মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী : মহাবিশ্বের হৃদয়ের কথক

share on:
মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী

মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী একজন সুফি সাধক ও কবি। তার রচিত ফার্সি ভাষার গ্রন্থ ‘মসনবী’ মুসলমানদের কাছে খুবই সন্মানিত ও আদরণীয়। পাশ্চাত্যেও এটি বহুলপঠিত বই। তিনি ইসলামের মৌল ধারণা তাওহীদকে বাতেনীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আজও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনা সভায় তার রচিত কবিতা আবৃত্তি করা হয়।

যারা প্রাচ্যের অতীন্দ্রিয়বাদ, বিশেষত সুফিবাদ, সম্পর্কে আগ্রহী তাদের কাছে মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিদিত। সর্বকালের সেরা একজন সুফিগুরু হিসেবে ইতিহাসে তাঁর আসন। কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক, বিশেষ করে ফার্সি সাহিত্যের গুণগ্রাহীরা তাঁর কাব্যকে উচ্চমানের কাব্য হিসেবে মর্যাদা দিয়ে থাকেন। জীবন ও জগত সম্পর্কে তাঁর অন্তর্ভেদী প্রেমময় দৃষ্টিভঙ্গি যেকোনো কালের মানুষের বোধ ও চিন্তার উৎকর্ষ সাধনে প্রাসঙ্গিক।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

তাঁর কবিতা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন শ্রেণীতে রূপান্তরিত হয়েছে। রুমিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি’ এবং ‘বেস্ট সেলিং পয়েট’ বলা হয়।রুমির কাজ বেশির ভাগই ফার্সি ভাষায় লেখা। কিন্তু মাঝেমধ্যে তিনি স্তবকগুলিতে তুর্কি, আরবি এবং গ্রিক ভাষাও ব্যবহার করেছেন।

সাহিত্যের সামগ্রিক বিচারে রুমির মাহাত্ম্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি তার সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে। ইসলামকে তিনি উপলদ্ধি করেছেন অন্তর দিয়ে। মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া মানব জাতির মুক্তি নেই। এ সত্য তিনি সুন্দরভাবে কাব্য রসে সিক্ত করে শৈল্পিক সুষমায় পরিপুষ্ট করে উপস্থাপন করেছেন। তার প্রতিটি শব্দ মানুষকে-মনকে পবিত্রতা ও সৌন্দর্য দান করে। মানব সন্তান সীমাহীন স্বাধীনতা ও অফুরন্ত স্বর্গীয় মহিমা নিয়ে জন্মলাভ করেছে। এ দু’টি পাওয়া তাদের জন্মগত অধিকার। তবে এ মহামূল্যবান দু’টি জিনিস পেতে হলে তাদের অবশ্যই ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কেউ হয়তো বা প্রশ্ন করতে পারেন এর মধ্যে নতুন কী আছে? দুনিয়ার সকল মহাপুরুষই তো এ কথা বলে গেছেন। রুমির মাহাত্ম্য এখানেই নিহিত যে, তিনি অত্যন্ত সরাসরি দৈনন্দিন জীবনাচরণ থেকে উদাহরণ টেনে মহাসত্যকে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করছেন দক্ষতার সাথে। উন্মোচন করেছেন মানবাত্মার রহস্য।

রুমির কবিতার সতেজ ভাষা এবং ছন্দ সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিতো। তার প্রতিটি শব্দ শুনে মনে হতো এগুলো সাধারণ ভাষা নয়, মানুষের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনের অনুবাদ, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের ভাষা। তিনি তার কবিতাগুলো বা গজলগুলো লেখার অনুপ্রেরণা পেতেন তার পারিপার্শ্বিকতা থেকেই। কখনো বা রাখালের বাজানো বাঁশির সুর শুনে, কখনো ঢাকের আওয়াজ শুনে, আবার কখনো স্বর্ণকারের হাতুড়ির আওয়াজ শুনে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টিকর্তার খোঁজ কোনো মসজিদ বা গির্জার পাওয়া সম্ভব নয়, সৃষ্টিকর্তার খোঁজ করতে হয় নিজের হৃদয়ে। তাই তিনি বলেছিলেন,

