জোসেফ রুডইয়ার্ড কিপলিং

share on:
জোসেফ রুডইয়ার্ড কিপলিং

জোসেফ রুডইয়ার্ড কিপলিং নোবেল বিজয়ী বৃটিশ-ভারতীয় লেখক , সাংবাদিক, ছোট গল্পকার, কবি ও ঔপন্যাসিক ।  তার সময়ে তিনি  ছিলেন বিশ্বে, বিশেষত যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয় লেখকদের অন্যতম।  ছিলেন ডান রক্ষণশীল, পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বন্ধু  ও সনাতন ভারতীয় সমাজের নিবিড় পর্যবেক্ষক।

১৯০৭ সালে তিনিই প্রথম ইংরেজি ভাষার লেখক, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ভূষিত হন। ৪১বছর বয়সে, সর্ব কনিষ্ঠ প্রাপক । এর আগে অবশ্য তিনি  ‘ব্রিটিশ পোয়েট লউরেটিশিপ’ ও ‘নাইটহুড’ খেতাব দু’টাই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ভারত নিবাসী বাবা লকউড কিপলিং ছিলেন ভাস্কর শিল্পী ও মৃৎশিল্পী। তিনি বোম্বের স্যার জামশেদ জী  আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন। রুডইয়ার্ড কিপ্লিং জীবনের বিভিন্ন সময়ে মোট প্রায় ৬৫ বছর ভারতে বসবাস  করেন।

শৈশবে ১৮৭০ সালে ইংল্যান্ডে একটি ফস্টার পরিবারে এবং তারপর বোর্ডিং-এ থেকে স্কুল জীবন যাপন । বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও একাডেমিক যোগ্যতা না থাকায়, তা হয়ে উঠে নি। ১৮৮২ সনে ফিরে আসেন ভারতে।

কিপলিং পরে লাহোরে ‘The Gazette ‘-এ সাংবাদিকতার কাজ করেন বছর খানেক। ফাঁকে ফাঁকে অনেক গল্প লিখেন। তার অনেকগুলোই  ‘Plain Tales from the Hills’, বইয়ে সংকলিত হয়। এরপর  The Gazette-এর  ভাতৃ সংস্থা ‘The Pioneer’-এ  সহযোগী সম্পাদক হয়ে এলাহাবাদ চলে আসেন। বছর দুয়েক  কাজ করেন ওখানে ও রাজস্থানে।

সংস্কৃতি ডটকম

১৮৮৮ জানুয়ারিতে কলকাতায় ‘Plain Tales from the Hills’, বইটি প্রকাশিত, তার ২২তম জন্মদিনের এক মাস পর। এরপর কিছু অর্থ হাতে আসায় তিনি পশ্চিমের বড় সাহিত্য কেন্দ্র লন্ডনে চলে যেতে মনস্থ করেন।

পরের বছর  তিনি ভারত ত্যাগ করেন;  রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং জাপানের হয়ে সান ফ্রান্সিসকোতে যাত্রা করেন ।  কিছু দিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

১৮৯২ সালে কিপলিং বিয়ে করেন এক আমেরিকান বন্ধুর বোন ক্যারোলিন বালস্টিনকে ।  মার্কিন মুলুকে  ভারমন্টের (Vermont) তাঁর পরিবার নিয়ে বসবাস করেন । ওখানে  কিপলিং লিখেছেন ‘ দ্য জঙ্গল বুক ‘  (১৮৯৪) । স্ত্রীর পরিবারের সাথে তিক্ততার কারনে কিপলিং ইংল্যান্ডে ফিরে যান ১৮৯৬ সালে। তখন তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।

‘দ্য জাঙ্গল বুক’  কিপলিং-এর এ সাহিত্যকর্মকে তৎকালের ভারতীয় ও বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজের রূপ ও চরিত্রের রূপক বর্ণনা বলা যায়।  ‘দ্য জাঙ্গল বুক’এর  উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে – আইন ও স্বাধীনতা। গল্পগুলোয় প্রাণী জগতের আচরনের দিককেই শুধু তুলে ধরা নয়; – বরঞ্চ ডারউইনের টিকে থাকার লড়াইকেও  উপজীব্য করে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও, প্রাণীর ন্যায় মানব আচরণও এর উল্লেখযোগ্য দিক। তারা জঙ্গলের নিয়ম-কানুনে নেতৃত্বদানকারীকে সম্মান, শ্রদ্ধা প্রদর্শনসহ সমাজে তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে শিখে। তা সত্ত্বেও, গল্পগুলোয় ভিন্ন জগতে অবাধে চলাচলের স্বাধীনতার বিষয়েও চিত্রিত করা হয়েছে।

দ্য জাঙ্গল বুক-এর  সবটাই কি ছোটদের? তার অনেকখানি জুড়েই রয়েছে প্রাপ্তমনস্কতা ! রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর ‘দ্য জাঙ্গল বুক’এ  বারবার একটা কথাই ঘুরেফিরে এসেছে—জঙ্গলের রাজত্ব, জঙ্গলের আইন। তা তো কঠিন, কঠোর, রক্তাক্ত এক জঙ্গল। আর অন্যতম প্রধান চরিত্র ‘মোগলি’ নামে মানুষের বাচ্চাটি সেখানে কখনও  নিরুপায়, কখনও মুখাপেক্ষী, কখনও স্বার্থপর, কখনও ষড়যন্ত্রী, কখনও আবার হয়তো রাজনৈতিকও !

এই সকল উদারতাবাদি ঈশ্বরেরা (ইংরেজগনের রূপক) প্রাচ্যের মানুষকে সভ্য করার গুরু দায়িত্ব হাতে নিয়েছিলেন। এ রকম এক ‘ঈশ্বর’ ছিলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং বিখ্যাত চরিত্র “মোগলি”র স্রস্টা ‘দ্য জাঙ্গল বুক’ গ্রন্থে, বাম সমালোচকদের মতে।

মোগলি-বাঘীরা-বালু-কা-শের খানেরা ছোট পর্দায় ফেরে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে।  এটির  টিভি  টোকিওতে জাপানী অ্যানিমেশন হয় ২০১৫র দিকে। তার হিন্দি ডাবিং করে ২০১৮তে ভারতীয় দূরদর্শনেও প্রদর্শিত হয়।

১০০ বছরেরও বেশি আগে লেখা   ‘দ্য জাঙ্গল বুক’ বইটি অদ্যাবধি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করছে।  বইটির ৫০০-এর অধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়াও, ১০০-এর অধিক অডিও-বুক রয়েছে।  কমপক্ষে ৩৬ ভাষায় এ গ্রন্থের অনুবাদ করা হয়েছে। শিশুদের দেখার মতো হলেও আপাদমস্তক বড়দের একটা ছবি।

কাদের চৌধুরী
কাদের চৌধুরী, লেখক।

কিপলিং-এর এতই জনপ্রিয়তা ছিল যে, কিপ্লিং-এর এক বন্ধু কানাডার তৎকালের মিডিয়া মোঘল  উইলিয়াম ম্যাক্সেল এইকেন একবার  কিপ্লিংকে ব্যাক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন, রক্ষণশীলদের পক্ষ থেকে ১৯১১তে  কানাডার সাধারণ নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য।

উইলি. এইকেন ছিলেন বৃটিশ – কানাডিয়ান ব্যাক-স্টেজ রাজনীতিক।  কানাডায় সর্বাধিক প্রচারিত তার রক্ষনশীল ‘Daily The Express’  পত্রিকা দেশের নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। ২য় মহাযুদ্ধ কালে এইকেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী  উইনস্টন চার্চিল  কেবিনেটে  বিমান উৎপাদন মন্ত্রীও ছিলেন।

যাক , কানাডায় তখন অন্যতম ইস্যু ছিল,  তৎকালের কানাডার লিবারেল প্রধানমন্ত্রী স্যার উইলফ্রিড  লরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিতর্কিত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছিলেন, যা স্যার রবার্ট বোর্ডেন-এর  ‘কানাডা  রক্ষণশীল পার্টি’  জোর বিরোধিতা করেছিল।

‘The Montreal Daily Star’  পত্রিকা কিপলিং-এর এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিবৃতি সে সময়  ফ্রন্ট-পেজে প্রকাশ করেছিল। বিবৃতিতে কিপলিং বলেছিলেন,  ‘এটা তার নিজের আত্মা, যা কানাডা আজ ঝুঁকিতে ফেলেছে’। (“It is her own soul that Canada risks today.) ।

সে সময় ‘মন্ট্রিয়ল ডেইলি স্টার’ ছিল কানাডার সবচেয়ে বহুলপঠিত সংবাদপত্র। পরের সপ্তাহে কানাডার প্রায় প্রতিটি ইংরেজি সংবাদপত্রে কিপলিংয়ের বিবৃতি পুনর্মুদ্রিত হয়। লিবারেল সরকারের বিরুদ্ধে  কানাডীয় জনমত গঠনের জন্য।

গ্রেট বৃটেনে ১৯২০সনে কিপলিং অন্যান্যের সাথে ‘লিবারেল লীগ’ নামে পার্টিও গঠন করেন। এই স্বল্পায়ু পার্টিটি, তৎকালে সে দেশে ক্রম-বর্ধিষ্ণু কমিউনিস্ট প্রবণতা মোকাবেলা করার জন্য লিবারেল বক্তব্য প্রচার করে। বৃটিশ লেবার পার্টিকে মনে করা হত কমিউনিস্ট পার্টির ‘ছদ্মবেশী শাখা’ । তৎকালের বৃটিশ লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনালডের সরকারকে কিপলিং উল্লেখ করেছিলেন, ‘বুলেট বিহীন বলশেভিক’, ‘ মস্কোর দালাল’ ।  কিপলিং সে সময় ইতালির বেনিতু মুসোলিনিকেও সমীহ করতেন; তবে তার ফেসিস্ট আদর্শকে নয়।

কমিউনিজম-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও,  তখন প্রথমবারের মত  লেনিন  শাসনাধীন রাশিয়ায় কিপলিং-এর  প্রধান অনুবাদগুলি প্রচারিত হয়।  দুই মহাযুদ্ধ কালে রাশিয়ার পাঠকদের কাছে কিপলিং জনপ্রিয় ছিলেন।

অনেক নব প্রজন্মের রাশিয়ান কবি ও সাহিত্যিক, যেমন কনস্ট্যানটিন সিমোনোভ তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ।  কিপলিং-এর রচনা শৈলী, চলতি ভাষার ব্যবহার এবং সহজ ছন্দের প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্ভাবন হিসেবে দেখা হয়েছিল তার কবিতা । তথাপি তাকে ‘ ফ্যাসিবাদী ‘ ও ‘ সাম্রাজ্যবাদী ‘ হিসেবেই  আক্রমণ করা হত রাশিয়ার উঁচু মহল হতে। ১৯৩৯ এ  সেখানে  কিপলিং-র বই নিষিদ্ধ হয়।

রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর বইয়ের অনেক পুরনো সংস্করণের প্রচ্ছদে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব প্রতিফলিত  ছিল। সে গুলোতে মূর্ত প্রতীক হিসাবে যেমন গণেশ, পদ্মফুল, সূর্য-  যা  সৌভাগ্য বা বিধাতার আশীর্বাদের সূচক হিসাবে সমসাময়িক ভারতীয় লেখকরাও নিজেদের বইয়ের প্রচ্ছদে ব্যবহার করতেন ।

১৯৩৬এর প্রথমে তিনি অসুস্থ হয়ে পরেন। আলসারের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয় শরীরে। এক সপ্তাহেরও কম সময় পরে তিনি মারা যান। কিন্তু তার মৃত্যু সংবাদটি ভুলবশত কাগজে ছাপা হয়েছিল আগেই।  তখন কিপলিং এ সংবাদটি পড়ে নিজেই ঐ সংবাদপত্রকে লিখেন, আমার মৃত্যু সংবাদটি এইমাত্র পড়লাম; – তাই আপনাদের গ্রাহক তালিকা হতে আমার নামটি কেটে দেবেন।

এ জাতীয় অপ্রত্যাশিত নজির আরও আগে ছিল। আবিষ্কারক, ব্যবসায়ী এবং রসায়নবিদ আলফ্রেড নোবেল, পত্রিকায় যার আগাম মৃত্যু-সংবাদে  তাকে ‘মৃত্যুর বণিক ‘ বলে নিন্দা করা হয়েছিল। সেটাই হয়তো তাকে নোবেল পুরস্কার সৃষ্টির জন্য তাড়িত করেছিল ।  কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদী নেতা মার্কাস গারভি, অভিনেতা আবে ভিগোদা প্রমুখেরও মৃত্যু-সংবাদ বাস্তবে মৃত্যুর আগেই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।

২০১০  সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন’  বুধ গ্রহের পৃষ্টে পরিদৃষ্ট দশটির  একটি গর্ত কিপলিং-এর নামে নামকরণ করে।

জোসেফ রুডইয়ার্ড কিপলিং ১৮ জানুয়ারি ১৯৩৬ মৃত্যু বরন করেন।

আরও পড়ুন : আলবেয়ার কামু ও অ্যাবসার্ড তত্ত্ব

অবহেলিত নোবেলজয়ীর স্মৃতি।

Facebook Comments Box
share on: