শাহ আবদুল করিম : বাউল সম্রাট

share on:
শাহ আব্দুল করিম

শাহ আবদুল করিম , বাংলাদেশের সর্বশেষ বাউল সম্রাট হিসেবে যাকে অভিহিত করা হয়। গানের আসরে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক গান বাঁধার মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি।

যে কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি যেমন তাৎক্ষণিক গান বাঁধতে পারতেন, তেমনি দক্ষ সুরকারের মতো সুরারোপ করে একতারা বা দোতারা বাজিয়ে গান গাইতেন।

এমন বিরল প্রতিভার গুণেই তিনি গ্রামবাংলার মানুষের মাঝে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ক্রমশই তার জনপ্রিয়তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বের বাঙালির কাছে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধল-আশ্রম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ভাটির জল-হাওয়া, মাটির গন্ধ আর কালনী-তীরবর্তী জনজীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ, দারিদ্র্য-বঞ্চনা, জিজ্ঞাসা, লোকাচার, স্মৃতি প্রভৃতি তার গানে এক বিশিষ্ট শিল্প-সুষমায় পরিস্ম্ফুট।

শাহ আবদুল করিম শুধুমাত্র বাউল ছিলেন না, তিনি একাধারে গণসংগীত শিল্পীও। সারাজীবন শোষিত বঞ্চিতদের পক্ষে গান লিখেছেন। তাঁর আঘাতের লক্ষ্য ছিলো ভণ্ড রাজনীতিবিদ, শোষক, পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদ। ধর্মের অপব্যবহার তো অবশ্যই।

শাহ আবদুল করিমের গানে বৈষ্ণব ধারার মীড়াশ্রয়ী সুরের ঝংকারের সঙ্গে সুফী ধারার গতিপ্রধান ছন্দের সম্মিলন ঘটেছে।

শাহ আব্দুল করিম রচিত পাঁচশতাধিক গানে যেমন সিলেটের ঐতিহ্য ও শিকড়ের সন্ধান মেলে তেমনি বৈষ্ণব-সুফী ধারার সাধন-ভজনের পরিচয়ও পাওয়া যায়। একদিকে বাস্তবজীবনের কঠিন কঠোর পথপরিক্রমা অন্যদিকে জগত-জীবন সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণ, সৃষ্টির রহস্য নিয়ে কৌতূহল শাহ আব্দুল করিমকে করে তুলেছে বাউল মরমী।

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের পূর্বসূরি মরমি সাধকরা তত্ত্বকথা বলে গেছেন। সমাজে সাম্য সৃষ্টির আন্দোলন করেছেন। কিন্তু শাহ আবদুল করিমের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন মাত্রার। দেশের, দশের, জনগণের, সমাজের দুঃখ-দুর্দশার কথা তিনি তাঁর রচনায় উল্লেখ করে ভিন্নধর্মী সংগ্রাম করেছেন।

শাহ আবদুল করিম কাগমারী সম্মেলনে গান করে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাদের শ্রদ্ধা আদায় করে নেন।শাহ আবদুল করিম বেড়ে ওঠার সময় লোক সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল পরিবেশ ছিল। শাহ আবদুল করিম ৫৪’র নির্বাচন ৬৯,এর গণ আন্দোলন, ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি পর্যায়ে স্বরচিত গনসঙ্গীত পরিবেশন করে জনতাকে দেশ মার্তৃকার টানে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর গণসঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে মাওলানা আবদুল হামিদ থান ভাসানী তাঁর পিটে হাত রেখে বলেছিলেন-বেটা, গানের একাগ্রতা ছাড়িও না, তুমি একদিন গণ মানুষের শিল্পী হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণসঙ্গীত শুনে একশ পচাশি টাকা দেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১১ টাকা দিয়ে বলেন, তোমার মতো শিল্পীকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়া হবে।

শাহ আবদুল করিম ৬টি গানের বই লিখেছেন। এগুলো হলো- ‘আফতাব সঙ্গীত’, ‘গণসঙ্গীত’, ‘ধলমেলা’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘ভাটির চিঠি’ ও ‘কালনীর কূলে’। দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে বাউল ও আধ্যাত্মিক গানের পাশাপাশি ভাটিয়ালি গানেও দখল ছিল তার। তিনি ১৬ শতাধিক গান লিখেছেন ও সুর করেছেন।

বাংলা একাডেমির উদ্যোগে তার ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, দুরবীন শাহর দর্শনে অনুপ্রাণিত ছিলেন আবদুল করিম। সঙ্গীতে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক। পেয়েছেন সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, সিলেট সিটি করপোরেশন নাগরিক সংবর্ধনা, বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি, অভিমত, শিল্পকলা একাডেমি, খান বাহাদুর এহিয়া সম্মাননাসহ বহু পদক, সম্মাননা ও সংবর্ধনা। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই গুণী শিল্পী।

শুধু সুরের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে তাঁর কাছ থেকে বাহবা কুড়িয়ে নেয়ার লক্ষ্য আর সাধারণ গায়কের মতো ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি থাকতেন বলেই তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সুখ-দুঃখের সাথে তাঁর গভীর পরিচয় ছিল। তাঁর গানের কথা বা ভাষাগুলো তাই প্রমাণ করে। তাঁর গানের মধ্যে সাধারণ মানুষেরই চাওয়া-পাওয়ার সুরই বেজে উঠেছে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : আব্বাসউদ্দীন আহমদ : বাঙালির প্রাণের শিল্পী।

Facebook Comments
share on: