লিওনার্দো দা ভিঞ্চি

share on:
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, পুরো নাম লিওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি। পৃথিবীর বেশিরভাগই মানুষই চেনে শুধুমাত্র ‘মোনালিসা’র কারণে।

এ ছাড়া তিনি ছিলেন একাধারে ভাস্কর, স্থপতি, অংকশাস্ত্রবিদ, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সংগীতজ্ঞ, সমর যন্ত্রশিল্পী। তার সৃষ্ট চিত্রকর্ম মোনালিসার মতোই তিনি নিজেও কম রহস্যময় ছিলেন না। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জন্ম এক কুমারী নারীর গর্ভে। তার বাবা পিয়েরো এন্টোনিও দ্য ভিঞ্চি পেশায় ছিলেন উকিল। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির ফ্লরেন্স প্রদেশের ভিঞ্চিতে জন্মগ্রহণ করেন।

ভিঞ্চি শৈশব থেকেই প্রচন্ড মেধাবী ছিলেন। গনিতে তার এতোটাই দক্ষতা ছিল যে, শিক্ষকরা পর্যন্ত কখনো কখনো বিভ্রান্ত হয়ে যেতো তাকে পড়াতে গিয়ে। তার প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে শিক্ষকরা ক্লান্ত হয়ে যেতো। শুধুমাত্র গনিতই নয়, সংগীতেও তার আকর্ষণ ছিল। তার কন্ঠস্বর ছিল সুমিষ্ট। পরবর্তীকালে যখন তিনি বাঁশি বাজাতেন এক স্বর্গীয় সুষমায় ভরে উঠত সমস্ত পরিমণ্ডল।

তখনকার সময়ে আর্টিস্টকে তেমন সম্মান দিতো না মানুষেরা। তাই লিওনার্দো যখন ছবি আঁকা শেখার অনুরোধ জানাল, সরাসরি তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন।

লিওনার্দো উপলব্ধি করতে পারলেন বাবার অনুমতি ছাড়া ছবি আঁকা সম্ভব নয়। তাই একটি বুদ্ধি করলেন। একটা বড় কাঠের পাটাতনের ওপর গুহার ছবি আঁকলেন। গুহার মধ্যে আধো আলো আধো ছায়ার এক অপার্থিব পরিবেশ। তার সামনে এক ভয়ঙ্কর ড্রাগনের ছবি, তার মাথায় শিং। চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। ভয়ঙ্কর হিংস্র দাঁতগুলো যেন ছুরির ফলা, নাক দিয়ে বেরিয়ে আসছে আগুনের লেলিহান শিখা। ছবি আঁকা শেষ হতেই ঘরের মধ্যে ছবিটাকে রেখে সব জানালা বন্ধ করে দিলেন। পিয়েরো কিছুই জানেন না। ঘরে ঢোকামাত্রই সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন। পিয়েরো শান্ত হতেই লিওনার্দো গম্ভীর গলায় বললেন, আমি মনে হয় আমার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পেরেছি।

পিয়েরো তখন আর কোন প্রতিবাদ করেননি। ভিঞ্চিকে ছবি আঁকা শেখার অনুমতি দিলেন। সেই সময় ফ্লোরেন্সের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন ভেরক্কিয়ো। চিত্রশিক্ষার জন্য তার স্কুলে গেলেন লিওনার্দো। তখন তার বয়স আঠারো বছর।

১৪৮২ সালে ভিঞ্চি চলে আসেন মিলানে। সেই সময় ফ্লোরেন্সের ডিউকের প্রাসাদে এক সঙ্গীত অনুষ্ঠনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে লিওনার্দো তার বাঁশি বাজালেন। তার অসাধারণ সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হলেন ডিউক। তাকে নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ করলেন। কয়েক দিনের পরিচয়েই ডিউক উপলব্ধি করতে পারলেন কী অসাধারণ প্রতিভাধর পুরুষ এই লিওনার্দো। তিনিই তাকে মিলানের অধিপতি লুডোভিকোর কাছে পত্র লিখতে অনুরোধ করলেন। লিওনার্দো লিখলেন তার সেই বিখ্যাত পত্র। এতে তিনি লিখলেন সামরিক প্রয়োজনে ৯টি মৌলিক সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কারের কথা।

মিলানে থাকা অবস্থায় ভিঞ্চির প্রতিভার পূর্ণ বিকশিত হয়েছিল। লিওনার্দো তখন কল্পনা করতেন একটি আদর্শ শহরের। যেখানে মানুষের প্রয়োজনীয় সব সুবিধা থাকবে, একদিকে মানুষ, অন্যদিকে যানবাহন। শহরটি হবে ছোট। ৫ হাজারের বেশি বাড়ি থাকবে না। শহরের কোন নর্দমা বাইরে বের হবে না। প্রতিটি নর্দমা হবে মাটির নিচে। সেখান দিয়ে সব আবর্জনা শহরের বাইরে নদীতে গিয়ে পড়বে।

ভিঞ্চি এসব কাজের অবসরে চর্চা করতেন জ্যামিতিক, জ্যোতির্বিদ্যা, অঙ্ক এবং এসব ক্ষেত্রে বহু মৌলিক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছিল। এসব বৈজ্ঞানিক কাজকর্মের মধ্যেই তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন লুডোভিকোর স্বার্থগত পিতার এক মূর্তি স্থাপন করার। শুরু করলেন সেই অভূতপূর্ব বিশাল মূর্তি। উচ্চতায় ২৬ ফুট। একটি ঘোড়ার ওপর বসে আছেন স্বর্গত রাজা। মূর্তিটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল আট বছর। এই সময় তিনি ‘ম্যাডোনা’ নামে একটি ছবিও আঁকেন। এবার তাকে নতুন একটা কাজের ভার দিলেন লুডোভিকো। যিশুর জীবনের কোনো বিষয় নিয়ে ছবি আঁকতে হবে।

শুরু হলো লিওনার্দোর ভাবনা। কী ছবি আঁকবেন? দীর্ঘ ভাবনার পর স্থির করলেন যিশুর শেষ ভোজের ছবি আঁকবেন। চিত্রশিল্পের জগতে ‘লাস্ট সাপার’ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি। ‘যিশু তার বারোজন শিষ্যকে নিয়ে শেষ ভোজে বসেছেন। তার দুপাশে ছয়জন ছয়জন করে শিষ্য। সামনে প্রশস্ত টেবিল। পেছনে জানালা দিয়ে মৃদু আলো এসে পড়েছে। যিশু বলেছেন তোমাদের মধ্যে কেউ একজন বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে ধরে দেবে। শিষ্যরা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তারা সকলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে তাদের মধ্যে কে বিশ্বাসঘাতকতা করবে’। ছবিটি সান্তামারিয়া কনভেন্টের এক দেয়ালে আঁকা হয়েছিল।

১৫০০ সালের ভিঞ্চি আবার ফিরে আসেন ফ্লোরেন্সে। কিছুদিন পরই ভিঞ্চি আঁকেন জগত বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’। কে এই মোনালিসা এ বিষয়ে ভিন্নমত আছে। কয়েকজনের অভিমত মোনালিসার প্রকৃত নাম ছিল লিজা। তিনি ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক অভিজাত ব্যক্তির স্ত্রী। ভিন্ন মত অনুসারে মোনালিসা ছিলেন জিয়োকোন্ত নামে এক ধনী বৃদ্ধের তৃতীয় পত্নী। নাম মাদোনা এলিজাবেথ। দিনের পর দিন অসংখ্য ভঙ্গিতে মুখের ছবি এঁকেছেন। কিন্তু কোনো ছবিই তার মনকে ভরিয়ে তুলতে পারেনি। একদিন লিওনার্দোর চোখে পড়ল এলিজাবেথের ঠোঁটের কোনায় ফুটে উঠেছে বিচিত্র এক হাসি। চমকে উঠলেন লিওনার্দো। এই হাসির জন্যই যেন তিনি তিন বছর অপেক্ষা করেছিলেন। মুহূর্তে তুলির টানে ফুটিয়ে তুললেন সেই সহাস্যমণ্ডিত কালজয়ী হাসি।

জীবনের শেষ দিকে এসে ক্রমশই তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ছিল ভিঞ্চির। ডান হাত অকর্মণ্য হয়ে গিয়েছিল। বা হাতেই ছবি আঁকতেন। তখন তিনি ঈশ্বরের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। ১৫১৯ সালের ২ মে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই কালজয়ী শিল্পী।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : পাবলো পিকাসো

Facebook Comments
share on: