মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট : নারীবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা

share on:
মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট একজন ইংরেজ লেখিকা ও দার্শনিক। নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে তার নাম স্বরণীয় হয়ে আছে। ৯ বছর ক্ষণস্থায়ী সাহিত্যিক জীবনে নারীবাদসহ দর্শন, শিক্ষা, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম, ইতিহাস ও নানা বিষয়ে লেখালেখি করেছেন।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট ১৭৫৯ সালের ২৭ এপ্রিল লন্ডনের স্পিটাফিল্ডসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এডওয়ার্ড জন ওলস্টোনক্র্যাফ্‌ট ও এলিজাবেথ ডিক্সনের সাত সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। পরিবারটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পতনের মধ্য দিয়ে তকে বেড়ে উঠতে হয়। ১৭৮০ সালে মায়ের মৃত্যুর পর উপার্জনের পথ বেছে নিতে হয়। ১৭৮৪ সালে বোন এলিজা ও বান্ধবী ফ্যানিকে নিয়ে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া গভর্নেস ও অনুবাদকের কাজসহ বিভিন্ন কাজ করেন। ব্যক্তিগত জীবনেও নানা ভাঙা-গড়া রয়েছে। সে সব অভিজ্ঞতার ছাপ তার লেখায় পাওয়া যায়। একই সঙ্গে নারী সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি কঠোরভাবে বিশ্লেষণ করেন।

মেরি ছিলেন নারী অধিকারের স্বপক্ষে এক বজ্র কন্ঠস্বর যাকে পুরুষতন্ত্র “পেটিকোট পরা হায়েনা” বা “দার্শনিকতাকারী সর্পিনী” বলে ভৎর্সনা করেও দমাতে পারে নি।

১৭৯১ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে মেরি লেখেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই “A Vindication of the Rights of Women : with strictures on political and Moral Subjects” যা পুরুষতন্ত্রের চোখে চরম আপত্তিকর কারন তা নারীমুক্তির পক্ষে প্রথম সুপরিকল্পিত ইশতেহার, নারীবাদের আদিগ্রন্থ। তার সেরা লেখা গণ্য করা হয় এ ভিন্ডিকেশান অব দ্য রাইটস অব উইম্যান (১৭৯২)-কে। এখানে তিনি যুক্তি দেখান- নারী প্রাকৃতিকভাবে পুরুষ অপেক্ষাহীন নয়। শিক্ষার অভাবেই নারী পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে পড়ে। তিনি প্রস্তাব করেন নারী ও পুরুষ উভয়কেই যুক্তিবাদী স্বত্বা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নারীও যুক্তি-বুদ্ধি সম্পন্ন। তাই তাদের স্বাধীকার দিতে হবে। এর মাধ্যমে যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক শৃঙ্খলা খুঁজে পাওয়া যাবে। ভোটাধিকারের আন্দোলনের সময় তার এই বই আন্দোলনকারী নারীবাদীদের উজ্জীবিত করেছিল।

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বিষাদময়। গরীব এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেন তিনি। বাবা ছিলেন উচ্ছৃংখল, স্বেচ্ছাচারী এবং মা ছিলেন সেই স্বেচ্ছ্বাচারের স্বেচ্ছ্বা শিকার। পুরো ব্যাপারটিকেই ঘৃণা করতেন মেরি। মেরির জীবনে দুজন পুরুষ এসেছিলেন সঙ্গী হিসেবে। প্রথম জন মার্কিন ঔপন্যাসিক ও ব্যবসায়ী গিলবার্ট এমল। তারা দুজন বিয়ে করেননি যদিও তাদের রয়েছে ফেনি এমলে নামের একটি কন্যা সন্তান। দ্বিতীয় পুরুষটি একজন লেখক, নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, দার্শনিক উইলিয়াম গডউইন, যাকে বিবাহপ্রথায় অবিশ্বাসী মেরি বিয়ে করেছিলেন। ১৭৬৮ সালে জন্ম নেওয়া মেরি মাত্র ৩৮ বছর বয়সে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যান। তাঁর মেয়ে মেরি গডউইন শেলি পৃথিবীর বিখ্যাততম গথিক উপন্যাস ‘ফ্রাংকেনেস্টাইন’র লেখক।

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্‌ট ১৭৯৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মারা যান। তার মৃত্যুর পর উইলিয়াম গডউইন প্রকাশ করেন মেমোয়ার অব দ্য অথর অব এ ভিন্ডিকেশান অব দ্য রাইটস অব উইম্যান (১৭৯৮) নামে জীবনী। সেখানে মেরির জীবনের অনিয়ন্ত্রিত দিক উঠে আসে। যার কারণে প্রায় এক শতাব্দি তার কাজের ভালো মূল্যায়ন হয়নি। তবে বিশ শতকে এসে তিনি নারীবাদী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠেন। কারণ নারীর অধিকার ও নারীত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো ভাঙতে তার লেখাগুলোতে রয়েছে প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি। বর্তমানে তাকে নারীবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তার জীবন ও কর্ম থেকে নারীবাদীরা প্রভাবিত হন।

শৈশবেই তার ভেতরের নারীবাদী সত্ত্বাটা জেগে উঠেছিল। মাতাল ভয়ংকর বাবার হাত থেকে মাকে রক্ষা করতে দরজা পাহারা দিতেন ছোট্ট মেরি। মনের ভেতরে ছিল রাগ, খেয়াল করেছিলেন তার চেয়ে তার ভাই স্কুলে বেশি সময় কাটাতে পারে। বুঝতে পারতেন, একদিন এই ভাই-ই হবেন সম্পত্তির উত্তরাধিকার।

দুঃখজনক বিষয় হলো, বিংশশতকের শেষার্ধ পর্যন্ত মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের কর্মজীবনের চেয়ে ব্যতিক্রমী উপায়ে যাপিত ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই বেশি চর্চা হয়েছে। কিন্তু বিংশ শতকে নারীবাদী আন্দোলনের উত্থানের সাথে সাথে নারীর সমানাধিকারের স্বপক্ষে মেরির জোরালো কন্ঠস্বর এবং তাঁর করা প্রথাগত নারীত্বের সমালোচনা – দুটোকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা শুরু হয়। মেরিকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে একজন প্রতিষ্ঠাতা নারীবাদী দার্শনিক হিসেবে যার কর্ম ও জীবন উভয়ই নারীবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট পান নারীবাদী সন্তের সম্মান।

তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো- ‘থটস অন দ্য এডুকেশন অব ডটার্স: উইথ রিফ্লেকশানস অন ফিমেল কনডাক্ট, ইন দ্য মোর ইম্পর্টেন্ট ডিউটিজ অব লাইফ’ (১৭৮৮), ‘মেরি: আ ফিকশন’ (১৭৮৮), ‘অরিজিনাল স্টোরিজ ফ্রম রিয়েল লাইফ: উইথ কনভারসেশনস ক্যালকুলেটড টু রেগুলেট দ্য অ্যাফেকশনস অ্যান্ড ফর্ম দ্য মাউন্ড টু ট্রুথ অ্যান্ড গুডনেস’ (১৭৮৮), ‘এ ভিন্ডিকেশান অব দ্য রাইটস অব ম্যান, ইন আ লেটার টু দ্য রাইট অনারেবল’ (১৭৯০), ‘এ ভিন্ডিকেশান অব দ্য রাইটস অব উইম্যান উইথ স্ট্রাকচারস অন মোরাল অ্যান্ড প্রাকটিক্যাল সাবজেক্টস’ (১৭৯২) ও ‘দ্য রঙস অব উউম্যান, অব মারিয়া’ (১৭৯৮)।

* আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন parthibrashed@ymail.com এ।

আরও পড়ুন : দ্রৌপদীর দুনিয়া দর্শন : গাজী তানজিয়ার গল্প।

Facebook Comments
share on: