সত্যজিৎ রায় ও বাংলা চলচ্চিত্র : পর্ব ২

share on:
সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায় নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি একটা প্রবল ভূমিকম্পের মত ভারতীয় চলচ্চিত্রের গৃহীত কাঠামোকে চূর্ণ করলো। পথের পাঁচালী যে নব বাস্তববোধ দর্শক ও সমালোচকদের হতবাক করেছিল তাই একদিন সত্যজিৎ রায়কে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তুলল।

পথের পাঁচালী পর সত্যজিৎ রায় অপরাজিত করার সিদ্ধান্ত নেন। পথের পাঁচালীর নিশ্চিন্দিপুর থেকে মা বাবার সাথে অপুর কাশিতে যাওয়া এবং কলেজে যাবার কাহিনী এই ছবিতে ওঠে এসেছে। ইতোমধ্যে চলচ্চিত্রের মধ্যে ভালভাবে ঢুকে যাবার জন্য সত্যজিৎ রায় ডি কে কিমার এর চাকুরী ছেড়ে দেন। পথের পাঁচালী তৈরির সময় প্রযোজক নিয়ে যে ভোগান্তি পোহাতে হয় অপরাজিত সম্পূর্ণ উল্টোটা ঘটে। প্রযোজকরা এক প্রকার লাইন দিয়ে থাকে সত্যজিৎ রায়কে দিয়ে ছবি বানানোর জন্য। শেষ পর্যন্ত চারু প্রকাশ ঘোষ, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং বিএন বন্দ্যোপাধ্যায় তিনজন মিলে এ ছবির প্রযোজনা করেন।

পথে পাঁচালী’র পরিবেশক অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশনও এবার পরিবেশকের দায়িত্ব নেয়। সেই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অজিত বসুর প্রস্তাব অনুযায়ী এক লাখ টাকার মূলধন নিয়ে একটি প্রযোজক সংস্থা করার প্রস্তাব হয়। এর পঞ্চাশ ভাগ মালিকানা থাকবে সত্যজিৎ রায়ের আর পঞ্চাশ ভাগ চারু প্রকাশ ঘোষ প্রমুখের। মূলধনের পঞ্চাশ হাজার টাকা অরোরা সত্যজিৎ রায়কে বার্ষিক এক টাকা সুদে ধার দেয়। অন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা চারু বাবুরা দেয়। সিদ্ধান্ত হয় প্রিন্ট ও পাবলিসিটি বাবদ সব খরচ অরোরা পরিবেশক বহন করবে। সত্যজিৎ রায় নতুন এই সংস্থার নাম দেন এপিক ফিল্মস। মূলতঃ পথের পাঁচালীর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর সত্যজিৎ রায়কে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

অপরাজিত ছবির বাজেট ঠিক হয়েছিল এক লক্ষ ছয় হাজার টাকা। সিদ্ধান্ত হয় চিত্রনাট্য রচনা ও চিত্র পরিচালনার জন্য সত্যজিৎ রায় অর্থ পাবেন যেটা তিনি পথের পাঁচালী করার সময় পাননি। কাহিনীর চিত্র স্বত্ব কিনে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন। আমার স্বামী দেখে যেতে পারলেন না তাঁর উপন্যাস থেকে কি সুন্দর ছবি হতে পারে।’

অপরাজিত ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পূর্বে চলচ্চিত্র জগৎ ও দর্শক মহলে হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। ১৯৫৬ সালের অক্টোবরে অমৃত বাজার পত্রিকার এক সংবাদে প্রকাশ হয়, এ স্পেশাল  শোয়িং অফ দ্য ফিল্ম উইল বি হেল্ড অ্যাট রাষ্ট্রপতি ভবন, নিউ দিল্লী, অন দ্য টেন্থ ইনস্টেন্ট। প্রাইম মিনিস্টার নেহেরু এন্ড শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধি আর লাইকলি টু গ্রেস অকেশন বাই দেয়ার প্রেজেন্স। …..’ সেই সুবাদে পরের দিন সকালে সত্যজিৎ রায় এবং এপিক ফিল্মসের অমিয় মুখার্জি দিল্লী যান।

সেই বছরই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অপরাজিত পাঠান হয়। কুরোসাওয়া, ভিসকান্তি, জিনেমান, নিকোলাস রে আর আঁদ্রে কায়াতের মত পরিচালকদের ছবির সাথে অপরাজিতও প্রদর্শিত হয়। বিষয়টি সত্যজিৎ রায়ের জন্য খুবই উত্তেজনার একটি বিষয় ছিল। উৎসবের সেরা ছবি বাছাইয়ে তাঁর ছবি প্রতিযোগিতা করবে কুরোসাওয়া বা ভিসকান্তির মত পরিচালকদের ছবির সাথে। ভেনিস উৎসবে উপস্থিত দর্শক সমালোচক এবং জুরীর সদস্যরা সত্যজিৎ রায়ের ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। অপরাজিত ছবিটি এই ফেস্টিভ্যাল হিস্ট্রিতে প্রথম বারের মত একই ছবি গ্র্যান্ড প্রাইজ আর ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড পায়।

বলা যেতে পারে, সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি পথের পাঁচালী এবং দ্বিতীয় ছবি অপরাজিত তাঁর জীবনের দুই বড় মাইলস্টোন। এই ছবি দুটি নির্মাণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ একই সঙ্গে সংগ্রাম, ব্যর্থতা, ধৈর্য-হতাশ, নিষ্ঠা, সাফল্য জনপ্রিয়তা ও আক্রমণের স্বাদ পেয়েছেন।

অপরাজিত’র শ্যুটিং এর সময় কাশীর ঘাটে দুর্ঘটনার জন্য তিন মাসের জন্য সত্যজিৎ রায়কে শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল। তখনই তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জলসাঘর গল্পটির সাথে তাঁর নতুন করে পরিচয় হয়। সত্যজিৎ বরাবর উনিশ শতকী বাংলার সামাজিক ইতিহাসে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। জলসাঘর হচ্ছে তাঁর প্রথম ছবি সেখানে সেই উনিশ শতকী সংস্কৃতি আর স্বভাবের সমন্বয় দেখা যায়- যার শেষ পর্ব রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণে। জলসাঘর সত্যজিতের নিজস্ব স্বভাবধর্ম প্রতিচিত্রণের আদি চলচ্চিত্র।

মুর্শিদাবাদের নিমতিতার জমিদার রায় চৌধুরীদের ভগ্ন প্রায় প্রাসাদোপম অট্টালিকাতে হয় লোকেশন শ্যুটিং। পরে সত্যজিৎ রায় জানতে পারেন এই বংশের উপেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী হলেন গল্পের বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্র চিত্রণের প্রেরণা।

জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের ভূমিকায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস। সত্যজিতের কথায় ‘ছবি বাবুর মত অভিনেতা না থাকলে জলসাঘর এর মতো কাহিনীর চিত্ররূপ দেওয়া সম্ভব হত কিনা জানি না। ছবির শ্যুটিং চলাকালীন ছবি বিশ্বাস অভিনীত তপন সিনহার ছবি কাবুলিওয়ালা বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনয়ন পায়। ফলে ছবি বিশ্বাস বার্লিন যাওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতে ছবি শ্যুটিং কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকে। সেই মুহূর্তে সত্যজিৎ একেবারে হাত পা গুঁটিয়ে বসে থাকতে চাইছিলেন না, ফলে তিনি রাজশেখর বসুর কমেডি, ফ্যান্টাসি, স্যাটায়ার, ফার্স আর প্যাথসের এক ধরনের সমন্বয়ে তৈরি গল্প পরশপাথর নিয়ে নতুন ছবিতে হাত দিলেন।

গল্পের সময়টা ছিল ১৯৪৮ সালের কোলকাতা। একটি পরশ পাথর একজন কেরানীর ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনে কি প্রভাব ফেলে এরই চমৎকার কৌতুকধর্মী উপস্থাপনা আছে এই ছবিটিতে। মূল চরিত্রে তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় অনন্য। জলসাঘর এর আগেই পরশ পাথর মুক্তি পায়। প্রথমটি ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে, পরেরটি অক্টোবরে। এরই মধ্যে ১৯৫৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসে সত্যজিৎ রায়কে পদ্মশ্রী উপাধিতে সম্মানীত করা হয়। ভাবতেই অবাক লাগে যে সত্যজিতকে তিন চার বছর আগে তাঁর প্রথম ছবি বানানোর জন্য কি বিশাল সব বাঁধা পেরুতে হয়েছে, সেই সত্যজিৎ একেবারে রাষ্ট্রের সম্মানীত সম্মানে ভূষিত হলেন।

অপরাজিত-র দ্বিতীয় পর্ব ছবি করার সময় সত্যজিৎ তার নাম দিলেন অপুর সংসার। আগের দুটো ছবি, পরশপাথর এবং জলসাঘর এ সত্যজিৎ পরিচিত আর পেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলেন। সেখানে প্রথম কাহিনী নির্বাচনের প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তুলসী চক্রবর্তীকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা। সত্যজিৎ এ ব্যাপারে বলেছিলেন, আই ওয়ান্টেড টু মেক এ ফিল্ম উইথ তুলসী চক্রবর্তী, ভীষণভাবে নেগলেক্টেড ছিলেন। দ্বিতীয় ছবি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ন্যাচারলি এক ধরনের থিয়াট্রিক্যাল প্রফেশনাল অভিনয়ে ছবি বিশ্বাস খুব পাকা ও দক্ষ ছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, জলসাঘর-এ বিশ্বম্ভর রায়ের যে চরিত্র, তাতে হয়ত খাইয়ে যাবে।’

অপুর সংসার করার সময় সত্যজিৎ ঠিক করেছিলেন প্রধানত নতুন মুখ নিবেন। তাঁর ফিল্ম ইউনিটের এক কর্মী নিয়ে এসেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। সৌমিত্র তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ ক্লাসের ছাত্র। মঞ্চে কাজ করেন আর আকাশ বাণী’র কলকাতায় ঘোষকের কাজ করছেন। অপর্ণার ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য অভিনেত্রীর খোঁজে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। অনেক আবেদন আসার পরও কাউকে সত্যজিতের চরিত্রটার সাথে যোগ্য মনে হয়নি। তবে খোঁজ পাওয়া গেল চিলড্রেনস লিটল থিয়েটারে এক বালিকাকে নৃত্যাভিনয়ে দেখা গেছে; তার সঙ্গে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সম্পর্ক আছে।

তাঁর ছোট বোন ঐন্দ্রিলা বা টিংকু ঠাকুর তপন সিংহ-র কাবুলিওয়ালা ছবিতে অভিনয় করেছেন। মেয়েটির বাবা গীতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মা ইরা ঠাকুর সত্যজিতের পরিচিত। সত্যজিতের লেক অ্যাভিনিউর বাড়ীতে ঠাকুর দম্পতি তাঁদের কন্যা শর্মিলাকে নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন তাঁর পরনে ছিল হলুদ রঙের ফ্রক আর মাথায় বব-ছাঁট চুল। বিজয়া রায় মেয়েটাকে শাড়ী পরিয়ে গ্রামীণ অপর্ণার সাজে সাজাতেই শর্মিলা হয়ে গেল আদ্যন্ত অপর্ণা। অপুর সংসার-এর শ্যুটিং শুরু হল ১৯৫৮ সালের ৯ আগস্ট।

১৯৫৯ এর ১ মে অপুর সংসার মুক্তি পেল। ১৯৫৯ সালের শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে এটি রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক পেল। তা ছাড়া বছরের সবচেয়ে মৌলিক চলচ্চিত্র হিসেবে ছবিটি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সাদারল্যান্ড ট্রফি পায়। ছবিটি বক্স অফিসের বিরাট সাফল্য পেয়েছিল।

১৯৫৯-এ প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় এর গল্প দেবী অবলম্বনে চলচ্চিত্র করার সিদ্ধান্ত নেন সত্যজিৎ রায়। হিন্দু সমাজে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারকে কুঠারাঘাত করেছেন তিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। সম্ভবত তিনি যেহেতু কুসংস্কারে একেবারে বিশ্বাসী ছিলেন না সে জন্য হিন্দু সমাজে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার সম্পর্কে মানুষের চেতনা খুলে দেওয়ার জন্যেই তিনি এই ছবিটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। জীবন বিমুখ ভক্তিতত্ত্বের দ্বারা আচ্ছন্ন মন যে কি নিদারুণ ট্রাজেডির কারণ হতে পারে সেই কথাটাই মূলত এই কাহিনীতে বলার চেষ্টা করা হয়েছে।

দেবী’র লেখক প্রভাত কুমার তাঁর কাহিনীর পটভূমিরূপে গ্রহণ করেছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের বাংলাদেশ। সে বাংলাদেশে একদিকে যেমন ছিল প্রাচীন ধর্মীয় গোঁড়ামির অজ্ঞতা, তেমনি অন্যদিকে ছিল ইংরেজী শিক্ষার প্রভাবে নবোন্নীলিত, সংস্কারমুক্ত নব্য যুব সম্প্রদায়। দেবী সেই যুগেরই একটি জমিদার গৃহের কাহিনী। যেখানে এই দুই বিপরীতমুখী ধারার সংঘাতে ট্রাজেডির উদ্ভব হয়। ১৯৬০ সালে দেবী শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক পায়।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষ পালনের জন্য ভারত সরকারের উদ্যোগে এক কমিটি তৈরি হল ১৯৫৮ সালে। সেই কমিটি থেকে সত্যজিৎকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের ভার দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্র শতবর্ষ পালনের মূল অনুষ্ঠানে ছবিটি দেখানো হবে। তবে কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য সত্যজিৎকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবনের ওপর তথ্যচিত্রের বিরোধিতা করেন।

তাঁদের যুক্তি ছিল, সত্যজিৎ রায় একজন মূলত চলচ্চিত্রকার, তিনি ইতিহাসবিদ নয়। ফলে তাঁর দ্বারা এমন একটা কাজ যথার্থভাবে করা সম্ভব নয়। শতবার্ষিক কমিটির সভায় চেয়ারম্যান ছিলেন তদানিন্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের ঐতিহাসিকের দরকার নেই, আমাদের দরকার একজন শিল্পীর। নেহেরু আরো বলেছিলেন, ‘সত্যজিৎ রায় সেই মানুষ, কোন ইতিহাসবেত্তার তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করার দরকার হবে না।’ বড় বেশি ভালোবাসতেন জওহরলাল নেহেরু সত্যজিৎ রায়কে।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর যে শোকযাত্রা বেরিয়েছিল তা দিয়েই তথ্য চিত্রের শুরু। তারপর ধীরে ধীরে কবির বংশ, পরিবার, বাল্যকাল, যৌবন, বার্ধক্যে তাঁর বিচিত্র প্রতিভার তথ্যাদি উপস্থাপিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রে সংগীত, দৃশ্য, ভাষা ছাড়াও তার আকর্ষণীয় দিক হল, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাংকন; পান্ডুলিপির কাটাকুটি থেকে শিল্পী হিসেবে উত্তরণ এবং শেষ দৃশ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে সভ্যতার সংকট ভাষণটির স্থাপনা।

৫৪ মিনিটের এই তথ্যচিত্রের দৈর্ঘ্য নিয়ে ভারত সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সমস্যায় পড়েছিল। ঠিক হয়, এই রাজ্যে সত্যজিতের কণ্ঠে ভাষ্যসহ পূর্ণাঙ্গ ছবিটি দেখানো হবে; অন্যত্র ২০ মিনিটের সম্পাদিত তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে। ১৯৬১ সালে ৫ মে দিল্লীতে ছবির মুক্তির সময়ে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘আই ডিড অ্যাজ সাচ ওয়ার্ক অন ইট অ্যাজ অন থ্রি ফিচার ফিল্মস। মাই অ্যাপ্রোচ টু দ্য বায়োগ্রাফি ওয়াজ টু স্ট্রেস টেগোর অ্যাজ এ হিউম্যান বিইং এন্ড পেট্রিয়ট।’

রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রটি এ দেশে এবং বিদেশে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিল। মুক্তির পর ছবিটি দিল্লীতে সরকার এবং বিদেশী মিশনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জন্য প্রদর্শিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু সত্যজিতকে একটি রৌপ্য ফলক উপহার দেন। ছয় রিল এবং ৪,৮৪৪ ফুটের তথ্যচিত্র এমনই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, ছবিটি শেষ হবার পরও নেহেরু এবং ড. রাধাকৃষ্ণন বেশ কিছুক্ষণ নীরবে বসেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রের শুরুর এক বছর আগে সত্যজিৎ ১৯৬০-এর আগস্ট এ তিন কন্যা’র শ্যুটিং শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিনটি ছোট গল্প; মনিহারা, পোস্ট মাষ্টার এবং সমাপ্তি নিয়ে এই ছবিটি তৈরি হয়।

পোস্ট মাস্টার গল্পটির শ্যুটিং আগে শেষ হয়। এখানে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অনিল চট্টোপাধ্যায় এবং রতনের চরিত্রে চন্দনা বন্দ্যোপাধ্যায়, এক নৃত্য শিক্ষার স্কুল থেকে তাকে নির্বাচন করা হয়েছিল। তার অভিনয় এত বেশি সুন্দর ও প্রাণবন্ত ছিল যে, অনিল চট্টোপাধ্যায়ের মত অভিজ্ঞ অভিনেতার অভিনয়ও ম্লান হয়ে গিয়েছিল। তিনকন্যা ছবির স্মরণযোগ্য প্রসঙ্গ হল যে, এই ছবিতে সত্যজিৎ রায় প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

তিনকন্যা ছবির পোস্ট মাস্টারের পর সমাপ্তি-র শ্যুটিং হয়। এখানে মূল ভূমিকায় ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অপর্ণা দাশগুপ্ত। অপর্ণাকে নির্বাচনে সাহায্য করেছিলেন বিজয়া রায়। অপর্ণা ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির অন্যতম প্রধান সংগঠক চিদানন্দ দাশগুপ্তের কন্যা। এই ছবিতে অপর্ণার অভিনয় সম্বন্ধে সত্যজিৎ একটু অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দ্য ওনলি ট্রাবল ওয়াজ হার অ্যাকসেন্ট ইন বেঙ্গলি হুইচ ওয়াজ রাদার সোফিসটিকেটেড।’ তুবও অপর্ণার চেহারা ও অভিনয় সমাপ্তির মৃন্ময়ীকে জনপ্রিয় করেছিল।

মনিহারা’য় অভিনয় করেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কণিকা মজুমদার। মনিহারা-র উল্লেখযোগ্য অংশ হল এর সঙ্গীতের ব্যবহার। সত্যজিৎ তাঁর চল্লিশ বছর বয়সের জন্মদিনের পর দিন তিনকন্যা ইন্ডিয়া ফিল্ম ল্যাবরেটরীতে দেখালেন। তিনকন্যা ছবিটিও প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা পেল কিন্তু বিদেশে ছবিটি দৈর্ঘ্যরে কারণে পুরো দেখানো সম্ভব হয়নি। মনিহারা-কে বাদ দিয়ে ছবিটির নাম টু ডটারস্ করে ছবিটি প্রদর্শিত হয়।

১৯৬২ সালে সত্যজিৎ রায় কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিটি বানালেন। অনেক দিক দিয়ে ছবিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রথম সত্যজিৎ নিজের কাহিনী নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করলেন এবং এই প্রথম তিনি ছবিতে রং নিয়ে এলেন। আর এই প্রথম কাহিনীর সাথে সময় এবং স্থানের সামুজ্য আনলেন। এখানে রঙের এক বিশাল ভূমিকা আছে। দুই বোন, অনিমা আর মনীষার শাড়ি, অলংকার, ঠোঁটের রং আর কপালের টিপ একই সঙ্গে তাদের সামাজিক অবস্থান, তাদের চরিত্র এবং জায়গা বা পরিবেশের কথাও বলে দেয়।

উজ্জ্বল রঙ শুধু সেই অশ্বারোহী শিশুটির গায়ে যাকে কোন সমস্যা বা ভাবনা আক্রমণ করেনি। শুধু তাই নয়, প্রতিটি ছোটো বা বড় চরিত্রের পোশাকেও তাদের সামাজিক পরিবেশ আর মূল্যবোধ ধরা পড়ে; সেই সঙ্গে ঘন্টা দুয়েকের সীমানায় দার্জিলিং পাহাড়ের দৃশ্যের ঘন ঘন বদল কখনো রোদ, কখনো কুয়াশা, পাইনের সারি, উঁচু নিচু পথ, ম্যাল প্রতিটিই এই রঙিন ছবিতে কাহিনীর চরিত্র হয়ে গিয়েছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা সম্বন্ধে আরো একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হল, এই ছবিটা সম্পূর্ণই আউটডোরে শ্যুটিং হয়েছে। দশ রিলের ছবিটির জন্য সত্যজিৎ সময় নিয়েছেন মাত্র ছাব্বিশ দিন।

১৯৬২ সালেই সত্যজিৎকে অপ্রত্যাশিতভাবে তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে অভিযান ছবির কাজ করতে হয়। মূলত সত্যজিতের বন্ধু বিজয় চট্টোপাধ্যায় ছবিটি তৈরির কথা ভেবেছিলেন এবং সত্যজিৎকে দিয়ে তিনি ছবিটির চিত্রনাট্যও তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন। শ্যুটিং লোকেশন দেখার জন্য বিজয় চট্টোপাধ্যায় এবং বংশী চন্দ্রগুপ্ত সত্যজিৎকে বাংলা-বিহার সীমান্তে অবস্থিত বীরভূমের দুবরাজপুরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানকার, দৃশ্যপট বিশেষ করে মস্ত মস্ত পাথর ছড়ানো পাহাড় দেখে সত্যজিৎ অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ঐসব দৃশ্যগুলোকে কাজে লাগাবার জন্য চিত্রনাট্যের সংশোধন করেন।

অভিযান ছবির প্রথমদিনের শ্যুটিং এ সত্যজিৎ হাজির ছিলেন। বন্ধুকে কিছু পরামর্শও দিলেন। শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের অনুরোধে সত্যজিৎকেই এই ছবির নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। একশ পঞ্চাশ মিনিটের এই ছবিটি সত্যজিতের দীর্ঘতম সৃষ্টি। বিজয় চট্টোপাধ্যায়ের পরিকল্পনা মতোই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নরসিং চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর গুলাবি চরিত্রের জন্য সত্যজিৎ রায়ের ওয়াহিদা রহমানকে পছন্দ হয়েছিল। সেই সময় ওয়াহিদা রহমান বোম্বের নামকরা নায়িকা। একটি ছবির জন্য তিনি যে পরিমাণ পারিশ্রমিক নিতেন তাতে গোটা অভিযান ছবির কাজ হয়ে যাবে। তারপরও সত্যজিৎ রায় ওয়াহিদা রহমানকে অভিযানে অভিনয় করার জন্য পাঠালেন।

ওয়াহিদা রহমানের কাছে সত্যজিতের বার্তা নিয়ে গেল বন্ধু বিজয় চট্ট্যোপাধ্যায় এবং অনিল চৌধুরী। সত্যজিতের ছবিতে অভিনয় করার জন্য ওয়াহিদা রহমান সাথে সাথে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অভিযান ছবিতে অভিনয়ের জন্য যে পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন তা ছিল সেই সময়কার বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ওয়াহিদার একদিনের উপার্জন। অভিযান ছবিটি সকলকেই মুগ্ধ করেছিল এবং খুব ভাল চলেছিল।যা চাইতেন তা ধরে ফেলতেন।

নরেন মিত্রের লেখা অবতরণিকা ও আকিঞ্চন গল্প নিয়ে ১৯৬২ সালে সত্যজিৎ শুরু করলেন মহানগর ছবির কাজ। মাধবী মুখোপাধ্যায়কে আরতি চরিত্রের জন্য নেয়া হয়। ইতোপূর্বে মাধবী মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ এবং ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণ রেখা’য় অভিনয় করেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে স্বপরিবারে মাধবী কোলকাতায় এসেছিলেন।

১৯৬৪ সালের ১৮ মার্চ ঢাকায় এক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষের দিনে মহানগর এর প্রদর্শনী হয়। প্রবল উৎসাহে সেদিন বেশ কয়েক হাজার দর্শক টিকিটের জন্য লাইন দিয়েছিলেন; প্রচুর জনসমাগমে সেদিন এক ধরনের হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায় এবং পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য লাঠিচার্জ করতে হয়। ফলাফল স্বরূপ প্রায় ১৫০ জন আহত হয়। অতিরিক্ত প্রদর্শনীয় দাবীতে কর্তৃপক্ষ সেদিন সকাল দশটা থেকে পরের দিন সকাল ৪.৩০ টা পর্যন্ত এক নাগাড়ে ছবিটির ১০ বার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে।

১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীতে ঢাকার পল্টন ময়দানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আপ্লুত সত্যজিৎ বলেছিলেন। ‘কয়েক বছর আগে যখন এখানে মহানগর ছবিটি দেখানো হয়েছিল, তাতে এখানকার জনসাধারণ কি ধরনের আগ্রহ, কৌতুহল প্রকাশ করেছিল এবং তার ফলে কী ঘটনার উদ্ভব হয়েছিল, সে খবর আমার কানে যখন পৌঁছায়। আমি সে কথা বিশ্বাস করিনি, কিন্তু তারপর এখান থেকে বহু বন্ধু আমাকে চিঠি লিখে, খবরের কাগজের খবর কেটে পাঠিয়েছিলেন। ….. বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভাবতে পারিনি যে এটা হতে পারে। একজন শিল্পীর এর চেয়ে বড় সম্মান, এর থেকে গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।’ ১৯৬৩-র ভারতের রাষ্ট্রীয় মানপত্র পেয়েছিল ছবিটি।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন :  সত্যজিৎ রায় ও বাংলা চলচ্চিত্র : পর্ব ১।

Facebook Comments Box
share on:
মনিস রফিক

মনিস রফিক

মনিস রফিকের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই রাজশাহী শহরে। ২০০৭ সাল থেকে চলচ্চিত্র ও আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা, পত্রিকা সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টোতে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কিছু বই হচ্ছে - ক্যামেরার পেছনের সারথি, চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা, তারেক মাসুদ : চলচ্চিত্রের আদম সুরত, সুবর্ণরেখা : প্রসঙ্গ ঋত্বিক ( সম্পাদনা), তিতাস একটি নদীর নাম ( সম্পাদনা)।