
শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সামগ্রিকভাবে অস্বস্তিটা বোধহয় এখানেই যে, তাঁকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই আমরা খুব দ্রুত ইতিহাস থেকে রাজনীতিতে, আর রাজনীতি থেকে আবেগে চলে যাই। তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই কেউ ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে পান, কেউ ১৫ আগস্টের সকালটি মনে করেন, কেউ বাকশাল দেখেন, কেউ বঙ্গবন্ধুকে দেখেন, কেউ আবার আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদি শাসনকে দেখেন।
এসবের মাঝখানেও শেখ মুজিবুর রহমান যে মানুষটি ছিলেন, তাঁকে নিয়ে নিরাসক্তভাবে কথা বলার জায়গাটি খুবই সীমিত করে ফেলা হয়েছে। আরও দূঃখজনক বিষয় হলো এই সীমিত করার কাজটি করেছে তার রেখে যাওয়া দল আওয়ামীলীগ ও তার মেয়ে শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর সেই জায়গাটি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ মুজিবের মূর্তি ভাঙা, ছবি নামানো কিংবা ধানমন্ডি ৩২-ভেঙে ফেলা—এসব শুধু একটি ব্যক্তির স্মৃতির ওপর আঘাত নয়; এগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, একটি জাতির ইতিহাস যখন দীর্ঘদিন ধরে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ভাষায় বলা হয়, তখন একসময় সেই দলের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ ইতিহাসের প্রতীকগুলোর ওপরও গিয়ে পড়ে।
মুজিবকে বুঝতে হলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা দিয়েই শুরু করতে হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের সময়কার মুজিব আজকের বাংলাদেশের মুজিব এক ব্যক্তি নন। তরুণ মুজিব পাকিস্তান চেয়েছিলেন; তাঁর রাজনৈতিক বেড়ে ওঠা মুসলিম লীগের রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দেশভাগ এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সেই সময়ের কলকাতা, মুসলিম ছাত্ররাজনীতি, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কের নানা বিবরণ পাওয়া যায়।[১]
পরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাস্তবতা তাঁকে বদলে দেয়। ভাষার প্রশ্ন, পূর্ব বাংলার প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট এবং কেন্দ্রীয় শাসনের দাপট তাঁকে ধীরে ধীরে পাকিস্তানি কাঠামোর একজন সমালোচক করে তোলে। এই পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুজিবের রাজনীতি কোনো একদিনে পাকিস্তানবিরোধী হয়ে ওঠেনি; সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক উপলব্ধিও বদলেছে। আবার এটাও প্রচলিত আছে যে , বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেয়ে ভারতের প্রতি তার আনুগত্য এবং পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়াই তার মূল বাসনা ছিল।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ। ছয় দফায় স্বাধীন বাংলাদেশের কথা সরাসরি বলা হয়নি। দাবি ছিল পাকিস্তানের একটি প্রকৃত ফেডারেল কাঠামো, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের হাতে থাকবে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা। কিন্তু রাজনীতিতে কোনো কোনো দাবি তার কাগুজে ভাষার চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে। ছয় দফার বেলায়ও তেমন হয়েছিল। পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বাঙালির অধিকার আদায়ের কর্মসূচি ধীরে ধীরে বাঙালির রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে চলে আসে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তা মেনে নেয়নি। এখান থেকেই সংকটটি আর কেবল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকল না; এটি হয়ে উঠল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটের অধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্ন।[২]
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবকে বুঝতে গেলে তাই তাঁকে একক কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে দেখলে চলবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা একজন মানুষের কৃতিত্ব নয়। এই দেশের স্বাধীনতার পেছনে ছিল কোটি মানুষের অংশগ্রহণ, ছাত্রদের আন্দোলন, কৃষক-শ্রমিকের প্রতিরোধ, মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংগঠন, প্রবাসী সরকার, সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরোধ এবং অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত মানুষের আত্মত্যাগ। কিন্তু এই সত্য বলার অর্থ মুজিবের ভূমিকা ছোট করা নয়।
বরং তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে তিনি একটি বিচ্ছিন্ন ক্ষোভকে রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দিতে পেরেছিলেন এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে সেই দাবির গণভিত্তি তৈরি করেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ তারই চূড়ান্ত প্রকাশ। ভাষণটির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর রাজনৈতিক অস্পষ্টতার মধ্যেই ছিল—এটি একদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছিল, অন্যদিকে জনগণকে আসন্ন সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করেছিল। UNESCO-ও পরবর্তীকালে ভাষণটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করে সেটিকে Memory of the World Register-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।[৩]
স্বাধীনতার পরের মুজিব অবশ্য অনেক বেশি জটিল। ১৯৭২ সালে তিনি যে দেশটির দায়িত্ব নিলেন, সেটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভূখণ্ড। অবকাঠামো ধ্বংস, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু, অস্ত্রের বিস্তার—সব মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রটির সামনে ছিল ভয়াবহ সমস্যা। ১৯৭২ সালের সংবিধান গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং নাগরিক অধিকারেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।[৪]
কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা দ্রুত কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রশাসনের দুর্বলতা এবং ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ সরকারের জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দেয়। দুর্ভিক্ষের পুরো দায় একা মুজিব সরকারের ওপর চাপানো ইতিহাসসম্মত হবে না; যুদ্ধের ক্ষতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারব্যবস্থার সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আসে ১৯৭৫ সালে। যে মুজিব একসময় পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা এমনভাবে কেন্দ্রীভূত করলেন যে বহুদলীয় গণতন্ত্র কার্যত সংকুচিত হয়ে গেল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হলো। পরে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা হয় এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও কঠোরভাবে সীমিত করা হয়।[৫]
কেন এই পরিবর্তন ঘটেছিল, তার পেছনে তখনকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা আছে। মুজিব নিজেও এটিকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি নতুন পথ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু উদ্দেশ্য যাই থাক, ফলাফলটি ছিল গণতান্ত্রিক বহুত্বের সংকোচন। ইতিহাসের এই অংশটিকে পাশ কাটিয়ে মুজিবের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া সম্ভব নয়।
এখানেই ‘ফ্যাসিস্ট মুজিব’ কথাটির সঙ্গে একটু সাবধান হওয়া দরকার। বাকশালকে কর্তৃত্ববাদী বা একদলীয় ব্যবস্থা বলা যায়; গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমালোচনার যথেষ্ট ভিত্তি আছে। কিন্তু ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের সঙ্গে একে সরাসরি এক করে ফেললে ইতিহাসের চেয়ে রাজনৈতিক অভিধাই বড় হয়ে ওঠে। মুজিবের ১৯৭৫-এর শাসন ছিল কর্তৃত্ববাদী এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক—এই কথাটি বলার জন্য ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটির আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোই বেশি শক্তিশালী প্রমাণ।
এছাড়া স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হলো—যে তরুণেরা একসঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁদেরই একটি অংশ স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। জাসদের উত্থান, গণবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বামপন্থী বিদ্রোহের পাশাপাশি রাষ্ট্রও কঠোর দমননীতির পথে যায়। জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠিত হয় ১৯৭২ সালে; পরবর্তী সময়ে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বেআইনি আটক, নির্যাতন ও হত্যার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং মুক্তিযুদ্ধফেরত তরুণরাও ছিলেন।
এখানে শেখ মুজিবুর রহমানের দায়ের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এসব হত্যাকাণ্ডের প্রত্যেকটির সরাসরি নির্দেশ মুজিব দিয়েছিলেন—এমন প্রমাণ নেই; কিন্তু রক্ষীবাহিনী তাঁর সরকারের অধীনেই গঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল এবং তাদের জবাবদিহি সীমিত করার আইনও তাঁর শাসনামলেই করা হয়। ফলে ব্যক্তিগত অপরাধের দায় আর রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক দায়কে আলাদা করেও মুজিবের শাসনের দায় অস্বীকার করা যায় না। একই সময়ে এটিও সত্য যে গণবাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীও হত্যা ও সহিংসতায় জড়িয়েছিল।
এই কারণেই ১৯৭২–৭৫-এর ইতিহাস শুধু ‘মুজিব মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করেছিলেন’—এমন সরল বয়ানে ধরা যায় না। বরং ট্র্যাজেডিটা ছিল এই যে, একটি স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধারাই পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল, আর নতুন রাষ্ট্রও তাদের একাংশের কাছে মুক্তির বদলে দমন ও ভয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। মুজিবকে ইতিহাসে সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে ১৯৭১-এর নেতা হিসেবে যেমন দেখতে হবে, তেমনি ১৯৭২–৭৫-এর রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হিসেবেও তাঁকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হবে।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ড এই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়। মুজিব ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যার কোনো রাজনৈতিক বা নৈতিক বৈধতা নেই। কিন্তু হত্যার পর দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে যে গল্পটি আমরা সবচেয়ে বেশি শুনি—‘সারা দেশের মানুষ আনন্দে মিষ্টি খেয়েছিল’—সেটিও সরল সত্য হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন। সমকালীন মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে ১৬ আগস্টের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছিল, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ব্যাপক জনউল্লাস দেখা যায়নি; বরং মানুষের মধ্যে ছিল এক ধরনের শান্ত গ্রহণযোগ্যতা এবং কোথাও কোথাও স্বস্তির অনুভূতি।[৬]
এই একটি নথি দিয়ে অবশ্য পুরো দেশের মানুষের মনোভাব নির্ধারণ করা যায় না। কেউ শোক করেছে, কেউ ভীত হয়েছে, কেউ নীরব থেকেছে, কেউ হয়তো সত্যিই স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাটি অন্তত একটি বিষয় বুঝতে সাহায্য করে—১৯৭৫-এর মুজিব এবং ১৯৭১-এর মুজিবের মধ্যে ততদিনে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা গুরুতরভাবে ক্ষয়ে গিয়েছিল।
মুজিবের মৃত্যুর পর তাঁর ইতিহাস আরও একবার বদলে যায়। এবার তিনি মানুষ থেকে প্রতীকে পরিণত হন। কখনো তাঁকে আড়াল করা হয়েছে, কখনো তাঁর নাম উচ্চারণও রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয় হয়েছে; আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় স্মৃতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে মুজিবের ব্যক্তিগত স্মৃতি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয় এতটাই কাছাকাছি চলে আসে যে তিনটিকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। মুজিব তখন আর শুধু ১৯৭১-এর নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, পাঠ্যবই, সরকারি স্থাপনা, রাজনৈতিক প্রচার এবং দলীয় বৈধতারও অংশ।
এখানেই সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল। কোনো জাতির ইতিহাসে একজন নেতা যত গুরুত্বপূর্ণই হোন, তাঁকে সমালোচনার বাইরে নিয়ে গেলে তাঁর স্মৃতিই একসময় দুর্বল হয়ে যায়। কারণ ইতিহাসকে পাথরে খোদাই করা যায় না। নতুন প্রজন্ম নতুন প্রশ্ন করবে, পুরোনো সিদ্ধান্তকে নতুন চোখে দেখবে। রাষ্ট্র যদি সেই প্রশ্নের জায়গা বন্ধ করে দেয়, একসময় প্রশ্নগুলো আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসে।
২০২৪ সালে সেটিই আমরা দেখেছি। শেখ হাসিনার পতনের পর মুজিবের প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য এবং স্মৃতিচিহ্নের ওপর যে আক্রমণ হয়েছে, তার মধ্যে নিছক ব্যক্তিগত মুজিববিদ্বেষ যেমন ছিল, তেমনি ছিল দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভও। ধানমন্ডি ৩২ তাই অনেকের কাছে শুধু একজন নেতার বাড়ি ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল একটি রাজনৈতিক যুগের প্রতীক। সেই প্রতীক ভাঙার মধ্য দিয়ে মানুষ হয়তো ১৯৭১-এর ইতিহাসকে ভাঙতে চায়নি; বরং ২০২৪-এর আগে যে রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে তারা দাঁড়িয়েছিল, তার দৃশ্যমান চিহ্নটিকেই আঘাত করেছে। কিন্তু প্রতীক ভাঙার এই রাজনীতির মধ্যেও বিপদ আছে। কারণ কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে নিয়ে ক্ষোভ থেকে যদি তাঁর পুরো ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তাহলে আমরা আবারও একই ভুল করব—ইতিহাসের বদলে রাজনৈতিক স্মৃতি তৈরি করব।
তাহলে ২০২৪-এর পর শেখ মুজিবকে আমরা কীভাবে দেখব?
সম্ভবত সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাঁকে আর কোনো একক বাক্যে আটকে না রাখা। পাকিস্তান আন্দোলনের মুজিবকে দেখতে হবে, যিনি পাকিস্তান চেয়েছিলেন। ভাষা ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের মুজিবকে দেখতে হবে। ছয় দফার মুজিবকে দেখতে হবে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের নেতা এবং ৭ মার্চের বক্তাকে দেখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে তাঁকে দেখতে হবে। একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের সমস্যাগ্রস্ত রাষ্ট্রনায়ক, বিরোধীদলের দমন-পীড়নকারী হিসেবেও দেখতে হবে, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময়ের শাসক এবং ১৯৭৫-এর বাকশালের প্রবক্তাকেও দেখতে হবে। তারপর দেখতে হবে মৃত্যুর পর কীভাবে তাঁকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় ও দলীয় মিথ তৈরি হয়েছে।
এই সবগুলোকে একসঙ্গে দেখলে মুজিবের গুরুত্ব কমে না, বরং বাড়ে। কারণ তখন তিনি আর পাথরের মূর্তি থাকেন না; একজন ঐতিহাসিক মানুষ হয়ে ওঠেন। তাঁর অসাধারণ রাজনৈতিক সাফল্য যেমন সত্য, তেমনি তাঁর গুরুতর রাজনৈতিক ভুলও সত্য। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র—কিন্তু একমাত্র চরিত্র নন। তিনি হত্যার শিকার—কিন্তু তাঁর হত্যাকাণ্ড তাঁর শাসনের ব্যর্থতাকে মুছে দেয় না। তিনি বাকশাল করেছিলেন—কিন্তু বাকশালের সমালোচনা করা মানে ১৯৭১-কে অস্বীকার করা নয়।
সম্ভবত মুজিবের প্রতি সবচেয়ে ন্যায্য আচরণ হবে তাঁকে নিয়ে আমাদের আবেগকে একটু সরিয়ে রেখে তাঁর সঙ্গে তর্ক করা। যে স্বাধীনতার রাজনীতি তিনি করেছিলেন, সেই স্বাধীনতার অর্থ যদি সত্যিই নাগরিকের স্বাধীনতা হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতার মধ্যেই মুজিবকে প্রশ্ন করার অধিকারও থাকতে হবে। তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন করা যদি অপরাধ হয়, তাহলে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক দাবিটিই দুর্বল হয়ে যায়।
২০২৪-এর পর তাই শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন করে আবিষ্কার করার দরকার নেই; দরকার তাঁকে নতুন করে পড়া। আওয়ামী লীগের মুজিব নয়, বিএনপি-জামায়াতের বিরোধিতার মুজিবও নয়; সরকারি পাঠ্যবইয়ের মুজিবও নয়, সামাজিক মাধ্যমে তৈরি প্রতিকূল মুজিবও নয়। দলীয় স্মৃতি থেকে তাঁকে কিছুটা মুক্ত করে ইতিহাসের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
মুজিবকে মূর্তি থেকে নামিয়ে ইতিহাসে বসানোই হয়তো আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ।
কারণ ইতিহাসে জায়গা পেতে কোনো মানুষকে নিষ্পাপ হতে হয় না। বরং বড় ঐতিহাসিক চরিত্রদের গুরুত্ব অনেক সময় তাঁদের সাফল্যের পাশাপাশি তাঁদের ভুলের মধ্যেও নিহিত থাকে। মুজিবও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁকে যদি ভালো-মন্দ মিলিয়ে দেখতে পারি, তাহলে হয়তো প্রথমবারের মতো তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক আলোচনা শুরু করতে পারব।
তথ্যসূত্রঃ
[১] শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।
[২] ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচি এবং ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচন।
[৩] UNESCO, The Historic 7th March Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Memory of the World Register, 2017।
[৪] The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, 1972।
[৫] The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, Fourth Amendment, 25 January 1975; Moudud Ahmed, Bangladesh: Era of Sheikh Mujibur Rahman।
[৬] U.S. Department of State, Foreign Relations of the United States, 1969–1976, Volume E–8: South Asia, 1973–1976, diplomatic reporting following 15 August 1975।