“আমি সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজছিলাম। তাই আমি মন্দিরে গেলাম, সেখানে তাকে খুঁজে পেলাম না। আমি গির্জায় গেলাম, সেখানেও তাকে পেলাম না। এরপর আমি মসজিদে গেলাম সেখানেও তাকে পেলাম না। এরপর আমি নিজের হৃদয়ে তাকে খুঁজলাম, সেখানে তাকে খুঁজে পেলাম।”

তিনি আরো বিশ্বাস করতেন ভালোবাসাই সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পাওয়ার সর্বোত্তম পন্থা। এজন্য তিনি বলেছিলেন,

“স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অজস্র পথ আছে। তার মাঝে আমি প্রেমকে বেছে নিলাম।”

রুমি প্রায়ই তার অনুসারীদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতির মাঝে ঈশ্বর অদৃশ্য জগতের বার্তা ছড়িয়ে দেন। তিনি প্রকৃতিকে ঈশ্বরের ভালোবাসার প্রতিফলন রূপে দেখতেন এবং সেখান থেকে কবিতা গজল রচনা করার অনুপ্রেরণা পেতেন। তিনি বলেছিলেন,

“প্রত্যেক বৃক্ষপত্র অদৃশ্য জগতের বার্তা বহন করে। চেয়ে দেখো, প্রতিটি ঝরা পাতায় কল্যাণ রয়েছে।”

প্রায়ই তিনি কবিতা বা গান রচনা করার সময় অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন। কখনো কখনো তিনি তার গজলগুলোর সাথে এতটাই একাত্ম সাথে হয়ে যেতেন যে গভীর মগ্নভাবে ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করতেন। তার নাচ দেখে মনে হতো, নাচের মাঝেই অন্য কোনো জগতে চলে গিয়েছেন, বাস্তব জগতের সাথে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি নাচতেন, যখন তিনি সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসার সাথে একাত্মতা অনুভব করতেন। তার নাচ তার কাছে একধরনের ইবাদত ছিল। তিনি বলেছিলেন,

“আমরা শূন্য থেকে ঘুরতে ঘুরতে এসেছি
যেমনটা তারারা আকাশে ছড়িয়ে থাকে।
তারারা মিলে একটি বৃত্তের সৃষ্টি করে,
এবং তার মাঝে আমরা নাচতে থাকি।”

রুমী ১২০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পারস্যের বলখ শহরের কাছে (বর্তমান আফগানিস্তানের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন ইসলামী ফিকহ, ধর্ম ও সুফিবাদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যে ধারক এক বংশের উত্তরাধিকারী। বাহাউদ্দিনের লেখা মা’রিফ (আত্মাকে ভালবাসার কথা) নামের বই রুমীকে কাব্যচর্চা ও আধ্যাত্মিকতায় অনুপ্রাণিত করেছিল।

পিতা সেই সময়ের বিখ্যাত উলামা এবং আইনজ্ঞ হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই রুমির সুযোগ ঘটে ইসলামি শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করার। আর তার মা মুইমিনা খাতুন খোয়ারিজমী রাজবংশের বংশধর হওয়ায় শৈশব থেকেই রুমি সমাজের উঁচু স্তরের লোকজনদের সাথে মিলেমিশে বড় হতে থাকেন। রুমির বয়স যখন ১১ বছর, বালখ শহরের রাজার সাথে এক বিবাদের জের ধরে বাহা উদ্দিন ওয়ালাদ তার পরিবার আর কয়েকশ অনুসারী নিয়ে মধপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হিজরতের জন্য বের হয়ে যান। আর এই হিজরত চলাকালেই রুমির সাথে সাক্ষাৎ ঘটতে থাকে সে সময়ের বিখ্যাত সব মনিষীদের।

তার ১৮ বছর বয়সে মক্কা যাওয়ার পথে নিশাপুরে তাদের সাথে দেখা হয় পারস্যের বিখ্যাত আধ্যাত্মিক কবি আত্তারের। তিনি রুমিকে তার বাবার পেছনে হাঁটতে দেখে বলে ওঠেন,“একটি হ্রদের পেছনে একটি সমুদ্র যাচ্ছে”। তিনি রুমিকে ইহজগতের আত্মার উপর লেখা একটি বই ‘আসারনামা’ উপহার দেন। যা রুমির কিশোর বয়সে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি রহস্যের উপরে আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। হিজরত চলার সময় কারামানে থাকা অবস্থায় ১২২৫ সালে রুমি গওহর খাতুনকে বিয়ে করেন। তাদের দুজন ছেলে- সুলতান ওয়ালাদ এবং আলাঊদ্দিন চালাবী। এরপর গওহর খাতুন মারা গেলে রুমি এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেন, যার আগে একটি মেয়ে ছিল কিমিয়া খাতুন নামে। এখানে রুমির এক ছেলে আমির আলিম চালাবী এবং এক মেয়ে মালাখী খাতুনের জন্ম হয়।

এই ঘটনার কিছুদিন পর ১২৩১ সালে রুমীর বাবা ইন্তেকাল করেন। এ সময় রুমী তার বাবার মুরিদদের আত্মার বিকাশের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিষয়, ধর্মতত্ত্ব, কবিতা ও সঙ্গীত বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দশ হাজার ছাত্রের সমাবেশ ঘটে।

১২৪৪ সালের ১৫ নভেম্বর রুমীর সাথে সাক্ষাত হয় তার আধ্যত্মিক পথ প্রদর্শক সুফি সাধক ও কবি শামস-ই-তাবরিজের। তাবরিজ তাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। রুমীর একটি বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজ’। শামস তাবরিজি ছিলেন একজন চালচুলোহীন ভবঘুরে সাধু, লোকে যাকে ‘পাখি’ বলে ডাকতো। কারণ তিনি এক জায়গায় বেশিদিন স্থির থাকতে পারতেন না আর প্রচলিত ছিল, তাকে একইসময় দুই জায়গায় দেখা যেত, যাতে মনে হতো তিনি উড়ে বা নিজের ইচ্ছামতো চোখের পলকে অবস্থান বদল করতে পারতেন।

শামস তাবরিজি প্রথম রুমিকে দেখেছিলেন যখন রুমির বয়স ২১ বছর, এবং তিনি রুমিকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন রুমিই হতে পারবেন তার যোগ্য শিষ্য এবং প্রতিনিধি, যিনি তার আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং ক্ষমতাকে পরিপূর্ণভাবে ধারণ করতে পারবেন। কিন্তু রুমির বয়স তখন কম থাকায় তিনি তখন রুমিকে ধরা দেননি। তাই রুমির বয়স যখন চল্লিশ হয় এবং সেই আধ্যাত্মিকতা ধারণ করার জন্য তিনি যোগ্য হয়ে ওঠেন, তখন শামস তাবরিজি আবার তাকে খুঁজে বের করেন। রুমিও শামস তাবরিজির সাক্ষাৎ পেয়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন এতদিন যে জীবন, যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন, তার বাইরেও অনেক কিছু আছে। অনেক কিছু তার বোঝার ও ধারণ করার আছে। তাই তিনি শামস তাবরিজিকে তিনি তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। তার সাথে দীর্ঘক্ষণ একান্ত সময় কাটাতে থাকেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন।

কিন্তু শামস তাবরিজির সাথে রুমির মেলামেশার এই বাড়াবাড়ি সকলে ভালোভাবে নিতে পারেনি। তার পরিবার এবং সমাজের উঁচু স্তরের লোকেরা মনে করতে থাকেন, শামস তাবরিজির সাথে এত মেলামেশায় রুমির ‘সম্মানহানি’ ঘটছে। তাই তারা শামস তাবরিজিকে বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন এবং তাবরিজিও এক পর্যায়ে কোনিয়া ছেড়ে দামেস্কে চলে যান। কিন্তু এই ঘটনায় রুমি প্রচন্ড ভেঙে পড়লে তার বড় ছেলে সুলতান ওয়ালাদ তাকে কোনিয়া ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন।

এরপর রুমি শামস তাবরিজিকে কোনিয়ায় ধরে রাখতে এক অদ্ভুত কাজ করে বসেন। তার ১২ বছর বয়সী সৎ মেয়ে কিমিয়া খাতুনকে ষাটোর্ধ্ব শামস তাবরিজির সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। এই ঘটনায় রুমির ছোট ছেলে আবদুল্লাহ চেলেবী প্রচণ্ড ক্ষেপে ওঠে, কারণ সে কিমিয়া খাতুনকে মনে মনে পছন্দ করতো। বিয়ের কয়েক মাস পর কিমিয়া খাতুন মারা গেলে সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তিদের মৌন সম্মতিতে আবদুল্লাহ শামস তাবরিজিকে হত্যা করে, এবং রাতের আঁধারেই রুমির অগোচরে তাকে দাফন করে ফেলে। রুমি তার জীবদ্দশায় এই ঘটনা কোনোদিনই জানতে পারেননি। তিনি প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেননি শামস তাবরিজি মারা গিয়েছেন। তাই তিনি লেখেন,

“কে বলে, যে অমর সে মারা গিয়েছে?
কে বলে, আশার সূর্য মারা গিয়েছে?
ঐ দেখো, এ তো সূর্যের শত্রু যে ছাদে এসেছে,
এবং চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে বলছে, “হে, সূর্যের মৃত্যু হয়েছে।”

এভাবে তিনি চল্লিশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং এরপর কালো পোশাক পরে শামস তাবরিজির মৃত্যুর ঘোষণা দেন। তাকে হারানোর এই শোকই রুমির জীবনের মোড় পরিপূর্ণভাবে ঘুরিয়ে দেয়। এবং তার কাব্যসাধনার সূচনা ঘটে এই আঘাতের পর থেকেই। নিজের প্রিয় শিক্ষক এবং বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা তাকে করে তোলে প্রেমের ও বন্ধুত্বের কবি। তিনি লেখেন,

“তুমি চলে গেলে আমার চোখ দিয়ে রক্ত বাহিত হলো। আমি কেঁদে কেঁদে রক্তের নদী বহালাম। দুঃখগুলো শাখা-প্রশাখা বেড়ে বড় হলো, দুঃখের জন্ম হলো। তুমি চলে গেলে, এখন আমি কীভাবে কাঁদবো? শুধু তুমি চলে গেছো তা-ই নয়, তোমার সাথে সাথে তো আমার চোখও চলে গেছে। চোখ ছাড়া এখন আমি কীভাবে কাঁদবো প্রিয়!”

শামস তাবরিজির মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পর রুমির আবার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সালাউদ্দীন জাকুব নামক এক স্বর্ণকারের সঙ্গে। তিনি একদিন সালাউদ্দিন জাকুবের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন এমন সময় তার হাতুড়ির আঘাতের শব্দ শুনে তিনি নাচতে শুরু করেন, তিনি জাকুবের হাতুড়ির আঘাতের শব্দের মাঝে যেন সৃষ্টিকর্তার করুণার সুর শুনতে পান, আর এভাবেই তাদের বন্ধুত্বের সূচনা হয়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন যাবত জাকুব রুমির ঘনিষ্ঠ সহচরী হয়ে ছিলেন। রুমি তার বড় ছেলের সাথে সালাউদ্দিন জাকুবের মেয়ের বিয়ে দেন।

সালাউদ্দিন জাকুবের মৃত্যুর পর রুমির এক ছাত্র হুসাম আল চেলেবীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। হুসাম আল চেলেবীকে তিনি ‘দিয়া আল-হাক’ বলে ডাকতেন। যার অর্থ ছিল ‘সত্যের প্রদীপ’। তার পরামর্শেই রুমি তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘মসনবী’’ লেখা শুরু করেন। মাসনাভির মাঝে ১৩ শতকের সূফীবাদের বেশ নিদর্শন পাওয়া যায়। এছাড়াও রুমি মাসনাভিতে ফুটিয়ে তুলেছেন শামস তাবরিজি, সালাউদ্দিন জাকুব এবং হুসাম আল চেলেবীর প্রতি তার ভালোবাসার কথা।

রুমী তার জীবনের শেষ ১২ বছর ধরে তার বিখ্যাত কবিতার বই ‘মসনবী’ রচনা করেন। ২৭ হাজার লাইন বিশিষ্ট কবিতাটি ছয় খণ্ডে বিভক্ত। এর কোথাও রয়েছে আত্মা-পরামাত্মার কথা, কোথাও বা রসিকতার ছলে কোরানের আয়াতের ব্যাখ্যা। মাওলানা রুমী বলেন, ‘মাসনভী গ্রন্থ রহস্য উদঘাটনে ধর্মের মূলনীতিসমূহের শিকড়। এটি মহান প্রভুর সর্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট দলিল।’ (মাসনভীঃ মুকাদ্দমা) এই মাসনভী শরীফ বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডারে পরিপূর্ণ। এই জ্ঞান-ভাণ্ডার থেকে প্রত্যেকে জ্ঞানের পরিধি অনুসারে লাভবান হতে সক্ষম। অসংখ্য বাস্তব কল্প-কাহিনী, উপকথা, নীতি-গল্প কাহিনীর মাধ্যমে তরীকত, হাক্কীকত এবং মারেফাতের গূঢ় রহস্য উন্মোচন, আল্লাহর মহব্বত, কামেল পীরের পরিচয়, পরলৌকিক সুখ-শান্তি লাভের উপায় এবং আল্লাহর অস্তিত্ব বিষয়ের বর্ণনা এই মাসনভীতে রয়েছে।

‘মসনবী’ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলায় এর কয়েকটি অনুবাদ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এমদাদিয়া লাইব্রেরিতে থেকে প্রকাশিত মাওলানা আবদুল মাজিদের অনুবাদ। ‘দিওয়ান-ই-শামস-তাবরিজ’ও বাংলায় পাওয়া যায়। এছাড়া রুমীকে নিয়ে রচিত কোলম্যান বার্কসের বই ‘দ্য সোল অব রুমী’ বাংলায় অনুদিত হয়েছে।

রুমীর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আশাবাদ (Optimism) মানুষ বিরহ বেদনা, দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকবে- কোনো হতাশা নৈরাশ্য নয়।
তার সুফি সাধনার বিশিষ্টতা লক্ষ্যণীয়। তিনি খোদা প্রাপ্তিতে গান, কবিতা ও নৃত্যের ব্যবহার করেন। তিনি সামা গাইতে উৎসাহিত করেন। তার দ্বারা ঘূর্ণনমান নৃত্যের একটি ধারার ব্যাপক প্রসার লাভ করে। রুমির মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে সুলতান ওয়ালাদ এবং এবং শিষ্য হুসাম আল চেলেবি রুমির অনুসারীদের নিয়ে মৌলভী সম্প্রদায় গড়ে তোলেন, যারা বর্তমানে তুর্কিস্থানের ‘ঘূর্ণায়মান দরবেশ’ নামে পরিচিত। রুমি তার কবিতা বা গজল গাওয়ার সময় যে ঘূর্ণায়মান নৃত্যে মেতে উঠতেন, তার নির্দিষ্ট কোনো ধরন ছিলো না।

সুলতান ওয়ালাদ পরবর্তীতে এই নাচের অনুসরণ করে তার বাবার সম্মানার্থে একটি নির্দিষ্ট ধরনের নাচের সূচনা করেন, যেখানে একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রাখা হয় রুমির রূপক হিসেবে এবং বাকিরা তাকে ঘিরে গোল করে ঘুরতে থাকে, যেভাবে সূর্যের চারপাশে গ্রহরা ঘুরে থাকে। আর এভাবেই রুমি নয় বরঞ্চ সুলতান ওয়ালদের হাত ধরে বিখ্যাত ‘সূফী নৃত্য’ বা ‘সামার’ সূচনা ঘটে।

রুমির বিভিন্ন কবিতা এবং গানের পাশাপাশি ‘ফিহি মা ফিহি’ নামে তার বিভিন্ন উক্তির সংগ্রহ পাওয়া যায়, যা তার অনুসারীরা এবং বন্ধুরা বিভিন্ন সময় লিখে রেখেছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে লেখা তার বেশ কিছু চিঠিও পাওয়া গিয়েছে। রুমির চিন্তা বা ধারণাগুলোকে আসলে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা সম্ভব নয়। অনেক সময় এদের নিজেদের মাঝেই বিভিন্ন পার্থক্য ও বৈচিত্র্য দেখা যায়। তার বিভিন্ন রূপকের ব্যবহার এবং ধারণার পরিবর্তনশীলতা অনেকসময় পাঠকদের ধাঁধায় ফেলে দেয়।

তার কবিতা বা লেখাগুলো আসলে বিভিন্ন রহস্যময় ও বিচিত্র অভিজ্ঞতায় মানুষের অভিব্যক্তিরই প্রতিফলন যেখানে মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন অনুভূতিকে খুঁজে পায়। তাই তো জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমিকে কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠী দিয়ে বেঁধে ফেলা সম্ভব নয়, কারণ তিনি সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়ের কথা বলেন, আর তিনি সবকিছু হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন। আর এ কারণেই তিনি সকলের হৃদয়ের সাথে মিশে যান।

রুমি প্রচন্ডভাবে বিশ্বাস করতেন যে সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌছানোর রাস্তা হচ্ছে সঙ্গীত, কবিতা, এবং নৃত্য। রুমির কাছে, সঙ্গীত সাহায্য করে সমস্ত সত্তাকে পবিত্র করতে কেন্দ্রীভূত করে এবং এতই তীব্রভাবে যে আত্না একই সাথে ধ্বংস এবং পুনরুত্থিত হয়। এই ধারণা থেকে সূফী নৃত্য গড়ে উঠে। তার শিক্ষা মৌলভি তরিকার ভিত্তি হয়ে উঠে, যেটি তার ছেলে সুলতান ওয়ালাদ পূর্ণাঙ্গ করে ছিলেন। রুমি “সামা” এর পৃষ্ঠপোষক, এটি সঙ্গীত শোনার মাধ্যেমে পবিত্র ভাবে নর্তন করা। মৌলভি ঐতিহ্যের মধ্যে “সামা” প্রতিনিধিত্ব করে মন এবং ভালবাসার মাধ্যমে একের নিকট আধ্যাত্মিক আরোহণের এক রহস্যময় ভ্রমণ। এই ভ্রমণে অন্বেষক প্রতিকীভাবে সত্যের দিকে ফিরে,ভালবাসা বৃদ্ধি, অহং পরিত্যাগ, সত্যের সন্ধান পায় এবং নির্ভুল একের নিকট পৌছায়। এরপর অন্বেষক আধ্যাত্মিক ভ্রমণ থেকে ফেরে, পরিপক্কতা লাভের মাধ্যমে সৃষ্টিকে ভালবাসতে এবং সেবা করতে।

রুমি বিশ্বাস করেন, সৌন্দর্য মানব মনের চিরন্তন কাম্য। কেননা আল্লাহ নিজেই সুন্দর এবং তিনি সব সৌন্দর্যের উৎস। আর মানবাত্মার প্রকৃত চাহিদা হচ্ছে খোদ আল্লাহর সান্নিধ্য।

সুফি সাধক ও কবি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী ১২৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর তুরস্কের কুনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন।

রুমির কবরের এপিটাফটিতে উজ্জ্বল হরফে লেখা রয়েছে, ‘যখন আমি মৃত, তখন আমাকে আমার সমাধিতে না খুঁজে মানুষের হৃদয়ে খুঁজে নাও।’

কোনিয়ায় তার মাজার বা সবুজ দরগা এখনো বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের, বিশেষ করে তুর্কিস্তানের মুসলিমদের কাছে তীর্থস্থান বলে পরিগণিত হয়।

আরও পড়ুন : ফ্রান্সিস বেকন : অভিজ্ঞতাবাদের জনক।

* আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন parthibrashed@ymail.com এ।

Facebook Comments
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।