জিম জারমুশ : সিনেমা নির্মাণে পাঁচ পরামর্শ

share on:
জিম জারমুশ

জিম জারমুশ , স্বাধীন সিনেমা অর্থাৎ ফর্মূলা সিনেমার বাইরের সিনেমার যে জগৎ সেখানে খুবই জনপ্রিয় একটি নাম।

মার্কিন নির্মাতা জারমুশের উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘স্ট্র্যাঞ্জার দেন প্যারাডাইস’, ‘প্যাটারসন’ , ‘ডেড ম্যান’, ‘ঘোস্ট ডগ : দ্য ওয়ে অব দ্য সামুরাই’, ‘কফি অ্যান্ড সিগারেটস’, ‘ব্রোকেন ফ্লাওয়ার্স’, ‘দ্য লিমিটস অব কন্ট্রোল’।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

২০০৪ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছিলেন জিম জারমুশ। যা ‘ফাইভ গোল্ডেন রুলস’ নামে পরিচিত। রুলসগুলো হলো :

এক. চলচ্চিত্র নির্মাণের ধরাবাধা কোনো নিয়ম নেই। প্রকৃত চলচ্চিত্র নির্মাতারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা নিয়ম তৈরি করেন। কেননা চলচ্চিত্র সত্যিকারভাবেই একটি মুক্ত মাধ্যম। তাই আমি ব্যক্তিগত ভাবে কাউকে এটা বলা পছন্দ করি না যে , চলচ্চিত্র বানাতে কি করা উচিত বা কিভাবে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করতে হবে। এটাকে অনেকটা কাউকে ধর্মবিশ্বাস ঠিক করে দেওয়ার মতো ব্যপার মনে হয় আমার কাছে। যা খুবই বাজে একটা ব্যপার। এটা আমার ব্যক্তিগত দর্শনের বিপরীত যে- কিছু নিয়মের মধ্যে থেকে কিছু একটা করার চেষ্টা। তারচেয়ে বরং নিয়মগুলোকে উপেক্ষা করে পড়াশোনা ও নিজস্ব বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজের জন্য একটা রাস্তা খোঁজা আমার পছন্দের। প্রত্যেক চলচ্চিত্র নির্মাতারই আসলে তাই করা উচিত কারণ চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো ধরাবাধা রাস্তা নেই। কেউ যদি বলে যে – এই উপায়ে যথার্থ চলচ্চিত্র বানানোর সবচেয়ে ভাল উপায়, তাহলে আমার পরামর্শ হলো তাকে আপনার শারীরিক ও মানসিক দুইভাবেই এড়িয়ে চলা উচিত।

দুই. কারো কথায় হতাশ হবেন না। তাহলে কেউ আপনাকে সাহায্য করুক বা না করুক, আপনি কখনও থেমে যাবেন না। মনে রাখবেন যারা চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে, বিপণণ করে, প্রচারণা চালায় ও প্রদর্শনী করে তারা কেউই চলচ্চিত্র নির্মাতা না। তারা যেমন সিনেমার ব্যবসার বেলায় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে ব্যবসার ধরণ ও প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে চায় না, তেমনি নির্মাতাদেরও উচিত সিনেমা নির্মাণের বিষয়ে তাদের নাক গলাতে না দেওয়া। দরকার হলে এজন্য বন্দুক ব্যবহার করুন।

সেইসঙ্গে পরগাছাদেরও পরিত্যাগ করা শিখুন। আপনার চারপাশে এমন অনেক পরগাছা ঘুরে বেড়ায় যারা আপনার উপরে ভর করে সিনেমার মাধ্যমে ধনী হতে চায়, বিখ্যাত হতে চায় এবং ক্ষমতাশালী হতে চায়। তারা আসলে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে ঠিক ততটুকুই জানে, যতটুকু জর্জ বুশ হাতাহাতির কৌশল সম্পর্কে জানে।

তিন . চলচ্চিত্রের জন্য সবকিছু। সবকিছু ভেবে নিয়ে তারপর চলচ্চিত্র বানানো নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি পুরো চলচ্চিত্র দুনিয়া উল্টাপথে হাটছে। সবাই চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবছে বাজেট, শিডিউল ও নির্মাণ সংশ্লিষ্ট আনুসাঙ্গিক বিষয়কে মাথায় রেখে। যেসকল নির্মাতারা এ বিষয়টি বুঝতে চান না তাদেরকে উল্টিয়ে ঝোলানো উচিত এবং জিজ্ঞেস করা দরকার যে আকাশটা পায়ের নিচে না মাথার উপরে।

চার. চলচ্চিত্র হলো সমন্বিত একটি প্রচেষ্টা। এসময় আপনাকে এমন কারও সাথে কাজ করতে হতে পারে যিনি মনন ও চিন্তায় আপনার চেয়ে অগ্রসর। এসময় আপনি খুবই বিপদজনক অবস্থায় পড়ে যাবেন যদি এটা না নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন যে সে তার নিজের কাজটাই ঠিকমত করছে, অন্যদের উপর খবরদারি না করে। আপনাকে আপনার সকল সহযোগিদেরকে সমান চোখে ও সম্মানের সাথে দেখতে হবে। একজন প্রযোজনা সহযোগি যে ভীড় নিয়ন্ত্রণ করছে যাতে সবাই ঠিকমতো নিজনিজ কাজ করতে পারে সে কোনোভাবেই একজন অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, পরিচালক বা প্রোডাকশন ডিজাইনারের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শ্রেণীবিভাগ করে কাজ করার যায়গা সিনেমা নয়। তাই আপনি যখন আপনার সহযোগী নিয়োগ করবেন তখন এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন। এমন কাউকেই খুজে বের করবেন যে আপনার, আপনার সিনেমার বিষয় ও মানের সাথে মানিয়ে চলতে পারবে, আপনার সিনেমাকে সে নিজের সিনেমা হিসেবে দেখবে। আর যদি আপনি অনেক মানুষের সাথে কাজ করার মানসিকতা সম্পন্ন না হয়ে থাকেন তাহলে আপনার জন্য ছবি আকা বা বই লেখাই ভালো হবে। আর আপনি যদি সিনেমাকে ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যম মনে করেন তাহলে ভালো হবে সিনেমা বাদ দিয়ে আপনার রাজনীতি করা।

পাঁচ . মৌলিক বলে কিছু হয় না। নিজেকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য এবং আপনার কল্পণাশক্তিকে বাড়ানোর জন্য যেখান থেকে চুরি করার দরকার পরে করুন। সেটা হোক হারিয়ে যাওয়া পুরোনো সিনেমা, নতুন সিনেমা, গান, চিত্রকলা, ফটোগ্রাফ, কবিতা, স্বপ্ন, আড্ডা, স্থাপত্য, সেতু, রাস্তার সংকেত, গাছ, মেঘ, স্রোত, আলো-আঁধার। এসব বিষয় থেকে তাই চুরি করার জন্য বাছাই করুন যা আপনার আত্মাকে প্রশান্তি দেয়। যদি এটা আপনি ঠিকঠাকভাবে করতে পারেন তাহলে আপনার কাজ সত্য শিল্প হয়ে যাবে। শিল্পে সত্যতা হলো অমূল্য, মৌলিকত্ব হলো ক্ষণস্থায়ি। আর এই চুরি করা নিয়ে মনোকষ্টে ভোগার কিছুই নেই- বরং আপনি ঠিকঠাক চুরি করতে পারছেন এটাকে উপভোগ করুন। এক্ষেত্রে জ্যা লুক গদারের একটি কথা মাথায় রাখবেন সবসময়- ‘ এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ হলো কোথায় নিয়ে যাওয়া হলো।’

আরও পড়ুন : ঋতুপর্ণ ঘোষের সাক্ষাৎকার।

Facebook Comments
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।