শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় ও তার সাহিত্য পাঠ । ভবেশ রায়

share on:
শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়

শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় সমাজ জীবনের সাধারণ মানুষের রহস্যময় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করে অভিভুত হয়ে পড়েছিলেন। সেই অনুভুতির আত্মপ্রকাশ ঘটাতে গিয়েই সৃষ্টি করেছিলেন উপন্যাসের কাহিনীগুলোকে।

গল্পের ট্র্যাজেডি সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রাচীন গ্রীক দার্শনীক অ্যারিষ্টটল বলেছিলেন- সাহিত্যে চরিত্র সৃষ্টি অপেক্ষা প্লটই মুখ্য। কারণ ঘটনা বিন্যাসের অভিনবত্ব ও বিস্ময় খুব সহজে পাঠক মনকে অভিভুত ও প্রভাবিত করতে পারে।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

অবশ্য অ্যারিষ্টটলের এই মতবাদের সাথে পরবর্তীকালের কোন সমালোচক একমত হননি। আর সবচেয়ে বড় কথা যে প্রাচীন গ্রীক ট্রাজেডির প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি একথা বলেছিলেন – সেই গ্রীক ট্রাজেডির বেলাতেও একথা পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। সাম্প্রতিককালের সমালোচকগণ তো কাহিনী বিন্যাস অপেক্ষা চরিত্র সৃষ্টিকেই বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

কিন্তু তবু বলতে হয়, স্বার্থক গল্প সৃষ্টিতে এর কোনটার গুরুত্বই কম নয়। শরৎ রচনারীতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে গেলেও এমন একটি অনুভুতির সৃষ্টি হয় বৈকি। গল্প রচনায় শরৎচন্দ্রের মূল লক্ষ্য ছিল চরিত্র সৃষ্টি, সন্দেহাতীতঅ অথৎ কাহিনীও সেখানে কাজ করেছে চরিত্র সৃষ্টির মূল সহায়ক শক্তিরূপে।

শরৎচন্দ্র সমাজ জীবনের সাধারণ মানুষের রহস্যময় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করে অভিভুত হয়ে পড়েছিলেন। সেই অনুভুতির আত্মপ্রকাশ ঘটাতে গিয়েই সৃষ্টি করেছিলেন উপন্যাসের কাহিনীগুলোকে। সেই সাথে প্রস্ফুটিত হয়েছিলো চরিত্রগুলো।

তার একমাত্র ‘পরিনীতা’ উপন্যাসটি ছাড়া আর সবগুলো গল্প উপন্যাসের কাহিনীতেই চরিত্র মাধুর্য প্রাধান্য লাভ করেছে। শরৎ সাহিত্যের সর্বত্র চরিত্র সৃষ্টির তাগিদেরই অবতারণা করা হয়েছে আখ্যান ভাগের।

শরৎচন্দ্রের অপরিণত বয়সের রচনাগুলোতে পূর্ণাঙ্গ বিকশিত চরিত্রের প্রেক্ষিতে উপযুক্ত আখ্যান ভাগের উদ্ভব ঘটেনি। তাই সেখানে তিনি এ দৈন্যতা পূরণ করেছেন গল্পের মধ্যে অবিশ্বাস্য ঘটনা ও প্রবল ভাবাবেগের সৃষ্টি করে। তাঁর এসময়ের রচনাগুরোর মধ্যে পড়ে ‘দেবদাস’, ‘স্বামী’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘বিপ্রদাস’ ইত্যাদি।

অবশ্য এই অপরিপক্কতা কাটিয়ে উঠতে শরৎচন্দ্রের খুব বিলম্ব ঘটেনি। তার পরিণত বয়সের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোতে চরিত্রচিত্রণ ও কাহিনী বিন্যাস এক অপূর্ব পূর্ণতা লাভ করেছে। সেখানে কোথাও ভাবের আতিশয্য নেই, গল্প সেখানে তার আপন স্বাচ্ছন্দ গতি অব্যাহত রেখে এগিয়ে গেছে। নায়ক-নায়িকার হৃদয়ের অনুভুতি প্রকাশের জন্য গল্পের গতি কোথাও ব্যাহত হয়নি এবয় চরিত্রের প্রতি অণু-পরমাণুতে এসেছে পূর্ণতা, পেয়েছে মাধুর্যতা।

‘গৃহদাহ’ শরৎচন্দ্রের এই পর্বের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর অন্যতম। এতে নারী হৃদয়ের যে গভীরতম অন্তর্দ্বন্দের রহস্য এবং অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে তা শরৎচন্দ্রকে একজন কুশলী কথা সাহিত্যিকের অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

গঠন কৌশলের দিক দিয়েও উপন্যাসটি অদ্বিতীয়। কাহিনীর আরম্ভ এবং এর পরিণতিও অপূর্ব সামঞ্জস্য লাভ করেছে। এর কোন খন্ড চিত্রই অনাবশ্যক না। বরং প্রতিটি খণ্ড চিত্র নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে এর বিশাল ঐক্য।

শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ উপন্যাসটির মধ্যেও এমনি একটি সামঞ্জস্য বিদ্যমান।

শরৎচন্দ্রের এ দুটি গ্রন্থ শিল্প নিপুণতার অপূর্ব নিদর্শনের পরিচয় বহন করে। তার এ জাতীয় অন্যান্য যেসব উপন্যাসের নামোল্লেখ করা যায়, সেগুলো অবশ্য ‘গৃহদাহ’ ও ‘দত্তা’র মতো এতখানি সুসংগঠিত নয়।

‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে বাইরের ও অন্তরের আসক্তি ও বিরক্তির সমন্বয় সাধন হয়েছে বটে, কিন্তু অতোখানি মাত্রাবোধ ও সামঞ্জস্য জ্ঞান সমৃদ্ধ নয়। ‘দেনা-পাওনার’র গঠন বৈশিষ্ট্যও একটু ভিন্নতর। এর কাহিনীতে চরম সংকটময় মূহুর্ত এসেছে উপন্যাসের শেষ প্রান্তে নয়, প্রারম্ভেই। তাই যে কাহিনী প্রথমেই চরমে পৌছায় তাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া কষ্ট সাধ্য।

কিন্তু শরৎচন্দ্র তা করেছেন একটি ভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে। লেখক এখানে অবতারণা করেছেন ভিন্ন উপকাহিনীর। উপন্যাসের দুটো সমান্তরাল কাহিনীর একটি হলো জীবানন্দ-ষোড়শী কাহিনী, অপরটি নির্মল হৈমবতীর কথা। তবে শেষেরটি গৌণ। মুখ্য কাহিনীর প্রয়োজন সিদ্ধির জন্যই দ্বিতীয় কাহিনীর অবতারণা।

শুধু তাই নয়, একাধিক কাহিনীর সমাবেশ ঘটানোর কৌশল শরৎচন্দ্র তার আরো বেশ কয়েকটি উপন্যাসে প্রয়োগ করেছেন। ‘চরিত্রহীন’, ‘বামুনের মেয়ে’ এবং ‘শেষ প্রশ্ন’- এ তিনটি উপন্যাসের প্রত্যেকটিতেই দুটো করে সমান্তরাল কাহিনী রয়েছে।

বামুনের মেয়ে’র প্রধান আখ্যান ভাগে রয়েছে অরুণ ও সন্ধ্যার প্রণয়নকাহিনী। অপরদিকে জ্ঞানদার কাহিনী সংক্ষিপ্ত বটে, কিন্তু অপাংতেয় নয়। ‘শেষ প্রশ্ন’ উপন্যাসের শুরু হয়েছে শিবনাত ও কমলের বিয়ের পর এবং কিছুকাল পরেই অজিত ও মনোরমার বিয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কিন্তু উপন্যাসের কাহিনী কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরেই দেখা গেলো শিবনাথের বিয়ে ভেঙ্গে গেছে এবং শিবনাথ আসক্ত হয়েছে মনোরমার প্রতি। অপরদিকে অজিতের দৃষ্টি নিবন্ধ হয়েছে কমরের দিকে। এখান থেকেই দুটো কাহিনী দুটো ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়ে গেছে।

এ দুটো উপন্যাসের তুলনায় শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের কাহিনী আরো অধিকতর জটিল এবং ঘটনাবলি আরো বেশি বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন। কাহিনীর শুরুতে দেখা যায়, সতীত ও সাবিত্রীর প্রেমময় জীবনে উপেন্দ্রর কোনো স্থান নেই। উপন্যাসের দুটো প্রধান নারী চরিত্র কিরণময়ী ও সাবিত্রী সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক। উপন্যাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে দুটো শেণী গুচ্ছে ভাগ করা যায়। কিন্তু কোথাও এর যোগসূত্র নেই।

কাহিনী চিত্রণে শরৎচন্দ্রের অদ্ভুত নৈপূণ্য এই যে, তিনি একটি কাহিনীতে বহু ঘটনার অবতারণা করেছেন বটে, কিন্তু সেগুলোকে পুনরায় সংঘবদ্ধ করতে কোন জবরদস্তি করেননি। যেন কাহিনীগুলো যে যার পথ বেছে নিয়েছে, তারপর আপনা থেকেই একসময় ঘটনার – স্রোতে আবর্তিত হতে হতে অলক্ষ্যেই এসে সংলগ্ন হয়েছে মূল কাহিনীর সাথে। এ ঐক্য একেবারেই স্বাচ্ছন্দ ও অকৃত্রিম। এখানেই শরৎচন্দ্রের দক্ষতা ও নিপুণতা।

যেমন ‘চরিত্রহীন উপন্যাসে কাহিনীর বাহুল্য থাকলেও সেখানে নায়ক চরিত্রহীন সতীশ। কিন্তু গোটা কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো চরিত্রবান উপেন্দ্র। কারণ তার সাথেই সকল পাত্রপাত্রীর সম্পর্ক আছে এবং তার চরিত্রের পরিবর্তনকে উপন্যাসের কেন্দ্র ধরেই সকল যোগসূত্রের সন্ধান লাভ করা যায়। এই অসম্ভব পরিবর্তনেই বিশাল উপন্যাসটির প্লট এবয় উপেন্দ্রের অন্তিম সময়ে অনাত্মীয় কিরণময়ী ও সাবিত্রীর মিলনের মধ্য দিয়ে কাহিনীর ঐক্য এবং সংঘবদ্ধতা সংরক্ষিত হয়েছে।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্য কর্মের সর্বাধিক আলোচিত ও অসাধারণ বৈচিত্র মণ্ডিত উপন্যাস ‘শ্রীকান্ত’- এ আছে অগণিত নর-নারীর সমাগম। এরা নিজেরা প্রয়োজনেই কাহিনীতে প্রবেশ করেছে এবয় প্রয়োজন শেষে অন্তর্ধানও হয়েছে তেমনি স্বেচ্ছায় ও সন্তর্পনে। শ্রীকান্তের আখ্যানভাগের বিশালতা এতো ব্যাপক যে গোটা বিশ্ব সাহিত্যেও তার তুলনা মেলা ভার।

কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- এতো বিশাল বিস্তুতির মধ্যেও শরৎচন্দ্র তার মূল সূত্র হারিয়ে ফেলেননি। কোন একটি বিচ্ছিন্ন কাহিনী বা চরিত্রই মূল কেন্দ্রকে অতিক্রম করেনি। সর্বত্র রয়েছে একটি পরিচ্ছন্ন সংযমতা। তিনি শ্রীকান্ত ও রাজলক্ষীর মনের যে সুক্ষ বিশ্লেষণ দিয়েছেন তার দক্ষতাও সত্যি অপূর্ব এবং অনন্য।

শরৎচন্দ্রের রচনারীতির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- তার কাহিনীর বহু নায়ক নায়িকার এক একটি করে অতীত ইতিহাস থাকে। যার সাথে বর্ণিত উপন্যাসের মূল আখ্যান ভাগেরও প্রচ্ছন্ন সম্পর্ক আছে। তবে তিনি কখনো পূর্ব ইতিহাসের কাহিনীতে দীর্ঘায়িত করেন নি, যাতে পাঠক চিত্তের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। সর্বত্র দিয়েছেন সংযমের পরিচয়।

পিয়ারী বাইজীর মধ্যে কেমন করে রাজলক্ষী সংগোপনে আত্মরক্ষা করেছিল, কেমভাবে জীবানন্দের বাহন অলকার বিয়ে হয়েছিল, অথবা কেমন করে একজন তৈরবীর অন্তরালে অলকা লুক্কায়িত ছিল এবং মেসে ঝি হবার আগে সাবিত্রি কি করেছিলো- এসব কাহিনীর বিস্তারিত বর্ণণা দিয়ে তিনি কাহিনীকে ভারাক্রান্ত করেননি।

তিনি মূল আখ্যান ভাগের মধ্যেই পাঠকের কৌতুহলকে কৌশলে ধরে রেখে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের মাধ্যমে আভাষে ইংগিতে পরিতৃপ্ত করেছেন সকলকে। যার ফলে সে কাহিনী এক সুন্দর রহস্যময়তার আড়ালে থেকে গেছে আপন স্ব-মহিমায়।

শরৎচন্দ্রের রচনারীতির বড় বৈশিষ্ট্য হলো কাহিনীর বাস্তবতা। তার অনুভুতির অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোমান্টিক বটে, কিন্তু তা কখনো রিয়ালিস্ট বা বস্তুতান্ত্রিক সাহিত্য পদ বাচ্যতা থেকে দূরে নয়।

ড: শ্রী কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এ বাস্তবত প্রসংগে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের সাহিত্যে নৌ-যাত্রা বর্ণণার অনেক কবিত্বপূর্ণ, সুষম অনুভুতির বিবরণ আছে। কিন্তু শরৎচন্দ্রের বর্ণণা ভিন্ন জাতীয়। ইহার মধ্যে কবিত্বের অভাব নাই, কিন্তু কবিত্ব ইহার সম্বন্ধে প্রধান কথা নহে। ইহার মধ্যে যে অকুণ্ঠিত বাস্তবতা, যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সুর পাওয়া যায় তাহা কবিত্বকে অতিক্রম করিয়া অনেক উর্ধ্বে উঠিয়াছে’।

শ্রীকান্তের প্রথম পর্বে ছিদাম বহুরূপীর কাহিনীর, মেজদার কঠোরতা, নতুনদার পাপ, এবং প্রায়শ্চিত্ত- এ সকল বর্ণণা শরৎচন্দ্রের বাস্তব দক্ষতার ফসল। তিনি প্রতিটি বস্তু বাস্তবে দেখেছেন, তীক্ষè পর্যবেক্ষণ শক্তির মধ্য দিয়ে। বাস্তব দৃষ্টি ভঙ্গীতে।

শরৎচন্দ্রের এই বাস্তবতা চরম সাফল্য লাভ করেছে ‘অরক্ষণীয়া’তে এসে। বাস্তবতা এখানে সর্বপ্রকার কাব্যিক সুষমা বিবর্জিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। এখানে স্বল্পভাষী জ্ঞানদার চরিত্র ও অনুভুতি প্রকাশে শরৎচন্দ্র যথেষ্ঠ সংযমতারও পরিচয় দিয়েছেন। দারিদ্র নিস্পেষিত করেছে, তার জীবনকে, কঠিন ব্যাধি হরণ করেছে তার রূপ সৌন্দর্য, তার প্রেমাষ্পের কাছে সে হয়েছে উপেক্ষিতা, ভয়, কুসংস্কার আর শোকে জননীর -স্নেহকেও সে ধরে রাখতে পারে নি। ‘কিন্তু সর্বাপক্ষো সহনাতীত অপমান আসিয়াছে জ্ঞানদার নিজের হাত হইতে বিবাহের পন্যশালায় নিজেকে বিকাইবার জন্য তাহার স্বহস্ত রচিত ব্যর্থ সজ্জানুষ্ঠানই তাহার চরম লাঞ্চনা।’ মানবতার এই চরম লাঞ্চনার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তিল তিল করে। কোনকিছুকেই তিনি হালকা করে দেখেননি।

শরৎ সাহিত্যের এই বাস্তবতা সর্বজন বিদিত। শুধু তিনি বাস্তববাতী নন। তিনি ছিলেন মূলত মুক্তিবাদী লেখক। তিনি তার গল্প উপন্যাসে যে শুধু সামাজিক বা রাজনৈতিক বিদ্রোহের কথা লিখেছেন তা-ই নয়। তিনি তার সাহিত্য কর্মের এই দিকটার কথা নির্দেশ করতে গিয়ে নিজেও বলেছেন, ‘ভাবে, কাজে, চিন্তায় মুক্তি এনে দেওয়াই তো সাহিত্যের কাজ।’ কিন্তু এই মুক্তি সম্পর্কে তার ধারণা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক।

তিনি বলেছেন, ‘সাহিত্য কোন আদর্শের বাহন হবে না।’ তার মতে সাহিত্য হলো মানবাত্মার অভিব্যক্তি। বাইরের কোন আদর্শ, কিংবা দার্শনিক মতবাদ দিয়েই তাকে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। তিনি নিজেও বলেছেন, ‘মন্ত্রের ওকালতি করিতে কোন সাহিত্যিক কোনদিন সাহিত্যের আসরে অবতীর্ণ হয় না, কিন্তু ভুলাইয়া নীতি শিক্ষা দেওয়াও সে আপনার কর্তব্য বলিয়া জ্ঞান করে না।… একটুখানি তলাইয়া দেখিলে তাহার সমস্ত সাহিত্যিক দুর্নীতির মূলে হয়তো একটা চেষ্টাই ধরা পড়িবে যে সে মানুষকে মানুষ বলিয়াই প্রতিপন্ন করিতে চায়।’ এটাই শরৎচন্দ্রের সাহিত্য ধর্ম।

শরৎচন্দ্র আইডিয়ালিস্ট বা রিয়ালিস্ট ছিলেন তা বিতর্কিত। মনে হয় তাকে এ দুটোর কোনটির মধ্যেই সীমারেখা টেনে চিহ্নিত করা যায় না।

তার নিজের বক্তব্য হলো – ‘গোটা দুই শব্দ আজকাল প্রায় শোনা যায়, আইডিয়ালিস্টিক বা রিয়ালিস্টিক, আমি নাকি এই শেষ সম্প্রদায়ের লেখক। অথচ কি করে যে এ দুটোকে ভাগ করে লেখা যায়, আমার অজ্ঞাত। … যা কিছু তার নিখুত ছবিকেও আমি যেমন সাহিত্য বস্তু বলিনে, তেমনি যা ঘটে না, অথচ সমাজ বা প্রচলিত নীতির দিক দিয়ে ঘটলে ভাল হয়। কল্পণার মধ্যে দিয়ে তার উচ্ছৃঙ্খল গতিতেও সাহিত্যের ঢের বেশি বিড়ম্বনা ঘটে।’

বস্তুত শরৎচন্দ্র কোন ছক বাঁধা আদর্শেই শৃংখলিত ছিলেন না। তিনি সম্পূর্ণ মোহমুক্ত এবং অশৃংখলিত মন নিয়ে মানব জীবনকে উপলব্ধি করতেন। কল্পিত কোন আদর্শ দিয়ে নিজেকে ভারাক্রান্ত করতেন না। বস্তুতঃ এ হিসাবেও তিনি ছিলেন বাস্তববাদী।

এ বাস্তব চিন্তার নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে তিনি শুধু বাইরের দৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করেন নি। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল চরিত্র সৃষ্টি। ঘটনার অন্তরালের ঘটনার অনুধাবন করা।
শরৎচন্দ্র তার সাহিত্যের এই চরিত্র সৃষ্টি প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘আমি তো জানি কি করে আমার চরিত্রগুলো গড়ে ওঠে। বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আমি উপেক্ষা করছিনে।

কিন্তু বাস্তব ও অবাস্তবের সংমিশ্রণে কত ব্যথা, কত সহানুভুতি, কতখানি বুকের রক্ত দিয়ে এরা ধীরে ধীরে বড় হয়ে ফোটে সে আর কেউ না জানে আমি তা জানি। সুনীতি-দুর্নীতির স্থাপন এর মধ্যে আছে, কিন্তু বিবাদ করবার জায়গা এতে নেই- এ বস্তু এদের অনেক উচ্চে।’ তিনি আরেক জায়গায় বলেছেন, -‘মানুষের সু-গভীর বাসনা নর-নারীর একান্ত নিগুড় বেদনার বিবরণ সে প্রকাশ করকে না তো করবে কে?’

শরৎচন্দ্র যে কোন ছক বাধা আদর্শ থেকে সাহিত্যকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি দৈনন্দিন ঘটনাকে চরম সত্য বলে গ্রহণ করেননি। কিন্তু এসব ঘটনার অন্তরালে ক্ষণজীবী অনুভূতিকে রুপ দিয়ে চরিত্র সৃষ্টি করতে চেয়েছেন।

সাহিত্য যে অনুভূতিকে প্রকাশ করে তা কল্পণা মাত্র নয়। সাহিত্যে তাঁর সবচেয়ে বড় দান সাহিত্যিক যথাসম্ভব ভারমুক্ত করতে চেয়েছেন। সাহিত্যের অনুভূতি জন্ম লাভ হয় এর বাস্তব সত্যের মধ্যে এবং এর প্রকাশ ঘটে বাইরের ঘটনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাইরের কোন আদর্শের দ্বারা সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রিত করা চলবে না, নইলে তাকে পঙ্গু করে ফেলা হবে।

তাই দেখা যায় আইডিয়ালিস্টিক এবং রিয়ালিস্টিক এই পরস্পর বিরোধী দুটি ধারার অপূর্ব সমন্বয় সাধন ঘটেছে শরৎ সাহিত্যে। রসতত্ত্ব বিচারেও এখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি সাহিত্যে চিন্তার বিস্তৃতি ও মতের ঔদার্যের যে পরিচয় দিয়েছেন তার তুলনা বিরল। রস বিচারেও তা অনন্য সাধারণ।

আর সে জন্যই সৃষ্টির আদি থেকে অদ্যাবধি কাল পর্যন্ত শরৎ সাহিত্যের জনপ্রিয়তা এতটুকু ম্লান হয়নি। আজো পাঠক সাগ্রহে গ্রহণ করে তার গল্পকে।

আরও পড়ুন : আলবেয়ার কামু ও অ্যাবসার্ড তত্ত্ব।

* আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন parthibrashed@ymail.com এ।

Facebook Comments
share on: