সালমান রুশদীর সাক্ষাৎকার : দ্বিতীয় পর্ব

share on:
সালমান রুশদীর সাক্ষাৎকার

সালমান রুশদীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন জ্যাক লিভিংস। এ সাক্ষাৎকারে লেখকের  জীবন-যাপন, লেখালেখি এবং চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে।

প্রকাশিত হয়েছিল প্যারিস রিভিউ’র ১৭৪তম সংখ্যায়। অনুবাদ করেছেন মিজান মল্লিক। আজকে দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্বের লিংক শেষে দেওয়া আছে।

এটাও হারিয়ে গেল?

কী ভয়ানক! আমার অনুতাপ হয়। দিনলিপির মতো করে আমার ওই সময়টা ধরা ছিল। স্কুল বয়সটাকে নিয়ে কোনো লেখা তৈরি করতে চাইলে পাণ্ডুলিপিটা কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারতো। আর কোনোভাবেই তা সম্ভব নয়। কেন যে বাসায় রাখতে গেলাম। এখন নিজেকে বেশ বোকা লাগে।

রাগবি স্কুলে আপনার সময়টা খারাপ কেটেছিল?

আমাকে বেত্রাঘাত করা হয়নি। তবে খুব নিঃসঙ্গ ছিলাম। বন্ধু ভাবতে পারি এমন লোকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। এদিকে পূর্বসংস্কার ভরসা করে অনেক কাজ করতে হতো। শিক্ষকদের কাছ থেকে অবশ্য শিখেছি। দুই কী তিনজন শিক্ষক ছিলেন রীতিমতো প্রেরণাদানকারী। রবিন উইলিয়ামস’র চলচ্চিত্রের মতো। জে.বি, হোপ-সিম্পসন নামের বয়স্ক এক ভদ্রলোক ছিলেন। ইতিহাসের শিক্ষক। ইনিই আমাকে দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তখন আমার বয়স ১৫ বৎসর। বইটার প্রেমে পড়ে গেলাম। এখনও এর প্রায় পুরোটাই মনে করতে পারি। তখন বইটির ভাষা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কাল্পনিক সব ভাষা। এক সময় তো এলভিশ ভাষায় ঝানু হয়েই উঠলাম।

এলভিশ বলার মতো আর কেউ তখন ছিল কি?

লর্ড অব দ্য রিংস পাগল দু’একজন মাত্র ছিল।

আর কী পড়তেন?

আগাথা ক্রিস্টি, পিজি উডহাউস-এর লেখা। ইংল্যান্ড আসার আগে এরাই আমার খুব প্রিয় লেখক ছিলেন। আলিগড়ের ঘটনা। দাদা-দাদি সেখানেই থাকতেন। আমার দাদা ছিলেন বিদ্যান লোক। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তিবিয়া কলেজে পড়ান। এই ভদ্রলোক কিন্তু একজন ডাক্তার ছিলেন। ইউরাপে প্রশিণপ্রাপ্ত ডাক্তার। তবে, ইউরোপে ট্রেনিং নিলে হবে কী, তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রতি। ওষুধের প্রতি। দাদার একটা হোন্ডা ছিল। দাদার পিছনে উঠে বসতাম। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে আমাকে নামিয়ে দিতেন তিনি। ছেড়ে দিতেন বইয়ের রাজ্যে। বাহারি সব বই। উল্টে পাল্টে দেখি। পড়ি। সেখানেই পেয়ে যাই আমার সেসময়ের প্রিয় এ দুই লেখককে। পড়ি আর মুগ্ধ হই। প্রেম জমে ওঠে। বাড়িতে বই নিয়ে আসি। এক সপ্তাহ যায়, পড়ে ফেলি। আবার যাই। লাইব্রেরি থেকে নতুন বই আনি। লাইব্রেরিটা তখন সারা ভারতেই জনপ্রিয় ছিল। নামডাক ছিল। এখনো সম্ভবত তাই।

সাড়ে ১৩ বছর বয়সের আগে আর কোনো গল্প লিখেছিলেন?

ওভার দ্য রেইনবো ছাড়া আর কোনো গল্প লিখেছিলাম কিনা, মনে পড়ে না। তবে, ইংরেজি ভাষাটা সেই বয়সেই আমার দখলে ছিল। একটা ঘটনার কথা বলি। স্যার ঢুকলেন কাসে। বললেন, ছাত্রেরা, তোমরা ছড়া লিখবে। পঞ্চপদী ছড়া। মুখস্ত নয়। নিজেরা বানিয়ে বানিয়ে লিখবে। একটা হলেই চলবে, তবে যারা দুইটা লিখতে পারবে তারা খুব ভালো ধরে নেব। লিখতে শুরু করে দিলাম। একে একে ৩৭টি লিখে ফেললাম। মনে মনে একটু গর্ববোধ করলাম। স্যারের কাছে জমা দিলাম। তিরস্কার করলেন তিনি। আমি তো হতভম্ব। কপি টপি করবো কী? আমি তো কারো ছড়া মুখস্ত করে রাখিনি। একেবারে তাৎণিক রচনা। কোথায় প্রশংসা কুড়াবো তা নয়। উল্টো তিনি আমাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন।

বম্বে শহরে বহু ভাষার চর্চা করা হয়। আপনার মাতৃভাষা কোনটি?

উর্দু। উর্দুই আমার মাতৃভাষা। পিতৃভাষাও বটে। উত্তর ভারতে হিন্দি বলারও চল ছিল। লোকজন অবশ্য কোনো একটা ভাষায় কথা বলতো না। বরং হিন্দি এবং উর্দুর ঘুটমিশেল দেওয়া হিন্দুস্থানি ভাষায় কথা বলতো তারা। এই ভাষার লিখিত কোনো রূপ নেই। বলিউডি চলচ্চিত্রের ভাষা এটা। বাড়িতে আবার আমরা হিন্দুস্থানির সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলতাম। সাড়ে তের বছর বয়সে ইংল্যান্ড আসার পর দুই ভাষাতেই কথা বলি। এখনও হিন্দি, উর্দুর মিশেল দেওয়া ভাষায় কথা বলতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি। লেখার জন্য উর্দু কিংবা হিন্দিকে বেছে নিই না। ইংরেজিতে লিখি।

ভালো ছাত্র ছিলেন?

নিজেকে যতটা স্মার্ট ভাবতাম, ততটা ছিলাম না। বম্বে স্কুলের ভালো ছাত্রই ছিলাম কিন্তু ইংল্যান্ডের স্কুল রিপোর্ট দেখলে বোঝা যাবে, এখানে ততটা ভালো নয়। ভারতের আর দশটা বাবার মতোই আমার বাবা আমাকে কিছু অতিরিক্ত অনুশীলন করাতেন। বেশি বেশি রচনা লিখাতেন। মনে হচ্ছিল তিনি আমাকে শেক্সপীয়র বানাবেন। ভারতে এই চিত্র খুব দেখা যায়। বিশেষ করে পরিবারের বড় ছেলে কিংবা একমাত্র সন্তান হলে তো কথাই নেই, তাকে ঘিরে পরিবারগুলো বড় বড় স্বপ্ন দেখে। রাগবিতে ঢুকার পর একটু হাওয়া বদল ঘটে। ইতিহাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। দীর্ঘ গবেষণাপত্র এবং রচনা লিখে পুরস্কার লাভ করি। এদিকে বাবা মনে করতেন ইতিহাস পড়া কোনো কাজই না। তিনি চাইতেন ক্যামব্রিজে আমি এমন কিছু পড়ি যার একটা বাজার দর আছে।

আপনি তাকে প্রতিরোধ করেছিলেন?

সেবার প্রাণে রক্ষা করেছিলেন ড. জন ব্রডবেন্ট। তাকে গিয়ে বললাম, দেখেন, বাবা চান না আমি ইতিহাসে পড়াশুনা করি। কারণ ইতিহাস পাঠ ভবিষ্যতে কোনো কাজে দেবে না বলেই তিনি মনে করেন। অতএব, আমাকে অর্থনীতিতে পড়ার সুযোগ দেন। তা না হলে, বাবা আমার টিউশন ফি পাঠানো বন্ধ করে দেবেন। পরিচালক সাহেব বললেন চিন্তা করো না ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। বাবাকে একটা ভয়ানক চিঠি পাঠালেন তিনি। জনাব রুশদী আপনার ছেলে আমাকে সব জানিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ক্যামব্রিজে অর্থনীতিতে পড়ার মতো যোগ্যতা তার নাই। যদি মনে করেন, ইতিহাস বিষয়ে তার পড়াশুনা অব্যাহত রাখার আবশ্যকতা নাই, তাহলে আমরা বরং আপনাকে আহ্বান জানাব তাকে ক্যামব্রিজ থেকে ফিরিয়ে নেন। তার জায়গা যোগ্যতর কাউকে ঠাঁই করে দেন। তখন ১৯৬৫ সাল। পাক-ভারত যুদ্ধ চলছে। খুব বিপদ। অথচ ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে ক্যামব্রিজে পড়তে গেলাম। টেলিফোনে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছিল না। সব লাইনই তখন সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। সব ধরনের চিঠিই সেন্সর করা হতো। তারপর পৌঁছতে লাগতো কয়েক সপ্তা। তার ওপর, বোমা হামলা বিমান হামলার খবর শুনছিলাম। যাক ব্রডবেন্টের চিঠি পাওয়ার পর অর্থনীতিতে পড়ার ব্যাপারে বাবা টু শব্দটি আর করলেন না। স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর তাকে বললাম, আমি উপন্যাস লিখছি। তিনি মর্মাহত হলেন। হাহাকার করে উঠলেন: আমার বন্ধুদের কী বলবো? আসলে তিনি যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা হলো, তার বন্ধুদের অপেক্ষাকৃত কম মেধাসম্পন্ন সন্তানেরা বিরাট বিরাট চাকরি করবে। আর আমি কি না চাচ্ছিলাম, কপর্দকহীন উপন্যাস লেখক হতে? লেখালেখিকে তিনি শখের কাজ বলে গণ্য করতেন। সোভৗগ্য আমার, তিনি বেঁচেছিলেন দীর্ঘদিন। ফলে, তার জীবদ্দশাতেই দেখে গেছেন, তার ছেলের পছন্দটা মোটেও বাজে ছিল না।

তিনি তা বলেছিলেন?

আমার লেখা বইগুলোর প্রশংসা করেননি কখনো: আবেগে আর উৎসাহে রুদ্ধশ্বাস অবস্থায় ছিলেন। আমি তার একমাত্র ছেলে। আর সে কারণেই আমাদের সম্পর্কটা ছিল কঠিন। বাবা মারা যান ১৯৮৭ সালে। ইতোমধ্যে, মিডনাইটস চিলড্রেন এবং শ্যাইম উপন্যাস দুটি প্রকাশিত হয়ে গেছে। স্যাটানিক ভার্সেস তখনো বেরোয়নি। তার মৃত্যুর এক কি দুই সপ্তাহ আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার লেখালেখি নিয়ে একটা কথাও বলেননি। অথচ আমার লেখা বইগুলো শতশতবার পড়েছেন তিনি। সম্ভবত, বইগুলোকে আমার চেয়েও বেশি জানতেন। আসলে কী, তার বিরক্তি ছিল অন্য জায়গায়। মিডনাইটস চিলড্রেন উপন্যাসে যে বাবা চরিত্র আমি সৃষ্টি করেছি, তিনি এটাকে তারই স্যাটায়ার ধরে নিয়েছিলেন। বাবা কিন্তু ক্যামব্রিজে পড়াশোনা করেছিলেন। সাহিত্যে। আর এই কারণে আমার বইগুলো সম্পর্কে তিনি কিছু বলবেন এমন আশায় মুখিয়ে থাকতাম। প্রশংসা বাক্য অবশ্য শুনেছি। তবে মায়ের কাছ থেকে। আমি ভেবেছিলাম উপন্যাসে যে পরিবারের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় তাতে বরং মা সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হবেন। অথচ বইটাকে তিনি ফিকশন হিসেবেই নিয়েছিলেন। আর বাবা আমাকে ক্ষমা করার আগে একটু সময় নিচ্ছিলেন।

আপনি যে-রকম বললেন, স্যাটানিক ভার্সেস পড়ার সুযোগ তিনি পাননি?

না। বাবা আমার পক্ষে পাঁচশ ভাগ থাকতেন এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তিনি ছিলেন ইসলামী পণ্ডিত। হযরত মুহাম্মদ (স:)’র জীবন এবং ইসলামের অরিজিন সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান ছিল তাঁর। কোরান কীভাবে নাজিল হলো, আরো কতশত বিষয়ে প্রজ্ঞাবান ছিলেন। আমরা বছরে মাত্র একবার মসজিদে যেতাম। মৃত্যুবরণ করার সময় এমন কোনো মুহূর্ত ছিল না যখন তিনি ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করেছেন কিংবা এমনও নয় আর্তনাদ করে আলাহকে ডাকছিলেন, কিছুই না। মৃত্যু একটা পরিসমাপ্তি নয় এমন মোহ তার কোনো দিনই ছিল না। দারুণ চিত্তাকর্ষক ব্যাপার। আমি ইসলামের উৎসের সন্ধানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। আমার ঘরেই এর চর্চা ছিল। বাবাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ক্যামব্রিজ থেকে বের হয়ে কোথায় গেলেন?

প্রথমে অভিনেতা হওয়ার চেষ্টা করলাম। লন্ডনে থাকতাম। আমার চার বন্ধু একসাথে এক রুমে। লিখবো লিখবো ভাবছি। চিন্তা করছি অভিনয় করবো। এ সময় খুব নার্ভাস লাগতো। থিয়েটার করে বেড়ায় এমন কয়েকজন বন্ধু ছিল আমার। লন্ডনে কলেজের বন্ধু। থিয়েটার পাড়ায় তখন লেখকদেরও ভিড় ছিল। কেউ কেউ আবার ভালো অভিনেতাও। আমার অবস্থা ওদের মতো ছিল না। হাতে টাকা কড়ি নাই। কী করি? দাস্তি হাগেস নামে আমার এক বন্ধু ছিল। ক্যামব্রিজে একসঙ্গে পড়তাম। সে আবার লেখক। থিয়েটার করে বেড়ায়। একদিন দেখি, সুপার মডেলদের সঙ্গে শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন দৃশ্যে কাজ করছে। রাতারাতি বাজিমাত। টাকা হলো তার। গাড়ি কিনলো। আমাকে বললো, সালমান এ লাইনে চেষ্টা করে দেখ। ব্যাপারই না। সবই আয়োজন করলো সে। আমি ফেল মারলাম। অবশ্য, ম্যাকমেনাস নামের অন্য একটা বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি পাই। জীবনের প্রথম চাকরি।

তখন কি উপন্যাস লেখাও চালিয়ে যান?

শুরু করি বটে। তবে ব্যর্থ হই। সামনে কোনো দিক নিদের্শনা নাই। লিখি আর লিখি। কাউকে দেখাই না। সব বাজে মাল। এই রকম চলতে থাকে। এরপর আমার প্রথম উপন্যাস গ্রিমাস প্রকাশিত হয়। তার আগে অবশ্য আরেকটা উপন্যাস লিখি। জয়েস-এর চেতনাপ্রবাহ রীতি অনুসরণ করে। নাম দিই দ্য বুক অব দ্য পীর। পীর উর্দু শব্দ। যার অর্থ সাধক। প্রাচ্যের কোনো একটা দেশের এই পীর অনেক মতাধর। দারুণ জনপ্রিয়। ধনী লোকজন তার পেছনে। একজন জেনারেল তার পেছনে। তারা ভাবে ওই পবিত্র লোকটিকে ক্ষমতায় বসাবে: ক্ষমতায় বসিয়ে ওদের চোখ তো চরকগাছ; এই ব্যাটা দেখি তাদের চেয়ে অনেক বেশি ধরিবাজ। এই যেমন ইরানের লোকজন ভেবেছিল ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের স্বপ্নপূরণ হবে। অতএব, ইসলামিক র‌্যাডিক্যালিসম তারা সমর্থন করলো। হলো কী, খোমেনির মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটলো। যাক, বইটা লিখলাম। ভাষা খুব গোলমেলে ঠেকলো। ফেলে রাখলাম। বিজ্ঞাপন নিয়ে মেতে উঠলাম।

বাজে লেখা স্তূপ দেওয়ার জন্য প্রত্যেক লেখকেরই একটা করে ড্রয়ার থাকে, তাই না?

আমার আছে তিনটা। মিডনাইট’স চিলড্রেন শুরুর ৭৫ কি ৭৬ সালে আগে লিখতাম আর ড্রয়ারে ফেলে রাখতাম। সব ভূষিমাল মনে হতো। আপনি কে? এই প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত কিছুই লিখতে পারবেন না। ভারত-পাকিস্তান এদিকে ইংল্যান্ড সব মিলিয়ে আমার জীবনটা ছিল একটা জগাখিচুড়ি। ফলে, যা লিখতাম তাও হতো খিচুড়ি মার্কা। আমার প্রথম উপন্যাস গ্রিমাস কে কোনো লেখাই মনে হয় না। যাক ছাপা হয়ে গেছে। আমি প্রত্যাখ্যানও করিনি। কিছু পাঠক অবশ্য জুটলো। তারা বললেন উপন্যাসটা ভালো।
সমালোচকরা অবশ্য ধোলাই দিতে কার্পণ্য করেননি। এতে উপকার হয়েছে। এরপর থেকে কোনোকিছু লিখতে গিয়ে সাঁতপাঁচ ভেবে, তবে নেমেছি। সব সময়ই একটা ভয়ে ভয়ে থাকতাম। মার্টিন এ্যামিস, ইয়ান ম্যাকওয়ান, জুলিয়ান বার্নেস, উইলিয়াম বায়িদ, কাজাও ইশিগুরু, তিমথি মো, এ্যাঞ্জেলা কার্টার, ব্রসি চ্যাটউইন প্রমুখরা তখন চুটিয়ে লিখছেন। ইংরেজি সাহিত্যের এ এক বিশেষ মুহূর্ত। আমি তখন সবে শুরু করেছি। কোন পথে যেতে হবে জানা নাই। অতএব, ব্যাপার খুব সহজ ছিল না।

মিডনাইটস চিলড্রেন, বিনিথ হার ফিট, ফিউরি, শলিমার দ্য কাউন-এর মতো সফল উপন্যাস লিখলেন। রচনা করলেন স্যাটানিক ভার্সেস। রুশদী ততদিনে এক কিংবদন্তির লেখক। তো স্যাটানিক ভার্সেসের শুরুর কথা একটু বলবেন?

একদল লোক আসমান থেকে পড়লেন। এই দৃশ্যটা, উপন্যাসটি শুরুর দিকের। এখন যেমন আছে। অথচ, এই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার আগে, শত শত পৃষ্ঠা লিখেছি। আর ভাবছি, দৃশ্যটা আঁকলাম। হচ্ছেটা কী? এ দৃশ্য কোথাকার? এখানকার নয় তো।

এই দৃশ্য দিয়ে, এভাবেই শুরু করলেন?

ভারি মজার দৃশ্য। শুরুটা অপূর্ব হয়েছে এমন ভেবে ছিলাম। আমার এখনো তাই ধারণা। যাক্ বই প্রকাশিত হলো। বহুলোক বইটাকে ঘৃণা করলো। অনেকে ভালোবাসলো। একজন লেখকের জন্য মজার অভিজ্ঞতা হলো, একটা বই তিনি লিখছেন, হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, যেভাবে লিখবেন বলে মনে মনে ঠিক করেছিলেন, এ বস্তু ঠিক তার থেকে আলাদা হচ্ছে। গতিপ্রকৃতি যাচ্ছে পাল্টে। এর মধ্য দিয়েই তিনি বইটির সমস্যাগুলো চিহ্নিত করবেন। সমাধান দেবেন। ফিউরি লিখছি শিরোনাম বদলে যাচ্ছে। প্রতিদিন। কী বিপদ! অনেক দিন ভেবে পাইনি বইটা কী বিষয়ে লিখছি। নিত্যদিন ঘুম ভেঙে দেখি উপন্যাসটা বদলে যাচ্ছে। এর নাম ঠিক করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারিনি বইটার উপজীব্য কী। কী নিয়ে লিখছি? পুতুল সম্পর্কে এ উপন্যাস, নাকি নিউইয়র্ক, সন্ত্রাস নাকি স্রেফ বিবাহ বিচ্ছেদ কাহিনী বর্ণনা করছি? মিডনাইট’স চিলড্রেন লেখার ক্ষেত্রেও একই মুশকিলে পড়ি। নাম স্থির করার ঝামেলা পোহাই। এক সময় ভাবলাম আগে নাম তো ঠিক করি। তারপর লেখালেখি। নাম ঠিক করতেই কয়েক দিন কেটে গেল। এইবার, দুইটা জুটলো। চিলড্রেন অব মিডনাইট এবং মিডনাইটস চিলড্রেন। নাম দুইটাকে একটার পর একটা টাইপ করতে থাকলাম। একদিন পর মনে হলো, চিলড্রেন অব মিডনাইট বাজে ধরনের। মিডনাইটস চিলড্রেনই খাসা। মনে ধরলো। উপন্যাসটির কেন্দ্রবিন্দু দেখতে পেলাম। স্যাটানিক ভার্সেস লিখতে গিয়ে দেখা দিল আরেক সমস্যা। ভেবে পাচ্ছিলাম না উপন্যাস কি তিনটা হবে না একটা। একে একটা উপন্যাস হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেকটা সময় পার করে দিই। দীর্ঘ উপন্যাস। লিখতে লিখতে ছেদ পড়তে পারে। বিরতি দিতে হতে পারে। তারপরও ঝুঁকি নিলাম। সাহস করলাম। আত্মবিশ্বাস ছিল দৃঢ়। ইতোমধ্যে দুটো উপন্যাস লিখে অসাধারণ সাফল্য লাভ করলাম। টের পেলাম ট্রাঙ্কে বিপুল জ্বালানি মজুদ আছে। আমার যা খুশি লেখার মতো মতা আর রসদ আছে।

খ্যাতি আর ফতোয়া সালমান রুশদীকে ইতোমধ্যে একটা কাল্ট-এ পরিণত করেছে। এই দুই বস্তু লেখার টেবিলেও হাজির হয়?

না। নিঃশব্দ নিরিবিলি ঠাঁই করে নেওয়ার হিম্মত লেখকদের থাকে। আমি আমার ঘরে। দরোজা বন্ধ। কোনোকিছু লিখছি। সেই মুহূর্তে লেখাই তাৎপর্যপূর্ণ আর কিছু নয়। লেখালেখি শক্ত কাজ। লেখা আপনাকে চাইবে খুব করে। অথচ মাঝে মধ্যে আপনার মনে হবে সব কথা ফুরিয়ে গেছে। বলার আর বাকি নেই। বাকশক্তিহীন মূক বলে নিজেকে অবিষ্কার করবেন। কোনো বই লেখার ক্ষেত্রে, আমার মনে হয়, শেষ অংশটা থেকে শুরু করাই ভালো। স্টুপিড অংশটা দিয়েই শুরু করবেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে, একটা স্মার্ট সমাপ্তি টানবেন। লেখা শুরুর পর অনুভব করবেন, আপনার কাজ খুব বেশি নয়। অপর্যাপ্তই। কখনো দেখা দেবে অন্য উৎপাত। বুঝতে পারবেন না আপনার কাজটা কী। কঠিন ব্যাপার! একবার কাজে মগ্ন হয়ে পড়লে, খ্যাতিমান হওয়ার জন্য হাহুতাশ করার মতো বেহুদা সময় আপনি আর পাব।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : সালমান রুশদীর সাক্ষাৎকার : প্রথম পর্ব

Facebook Comments Box
share on: