কেন?

আমি জানি না কেন। আজকের দিনে হলে আমি হয়তো ঐ ছবিগুলোতে কাজ করতে মানা করতাম না। তখন বয়স কম ছিল, বুদ্ধি-সুদ্ধি কম ছিল, টাকার দরকারটাও সেভাবে বুঝিনি। সত্যি বলতে, হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বাকিদের কাজ করতে দেখে নিজে কখনো উৎসাহ পাইনি। ওখানে গিয়ে কাজ করলে আমি কবিতা লিখতে পারতাম? মঞ্চে কাজ করতে পারতাম? হ্যাঁ, হিন্দি সিনেমায় কাজ করলে আমার নাম-যশ-খ্যাতি অনেকটাই বেড়ে যেত। কিন্তু আমি তো সত্যজিৎ রায়ের সাথে অসংখ্য কাজ করেছি, আন্তর্জাতিকভাবে সেগুলো স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাকে লোভ দেখানোর আর কী-ই বা থাকতে পারে? পরবর্তীতে আমি টিভি ফিল্মে অভিনয় করেছিলাম, সবাইকে জানানোর জন্য যে আমিও হিন্দি বলতে পারি।

তখনকার আর এখনকার মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?

দুই দশকের মধ্যে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা নকল করে মূলধারার সব বাংলা সিনেমা বানানোর প্রথা চালু হয়ে গেছে। সৌভাগ্যবশত সে দিনগুলো আমরা অনেকটাই পার হয়ে এসেছি, তরুণ নির্মাতারা সুন্দর সিনেমা বানাচ্ছে এখন। কিন্তু বিষয়বস্তুর দুর্বলতার কথা এখানে না বললেই নয়। ছবির ভেতরে এখন আর কোনো প্রাণ নেই, কেমন যেন সব চালবাজি মনে হয়।

পুরো ইন্ডাস্ট্রিরই কি একই অবস্থা বলে আপনি মনে করেন?

কেউ কেউ তো অবশ্যই ভালো করছে, নাহলে সুজয়ের ‘কাহানী’র মতো সিনেমা এলো কী করে? হিন্দি হলেও এটি মূলত একটি বাংলা সিনেমা। খালি কলকাতায় শ্যুটিং হয়েছে বলেই বলছি না, এর মধ্যে কলকাতার প্রাণ রয়েছে, লোকজন রয়েছে, আবহ রয়েছে।

আপনার আবির্ভাব থিয়েটারের মাধ্যমে, তাহলে সেটিই কি আপনাকে চলচ্চিত্রের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছে?

দু’টি মাধ্যম একেবারেই আলাদা। থিয়েটার আমাকে চলচ্চিত্রের জন্য হয়তবা কিছুতা সাহায্য করেছে। তবে আমার অভিনয় রপ্ত করার মাধ্যম ছিলেন মূলত সহ-অভিনেতা ও পরিচালকেরা, তাদের কাজ লক্ষ্য করা ও তাদের নির্দেশনা গুলো মেনে চলার মাধ্যমেই অভিনয় শিখেছি। আর আমি আগেই বলেছি, অভিনয় এমন একটি বিদ্যা, যেটি কাউকে শেখানো যায়না। তবে কেউ শিখতে চাইলে নিজেদের মত করে শিখতে পারে।

ক্যামেরার সামনে কাজ করা সব সময়ই কঠিন। একটা ছোট উদাহরণ দিই, একবার আমার এক ছবিতে একজন যৌন কর্মীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য একজন ভদ্রমহিলাকে নির্বাচিত করা হয়, যিনি বর্তমানে একটি এনজিও-তে কর্মরত আছেন। তবে পূর্বে তিনি যৌনকর্মী ছিলেন। তিনি চরিত্রটি রুপায়ন করার ব্যাপারে বেশ আত্নবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু অভিনয়ের সময় তিনি কোনোভাবেই চরিত্রে প্রবেশ করতে পারেননি। অবশেষে নির্মাতা একজন পেশাদার অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে চরিত্রটিতে অভিনয় করান।

অভিনয় এক ধরনের বিদ্যা, এটিকে অর্জন করতে হয়। ধীরে ধীরে এই বিদ্যাটিকে রপ্ত করতে হয়। চরিত্রগুলোকে অনুভব করার মাধ্যমেই অভিনয় বিদ্যা রপ্ত করা যায়।

ক্যারিয়ারের পাঁচ দশকে আপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কী?

বিশ্বস্ত হওয়া, সৎ হওয়া।

আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলো কী কী?

নাটক-সিনেমার প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার এক ধরনের টান ছিল। অভিনেতা হিসেবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি অপুর সংসারে কাজ করার সুযোগ পাওয়া, আমার জীবনই বদলে দিয়েছে ঐ একটি ঘটনা। আর ব্যক্তিগত জীবনের কথা বললে বাচ্চারাই আমার সব।

এখনো কাজ করতে কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে?

বিষয়টা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আমি কখনো আত্মতৃপ্তিতে ভুগি না। সবার জীবনেই এমন একটা সময় আসে যখন মানুষ ভাবে আসলে তার জীবনের উদ্দেশ্য কি? সে সমাজকে কি দিয়েছে?

যদি সম্ভব হত, আমিও আলবার্ট শুইয়েইটযারে’র মতো সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে কোনো এক লেবার ক্যাম্পের সেবায় নিজেকে সঁপে দিতাম। কিন্তু সেটা সম্ভব না। তখন আমি ভাবলাম, যদি আমি মানুষের জীবনে ক্ষণিকের জন্য হলেও আনন্দ নিয়ে আসতে পারি, সেটাও এক প্রকারের সমাজসেবা-ই হবে।

দর্শকদের প্রতি আমার দায়িত্ববোধই আমাকে তাঁতিয়ে রাখে। যারা আমার কাজ দেখতে আসে, তারা যেন কিছু সুখের স্মৃতি নিয়ে যেতে পারে আমার কাজ থেকে, সেই চেষ্টাই করি। তাঁরা আমাকে দেখার জন্যই গাঁটের পয়সা খরচ করে। তাই আমার সবকিছুর জন্য আমাকে তাদেরকেই ধন্যবাদ দিতে চাই, প্রযোজকদের নয়।

বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) গিয়ে অনেক পয়সা-কড়ি আয় করতে পারতাম। কিন্তু আমি গ্লামারাস জীবন-যাপনের চেয়ে মধ্যবিত্ত জীবনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, ক্যারিয়ারের এর চেয়ে আত্মার খোরাক বেশি জরুরী। অভিনয় আমার জন্য আত্মার খোরাক। আমার কাজগুলোই ভক্তদের প্রতি আমার সেবা, যাদের অফুরন্ত ভালবাসায় আমি আজকের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

আরও পড়ুন :

সাদাত হাসান মান্টো : কেন লিখি ?

ভাল থেকো জ্যাঠামশাই

 

Facebook Comments Box
share on: