প্যারাসাইট রিভিউ : বিশ্ব সেরা চলচ্চিত্র

share on:
প্যারাসাইট

প্যারাসাইট বং জুন হো পরিচালিত দক্ষিণ কোরিয়ান চলচ্চিত্র। প্যারাসাইট চলচ্চিত্রটি প্রথম অন্য ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জয় করে।

প্যারাসাইট সিনেমার গল্প দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি পরিবারের গল্প। একটি পরিবার গরীব, আরেকটি পরিবার খুব ধনী। গরীব পরিবার থাকে একটা বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে অর্থাৎ মাটির নীচের ফ্ল্যাটে। আর ধনী পরিবারটি থাকেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়িতে।

প্যারাসাইট সিনেমা বুঝতে হলে আপনাকে প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়ার সোলে শহরের মানুষের জীবনযাত্রা ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখতে হবে। সাম্প্রতিককালে কোরিয়ায় শ্রেণী বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপক হারে।

সিনেমার কাহিনী কাল্পণিক, কিন্তু সিনেমায় দেখানো শ্রেণী বৈষম্য কাল্পণিক নয়। এরকম বেসমেন্টে বাস করে সোলে শহরের হাজার হাজার নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার। স্থানীয় ভাষায় এ ফ্ল্যাটগুলোকে বলে বানজিহা। বানজিহাগুলো কেমন ফ্ল্যাট তা বোঝার জন্য কিছু লেখার দরকার নেই। প্যারাসাইট সিনেমা দেখলেই পুরোটা বুঝতে পারা যাবে।

বানজিহায় বসবাসকারি পরিবার ও পরিবারের তরুণ—তরুণীরা এ জীবনের প্রতি প্রচন্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে বেড়ে ওঠে, কঠোর পরিশ্রম করে এবং স্বপ্ন দেখে বানজিহা থেকে মুক্তির। কেননা কোরিয়ান সমাজে বানজিহায় বসবাসকারীদের খুবই নীচু চোখে দেখা হয়।

বানজিহার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। যখন উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা চরমে। এসময় দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার প্রতিটি বিল্ডিংয়ের নীচে বেসমেন্ট তৈরির আদেশ জারি করে। যাতে যুদ্ধকালিন পরিস্থিতিতে বিল্ডিংয়ের সব পরিবার এটাকে বাংকার হিসেবে ব্যবহার করে নিরাপদে থাকতে পারে। আশির দশকে তীব্র আবাসন সংকট দেখা দেওয়ায় বানজিহাগুলোকে ভাড়া দেওয়া শুরু হয়। যদিও আইনে এর আগে বানজিহা ভাড়া দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল।

প্যারাসাইট সিনেমায় এক পর্যায়ে ধনী পার্ক পরিবারের সাথে বানজিহায় বসবাসরত দরিদ্র জিম পরিবারের পরিচয় হয়। পরিচয়টা শুরু হয় পরিবারের ছেলে জি—ইউয়ের টিউশনি শুরু করার মাধ্যমে। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন কৌশলে জি—ইউ তাদের পরিবারের সব সদস্য বাবা—মা—বোনের চাকরীর ব্যবস্থা করে ধনী পরিবারে। পার্ক পরিবারের ছোট ছেলে এ পর্যায়ে লক্ষ্য করে — জিম পরিবারের সদস্যদের গায়ে কেমন একটা উৎকট গন্ধ।

কিম তার গা থেকে এ গন্ধ দূর করতে চাইলে মেয়ে বলে— এটা বানজিহার গন্ধ। চাইলেই এটাকে দূর করা যাবে না। এজন্য বানজিহায় থাকা বন্ধ করতে হবে। এক সময় গন্ধ দূর করার এ সুযোগটা এসে যায়। পার্ক পরিবার বেড়াতে যায়। এসময় পরিবারের সবাই গিয়ে পার্ক পরিবারের বিলাসবহুল বাড়িতে ওঠে। দূর্যোগটা শুরু হয় এখান থেকেই।

পরিচালক বং জুন হোর কৃতিত্ব হলো— বিনোদন দিতে দিতে সমাজের শ্রেণী বৈষম্য, লোভ থেকে তৈরি হওয়া পশুত্ব তুলে ধরা। যা পূঁজিবাদী সমাজের প্রতি তুমুল একটি আঘাত।

বং জুন হোর কোনো সিনেমার গল্পই প্রচলিত বা সহজ সরল পথে এগোয়নি, আর এটাই তাকে এসময়ের মাস্টার একজন নির্মাতার কাতারে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। দর্শককে আনন্দ দিতে দিতে এমন একটা অবস্থার মুখোমুখি তিনি দাঁড় করিয়ে দেন যা একই সাথে কাল্পণিক কিন্তু তীব্রভাবে বাস্তব। সেটা যেমন ভৌতিক সিনেমা ‘দা হোস্ট’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তেমনি সমানভাবে খাটে ডিসটোপিয়ান ফ্যান্টাসি ‘স্নোপিয়ারসার’র বেলায়ও।

সিনেমাগুলো দেখেই বোঝা যায় সিনেমার প্রচলিত ঘরাণার সাথে বং জুন হোর আত্মীয়তা খুবই গাঢ়, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে রাজি তিনি নন। প্যারাসাইট— সিনেমার গল্প যেমন দুনিয়ার বাস্তবতার সাথে মেলে না, তেমনিভাবে এটা কোনোভাবেই ফ্যান্টাসিও নয়। সিনেমার গল্প কোনো নির্দিষ্ট বাধাধরা পথে চলে না, ক্রমশই পরিবর্তনশীল।  পরিচালকের ভাষায়, ‘প্যারাসাইট একটি ক্লাউনবিহীন কমেডি আর একটি ভিলেনবিহীন ট্র্যাজিডি সিনেমা।’

বং জুন হোর অত্যন্ত আগ্রহের একটি বিষয় শ্রেণী বৈষম্য। তবে প্যারাসাইট শুধু শ্রেণী বৈষম্যের কথাই তুলে ধরে না। সিনেমায় পূঁজিবাদকে একটি বিভ্রমের ভেতরে বিভ্রম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে সবাই তার গন্তব্য না জানা স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে আরেকজনকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করে না।

প্যারাসাইট সমাজের দুই শ্রেণীর মানুষের গল্প তুলে ধরে। উচুশ্রেণী যারা কেবল তাদের উন্নতি ও আরামের জন্য নীচুশ্রেণীর মানুষের রক্ত শুষে নেওয়ার সব আয়োজনে ব্যস্ত, তাদের কাছে কেবল শ্রমের মূল্যই আছে, সেখানে মানবিকতার কোনো স্থান নেই। আবার নীচুশ্রেণী যারা তাদের গায়ের দরিদ্রতার গন্ধ মুছে ফেলতে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। প্যারাসাইটের বাংলা অর্থ পরজীবি।  চলচ্চিত্রটি আসলে এই দুই শ্রেণীর পরজীবিকেই তুলে ধরে।

পরজীবিরা তাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে অন্যের শরীরে বাসা বাঁধে, শুষে নেয় অন্য জীবের পুষ্টি। এই আর্থ—সামাজিক শ্রেণী বৈষম্য, শ্রেণীর মধ্যকার পারস্পারিক ক্রিয়া—প্রতিক্রিয়া ও পরজৈবিক নির্ভরশীলতাই প্যারাসাইট সিনেমার কেন্দ্রীয় বিষয়। সামগ্রিকভাবে বর্তমান পৃথিবীর সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে আঙুল তুলে ধরে প্যারাসাইট।

চলচ্চিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ২১শে মে কান চলচ্চিত্র উৎসবে এবং সেখানে এটি প্রথম কোরীয় চলচ্চিত্র হিসেবে পাল্ম দর লাভ করে এবং ২০১৩ সালের ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার  চলচ্চিত্রের পর সর্বসম্মত ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়।

২০১৯ সালের ৩০শে মে সিজে এন্টারটেইনমেন্ট কর্তৃক দক্ষিণ কোরিয়ায় মুক্তি পায় প্যারাসাইট। এটি সর্বকালের অন্যতম সেরা দক্ষিণ কোরিয় চলচ্চিত্র এবং ২০১০-এর দশকের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে প্রশংসিত হয়। চলচ্চিত্রটি সারাবিশ্বে $১৬৭.৬ মিলিয়ন উপার্জন করে, যা জুন-হোর সর্বোচ্চ উপার্জনকারী চলচ্চিত্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার তৃতীয় সর্বোচ্চ উপার্জনকারী চলচ্চিত্র।

প্যারাসাইট চলচ্চিত্রটি প্রথম দক্ষিণ কোরীয় চলচ্চিত্র এবং অন্য ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে ৯২তম অস্কারের আসরে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জয় করে। এছাড়াও চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালনা ও শ্রেষ্ঠ মৌলিক চিত্রনাট্য বিভাগে অস্কার পুরস্কার পায় ।  ৭৭তম গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারে চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার লাভ করে।

৭৩তম ব্রিটিশ একাডেমি চলচ্চিত্র পুরস্কারে চলচ্চিত্রটি ইংরেজি ভিন্ন অন্য ভাষার চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ মৌলিক চিত্রনাট্য বিভাগে পুরস্কৃত হয়। এছাড়া এটি প্রথম অ-ইংরেজি চলচ্চিত্র হিসেবে চলচ্চিত্রের কুশীলবদের সেরা অভিনয় বিভাগে স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড পুরস্কার অর্জন করে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : দশকের সেরা চলচ্চিত্র রিভিউ।

Facebook Comments Box
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।