মাক্সিম গোর্কি : সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা

share on:
মাক্সিম গোর্কি

মাক্সিম গোর্কি সোভিয়েত লেখক, সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কয়েকজন গদ্যশিল্পীর অন্যতম।  তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন।

তাঁর রচনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গেয়র্ক লুকাচ বলেন— ‘লেখক হিসেবে গোর্কি সর্বদাই তাঁর সমকালীন ঘটনাবলীর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন এবং নিজের রচনার মধ্যে এমন ভেদরেখা টেনে দেননি যাতে কতটুকু একজন সাহিত্যিকের লেখা আর কতটুকু এক বিপ্লবী সাংবাদিক ও প্রচারকর্মীর তা ধরা যায়। সত্য এর বিপরীতটাই। তাঁর মহত্তম সাহিত্যকীর্তি সর্বদা সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে উত্থিত হয়েছিল।’

মাক্সিম গোর্কি ১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার নিজনি নভগরোদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মার দেওয়া নাম ছিল আলেক্সেই পেশকভ। কিন্তু তিনি বেছে নেন মাক্সিম গোর্কি। গোর্কি শব্দের অর্থ তিক্ত। আক্ষরিক অর্থে তার জীবন এমনই ছিল। মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবা-মার মৃত্যুর পর স্থান হয় দাদির কাছে। ১৮৮০ সালে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। প্রথমে কাজ করেন জুতার দোকানে। এর পর কাজ নেন কয়েদি জাহাজে।

নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এক পেশা থেকে আরেক পেশায় ঘুরতে ঘুরতে বেড়ে ওঠেন। সেই থেকে একটানা দীর্ঘকাল তাঁর ভবঘুরে জীবন, হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও শোষণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়। এরই মধ্যে দু’দুবার পায়ে হেঁটে রাশিয়ার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়ানোর ফলে বিচিত্র সব মানুষের সংস্পর্শ। পাশাপাশি গড়ে তুললেন বই পড়ার অভ্যাস। কোরআন , আরব্য রজনী ও রুশ সাহিত্য থেকে শুরু করে রুশ অনুবাদে বিশ্ব সাহিত্যের ক্লাসিক, হাইনের কবিতা, এমনকি নিটশের দর্শন-একে এক সবই পড়া হয়ে গিয়েছিল তাঁর। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় এক সময় মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। ১৮৮৭ সালের ডিসেম্বরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

পরিণত বয়সে লেখা ‘আমার ছেলেবেলা’ (১৯১১), ‘পৃথিবীর পথে’ (১৯১৫) ও ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’ (১৯২৩) নামে আত্মজৈবনিক উপন্যাসত্রয়ীতে লেখক তাঁর ছোটবেলার সেই বিচিত্র জীবনের কাহিনী আমাদের শুনিয়েছেন। যেভাবে কৌশলে নিজেকে মনোযোগের কেন্দ্রস্থল থেকে আড়ালে সরিয়ে রেখে নিজেরই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে, ভবঘুরে জীবনে দেখা মানুষজন ও ঘটনার এক একটি রেখাচিত্র তিনি এঁকেছেন তাতে এই রচনাকে না উপন্যাস না আত্মজীবনী-কোনো কোঠাতেই ফেলা যায় না। লেখকের জাদু লেখনীয় স্পর্শে তা হয়ে উঠেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের অবক্ষয়ী রাশিয়ার জীবনদর্শন।

আমার ছেলেবেলাতে লেখক সেই সারকথাটি প্রকাশও করে গেছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ‘আমাদের জীবনকে দেখে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় শুধু এই জন্য নয় যে, এই জীবনের একদিকে আছে পশুসুলভ প্রচন্ড একটা নোংরামি যা দিনের পর দিন পাহাড়প্রমাণ হয়ে উঠেছে. আশ্চর্য হতে হয় এই জন্যও যে এই জীবনের অন্তরালে এক সুস্থ সৃজনশীল শক্তিও দেদীপ্যমান।’

১৮৯২ সাল নাগাদ গোর্কি ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে তার প্রথম বই, যার ইংরেজি এসেজ অ্যান্ড স্টোরিস প্রকাশ পায়। এই বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে গোর্কি খ্যাতি। এরপর তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর লেখা প্রথম দিকের গল্পগুলোতে নিটোল রোমান্টিকতা থাকলেও পরবর্তীতে গল্পের বিষবস্তু এবং উপস্থাপনা শৈলী ভিন্ন রূপ নিতে থাকে। দেখা যায়, সমকালীন বাস্তবতা, সমাজের নিচুতলার মানুষই তাঁর গল্পের উপজীব্য বিষয়। মূলত প্রথম দিকে তিনি লিখতেন প্রথাগত নিয়মে। তাঁর অন্যান্য গল্পগন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ‘মানুষের জন্ম (১৮৯২)’,‘বুড়ি ইজরেগিল (১৮৯৪)’‘চেলকাশ (১৮৯৪)’,‘কনভালভ(১৮৯৫)’,‘বোলেসস্নভ (১৮৯৬)‘,‘ঝড়োপাখির গান (১৯০১)’ ইত্যাদি।

তারপর এক সময় তাঁর পরিচয় হল এক বিখ্যাত তরুণ লেখক ভ্লাদিমির করোলেঙ্কার সঙ্গে। করোলেঙ্কার কথায় চেতনা ফিরে পেলেন গোর্কি। প্রথাগত চেতনার ধারাকে বাদ দিয়ে শুরু হল তাঁর নতুন পথে যাত্রা। সমাজের নিচুতলার মানুষেরা— চোর, লম্পট, ভবঘুরে, মাতাল, গণিকা, চাষী, মজুর, জেলে প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর রচনায়। সমাজের নিচুতলার মানুষের জীবনচিত্র প্রকাশই হয়ে ওঠে তার মূল লক্ষ্য। এই পর্বের কয়েকটি বিখ্যাত গল্প হল ‘মালভা’, ‘বুড়ো ইজরেগিল’, ‘চেলকাশ’, ‘একটি মানুষের জন্ম’। গল্পগুলিতে একদিকে যেমন ফুটে ওঠেছে নিচু তলার মানুষের প্রতি গভীর মমতা অন্যদিকে অসাধারণ বর্ণনা, কল্পনা আর তাঁর সৃজনশক্তি। সে সময় চেখভ ও তলস্তয়ের সঙ্গে তার নামও উচ্চারিত হতে থাকে।

১৯০০ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘ফোমা গর্দেয়ভ’। এ উপন্যাসে তিনি নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের মর্মবেদনার কথা তুলে ধরেন, যা রুশ শাসকদের বিচলিত করে তোলে। বন্দি হন তিনি। তবে শিগগিরই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ১৯০১ সালে বিপ্লবী অন্দোলন ক্রমেই বেড়ে চলছিল। গোর্কি তখন সেন্ট পিটার্সবার্গে। কাজানের এক আন্দোলনে অনেক ছাত্র নিহত হলে ছাত্রদের হত্যার প্রতিবাদে গোর্কি লেখেন ‘দ্য সং অব দ্য স্টর্মি পেত্রল’ (ঝোড়ো পাখির গান) নামের বিখ্যাত কবিতা।

‘ঝোড়ো পাখির গান’ হয়ে ওঠে বিপ্লবের মন্ত্র। এবার তিনি জনসম্মুখেই জারের বিরোধিতা শুরু করেন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হন। অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। গোর্কি লেখার জীবনবোধ ও ক্ষুরধার রাশিয়ার জার শাসকদের বিচলিত করে তোলে। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে প্রতিবাদের মুখে তাঁকে আবার ছেড়ে দিতেও বাধ্য হয় সরকার।

১৯০২ সালে লেনিনের সঙ্গে তার দেখা হয়। এরপর তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন। এ সময় তিনি প্রেসের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিয়েও কথা বলেন। ওই বছর অনারারি একাডেমিশিয়ান অব লিটারেচার নির্বাচিত হন। কিন্তু জার নিকোলাস দুজনই তা রদ করেন। এর প্রতিবাদে আন্তন চেকভ ও ভ্লাদিমির করোলেঙ্কো একাডেমি ত্যাগ করেন। ১৯০৫ সালের বিপ্লব নিয়ে লেখেন নাটক চিলড্রেন অব সান। নাটকটির প্রেক্ষাপট ছিল ১৮৬২ সালের কলেরার মহামারী। কিন্তু প্রতীকী অর্থ বাদ দিলে এটি ওঠে সে সময়কার রাশিয়ার চিত্র।

একই বছর তিনি বিখ্যাত দ্য লোয়ার ডেপথ নাটকটি লেখেন। ১৯০৬ সালে বলশেভিকরা তাকে আইভান নরোদনির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে দলের তহবিল গঠনের জন্য পাঠান। তারা জার্মানি হয়ে ফ্রান্স ও অমেরিকায় যান। সেখানেই লেখেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য মাদার’। বইটির প্রথম প্রকাশও হয় ইংরেজিতে। ‘মা’ রুশ কথাসাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি রচিত এক কালজয়ী উপন্যাস। রুশ ভাষায় লিখিত এই উপন্যাসটি বিশ্বের প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মা উপন্যাস এবং দুশমন নাটকের দৃষ্টান্ত সামনে রেখেই আরও কয়েক দশক পরে, ১৯৩২ সালে সোভিয়েত আমলে, সোভিয়েত লেখক সংঘ থেকে ঘোষিত হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা নামে একটি নতুন শিল্পধারা।

রুশ সাহিত্যের গতিপ্রকৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিল এই নতুন আন্দোলন। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সোভিয়েত সাহিত্য নামে পরিচিত নতুন সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা তাই গোর্কি। সরকার-বিরোধী কার্যকলাপের জন্য যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল, ১৯১৩ সালে রমানভ রাজবংশের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তাদের ওপর থেকে তা তুলে নেওয়া হলে লেনিনের আগ্রহতিশয্যে গোর্কি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর গোর্কি দেশের সাহিত্য ও রাজনীতির ক্ষেত্রে গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯১৫ সাল থেকে তিনি রাজনীতিনির্ভর সাহিত্য পত্রিকা লিটোপিস প্রকাশ করেন। কিন্তু এই সময় থেকে শুরু করে অক্টোবর বিপ্লবের মাঝখানে রাশিয়ায় যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটতে চলেছিল তার মূল্যায়ন নিয়ে বলেশেভিকদের সঙ্গে গোর্কির বড়ো রকমের মত পার্থক্য দেখা দেয়। তাঁর মনে হয়েছিল ক্ষুদ্র স্বার্থবুদ্ধি প্রণোদিত নৈরাজ্যবাদী প্রাকৃতিক শক্তি বিপ্লবের অগ্রণী ভূমিকার পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। বিপ্লবের পর নতুন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে।

লেনিন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু অবাধ্য গোর্কির জনপ্রিয়তা শাসকগোষ্ঠীর কাছে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে ১৯২১ সালে লেনিনের উদ্যোগেই আবার তাঁকে দেশ ছাড়তে হল-এ বারে স্বাস্থ্যোদ্বারের অজুহাতে। এ বারেও দীর্ঘকালের জন্য- সেই ইতালিতে। বেশ কিছুকালের মধ্যে- এমনকী মাঝখানে লেনিনের মৃত্যু হলে সেই সময়ও- দেশে আর পদার্পণ করলেন না।

পরে ১৯২৮ সাল থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিবছরই গ্রীষ্মকালে কিছু সময়ের জন্য রাশিয়া ঘুরে যেতেন। দেশত্যাগী তিনি কখনও হননি-বিদেশ থেকেও দেশের নবীন লেখক গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলতেন। তিনি সোভিয়েত লেখক সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৩৩ সালে তাঁর উদ্যেগে নবীন লেখকদের প্রশিক্ষণের জন্য মস্কোর গোর্কি সাহিত্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘ আর্তামোনভ বৃত্তান্ত’ (১৯২৫) তাঁর এই পর্যায়ে লেখা উল্লেখ্যযোগ্য উপন্যাস। বিপ্লব- পূর্ববর্তী রাশিয়ার কয়েক শতাব্দীব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যাপক চিত্র এই উপন্যাসে বিধৃত।

মাঝেমধ্যে দেশে এলেও স্তালিনের আমন্ত্রণে পাকাপাকিভাবে ফেরেন ১৯৩২ সালে। এরপর তিনি নানান ধরনের সম্মাননা ও উপঢৌকন লাভ করেন। স্তালিনের আমলে তিনি সম্মান পেলেও অচিরেই তার একনায়কতন্ত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গোর্কি এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বরে বলশেভিক নেতা সার্গেই কিরবের হত্যাকাণ্ডের পর গোর্কিও গৃহবন্দি হন।

ম্যাক্সিম গোর্কি ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : বই প্রসঙ্গ – মাক্সিম গোর্কি

জুল ভার্ন : কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর জনক

Facebook Comments Box
share on: