ফিফার এক লাখ ডলার ফিরিয়ে দিলেন সোমালি রেফারি ওমর আর্তান

ফিফার এক লাখ ডলার ফিরিয়ে দিলেন সোমালি রেফারি ওমর আর্তান: আত্মসম্মানের কাছে হার মানল অর্থ

ক্রীড়াঙ্গনে বর্ণবাদ, জাতিগত বৈষম্য এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ইমিগ্রেশন নীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায়শই আলোচনা-সমালোচনা হয়। তবে সম্প্রতি ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়া একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক ব্লগোস্ফিয়ারে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার মতো গৌরবময় কাজের জন্য ফিফা কর্তৃক মনোনীত ও আমন্ত্রিত হয়েও শুধুমাত্র সোমালিয়ান নাগরিক হওয়ার কারণে আমেরিকার ইমিগ্রেশনে চরম হেনস্তা ও বর্ণবাদের শিকার হতে হয়েছে সোমালি রেফারি ওমর আর্তানকে (Omar Artan)। পরবর্তীতে ফিফা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে ১ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা) সাধলেও, দেশের ও নিজের আত্মসম্মানের প্রশ্নে সেই বিপুল অর্থ প্রত্যাখ্যান করেছেন এই রেফারি।

একজন আন্তর্জাতিক রেফারির ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপের মঞ্চে ম্যাচ পরিচালনা করা সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ও স্বপ্নের বিষয়। ফিফা (FIFA)-এর সমস্ত কঠোর পরীক্ষা ও ক্রাইটেরিয়া অত্যন্ত সুনামের সাথে এবং সম্মানের সাথে পার করেই এই সুযোগটি অর্জন করেছিলেন ওমর আর্তান। কিন্তু আমেরিকার মাটিতে পা রাখতেই তার সেই রঙিন স্বপ্ন এক বিভীষিকায় পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র তার ‘সোমালিয়ান’ পরিচয়ের কারণে তার ওপর চালায় নজিরবিহীন মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন।

ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ওমর আর্তানকে বিমানবন্দর থেকে আটক করে টানা ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তার সমস্ত পোশাক খুলে ফেলা হয় এবং শরীরে ‘লাই ডিটেক্টর’ বা মিথ্যা ধরার যন্ত্র জুড়ে দেওয়া হয়—যা একজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের জন্য চরম হিউমিলিয়েশন বা অবমাননাকর। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তার ব্যাগের প্রতিটি নাটবল্টু পর্যন্ত খুলে তল্লাশি করে। উচ্চমানের প্রশিক্ষণ, স্কিল এবং ফিফার অফিসিয়াল আমন্ত্রণপত্র থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র জাতিগত বিদ্বেষের কারণে তাকে আমেরিকার মাটিতে প্রবেশ করতে না দিয়ে ইমিগ্রেশন থেকেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আমেরিকায় চরম বৈষম্য ও অপমানের শিকার হয়ে সোমালিয়ায় ফিরে আসার পর ওমর আর্তানকে সাধারণ কোনো মানুষ হিসেবে নয়, বরং একজন ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে বরণ করে নেয় সোমালির জনগণ ও দেশটির সরকার। পরবর্তীতে সোমালিয়া সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় আর্তান পুরো বিষয়টি ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন এবং এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও জবাব চান।

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা নিজেদের আমন্ত্রিত অতিথির নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় এড়াতে ওমর আর্তানকে ১ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু ওমর আর্তান মনে করেন, এই টাকা তার এবং তার দেশের অপমানের তুলনায় অত্যন্ত তুচ্ছ।

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অর্থ দিয়ে আত্মসম্মান কেনা যায় না, এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি ফিফার এই ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেন। ওমর আর্তানের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, আত্মমর্যাদা এবং দেশপ্রেম কোনো প্রাচুর্যের কাছে বিক্রি করার জিনিস নয়। তিনি হয়তো বিশ্বকাপের মাঠে বাঁশি বাজাতে পারেননি, কিন্তু বিশ্ববাসীর হৃদয়ে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় নায়ক হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *