স্যামুয়েল বেকেট

share on:
স্যামুয়েল বেকেট

স্যামুয়েল বেকেট আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এবং নাট্যকার। বেকেটের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকর্ম ওয়েটিং ফর গডো।

কবরের দুপাশে পা এবং একটি কঠিন জন্ম। গর্তের নীচে, অলসভাবে, কবর খননকারীরা সাঁড়াশীর উপরে রাখে। বেড়ে ওঠার জন্য আমাদের যথেষ্ট সময় আছে। বাতাস আমাদের কান্নায় পরিপূর্ণ।
— ওয়েটিং ফর গডো।

স্যামুয়েল বেকেটের জন্ম অবশ্য হয়েছিলো কোনো রকমের জটিলতা ছাড়াই ১৯০৬ সালের ১৩ এপ্রিল আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন শহরে। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে তিনি পৃথিবীর বাতাসকে ভরে দিয়েছেন নানান রকমের কান্নায়। মধ্যবিত্ত প্রোটেস্টেন্ট পরিবারের তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান এবং বেড়ে উঠেছেন কোনোরকম বাধাবিপত্তি ছাড়াই।

শারিরীক ভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া স্বত্বেও ছোটবেলা থেকেই তিনি নির্জনতার স্থবিরতাকে উপভোগ করতে শিখেছেন। শুরুতে ডাবলিন শহরে পড়াশোনা শুরু করলেও এন্নিস্কিলেন এর পর্তরা রয়াল স্কুলে ভর্তি হন যে স্কুলের ছাত্র ছিলেন অস্কার ওয়াইল্ড। এই স্কুলেই বেকেট ফ্রেঞ্চ শেখা শুরু করেন। স্কুলে বেকেটের ক্রীড়াবিদ হিসেবে বেশ সুনাম ছিলো বিশেষ করে ক্রিকেট, টেনিস ও বক্সিংয়ে।

ট্রিনিটি কলেজে পড়ার সময়ে বেকেটের মনোযোগ খেলার চেয়ে পড়াশোনার দিকে পরিবর্তিত হয়। এসময় তিনি বিষয় হিসেবে বেছে নেন ফ্রেঞ্চ ও ইতালি ভাষা। এসময় তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী ডাবলিনের নাটকের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে জে.এম সিঙ্গের নাটকের। এ সময়ে তিনি আমেরিকান সিনেমা দেখারও সুযোগ পান। বিশেষ করে  মুগ্ধ করে বুস্টার কিয়েটন ও চার্লি চ্যাপলিনের সিনেমাগুলো যা তাকে সাহিত্য দিয়ে পৃথিবী ভ্রমণের জন্য উৎসাহী করে তোলে।

পড়াশোনা শেষে বেকেট প্যারিসে যান, যেখানে তার সাথে পরিচয় হয় জেমস জয়েসের সাথে। এক পর্যায়ে জেমস জয়েসের সাথে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এসময় তিনি পারসিয়ান লিটারেরি সার্কেলের অনুপ্রেরণায় লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৩০ সালে ‘হরোস্কোপ’ নামের একটা কবিতা লেখার মাধ্যমে লেখালেখি শুরু করেন। কবিতাটি একটি প্রতিযোগীতায় ১০ পাউন্ড পুরষ্কার লাভ করে।

এরপর তিনি লেখেন ‘দান্তে, ব্রুনো… ভয়েজ জেমস জয়েস’ শিরোনামে জেমস জয়েসকে নিয়ে একটি রচনা। জেমস জয়েস হলো সেই ব্যক্তি যে বেকেটকে একজন শিল্পীর যে শৈল্পীবোধ থাকা দরকার তা বুঝতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু সে সময়ে সাহিত্যমহল জেমস জয়েসের লেখার দূর্বোধ্যতা নিয়ে সমালোচনায় মুখর। বেকেটের এ লেখার উদ্দেশ্য ছিলো জয়েসকে সহজবোধ্য করে সমালোচক ও পাঠকদের সামনে তুলে ধরা। তার এ লেখার মাধ্যমে তিনি বেশ সফলই হয়েছেন বলা যায়। এরপর থেকে জেমস জয়েসের সমালোচনা বেশ কমে এসেছিল।

এরপর বেকেট যখন ডাবলিনে ফিরে আসেন ট্রিনিটি কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, তখন তিনি তার প্রথম গল্পগুলো লিখে ফেলেছেন— পরবর্তীতে যা ‘মোর প্রিকস দ্যান কিকস’ নামে সংকলিত হয়।

ক্রমান্বয়েই বেকেট শিক্ষকতা পেশার প্রতি অনাগ্রহি হয়ে ওঠেন। ১৯৩২ সালে তিনি চাকরী ছেড়ে দিয়ে আবার প্যারিস চলে যান। এসময় তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘ড্রিম অব ফেয়ার টু মিডলিং উইম্যান’ লেখেন। কিছুদিনের মধ্যেই টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি আবার ডাবলিনে ফিরে যান। আবার কিছুদিন পরই তিনি লন্ডন চলে যান। ১৯৩৪ সালে তিনি লেখেন ‘মুরফি’ নামের উপন্যাস। উপন্যাসের পান্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের কাছে যান এবং প্রত্যাখ্যাত হন। ১৯৩৭ সালে তিনি আবার প্যারিস চলে আসেন। মুরফি প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ন্যাৎসিদের চূড়ান্ত বর্বরতা এবং অমানুষিকতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে বেকেট ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মমতা, অনৈতিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সুস্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তোলেন বেকেট তাঁর উপন্যাসে। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে বেকেট তার মায়ের কাছে ডাবলিনে যান।

এসময়ে বাড়ির ছোট্ট ঘরের কোনে বসে তার মধ্যে সাহিত্যিক নতুন বোধের জন্ম হয়, ‘ এসময় আমি আমার মূর্খতাকে উপলব্ধি করতে শিখি, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নেই আমি কেবল তাই লেখবো যা আমি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করি।’ এসময় তিনি ফ্রেঞ্চ ভাষায় লেখালেখি শুরু করেন এবং নতুন একটি সাহিত্য ভাষা সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন যাকে তিনি বলেছেন — যার আসলে কোনো শৈলী নেই।

তার প্রথম ফেঞ্চ উপন্যাস ‘মার্সিয়ের ও কামিয়ের’ — যেখানে দুজন মানুষের ঘুরে বেড়ানো, ন্যুনতম শৈল্পিক উপস্থাপনা, বারবার একই জিনিসের পূনরাবৃত্তি, সম্ভাবনাময় উদ্বেগ এবং যার ফলেই তৈরি হয়েছে ‘ওয়েটিং ফর গডো’— ১৯৭০ সালের আগে প্রকাশিত হয় নি। ‘মার্সিয়ের ও কামিয়ের’ মূলত ফেঞ্চ ভাষায় বর্ধিত গদ্য কথাসাহিত্যের প্রথম প্রচেষ্টা। এসময়ই তিনি লেখেন তার বিখ্যাত উপন্যাত্রয়ী মলয়, ম্যালোনে ডাইস, দা আন্যাম্যাবল।

১৯৪৭ সালে বেকট তার প্রথম নাটক ‘ইলেউথেরিয়া’ লেখেন। যা তিনি তার জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে দেন নি। তার মৃত্যুর পর যখন এটি ইংরেজি অনুবাদে আমেরিকায় প্রকাশিত হয়, তখন তা তুমুল বির্তকের বিষয় হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সালে বেকেট লেখেন তার বিখ্যাত নাটক ‘ওয়েটিং ফর গডো’। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে অভিনেতা ও নির্দেশক রজার ব্লিনের নির্দেশনায় প্যারিসের থিয়েটার ডে ব্যাবিলনে মঞ্চস্থ হয় ‘ওয়েটিং ফর গডো’। প্যারিসের নাট্যপ্রেমীদের জন্য নাটকটির ফরাসি নাম রাখা হয় ‘এন অ্যাটেনডেন্ট গডো’ অর্থাৎ গডো’র জন্য প্রতীক্ষা। এ নাটকের মাধ্যমেই বেকেটের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে প্যারিসে ও প্যারিসের বাইরেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়া যখন এক চূড়ান্ত অবক্ষয়ের সামনে; চারদিকে ধ্বংসযজ্ঞ; মানবতা পদদলিত; বেঁচে থাকাই যখন এক বেদনাদায়ক, ক্লান্তিকর, গ্লানিময় অভিজ্ঞতা আর অস্তিত্ব যখন হয়ে উঠছে এক ভীষণ অর্থহীন বিষয়; ঠিক সে সময় ফরাসি নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেট তার নাটক ওয়েটিং ফর গডো গডোর জন্য অপেক্ষা নিয়ে হাজির হলেন বিশ্ব দরবারে। সেই থেকে চলছে গডোর জন্য অপেক্ষা। হাজারো নৈরাশ্যের মধ্যে একটা কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় মানুষের অন্তহীন পথচলা, বিনিদ্র অপেক্ষা, তারই প্রেক্ষাপটে নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেটের অ্যাবসার্ডধর্মী নাটক ওয়েটিং ফর গডো।

বেকেটের অন্যতম প্রিয় বন্ধু জেমস নেলসনের কথায়, নাটকটির শো ছিল হাউসফুল। প্রিয় বন্ধুর রচিত নাটকটির বিখ্যাত হবার অন্যতম কারণ হিসেবে নেলসন জানান, নাটকটি’র ভিন্ন ভিন্ন অর্থ করেছেন ভিন্ন ভিন্ন নাট্যপ্রেমী মানুষ, আর এই কারণেই বিশেষ কোনো কালের গণ্ডীতে আবদ্ধ না থেকে এ নাটক হয়ে উঠেছে কালোত্তীর্ণ, সার্বজনীন।

১৯৫৪ সালে নিউইয়র্কে প্রকাশিত হয় ‘ওয়েটিং ফর গডো’র ইংরেজি অনুবাদ। তারপর থেকে সম্ভবত ২৩টিরও বেশি দেশে মঞ্চস্থ হয়েছে এ নাটক এবং ৩২—৩৩টি ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। এই কালক্রমিক ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে’ওয়েটিং ফর গডো’র অনন্যতা।

১৯৫৫ সালে লন্ডনের আর্ট থিয়েটারে চব্বিশ বছরের তরুণ পরিচালক পিটার হল—এর পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয় ‘ওয়েটিং ফর গডো’।

১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালে, বেকেট তার বিখ্যাত ও কালজয়ী মাস্টারপিস নাটকগুলো লেখেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য — এন্ডগেম, ক্র্যাপস লাস্ট টেপ, হেপি ডেইস। এসময় তিনি আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক নাটক প্রোডাশনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। তবে শুধু নাটক লেখার মধ্যেই তিনি নিজেকে সীমাবব্ধ রাখেন নি, রেডিওর জন্যও নাটক লিখেছেন, লিখেছেন উদ্ভাবনী গদ্য কথাসাহিত্য যার মধ্যে মহাকাব্য ‘হাউ ইট ইজ’ এবং ভৌতিক ‘ দা লস্ট ওয়ানস’ উল্লেখযোগ্য।

ক্রমান্বয়েই সারাবিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারও পান। যদিও বেকেটের প্রথাভাঙাই যে উত্তরকালে এক নতুন নাট্যশিল্পরীতির জন্ম দেবে, তা প্রাথমিকভাবে অনুমান করতে পারেননি অনেকেই। বোধহয় নোবেল কমিটিও সে দ্বিধায় আক্রান্ত ছিল। সম্প্রতি, ১৯৬৮ সালের নোবেল আর্কাইভস উন্মোচনে (একটি বছরের প্রদত্ত পুরস্কারের নেপথ্যকাহিনি—নথি পঞ্চাশ বছর পর তারা জনসমক্ষে আনে! তাই ’৬৮—র ফাইল খুলেছে) দেখা যাচ্ছে, সে বছর বেকেট মনোনীত থাকলেও তাঁকে পুরস্কার প্রদানে ছিল কমিটি সভাপতির ঘোর অনীহা।

তাঁদের মতে বেকেট নোবেল পুরস্কারের জন্য সঠিক নির্বাচন হবেন না ‘regarding Samuel Beckett, unfortunately, I have to maintain my basic doubts as to whether a prize to him is consistent with the spirit of Nobel’s will.’ ১৯৬৮ সালে পুরস্কার পেয়েছিলেন জাপানের ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা। নমিনেশনে নাম ছিল আরও বিখ্যাত সব লেখকদের— ডব্লিউ এইট অ়ডেন, আঁদ্রে মালরো, এজ়রা পাউন্ড, গ্রাহাম গ্রিন, চিনওয়া আচেবে, ভ্লাদিমির নাবোকভ প্রমুখ (এঁদের কেউ—ই কোনওদিন আর নোবেল সম্মান পাননি)। বেকেট—কে যদিও বেশিদিন অস্বীকার করা যায়নি। পরের বছরই সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন স্যামুয়েল বেকেট।

তবে পুরষ্কার, তাকে নিয়ে মানুষের আগ্রহকে তিনি অত বেশি আমলে নেন নি। বরং অখুশিই হয়েছিলেন। অবশ্য ১৯৭০ সালের পর থেকে তার লেখালেখি আর খুব বেশি অগ্রসর হয় নি। তাছাড়া এসময় তিনি চোখের অপারেশনও করিয়েছেন। ১৯৭০ সালের পর থেকে তিনি বিবিসির জন্য টেলিভিশন নাটক ও মঞ্চনাটক নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বেশ কিছু দিন। ১৯৭৭ সালে তিনি ‘দা অটোবায়োগ্রাফিকাল কোম্পানী’ শুরু করেন। ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে কিছু গদ্য সাহিত্য এবং নাটক লেখেন। তার শেষ উল্লেখযোগ্য কাজ গদ্য কথাসাহিত্য ‘স্টিরিংস স্টিল’ লিখেছেন ১৯৮৬ সালে।

এরপর অসুস্থ হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। ১৯৮৯ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : হেনরিক যোহান ইবসেন : আধুনিক নাটকের জনক

Facebook Comments
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।