মান্না দে : হিন্দি গানের ভুবনে সবর্কালের সেরা গায়ক

share on:
মান্না দে

মান্না দে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটিসহ অজস্র ভাষায় গান গেয়ে চলেছেন ষাট বছরের বেশি সময় ধরে।

বৈচিত্র্যের বিচারে তাঁকেই হিন্দি গানের ভুবনে সর্বকালের সেরা গায়ক হিসেবে স্বীকার করে থাকেন অনেক বিশেষজ্ঞ সঙ্গীতবোদ্ধারা। সঙ্গীত সমালোচকরা বলে থাকেন মান্না দের বিভিন্ন ধরণের – নানা আঙ্গিকের গান গাওয়ার সহজাত প্রতিভার কারণেই জনপ্রিয়তম সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

‘মান্না দে’ গায়ক হিসেবে আধুনিক বাংলা গানের জগতে সর্বস্তরের শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও সফল সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। এ ছাড়াও, হিন্দি এবং বাংলা সিনেমায় গায়ক হিসেবে অশেষ সুনাম কুড়িয়েছেন। মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মুকেশের মতো তিনিও ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সঙ্গীত জীবনে তিনি সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেন।

বিখ্যাত গায়ক মান্না দে ১৯১৯ সালের ১ মে জন্মগ্রহণ করেন। পুরো নাম প্রবোদ চন্দ্র দে। মা-বাবার দেওয়া নামটা কেবল খাতা কলমেই রয়ে গেল। মান্না দে নামটাই উঠে এল জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটিসহ বিশটির মতো ভাষায় ষাট বছরেরও বেশি সময় তিনি সঙ্গীত চর্চা করেন। বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা বাংলা গানে স্থান পেয়েছিল তার ‘কফির হাউস’ গানটি।

তার বাবা-মায়ের নাম পূর্ণ চন্দ্র ও মহামায়া দে। শৈশবে ভর্তি হন ‘ইন্দু বাবুর পাঠশালা’ নামে একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর স্কটিশ গির্জা কলেজিয়েট স্কুল ও স্কটিশ গির্জা কলেজে স্নাতক পর্যন্ত পড়েন। ঐ সময়ে আন্তঃকলেজ সংগীত প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে তিন বছর তিনটি আলাদা বিভাগে প্রথম হন।

বাবা-মা ছাড়াও সংগীতে তাকে অনুপ্রাণিত করেন চাচা সংগীতজ্ঞ কেসি দে (কৃষ্ণ চন্দ্র দে)। তার হাত ধরেই ১৯৪২ সালে মুম্বাইয়ে পা রাখেন৷ কাকার সঙ্গে কাজ করতে করতেই নজরে পড়েন শচীন দেব বর্মনের৷ ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের তালিম নেন উস্তাদ আমান আলী খান, উস্তাদ দবির খান ও উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছে৷ ১৯৪৩ সালে তামান্না ছবিতে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন৷ সুরাইয়ার সঙ্গে দ্বৈত গানে সুরকার ছিলেন কেসি দে। অভিষেকেই শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যান৷ ১৯৫২ সালে একই নাম ও গল্পের বাংলা ও মারাঠী ছবিতে ‘আমার ভূপালী’ গানটি গেয়ে সংগীতপ্রেমীদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পান। এরপর নানা ভাষায় নানা আঙ্গিকে চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রের বাইরে গান রেকর্ড করেন। যার বেশিরভাগই শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করে।

গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘কফির হাউস’ (১৯৮৪) গানটি এখনও সব প্রজম্মের বাংলাভাষীদের কাছে সমান জনপ্রিয়। গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার ছাড়াও তার বিখ্যাত গানগুলোর বেশিরভাগ লিখেছিলেন পুলক বন্দোপাধ্যায়। বাংলায় তার গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে- অনেক কথা বলেও (১৯৮৬), অপবাদ হোক না আরও (১৯৭২), আজ আবার সেই পথে দেখা হয়ে গেল (১৯৭২), আবার তো দেখা হবে (১৯৬৪), আমি যে জলসাঘরে (১৯৬৭), আমি ফুল না হয়ে কাঁটা হলে বেশ (১৯৭৮), আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না (১৯৭০), উথালি পাথালি আমার বুক (১৯৬০), এই কূলে আমি ঐ কূলে তুমি (১৯৫৮), ক’ফোটা চোখের জল ফেলছ (১৯৭১), কালো যদি মন্দ তবে (১৯৭৪), কোনো কথা না বলে (১৯৬৭), কতদিন দেখিনি তোমায় (১৯৮৪), কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায় (১৯৬৮), যদি কাগজে লেখো নাম (১৯৭৪), তুমি তানপুরাটার তার বেঁধে নাও (১৯৮০), ধান ধান্যে পুষ্পে ভরা (১৯৭২), পৌষের কাছাকাছি (১৯৮২), সই ভালো করে বিনোদ বেনী (১৯৮০), সে আমার ছোট বোন (১৯৭৮, সবাই তো সুখী হতে চায় (১৯৮২) উল্লেখযোগ্য। দ্বৈতগানে কন্ঠ দিয়েছেন তার সময়কালের অনেক জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে। এর মধ্যে আরতি মুখোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, ভীমসেন জোসি ও কিশোরকুমার উল্লেখযোগ্য।

২০০৫ সালে বাংলায় তার আত্মজীবনী ‘জীবনের জলসাঘরে’ প্রকাশিত হয়। পরে এটি ইংরেজি, হিন্দি ও মারাঠী ভাষায় অনুদিত হয়। তার জীবন নিয়ে ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে একটি তথ্যচিত্র ২০০৮ সালে মুক্তি পায়। মান্নাদে সংগীত একাডেমি তার সম্পূর্ণ আর্কাইভ রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও কোলকাতা সঙ্গীত ভবন মান্নাদে’র গান সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।

সঙ্গীত ভুবনে তাঁর এ অসামান্য অবদানের কথা স্বীকার করে ভারত সরকার ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননায় অভিষিক্ত করে।

কেরালার সুলোচনা কুমারনকে ১৯৫৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিয়ে করেন। তাদের দুই কন্যা শুরোমা ও সুমিতা। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় মুম্বাইয়ে কাটানোর পর শেষের দিনগুলো ব্যাঙ্গালোরের কালিয়ানগর শহরে কাটান।

তিনি ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর দেহত্যাগ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : এখনও রোবসন : গৌতম ঘোষ

Facebook Comments
share on: