সত্যজিৎ রায় ও বাংলা চলচ্চিত্র : পর্ব ১

share on:
সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায় নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি একটা প্রবল ভূমিকম্পের মত ভারতীয় চলচ্চিত্রের গৃহীত কাঠামোকে চূর্ণ করলো। পথের পাঁচালী যে নব বাস্তববোধ দর্শক ও সমালোচকদের হতবাক করেছিল তাই একদিন সত্যজিৎ রায়কে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তুলল।

বালক সত্যজিৎ যখন দশে পা দিল, তখন পৌষমেলা দেখার জন্য শান্তিনিকেতন গিয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন মা সুপ্রভা রায়। নতুন অটোগ্রাফের খাতা কেনা হয়েছে। ভীষণ শখ জেগেছে প্রথম আটোগ্রাফটা নিবে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। এক সকালে মা’র সঙ্গে সত্যজিৎ গেল উত্তরায়ণে। পারিবারিকভাবে ঠাকুর পরিবার আর রায় পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুন্দর সম্পর্ক। সত্যজিৎ এর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন আর পিতা সুকুমার রায় ছিলেন বিশ্বকবির পরম স্নেহভাজন। সুকুমার রায় সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকার তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ পাঠক। দশ বছরের বালক সত্যজিৎ রায়, যাকে মানিক নামেই রবীন্দ্রনাথ চিনতেন, বিশ্বকবির সামনে কিছুটা  ত্রস্ত ভঙ্গিতে অটোগ্রাফের খাতাটা নিয়ে দাঁড়াতেই কবি পরম স্নেহে কাছে টেনে নিলেন। জানতে চাইলেন খাতা নিয়ে সে কেন এসেছে। বালক মানিক খাতাটা এগিয়ে তার ইচ্ছার কথা জানাল। কবি তার দিকে কিছুক্ষণ তাকালেন তারপর স্নেহে বললেন, ‘এটা থাক আমার কাছে; কাল সকালে এসে নিয়ে যেও।’ কথামত মানিক পরের দিন গেল। টেবিলের উপর চিঠি-পত্র, খাতা-বইয়ের ডাঁই, তার পিছনে বসে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মানিককে দেখতেই তার ছোট্ট বেগুনী খাতাটা খুঁজতে লাগলেন সেই ভীড়ের মধ্যে। মিনিট তিনেক হাতড়ানোর পর বেরোল খাতাটা। তারপর সেটা তাকে দিয়ে মা সুপ্রভা রায়ের দিকে চেয়ে বললেন, এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে।’ খাতা খুলে বালক সত্যজিৎ আট লাইনের ভুবনজয় করা কবিতাটা দেখল। বিশ্বকবির ঘর থেকে বের হয়ে উত্তরায়ণের সামনের যে বিশাল আমগাছ তার নীচে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে আবৃত্তি করতে লাগল;

বহু দিন ধরে’ বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছে সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু ॥

একটানে আটটি লাইন আবৃত্তি করে কিছুক্ষণ থামলো সে। তারপর দম নিয়ে লাইনগুলোর নীচের শব্দগুলো উচ্চারণ করলো- ৭ই পৌষ ১৩৩৬ শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ততক্ষণ মা এসে পিছনে দাঁড়িয়েছেন। জানতে চাইলেন লাইনগুলোর মানে বুঝেছে কিনা। সে তখন অল্প মাথা ঝাঁকিয়ে জানাল, ‘কিছুটা’।

ভারত উপমহাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে সম্মানীত ব্যক্তি এবং যাঁকে চলচ্চিত্র জগতের রবীন্দ্রনাথ বলা হয় সেই সত্যজিৎ রায় সম্ভবত বালক বয়সেই বিশ্বকবির এই আটটি লাইন মনের অজান্তেই গভীরভাবে ধারণ করেছিলেন। ফলে ফর্মে আন্তর্জাতিক হলেও বিষয়ে প্রচণ্ডমাত্রায় দেশজ হতে পেরেছেন আর একটানে বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বের চলচ্চিত্র কাতারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালে ২মে কোলকাতায়। পূর্বপুরুষের বাসস্থান বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার মসুয়া গ্রামে। মাত্র আড়াই বছর বয়েসে পিতাকে  হারানোর ফলে তাকে আর তার মা’কে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটতে হয়। তবে মামার আশ্রয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পান মা ও ছেলে। মা চাকুরী নেন একটি স্কুলে। আট বছর পর্যন্ত সত্যজিৎ মায়ের কাছে বাড়ীতেই পড়াশুনা করেন। তারপর ১৯৩০ সালের জানুয়ারী মাসে বালিগঞ্জ সরকারী বিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্স এ ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই সত্যজিৎ ১৯৩৬ সালের মার্চ মাসে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর দশ মাস। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৬ সালেই তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। এই কলেজে তাঁর পিতামহ ও পিতৃদেবও ছাত্র ছিলেন।

কলেজের ছাত্র হবার পর বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত চর্চায় আরো বেশি মন দেন। আগে যেমন চলচ্চিত্র বিষয়ে ভাবতে গিয়ে শুধুমাত্র অভিনেতাদের নিয়ে ভাবতেন, এবার তাঁর আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ছবি পরিচালনা ও পরিচালক। ইতোমধ্যে পুদভকিনের চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক দিক সর্ম্পকে দুটি বই পড়ে ফেলেছেন তিনি এবং সেই সময়ে বৃটেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পত্রিকা সাইট এন্ড সাউন্ড এর গ্রাহক ও হয়েছেন তিনি। সাইট এন্ড সাউন্ড পত্রিকার চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখাগুলো তাঁকে কিভাবে আলোড়িত তা বলতে গিয়ে পরবর্তী জীবনে তিনি লেখেন, ‘যেন একটা নতুন জগতের দরজা খুলে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে । … নজর করে দেখছি যে, ক্যামেরাটাকে কোথায় কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, কোন দৃশ্য কোথায় ‘কাট’ করা হচ্ছে, ছবির গল্পাংশ কীভাবে উম্মোচিত হচ্ছে আর কী কী সেই বৈশিষ্ট্য যা একজন পরিচালকের কাজকে আর একজনের কাজ থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।’ সেই সময় কোন ছবির ডিসটিংটিভ কোয়ালিটি ফিনিশ দেখে সত্যজিৎ আলাদা করতে পারতেন এমজিএম থেকে প্যারামাউন্ট বা ওয়ার্নার থেকে টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরী ফক্সের ছবি। সেই সঙ্গে ফোর্ড এবং ওয়াইলার, বা কাপরার সঙ্গে স্টিভেন্স এর মতো পরিচালকের ছবির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে ফেলতেন। শেষ জীবনে সেই কিশোর সময়ের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বারবার বলতেন, ‘দিস ওয়াজ প্রেসাইজলি দ্য পয়েন্ট হোয়ার মাই ইনটারেস্ট টুক এ সিরিয়াস টার্ণ।

১৯৩৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবার পর সত্যজিৎ ঠিক করেছিলেন হিউম্যানিটিজের কোনও বিষয় নিয়ে পড়বে। তাঁর ইচ্ছে ছিল সাহিত্য নিয়ে পড়বে। কিন্তু ভারতের প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ পিতৃহীন বন্ধুপুত্রকে সাহায্য করার ইচ্ছায় সুপ্রভা রায়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সত্যজিৎ যদি অর্থনীতিতে অনার্স নিয়ে বি.এ পরীক্ষা দেয়, তাহলে তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান স্ট্যাটেটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের মুখপত্র সংখ্যা পত্রিকায় চাকুরীর সুবিধা হতে পারে। ‘চাকুরী’ এই শব্দ বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তনের পক্ষে নিশ্চয় বরী বড় লোভনীয় ছিল। ফলে সত্যজিৎ অনেকটা বাধ্য হয়েই অর্থনীতিতে অনার্স নিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থনীতি তার ভালো লাগত না। স্রেফ মুখস্থ বিদ্যার জোরে একটা সেকেন্ড ক্লাস নিয়ে সত্যজিৎ রায় অনার্স পাশ করেন।

সত্যজিৎ রায়ের মায়ের একান্ত বাসনা ছিল, সত্যজিৎ শান্তি নিকেতনের শিল্প বিষয় নিয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে কলকাতার পাইকপাড়ার সিংহবাড়ীতে এক অনুষ্ঠানে সুপ্রভা রায় ও সত্যজিৎ রায় গিয়েছিলেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সুপ্রভা কবিকে প্রণাম করতেই কবি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ছেলে কি করছে? তাকে আমাদের আশ্রমে পাঠাও না কেন?’ রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে সুপ্রভা রায়ের সুপ্ত ইচ্ছটা জেগে উঠল এবং এক রকম জোর করেই সত্যজিৎকে শান্তি নিকেতনে জ্ঞানলাভ করতে পাঠালেন। কলকাতার সরগরম পরিবেশ ছেড়ে শান্তিনিকেতনের মত একটি নিরব নিশ্চুপ পরিবেশে যেতে তার একেবারে মন টানছিল না। উপরন্ত শান্তিনিকেতনে নিয়মিত সিনেমা দেখার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া আশ্রমিকদের কিছুটা মেয়েলি ও কৃত্রিম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সত্যজিতের একবারে পছন্দের ছিল না। কিন্তু মা’য়ের ইচ্ছের কাছে একমাত্র বাধ্য সন্তান ১৯৪০ সালে ১৩ জুলাই শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হলেন। শান্তিনিকেতনের প্রথম দিনে সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কবি তখন উত্তরায়ণ চৌহদ্দির মধ্যে সবে তৈরি ‘উদীচী’ বাড়িতে ছিলেন। সেখানে সত্যজিৎ দেখলেন, কবি সামনের বারান্দায় বসে আছেন আরাম কেদারায় ঠেস দিয়ে, তাঁর চাদরে ঢাকা পা দুটো সামনে একটা টুলের ওপর তোলা।

সত্যজিৎকে দেখে খুশী হলেও মুখের ভাবে সে খুশী প্রকাশ করার একটু অসুবিধা ছিল, কারণ একজন নাম করা বাঙালী ভাস্কর তার মূর্তি গড়ছেন মাটি দিয়ে। আর রবীন্দ্রনাথ অনড় হয়ে বসে তাকে সিটিং দিচ্ছিলেন। শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর যে বিশেষ দু’জনের স্নেহ সত্যজিৎ সারাজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতেন তারা হচ্ছেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। তিনি প্রায় বলতেন। শান্তি নিকেতন তাঁকে দুটি বিষয় শিখিয়েছে- ছবি দেখা এবং প্রকৃতিকে চেনা। ফলে ভীষণ বাস্তববাদী কবিত্বহীন মন নিয়ে তিনি শান্তিনিকেতনেই খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ভবিষ্যতের যাত্রাপথ। তিনি বলেছেন, ‘দ্য প্লেস হ্যাড ওপেনড উইনডোস ফর মি। ইট হ্যাড ব্রট টু মি অ্যান আওয়ারনেস অফ আওয়ার ট্রাডিশনস হুইচ আই নিউ উড সার্ভ অ্যাজ এ ফাউন্ডেশন ফর এনি ব্রাঞ্চ অফ আর্ট দ্যাট আই উইশড টু পারস্যু।’ এইখানেই ভবিষ্যতের এক শিল্পীর গড়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।আড়াই বছর শান্তিনিকেতনে চিত্রকলার শিক্ষগ্রহণ করে অধ্যক্ষ নন্দলাল বসুর অনুমতি নিয়ে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হওয়ার বাসনায় তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। অথচ সত্যজিৎ এর শান্তিনিকেতনে চার বছর থাকার কথা ছিল।

শান্তিনিকেতন থেকে চলে আসার তিনমাস পরে ১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল সত্যজিৎ চাকুরী পেলেন বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমার-এর জুনিয়র ভিসুলাইজার আর্টিস্ট হিসেবে। বাইশ বছরের চলচ্চিত্র রসিক সত্যজিৎ তখনো চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠার কথা ভাবেন নি। ১৯৪৮ সালে নাগাদ সত্যজিৎ ডি জে কিমার আর্ট ডিরেক্টর হয়েছিলেন।

চাকরী জীবনে শনিবার বিকেলে ফিল্ম দেখা তাঁর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেয়েছিল। চলচ্চিত্র সংক্রান্ত পড়াশুনার জন্য মাঝে মধ্যেই যেতেন ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরফেশন লাইব্রেরীতে। সেখানেই আলাপ হয়েছিল বংশী চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে। কাশ্মীর থেকে ১৯৪৩ সালে কলকাতায় আসা বংশী ইতোমধ্যে কলকাতা গ্রুপের সদস্য হয়েছেন এবং চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর গভীর ভাবনা থাকায় খুব সহজেই সত্যজিতের সাথে বংশীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সেই দিনগুলোতে সত্যজিতের হাতে রজার ম্যানভিলেন ফিল্ম বইটি। বইটির শেষ পরিচ্ছেদের শিরোনাম ছিল হোয়াই নট স্টার্ট এ ফিল্ম সোসাইটি। লেখাটি নিয়ে সত্যজিৎ বংশী দুজনেই নিজেদের মধ্যে আলাপ করলেন। অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন কলকাতায় একটি ফিল্ম সোসাইটি সংগঠিত করবেন। সমমনা চলচ্চিত্রে আগ্রহী কিছু যুবক নিয়ে ১৯৪৭ সালের ৫ অক্টোবর যাত্রা শুরু হয় ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির। পঁচিশজন সদস্য নিয়ে সোসাইটিটির পত্তন হয়। সত্যজিৎ ও বংশী চন্দ্রগুপ্ত ছাড়া সোসাইটির উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হচ্ছেন, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, পূর্ণেন্দু নারায়ণ, মনোজেন্দু মজুমদার। সত্যজিৎ লিখেছেন, ‘সাধারণত আমাদের বাড়ীর বৈঠকখানায় বসে আমরা ১৬ মিলিমিটারের ফিল্ম দেখতাম এবং যেসব ফিল্ম দেখতাম তার নানান দিক নিয়ে আলোচনা করতাম নিজেদের মধ্যে। আমরা প্রথম দেখেছিলাম আইজেনস্টাইনের ক্ল্যাসিক ছবি ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’।

যে পথের পাঁচালী ছবি করে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র পরিচালনার জগতে নিজের স্থান করে নেন, সেই পথের পাঁচালী’র কাহিনীটা একটু নাটকীয়ভাবে তাঁর জীবনে আসে। সত্যজিৎ যে কোম্পানীতে চাকুরী করতেন, সেই কোম্পানী থেকে বাংলা সাহিত্যের সব সুন্দর বইগুলো একেবারে সাধারণ পাঠক বা কিশোরদের উপযোগী করে নতুন সংস্করণে ছাপা হতো। আর এই সব বইগুলির প্রচ্ছদ থেকে ছবি আঁকার দায়িত্ব পড়তো সত্যজিৎ রায়ের উপর। একদিন কোম্পানীর ডি কে গুপ্ত সত্যজিৎকে ডেকে বললেন। পথের পাঁচালীর এক কিশোরপাঠ্য সংস্করণ বের হবে এবং এর ছবিগুলো তাঁকে আঁকতে হবে। সময়টা ছিল ১৯৪৫ সাল। সত্যজিৎ তখনও পথের পাঁচালী পড়েন নি। ব্যপারটা শুনে ডি কে গুপ্ত তাঁকে স্নেহ ধমক দিলেন এবং জানিয়ে দিলেন, এই বইয়ের কাহিনী থেকে একটি সুন্দর চলচ্চিত্র হতে পারে। সত্যজিৎ তিনশত পৃষ্ঠার মূল বই পড়ে ফেললেন। পড়ে শুধু তিনি অস্ফূট স্বরে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘অপূর্ব’! তারপরই কাহিনীটা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।

এর মধ্যে কয়েক বছর কেটে গেল। পথের পাঁচালী নিয়ে ছবি করার ভাবনা একেবারে উস্কে গেল ১৯৪৯ সালে। বিখ্যাত ফরাসী চলচ্চিত্রকার জ্যঁ রেনোয়া সেই সময় কোলকাতায় এসেছেন তাঁর ছবি দি রিভার এর লোকেশন দেখার জন্য। সেই সময়ে রেনোয়ার কোলকাতায় আগমন ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির তরুণদের অদ্ভুতভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। রেনোয়া সত্যিই ছিলেন একজন ‘মেকার’। এই ‘মেকার’ শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ অর্থেই নয় বরং চলচ্চিত্রের পরিচালক ও কলাকুশলী তৈরির অর্থেও। রেনোয়া আপন করে নিয়েছিলেন বাংলার এই চলচ্চিত্র পাগল যুবকদের। তিনি সোসাইটির খোঁজ খবর রাখতেন। সোসাইটির ছেলেদের সাথে বসে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে খুঁটিনাটি আলাপ করতেন এবং উৎসাহী যুবকদের প্রত্যক্ষভাবে চলচ্চিত্র বিষয়ক জ্ঞান দেওয়ার জন্য নিজের শ্যুটিং ইউনিটে কাজের সুযোগ করে দিতেন। তবে কোলকাতার এই যুবকদের মধ্যে রেনোয়ার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল সত্যজিৎ রায়কে। ছয় ফুটের উপরে লম্বা এই বাঙালী ছেলেটির বিশ্ব চলচ্চিত্র এমনকি তাঁর ছবি নিয়ে এত স্বচ্ছ ধারণা তাঁকে বিস্মিত করেছিল।

সত্যজিৎ তখন চাকুরী করেন। শুধুমাত্র শনিবার তাঁর ছুটি। রেনোয়া যতদিন কোলকাতায় ছিলেন সেই দিনগুলোতে সত্যজিৎ প্রতি শনিবার রেনোয়ার কাছে আসতেন। তারপর তাঁর গাড়ীতে করে বের হয়ে যেতেন নতুন শ্যুটিং লোকেশন-এর সন্ধানে। রেনোয়াও সত্যজিতের জন্য আকুলভাবে অপেক্ষা করে থাকতেন। রেনোয়াকে সত্যজিৎ প্রথম বলেছিলেন পথের পাঁচালী নিয়ে ছবি করার। রেনোয়া শুধু  বলেছিলেন, ‘তোমার বাংলায় যে ঐশ্বর্য আছে, সেটাই ব্যবহার কর। নিছক হলিউডের  ছবির নকল করার কথা কখনো ভাববে না। তবে পাশ্চাত্য জ্ঞান আবশ্যই গ্রহণ করবে।’ হয়তোবা গুরু রেনোয়ার কথাগুলোকে সত্যজিৎ চিরদিন সম্মান জানিয়ে এসেছেন, ফলে দেখা যায় তিনি ফর্মে আন্তর্জাতিক হলেও বিষয়ে একেবারে দেশজ। আটত্রিশ বছর পর সত্যজিৎকে ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানীয় বেসামরিক পুরস্কার লিজিয়ন অফ দ্য অনার দেওয়ার জন্য স্বয়ং ফরাসী রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া মিতেরা ছুটে এসেছিলেন কোলকাতায়। সেই সময় এক প্রশ্নের উত্তরে সত্যজিৎ জানিয়েছিলেন, ফ্রান্সের জ্যঁ রেনোয়া তাঁর প্রিন্সিপাল মেন্টর।

১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ মামাতো বোন বিজয়ার সাথে সত্যজিতের বিয়ে হয়। ১৯৫০ সালের এপ্রিলে কোম্পানীর লন্ডন শাখায় তাঁকে কাজ করার জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সত্যজিতের ঐ মুহূর্তে লন্ডন যাবার কোন ইচ্ছে ছিল না। কারণ তাঁর মন পড়েছিল রেনোয়ার দি রিভার শ্যুটিং-এর প্রতীক্ষায়। যাহোক অফিসের কর্তাদের প্ররোচনায় আর ইংল্যান্ডের চলচ্চিত্র কাছ থেকে দেখার স্বপ্নে ১৪ এপ্রিল বিজয়া ও সত্যজিৎ সমুদ্র পথে রওনা হলেন। জাহাজে করে কলম্বো থেকে লন্ডনে পৌঁছাতে ষোল দিন লেগেছিল। এই দিনগুলোতে তিনি পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্যের খড়সা করে ফেললেন। উল্লেখ্য, পথের পাঁচালী কিশোর সংস্করণকে আম আঁটির ভেপু নামকরণ করা হয়।

নিঃসন্দেহে, ১৯৫৫ সালকে বাংলা চলচ্চিত্রের মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এটির কারণ হচ্ছে এই বছরে পথের পাঁচালী’র মুক্তিলাভ। এমন একটি ক্ষণ-এর জন্য যে দীর্ঘ পরিশ্রম ও সাধনার প্রয়োজন সত্যজিৎ রায় তাঁর জীবন দিয়ে সেটা দেখিয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পথের পাঁচালী নিয়েতো চিন্তাভাবনা ছিল, তবে ১৯৫১ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত চলচ্চিত্র উৎসব বলতে গেলে তাঁকে ঠেলে দিল পথের পাঁচালী নির্মাণের জন্য । সেই উৎসবে আসা ছবিগুলো মধ্যে অন্যতম ডি সিকার বাইসিক্ল থিফ, মিরাকল ইন মিলান, রোসিলিনির ওপেন সিটি, টাটির জুর দ্য ফেত এবং আকিরা কুরোসাওয়ার রশোমন। সত্যজিতের মতে, তাঁর উপরে রশোমন এর প্রভাব ছিল ‘ইলেকট্রিক’। পরপর তিনদিন তিনি রশোমন দেখেছেন। তিনি বলেছেন ‘কী তীব্র আবেদনে যে এ ছবি আলোড়িত , স্বচক্ষে না দেখলে তা আন্দাজ করা যায় না।’ এই উৎসবের যে ফল সত্যজিতের উপর পড়ল তা হচ্ছে, তাঁর মনে আর কোন সংশয় রইল না যে তিনি ছবি করবেন। আর পথের পাঁচালী’ই হবে তাঁর প্রথম ছবি।

১৯৫২ এর ডিসেম্বর মাসে বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারকে জানানো হয়েছিল যে, সত্যজিৎ পথের পাঁচালী নিয়ে ছবি করতে আগ্রহী। সত্যজিৎ রায়ের খুব ইচ্ছে ছিল যে, বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর উপন্যাস নিয়ে কথা বলা এবং তাঁর পরিকল্পনার কথা জানানো। কিন্তু ১৯৫০ সালে পহেলা নভেম্বরে বিভূতিভূষণের আকস্মিক মৃত্যু হলে সত্যজিৎ এর আশা পূরণ সম্ভব হয় নি। এই মৃত্যুতে সত্যজিৎ খুবই বেশি ম্রিয়মান হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময়ে পথের পাঁচালী’র চিত্রস্বত্ত্বের জন্য অনেকেই বিভূতিভূষণের বিধবা স্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন এবং মোটা অংকের টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন। কিন্তু রমা দেবী টাকার প্রলোভনে না পড়ে সত্যজিৎকেই ছবিটি করার অনুমতি দেন। এর পেছনে অবশ্য কাজ করেছিল, আম আঁটির ভেঁপু বইয়ে করা সত্যজিতের চমৎকার সব ইলাসট্রেশন আর সত্যজিতের পরিবার। কারণ রমা দেবী নিজে ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমার রায়ের অত্যন্ত অনুরাগী। রমা দেবী শুধু সত্যজিৎ রায়কে বলেছিলেন, শুধু শ্যুটিং এর অর্থ জোগাড় করতে, চিত্রস্বত্ত্বের অর্থ নিয়ে না ভাবতে। তবে সেই সময় বেশ কয়েকজন পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক রমা দেবীর কাছে এমন অনুযোগ করেছিলেন যে, সত্যজিৎ এর মত কম বয়স্ক ও চলচ্চিত্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ একজনের হাতে এত সুন্দর একটা কাহিনী দিয়ে যে ছবিটি তৈরী হবে, সেখানে অবশ্যই উপন্যাসের মৃত্যু ঘটবে।

পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্যের ঝামেলা শেষ হবার পর সত্যজিৎকে পড়তে হল প্রযোজক জোগাড়ের সমস্যায়। নতুন এক পরিচালককে বিশ্বাস করে কেউ অর্থলগ্নি করতে চাইলো না। তার উপর এই ছবিতে কোন নামীদামী অভিনেতা অভিনেত্রী নেই যাদের দেখে দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে ছুটে আসবে। পথের পাঁচালী’র বাজেট ছিল সত্তর হাজার টাকা। এই টাকার জন্য বা প্রযোজক জোগাড় করে দেবার জন্য সত্যজিৎ এবং তাঁর বন্ধুরা প্রথমে গেলেন সেই সময়ের কোলকাতার একমাত্র শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত রঙ্গমঞ্চের মালিক শিশির মল্লিক এর কাছে। তিনি চিত্রনাট্যের বিন্যাস শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। তখনই তিনি রানা এন্ড দত্তকে পথের পাঁচালীর জন্য জোর সুপারিশ করেন। রানা বাবু প্রথম কিস্তিতে চল্লিশ হাজার টাকা দিতে রাজী হন। তবে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন, যে ছবিতে স্টার নেই, গান নেই এবং মারপিঠ নেই, সেই ছবিতে এত অর্থ খরচ হবে কি করে? তবে প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো সত্যজিতের ভাল লাগছিল না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আসলেই ছবি তুলতে পারেন কি না, এটা বুঝানোর জন্যই কিছু দৃশ্যের শ্যুটিং করে প্রযোজকদের দেখাবেন। আর এ কাজের জন্য অন্তঃত দশ হাজার টাকা সংগ্রহের  জন্য তিনি তাঁর ইন্সিওরেন্স থেকে প্রায় সাত হাজার টাকা এবং বাকী টাকা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেন। পথের পাঁচালী’তে যে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের কথা রয়েছে, বিভুতিভূষণের প্রিয় গোপাল নগর গ্রামে গিয়ে সত্যজিতের মনে হয়েছিল, ছবির মূল শ্যুটিংটা ওখানেই করবেন।

মূল শ্যুটিং এর টাকা প্রথম প্রথম রানা বাবু দিতে থাকেন, কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে তিনি অর্থের যোগান বন্ধ করে দেন। মহাঝামেলায় পড়ে শ্যুটিং ইউনিটের পুরো দল। এই ঝামেলা থেকে সাময়িক উদ্ধারের জন্য বিজয়া রায় তাঁর সমস্ত গয়না দিয়েছিলেন, সেগুলো বন্ধক রেখে কয়েকটি দিন শ্যুটিং চলেছিল। পথের পাঁচালী শেষ করার জন্য সত্যজিৎকে তাঁর বহুদিনের বহু কষ্টে সংগৃহীত বড় আদরের বিদেশী প্রকাশনের বৃহদাকার বই, অ্যালবাম এবং বিদেশী ধ্র“পদী সঙ্গীতের রেকর্ডগুলো বিক্রী করে দিতে হয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছবিটি শেষ করার জন্য এগিয়ে আসে। উল্লেখ্য, তখন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়। ডা. রায়ের সিদ্ধান্তে ছবির পুরো সত্তর হাজার টাকা সত্যজিৎকে দেয়া হয় যদিও সেই সময়ের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চলচ্চিত্র বিষয়ক কর্মকর্তা সত্যজিৎ রায়কে এই অর্থ প্রদান সম্পূর্ণই জলে গেল বলে মন্তব্য করেছিলেন। অথচ শুধুমাত্র ১৯৬১ সালে পথের পাঁচালীর মার্কিন ডিস্ট্রিবিউটর এডওয়ার্ড হ্যারিসন কোম্পানী পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ৫০,০০০ ডলার রয়্যালটি দিয়েছেন; সরকারের অবশ্য আরো প্রাপ্য বাকী ছিল। চুক্তির শর্তে কোন উল্লেখ থাকার ফলে সত্যজিৎ পথের পাঁচালী ছবি থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এই বিশাল অংকের অর্থের কোন অংশ পান নি। অর্থ পাওয়া সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করায়, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “নট আ পেনি। দে গেট দ্য মানি বাট আই গট দ্য ফেম।”

১৯৫৫ সালের ১৯ আগষ্ট পথের পাঁচালী মুক্তি পায়। ছবিটি শুরু থেকে প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পথের পাঁচালীর জন্য সত্তর হাজার টাকা দিতে গিয়ে বলেছিল, টাকাটা পুরোটায় জলে যাচ্ছে, সেই সরকারের কোষাগারে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ সত্তর হাজার টাকা জমা হয়। পথের পাঁচালীকে ভারতের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা সফল ছবি বললে সম্ভবত ভুল হবে না। কারণ এটাই একমাত্র ছবি যেটা সেই সুদূর ১৯৫৫ সাল থেকে এখনো ব্যবসা করে যাচ্ছে, যার জন্য বিনিয়োগ ছিল মাত্র সত্তর হাজার টাকা।

১৯৫৫ সালেই ভারতীয় ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্ররূপে পথের পাঁচালী নির্বাচিত হয় এবং সেরা পরিচালকের সম্মান পান সত্যজিৎ রায়। কিন্তু পুরষ্কারটি ঘোষিত হয় ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। পথের পাঁচালী কোলকাতায় ২৬ আগষ্ট মুক্তি পাওয়ার পূর্বে প্রথম প্রদর্শিত হয় নিউইয়র্কে। ১৯৫৫ সালের ৩ মে তারিখে। বিদেশ থেকেই এর জন্য প্রথম পুরষ্কার আসে। ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট হিসেবে স্পেশাল জুরি পুরষ্কার পায়।

পথের পাঁচালী একটা প্রবল ভূমিকম্পের মত ভারতীয় চলচ্চিত্রের গৃহীত কাঠামোকে চূর্ণ করলো। পথের পাঁচালী যে নব বাস্তববোধ দর্শক ও সমালোচকদের হতবাক করেছিল, তার উপাদানে সত্যজিৎ রায়ের ডিটেলের বিশেষ অবদান রয়েছে।

নিশ্চিন্দিপুরের গরীব পুরোহিত হরিহরের পরিবারের কাহিনী যেমন গ্রাম বাংলার অসংখ্য মানুষের কাহিনী। হরিহরের স্ত্রী সর্বজায়া, কন্যা দুর্গা, পুত্র অপু এবং দুঃসম্পর্কের ইন্দির ঠাকুরণকে নিয়ে আবর্তিত কাহিনীর মাঝে মধ্যে যে ডিটেল সত্যজিৎ রায় ব্যবহার করেছেন তা সত্যিই ভারতীয় ছবিতে পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। শাপলা পাতার ওপর ফড়িঙের খেয়ালী নৃত্য, জল-পতঙ্গের ছন্দোবদ্ধ গতি, আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি কিংবা বর্ষণক্ষান্ত রাত্রির শেষে ভাঙ্গা রান্না ঘরে চিৎ হয়ে থাকা মরা ব্যাঙ পূর্বে কখনো এত সূক্ষ্মভাবে ভারতীয় দর্শকরা দেখেনি। এ ছবিতে ছোট্ট দুর্গার চুরি করা পেয়ারা নিয়ে ইন্দির ঠাকুরণের সেই খুশি হয়ে ওঠার মধ্যে সারা গ্রাম বাংলার অতীত যেন তার সরলতা, দারিদ্র এবং সহজ সুখ নিয়ে ধরা পড়ে। অথবা দুর্গার মৃত্যুর কয়েকদিন পরে বিষন্ন অপু স্নানের পর ভিজে চুল নিজেই আঁচড়ায়। এ কাজটা দিদির অভাবে সে প্রথম করে। এরপর গায়ে চাদর জড়িয়ে সে বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিরে আসে এবং ছাতাটা সঙ্গে নিয়ে যায়। মনে হয়েছে, একটি সহায় সম্বলহীন অতি দরিদ্র পরিবারে মাত্র কয়েকদিন পূর্বেকার একটি মৃত্যু তাকে যেন প্রাপ্ত বয়স্ক করে তোলে এবং সহসা একটা স্বনির্ভরতা এবং দায়িত্ববোধ ছোট্ট অপুর মধ্যে সচেতন হয়ে ওঠে। এমন অসংখ্য ডিটেলস্ এ পথের পাঁচালী একটি অনন্য সুন্দর চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে এবং এই নতুন ছবির স্বাদ শুধুমাত্র ভারতীয় দর্শকরা গ্রহণ করেনি বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সৎ চলচ্চিত্রের সব দর্শক তা গ্রহণ করেছে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

প্রথম পর্ব পড়ুন : সত্যজিৎ রায় ও বাংলা চলচ্চিত্র : পর্ব ২

আরও পড়ুন : ডেভিড লিন : বিশ্বসেরা নির্মাতা

Facebook Comments Box
share on:
মনিস রফিক

মনিস রফিক

মনিস রফিকের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই রাজশাহী শহরে। ২০০৭ সাল থেকে চলচ্চিত্র ও আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা, পত্রিকা সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টোতে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কিছু বই হচ্ছে - ক্যামেরার পেছনের সারথি, চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা, তারেক মাসুদ : চলচ্চিত্রের আদম সুরত, সুবর্ণরেখা : প্রসঙ্গ ঋত্বিক ( সম্পাদনা), তিতাস একটি নদীর নাম ( সম্পাদনা)।