পাবলো পিকাসো

share on:
পাবলো পিকাসো

পাবলো পিকাসো বিশ শতকের প্রভাবশালী শিল্পীদের অন্যতম । তিনি কিউবিস্ট আন্দোলনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, গঠনকৃত ভাস্কর্য ও কোলাজের সহ-উদ্ভাবক।

পাবলো পিকাসো শুধু চিত্রশিল্পী হিসেবে নয় , তার কৃতিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমান মেলে ভাস্কর, প্রিন্টমেকার, মৃৎশিল্পী, মঞ্চ নকশাকারী, কবি ও নাট্যকার হিসেবেও। তবে চিত্রশৈলীর বিস্তৃত ভিন্নতার কারণে তিনি সারাবিশ্বে অধিক পরিচিত।

পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর স্পেনের মালাগায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম পাবলো দিয়াগো হোসে ফ্রান্সিসকো ডি পওলা জোয়ান নেপোমেসিনো মারিয়া ডি লস রেমেডিওস সিপ্রিয়ানো ডি লা সান্টিসিমা ত্রিনিদাদ রউস ই পিকাসো। তার বাবার নাম ডন জোসে রুইজি বস্নাসকো ও মায়ের নাম মারিয়া পিকাসো লোপেজ।

পিকাসোর বাবা ছিলেন বার্সেলোনার চারুকলা বিদ্যালয়ের অধ্যাপক। পিকাসোর শিল্পী হওয়ার পেছনে তার অবদান অগ্রগণ্য। অল্প বয়স থেকেই আঁকাআঁকিতে পিকাসোর ঝোঁক ছিল। ১৮৯০ সালের আগে ফিগার ড্রইং ও তৈলচিত্রের আনুষ্ঠানিক হাতেখড়ি বাবার কাছেই। বাবা একদিন দেখলেন, তার অসমাপ্ত কবুতরের চিত্রটি পিকাসো এত নিখুঁতভাবে আঁকছে যে, মনে হল না এটি ১৩ বছরের কোনো ছেলে আঁকতে পারে। মনে হল পিকাসো তাকে অতিক্রম করে গেছে। এর পর পিকাসোর বাবা পেইন্টিংয়ে ইস্তফা দেন।

পিকাসোর সে সময়কার অগ্রগতি ফুটে ওঠে বার্সেলোনায় মুইজিওতে সংগৃহীত চিত্রকর্মগুলোতে। জাদুঘরটি যে কোনো প্রধান শিল্পীর প্রারম্ভিক কাজের সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত। পিকাসো ১৪ বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষায় পাস করেন। এর দুই বছর পর মাদ্রিদের রয়্যাল একাডেমিতে পড়াশোনা করতে যান।

১৯ বছর বয়সে শিল্প সমালোচকদের নজর কাড়েন পিকাসো। ১৯০৪ সালে মাদ্রিদের পড়াশোনা শেষে প্যারিসে চলে আসেন, আমৃত্যু তার শিল্প সাধনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে প্যারিস। এখানে বন্ধু ম্যাক্স জ্যাকবের সহায়তায় ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষতা অর্জন করেন।

কিউবিস্ট ধারার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিখ্যাত পিকাসোর শিল্পকর্ম বৈচিত্র্যের জন্যও সমাদৃত। শৈশব ও কৈশোরে রিয়ালিস্টিক ধারায়ও অতিপ্রাকৃতিক শৈল্পিক মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন পিকাসো। তবে বিশ শতকের প্রথম দশকে তিনি বিভিন্ন শিল্পতত্ত্ব, কৌশল ও ধারণার মুখোমুখি হন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষা করেছেন। ১৯১০ সালের মধ্যেই কিউবিস্ট অঙ্কনশৈলী তার চেষ্টায় পূর্ণতা লাভ করে।

রাত দশটা-এগারোটা থেকে আঁকা শুরু করতেন তিনি। আঁকা-আকি চলত সারা রাত ধরে।  অসম্ভব জীবনীশক্তি নিয়ে জীবনের শেষ দিন একের পর এক অসাধারণ সৃষ্টি করে গিয়েছেন। দর্শক যখন পিকাসোর ছবি দেখে, তখন শুধু বিষয়বস্তুর দিকে নজর থাকে না। চিত্রের মধ্যে শিল্পীর যে এনার্জি রয়েছে, যে মন এবং নান্দনিক বোধ রয়েছে, তাকেও অনুভব করে। মানুষের মুখ, চেহারা, ল্যান্ডস্কেপ পিকাসোর যে কোনও ছবিতেই প্রচণ্ড শারীরিক এবং মানসিক এনার্জি উপলব্ধি করা যায়। এই এনার্জির সঙ্গে মিশেছিল নন্দনতত্ত্ব।

তার আঁকাআঁকিকে সময়কাল হিসেবে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়— বাস্তবধর্মী, ব্লু পিরিয়ড (১৯০১-১৯০৪), রোজ পিরিয়ড (১৯০৪-১৯০৬), আফ্রিকান-ইনফ্লুয়েনড পিরিয়ড (১৯০৭-১৯০৯), এনালাইটিক কিউবিজম (১৯০৯-১৯১২) ও সিনথেটিক কিউবিজম (১৯১২-১৯১৯)।

বাস্তবধর্মী বা রিয়ালিজমের মূল জায়গাটাকে তিনি ছোট্ট বয়সেই অর্জন করেন। তার পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা, নানা ভাবে ছবিকে ভাঙার কাজ।

এ বিষয়ে পিকাসোর অভিমত, ‘ছোটবেলায় তিনি ওল্ড মাস্টারদের মতো আঁকতেন। আর বড় হয়ে শিশুদের মতো। ’  তাই তাঁর পরবর্তী ছবিগুলোতে ছিল শিশুদের সেই স্বাধীন, কোনও কিচ্ছু পরোয়া না-করা মনটা।

‘ব্লু পিরিয়ড’ এ তিনি রেস্তোরাঁয় খেতে আসা রুগ্ন, জীর্ণ চেহারার গরিব মানুষের ছবি আঁকতেন। এ ছবিগুলো ছিল মূলত নীল রঙে আঁকা। এ সময় থেকেই তিনি পরিচিত হতে শুরু করেন। শিল্পমাধ্যমের ওপর তাঁর ক্ষমতা, প্রতিভা স্বীকৃতি পেতে থাকে।

‘রোজ পিরিয়ড’এ স্প্যানিশ সার্কাসের হার্লেকুইন, কলাকুশলী, ক্লাউন, রিঙের খেলা হয়ে ওঠে তাঁর ছবির বিষয়বস্তু। এই পর্যায়ের ছবিতে তাই দেখা যায় রঙের প্রাচুর্য।

পিকাসোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তিনি প্রত্যেক পর্যায়ে তাঁর আগের পর্যায় থেকে সরে এসেছেন, এক-একটা পর্যায়কে ভেঙে আর একটা পর্যায়ে গিয়েছেন। আর এই সব কিছুর সঙ্গেই তাঁর গভীর আত্মিক যোগ ছিল। আদ্যন্ত এক শিল্পীর জীবন তিনি কাটিয়ে গিয়েছেন। তাঁর প্রত্যেকটা ছবির মধ্যেই আসল মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া যায়। ‘ওয়ার্ল্ড আর্ট’-এ তিনি যে বৈপ্লবিক অবদান রেখে গিয়েছেন, তা অন্য কারও মধ্যেই দেখা যায় না। সেখানে তাঁর অবস্থান এতটাই তীব্র, মনে হয় না অন্য কোনও শিল্পী পাবলো পিকাসোকে শিল্পে তাঁর জায়গা থেকে সরাতে পেরেছেন।

পিকাসোর সৃষ্টিশীলতা ছিল বাঁধনহারা, সব সময়ই নতুন কিছু খোঁজার চেষ্টা করতেন। যদিও উনি নিজে বলতেন, ‘আমি কিছু খুঁজি না, আমি পেয়ে যাই।’

একই সময় আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য চিত্রশিল্পীর আগমন ঘটে। বলা হয়ে থাকে পিকাসো, হেনরি মাতিসে ও মার্সেল ডচাম্প বিশ শতকের শুরুতে প্লাস্টিক আর্টে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধনের মাধ্যমে চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, প্রিন্টমেকিং ও মৃৎশিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটান।

পাবলো পিকাসোর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হল— ল্যা মূল্যাঁ দা ল গালেৎ, দ্য ব্লু রুম, ওল্ড গিটারিস্ট, সালত্যাঁবাঁক, সেলফ-পোট্রেট, টু নুডস, আভাগঁর রমণীবৃন্দ, থ্রি মিউজিশিয়ানস, স্কাল্পটর, মডেল এ্যান্ড ফিশবৌল, থ্রি ডান্সার্স, গিটার, গ্লাস অব আবস্যাঁৎ, সিটেড বাথার, পালোমা ও গোয়ের্নিকা। পিকাসো একের পর এক ছবি আঁকছেন, ভাস্কর্য গড়ছেন, প্রিন্ট ও খোদাইয়েরও কাজ করছেন! যখন কাজ করতেন না তখন মেতে থাকতেন বুলফাইটিং বা ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে। এ ছাড়া ১৯৩৫-১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিন শতাধিক কবিতা লিখেছেন।

পিকাসোর পারিবারিক জীবনে ছিল অস্থিরতা। প্রথম স্ত্রী ছিলেন ডোরা মার। তার কাছে গোয়ের্নিকা সংরক্ষিত ছিল। এর পর পিকাসো আরও দুটি বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী গিলোট ছিলেন তার চেয়ে ৪০ বছরের ছোট। ১৯২৭ সালে ১৭ বছর বয়সী মেরি থেরেসে ওয়াল্টার নামে এক তরুণীর প্রেমে পড়েন। এ সময়গুলোতে পিকাসো স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতেন। পিকাসোর মৃত্যুর চার বছর পর থেরেসে আত্মহত্যা করেন।

১৯৭৩ সালের ৮ এপ্রিল ৯১ বছর বয়সে ফ্রান্সের মুগী শহরে বিশ্ববরেন্য শিল্পী পাবলো পিকাসো মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : ভিনসেন্ট ভ্যান গগ

Facebook Comments
share on: