এস এম সুলতান

share on:
এস এম সুলতান

এস এম সুলতান স্বতন্ত্র্যরীতিতে ফিগার, নিসর্গ এবং গ্রাম-বাংলাকে চিত্রায়িত করার জন্য বিখ্যাত। লন্ডনের হ্যামস্টিভ ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্টে সে-সময়ের এমনকি বর্তমান সময়ের প্রতিভাধর-ক্ষমতাধর পাবলো পিকাসো, দালি, ব্রাক, ক্লি প্রমুখ শিল্পীর সঙ্গে সুলতান প্রদর্শনী করেছেন।

জীবনের মূল স্রোত, সুর ও ছন্দ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বাঙালির গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার প্রতিচ্ছবি তার শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে অনবদ্য এক শিল্পালোয়ে।

এস এম সুলতানের নির্লোভ স্বভাব, বোহেমিয়ান জীবন – এ সবকিছুই একেবারে আলাদা সুশীল সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পবলয় থেকে। যে-শিল্পচর্চার আঙ্গিক গঠিত হয়েছিল দুশো বছর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনির শাসন শুরুর মধ্য দিয়ে, সুলতান প্রত্যাখ্যান করেছেন এই ঔপনিবেশিক দাসত্ব।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

বাংলাদেশের আর কোনো শিল্পীকে নিয়ে, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে, এতো তোলপাড় করা ইতিবাচক ও নেতিবাচক তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা হয়নি। গভীরতর রহস্যের ধূম্রজাল যাঁকে নিয়ে, তিনি আসলে একজন সহজ মানুষ ছিলেন। নিজের মতো, সযতনে অন্যের আরোপিত সংস্কৃতিকে পাশ কাটিয়ে গেছেন আর ছবি এঁকেছেন।

কখনো রাধা, কখনো কৃষ্ণ সেজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ পারফর্মিং আর্ট, যা একবিংশ শতকে বাংলাদেশে অনেক শিল্পীই চর্চা করেন, সুলতান বহু আগেই তা শুরু করেছিলেন।

নিজের কাজ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো,

“আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলছি৷ আমার সকল চিন্তা, সবটুকু মেধা, সবটুকু শ্রম দিয়ে যা কিছু নির্মাণ করি তা কেবল মানুষের জন্য, জীবনের জন্য, সুন্দর থেকে সুন্দরতম অবস্থায় এগিয়ে যাবার জন্য৷ আমার ছবির মানুষেরা, এরা তো মাটির মানুষ, মাটির সঙ্গে স্ট্রাগল করেই এরা বেঁচে থাকে৷ এদের শরীর যদি শুকনো থাকে, মনটা রোগা হয়, তাহলে এই যে কোটি কোটি টন মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তুসকল আসে কোত্থেকে? ওদের হাতেই তো এসবের জন্ম৷ শুকনো, শক্তিহীন শরীর হলে মাটির নিচে লাঙলটাই দাব্বে না এক ইঞ্চি৷ আসলে, মূল ব্যাপারটা হচ্ছে এনার্জি, সেটাই তো দরকার৷ ঐ যে কৃষক, ওদের শরীরের অ্যানাটমি আর আমাদের ফিগারের অ্যানাটমি, দুটো দুই রকম৷ ওদের মাসল যদি অতো শক্তিশালী না হয় তাহলে দেশটা দাঁড়িয়ে আছে কার উপর? ওই পেশীর ওপরেই তো আজকের টোটাল সভ্যতা৷”

সুলতান ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম রাখা হয় লাল মিয়া। বাবা মো. মেছের আলী, মা মোছা. মাজু বিবি। ছোটবেলা থেকে ছবির প্রতি ছিল লালমিয়ার ভীষণ টান৷ কোনকিছু ভাল লাগলেই চকখড়ি, কাঠকয়লা, হলুদ ও পুঁই ফলের রস দিয়ে ছবি আঁকতেন৷

স্থানীয় ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর নাকানি এ. বি. এস. জুনিয়র মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন সুলতান৷ সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালে সৎ মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যান৷

কলকাতায় গিয়ে নড়াইলের জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুরের বাড়িতে উঠেন৷ এন্টান্স পাশ না করেও তিনি জমিদারের পরামর্শে কলকাতা আর্ট কলেজের ভর্তি কমিটির সদস্য শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সাহায্যে ভর্তি পরীক্ষা দেন। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ১৯৪১ সালে ভর্তি হলেন কলেজে৷ শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর বাড়িতে থেকেই কলেজে যেতেন সুলতান৷ সোহরাওয়ার্দীই লালমিয়ার নাম বদলে রাখেন শেখ মোহম্মদ সুলতান৷ বিভিন্ন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা সত্ত্বেও আর্ট স্কুলের বাঁধাধরা জীবন তাঁর ভাল লাগেনি। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ও ভবঘুরে প্রকৃতির। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার রীতিনীতি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ছিলেন প্রকৃতি প্রেমী একজন আবেগি মানুষ তাই তিনি অস্বীকার করেছিলেন যান্ত্রিকতা পিষ্ট নগর ও নাগরিক জীবনকে।

১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি বেড়িয়ে পড়েন উপমহাদেশের পথে পথে। ছোট বড় শহরগুলিতে ইংরেজ ও আমেরিকান সৈন্যদের ছবি আঁকতেন। ছবি প্রদর্শনী ও ছবি বিক্রি করে চলত তাঁর জীবন। শিল্পী হিসেবে তিনি তখন কিছুটা পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কিন্তু জাগতিক বিষয়ের প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড অনাগ্রহ। শিকড় ছড়াবার আগেই তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন। আর তাই তখনকার আঁকা তাঁর ছবির নমুনা, এমনকি ফটোগ্রাফও এখন আর নেই। তবে সে সময় তিনি নৈসর্গিক দৃশ্য ও প্রতিকৃতির ছবি আঁকতেন। কাশ্মীরে কিছুদিন থেকে তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন।

দেশ বিভাগের পর কিছু দিনের জন্য সুলতান দেশে ফেরেন। কিন্তু এর পরই ১৯৫১ সালে তিনি করাচি চলে যান। সেখানে পারসি স্কুলে দু’বছর শিক্ষকতা করেন। সে সময় চুঘতাই ও শাকের আলীর মত শিল্পীদের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। এর আগে ১৯৫০ সালে তিনি আমেরিকায় চিত্রশিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন। এবং নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন ও পড়ে লন্ডনে তাঁর ছবির প্রদর্শনী করেন।

শিশুদের নিয়ে সুলতানের বহু স্বপ্ন ছিল। ১৯৫৩ সালে তিনি নড়াইলে ফিরে আসেন এবং শিশু শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। নড়াইলে তিনি নন্দন কানন নামের একটি প্রাইমারী ও একটি হাই স্কুল এবং একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের জন্য কিছু করার আগ্রহ থেকে তাঁর শেষ বয়সে তিনি ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

মধ্য পঞ্চাশে ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে প্রচুর কাজ হয়। সে সময় শিল্পীরা উৎসাহ ও আগ্রহে বিভিন্ন কৌশল-রীতি, নিয়ম, ও ছবির মাধ্যম সহ নতুন নতুন বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত হয়ে উঠেন। সে সময়ও তিনি সকলের চোখের আড়ালে নড়াইলেই রয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসতেন কিন্তু তাঁর জীবনের মূল সুরটি ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষক ও কৃষিকাজের ছন্দের সঙ্গে বাঁধা। গ্রামীণ জীবন থেকেই তিনি আবিষ্কার করেছেন বাঙালি জীবনের উৎস কেন্দ্রটি, বাঙালির দ্রোহ ও প্রতিবাদ, বিপ্লব ও সংগ্রাম, নানান প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার ইতিহাস, অনুপ্রেরণা।

গ্রামীণ জীবনেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি। তিনি কৃষক পুরুষকে দিয়েছেন পেশীবহুল ও বলশালী দেহ আর কৃষক রমণীকে দিয়েছেন সুঠাম ও সুডৌল গড়ন, দিয়েছেন লাবণ্য ও শক্তি। হয়তো তাঁর দেখা দুর্বল দেহী, মৃয়মাণ ও শোষণের শিকার কৃষকদের দেখে কল্পনায় তিনি নির্মাণ করেছেন শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান কৃষক সমাজ। তাঁর ছবিতে পরিপূর্ণতা ও প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি ছিল শ্রেণী বৈষম্য, গ্রামীণ জীবনের কঠিন বাস্তবতার চিত্র। তাঁর আঁকা হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) ও চরদখল (১৯৮৮) এরকমই দুটি ছবি।

১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সুলতান শিল্প রসিকদের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে যান। মধ্য সত্তরে তাঁর কিছু ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ী তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় আঁকা তাঁর কিছু ছবি দিয়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। মূলত এ প্রদর্শনীটিই তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। এ ছবিগুলিই তাকে নিম্নবর্গীয় মানুষের প্রতিনিধি ও তাদের নন্দন চিন্তার রূপকার হিসেবে পরিচিত করে। তাঁর ছবিতে কৃষকই হচ্ছে জীবনের প্রতিনিধি এবং গ্রাম হচ্ছে বিশ্বের কেন্দ্র। গ্রাম ও গ্রামের মানুষের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টির প্রেরণা। এজন্যই কৃষক ও তাদের জীবন একটি কিংবদন্তী শক্তি হিসেবে সকলের চোখে তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে।

এস এম সুলতানের আঁকা ছবিগুলোতে বাঙালি কৃষকদের দৈহিকভাবে একরকম বলিষ্ঠ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং চিত্রকর বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো -সেটাও রোগা…। আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা আমার মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি সেভাবেই তাদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশের এই কৃষক সম্প্রদায়ই একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। দেশের অর্থবিত্ত ওরাই যোগান দেয়। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা র্গ্নু কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়, ফসল ফলায়। ওদের বলিষ্ঠ হওয়া উচিৎ।’

তিনি শুধু বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন তাঁকে বিশ্বজুড়ে কাল্পনিক কৃষিসভ্যতার জনক বলা হয় । তাঁর জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই খেটে খাওয়া কৃষিজীবী মেহনতি মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে।

তাঁর চিত্রকর্মে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সংগ্রামীরূপ ফুটে উঠেছে শিল্পীর একান্ত নিজস্ব মহিমায় ও স্বকীয়তায়। তাঁর ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর জীবনকে কৃষি এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তিনি শেষ জীবনে তার পরিপূর্ণতা নিয়ে এইভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন- ‘আমি সুখী। আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে’।

সুলতানের ড্রইংগুলো শক্তিশালী রেখা এবং রেখার গতিতে। এগুলো দ্রুত আঁকা। নারী ও পুরুষ চরিত্র, প্রাকৃতিক দৃশ্য, ফুল-লতাপাতা ও পশুর ড্রইংগুলো অধিকাংশ চারকোল মাধ্যমে আঁকা। কিছু জলরং, কলমের টোনের কাজ ও কিছু পেনসিলে করা ছবি আছে। ছবিগুলোতে সুলতানের পেইন্টিংয়ের পেশিবহুল নারী-পুরুষ নেই। কিন্তু রয়েছে ‘পেশিবহুল’ আঙ্গিকের উৎস। ড্রইংগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কোনো পূর্ণাঙ্গরূপ নেয়নি। কুইক ড্রইংয়ের এমন বৈশিষ্ট্য স্বীকৃত। কিন্তু এই ড্রইংগুলোতেও মৌলিকত্ব দৃশ্যমান। ভারতীয় অঞ্চলের কলা ব্যাকরণের সঙ্গে এর সাযুজ্য বিদ্যমান। এসব ড্রইংয়ের অন্তর্গত বস্ত্তগুলোর গঠন, মহিলাদের সুগঠিত শারীরিক গঠন, রেখার ছন্দ, অসম্পূর্ণতাও রহস্যময়ভাবে দেখা যায়।

অবয়ব বা আকৃতিধর্মিতাই তাঁর কাজের প্রধান দিক। তিনি আধুনিক ও নিরবয়ব শিল্পের চর্চা করেননি। তাঁর আধুনিকতা ছিল জীবনের অবিনাশী বোধ ও শিকড়ের শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করা। সুলতান নির্দিষ্ট নিয়মের প্রতি গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির উত্থানকে।

উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই ও উপনিবেশিকোত্তর সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তুলে ধরেছেন। এটিই তাঁর দৃষ্টিতে আধুনিকতা। তিনি ইউরো কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের ন্যায় খুঁজেছেন মানবের কর্ম বিশ্বকে। সুলতানের মতো আর কেউ আধুনিকতার এমন ব্যাখ্যা দেননি। তাঁর অনন্য স্টাইলটি অনুকরণীয়। তাঁর কোন অনুসারী বা স্কুল নেই, তাঁর মতো মাটির কাছাকাছি জীবন তাঁর সময়ে আর কোন শিল্পী যাপন করেননি। সুলতান তেলরঙ ও জলরঙের ছবি এঁকেছেন। ব্যবহার করেছেন সাধারণ কাগজ, সাধারণ রঙ ও চটের ক্যানভাস। এজন্য তাঁর অনেক ছবি নষ্ট হয়ে যায়। সেদিকেও তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

আশির দশক থেকে সুলতান নড়াইলে থেকে যেতে অনেকটা বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর কাছে আশ্রয় নেয়া মানুষ, শিশু ও জীবজন্তুদের জন্য তাঁর বাড়িটি ছেড়ে দেন। তাঁর একটি চিড়িয়াখানা ছিল। শিশুদের জন্য তিনি একটি বিরাট নৌকা বানিয়েছিলেন।

সিমলায় ১৯৪৬ সালে তাঁর আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়। সেখানকার মহারাজা প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন৷ ১৯৪৮ সালে করাচিতে এবং ১৯৪৯ সালে লাহোর ও করাচিতে চিত্র প্রদর্শনী হয়৷ তারপর আরো কয়েক বছর কাশ্মীর ও ভারতে কাটান তিনি৷ ১৯৫১ সালে চিত্রশিল্পীদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান৷ ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে তাঁর মোট বিশটি একক প্রদর্শনী হয়৷ ১৯৫৩ সালে ভবঘুরে জীবন ছেড়ে নড়াইল ফিরেন। কিছুদিন পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫১ সালের পর পনের বছর কোন প্রদর্শনী করেননি।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে পঁচাত্তরটিরও বেশি চিত্রকর্ম নিয়ে হয় তার প্রদর্শনী। ১৯৮৪ সালে সরকার তাকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আবাসিক শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷ ১৯৮৭ সালে এপ্রিল-মে মাসে গ্যেটে ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয়বারের মতো একশটিওর বেশি ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করেন৷ এর কিছুদিন পর তিনি আবার নড়াইলে ফিরে যান। ১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি ‘টোনে’ স্কেচ প্রদর্শনী করেন। এটি তাঁর শেষ প্রদর্শনী৷ একই বছরের ১০ আগস্ট শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে নড়াইলে ৭০তম জন্মদিন পালন করা হয়৷

সুলতান ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’, নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা, ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। চিত্রা নদীর তীরে এস এম সুলতানের বাড়িতে প্রতিবছর জম্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী আড়ম্বরে পালন করা হয়। বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান।

তাকে নিয়ে ‘আদমসুরত’ নামে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ।

আরও পড়ুন : বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা : স্বাধীনতার আগে ও পরে।

* আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন parthibrashed@ymail.com এ।

Facebook Comments
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।