যামিনী রায় : প্রথম ভারতীয় সফল পোট্রেটশিল্পী

share on:
যামিনী রায়

যামিনী রায় স্থানীয় লোকশিল্পের ঐতিহ্যকে অঙ্কনরীতিতে গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তিনি নিজেকে পটুয়া হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। তিনি পোট্রেটশিল্পী হিসেবে সাফল্য পাওয়া প্রথম ভারতীয় শিল্পী।

চিত্রশিল্পকে জাদুঘরের দেওয়াল থেকে মধ্যবিত্তের গৃহস্থালিতে পৌঁছে দেওয়া শিল্পীর নাম যামিনী রায়। চারিদিকে যখন পাশ্চাত্য শিল্পের অনুপ্রেরণায় ছবি আঁকার চল শুরু হয়েছে, সেই সময়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভূমিজ শিল্পকে। সেই শিল্পের পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি আজীবন অনড় থেকেছেন তার সমৃদ্ধির চেষ্টায়।

১৯২৫ সালের কাছাকাছি সময়। কালীঘাট মন্দিরের আশপাশে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ পটচিত্রগুলোর উপরে চোখ পড়ল তরুণ শিল্পী যামিনী রায়ের। কালী চরিত্র এবং কাহিনি তুলির টানে, উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। যেন ধাক্কা খেলেন। ‘ইম্প্রেশনিজম’ এবং ‘কিউবিজম’-উত্তর সময়ে শিল্পের এই সারল্য তাঁকে মুগ্ধ করল। খুঁজে পেয়েছিলেন, যা খুঁজছিলেন এত দিন ধরে।

চিত্রশিল্পী যামিনী রায় ১৮৮৭ সালের ১১ এপ্রিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতে আধুনিক চিত্রকলার অগ্রপথিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য তিনি।

তার বাবার নাম রামতরণ রায়। যামিনী রায়ের শৈশব-কৈশোর কাটে বাঁকুড়ার গ্রামে। সে সময় বাঁকুড়া মাটির মূর্তি তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল। শিশু যামিনী নিজ গ্রামের মূর্তিশিল্পীদের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেতেন। স্কুলের পড়া শেষে ১৯০৩ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। এখানে প্রচলিত ধ্রুপদী অঙ্কনরীতি এবং তৈলচিত্রে শিক্ষালাভ করেন। ১৯০৮ সালে ফাইন আর্টে ডিপ্লোমা লাভ করেন। এখানে তার পড়াশোনা চলে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন মেধাবী। ছাত্রাবস্থাতেই তার আঁকা ছবি ক্লাসে বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রাখা হতো।

তিনি প্রথম জীবনে পাশ্চাত্যের ইমপ্রেসনিস্ট ধারার ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এখান থেকে সরে আসেন। তিনি কালিঘাটের পট দ্বারা খুবই প্রভাবিত হন। এখানে ব্রাশের বিশেষ ধরনের ব্যবহার দেখা যায়। তিনিও তা নিজের ছবিতে ব্যবহার করেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যকার সময়ে তিনি নতুন এ নিরীক্ষার জন্য সাঁওতাল নাচকে বিষয় আকারে বেছে নেন। তার আঁকার রীতি বেঙ্গল স্কুল ও প্রচলিত পশ্চিমা ধারার বিরুদ্ধে ছিল নতুন এক প্রতিক্রিয়া। তার এ বাঁক বদলে তিনটি বিষয় স্থান পায়- গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপনের সরল মর্মকে তুলে ধরা, সমাজের বিস্তৃত অংশের মধ্যে চিত্রকলাকে প্রবেশসাধ্য করা এবং ভারতীয় চিত্রকলাকে নিজস্ব পরিচিতি দেওয়া।

ছবির ধারণা ও উদ্ভাবনায় বাংলার সাধারণ সমাজের ধর্ম, আচরণ, শিল্পকলা, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস উপজীব্য হল। তাঁর ছবির ফ্রেমে বাংলার উদ্ভিদজগৎ, প্রাণিজগৎ, প্রাকৃতিক জগৎ ধরা পড়ল। তবে এ সব তিনি মূলত খুঁজে পেলেন বাংলার পটচিত্রে।

স্বদেশপ্রেমিক শিল্পী যামিনী রায় তার পটচিত্রে শুধুমাত্র দেশজ রঙই ব্যবহার করেছেন। তিনি তার চিত্রে দেশজ উপাদান, যেমন- বিভিন্ন বর্ণের মাটি, ভূষোকালি, খড়িমাটি, বিভিন্ন গাছগাছালি, লতাপাতার রস থেকে আহরিত রং ব্যবহার করতেন। তার সকল চিত্র যেন জীবন্ত হয়ে উঠতো দেশীয় উপাদানে আর রঙে। তিনি সবকিছুতেই দেশীয়ই উপাদানের সাহায্য নিয়েছিলেন, যাতে ধনী-নির্ধন সবার কাছে অনায়াসেই পৌঁছুতে পারেন। তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছেন সাধারণের জন্য। খুবই স্বল্পমূল্য ও সহজলভ্যও ছিল চিত্রগুলো।

তাই সাঁওতাল সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা চালান। পাশ্চাত্য নয়, নিজস্ব সংস্কৃতি থেকেই আঁকাআঁকির বিষয়বস্তু ও শিল্পরীতি খোঁজা উচিত- এ উপলব্ধি তার মধ্যে কাজ করে। পরে তিনি কালিঘাটের পটচিত্রের রীতিকে আত্মস্থ করে ধর্মগত দৃশ্যাবলী, নৃত্য ও কর্মরত গ্রাম্য মানুষের ছবি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন। পটুয়াদের মতো তিনি মেটে রংয়ে ছবি আঁকতেন। তাদের মতোই একই বিষয়বস্তুকে বহুবার নানা ভাব-ভঙ্গিতে ও রঙে এঁকেছেন। তার আঁকা বিখ্যাত ছবির মধ্যে রয়েছে- ‘সাঁওতাল মা ও ছেলে’, ‘চাষির মুখ’, ‘পূজারিণী মেয়ে’, ‘কীর্তন’, ‘বাউল’, ‘গণেশ জননী’, ‘তিন কন্যা’, ‘যিশুখ্রিস্ট’, ‘কনে ও তার দুই সঙ্গী’ ও ‘ক্রন্দসী মাছের সাথে দুই বেড়াল’। এর মাধ্যমে রীতিটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন ভাব নিয়ে হাজির হয়। এ ছাড়া বিষয় বাছাইয়েও তার আন্তর্জাতিকতা ফুটে উঠে। যেমন- তার চিত্রে স্থান পায় যিশুখ্রিস্ট।

১৯৩০ এর দশকের শেষদিকে যামিনী রায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রণে ভারতীয় চিত্রকলাকে বিশ্ব দরবারে সম্মানজনক আসনে নিয়ে যান। ১৯৩৮ সালে কলকাতায় তার প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪০ এর দশকে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্ত ও ইউরোপিয়ানদের কাছে সমাদর পান। ১৯৪৬ সালে লন্ডন ও ১৯৫৩ সালে নিউইয়র্কে তার ছবির প্রদর্শনী হয়। এ ছাড়া আরও অনেক দেশি ও বিদেশি প্রদর্শনীতে তার ছবি ঠাঁই পেয়েছে। ভিক্টোরিয়া ও আলবার্ট মিউজিয়ামসহ অনেক সংগ্রাহকের মূল্যবান ভাণ্ডারে সংরক্ষিত আছে তার চিত্রকর্ম। পরবর্তীতে অনেক চিত্রশিল্পী তার কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

১৯৫৫ সালে তিনি পদ্মভূষণ উপাধি লাভ করেন এবং ১৯৫৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি দেয়।

১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : ভিনসেন্ট ভ্যান গগ।

Facebook Comments
share on: