আকিরা কুরোসাওয়ার সাক্ষাৎকার

আকিরা কুরোসাওয়ার সাক্ষাৎকার

আকিরা কুরোসাওয়া প্রথম জাপানিজ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠেন ১৯৫১ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘রশোমন’ সেরা চলচ্চিত্র পুরষ্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে। তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে টেকনিক ও গল্প বলার ধরন ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান চলচ্চিত্র দ্বারা প্রভাবিত, বিশেষ করে ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র দ্বারা।

আকিরা কুরোসাওয়া বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পোত্তীর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় দিকসমূহের সম্পর্কে। জাপানে আকিরা কুরোসাওয়া ‘চলচ্চিত্রের সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

আপনার ডাকনাম সম্রাট হলো কিভাবে?

এটা আমি পেয়েছি সাংবাদিকদের কাছ থেকে, তাঁরা আমাকে এই নামেই ডাকতে বেশি পছন্দ করে।

আপনি পেইন্টিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু পেইন্টার না হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা হলেন কেন?

আমার পেইন্টার না হওয়ার একটা কারণ হলো- আমি পরীক্ষায় পাশ করি নাই।

আপনার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়?

কেউ কেউ বলে সেটা হলো ‘সেভেন সামুরাই’। সেভেন সামুরাই সেই সময়ের চলচ্চিত্র যখন আমার জনপ্রিয়তা ছিলো শীর্ষে। তারপরেও, ব্যক্তিগত এটা আমার পছন্দের চলচ্চিত্র নয়। তাছাড়া একটি কাজের জন্ম দেওয়ার পেছনে যখন কারও অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকার ব্যপার থাকে, একেবারে আইডিয়া থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার জন্য, তখন আলাদাভাবে একটি কাজকে বেশি প্রিয় ভাবা আর সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। আমি বলতে চাই, আমার প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রই আমার কাছে আলাদা আলাদা যায়গা থেকে আমার প্রিয়, আমার জীবনের এক একটি অংশ।

কোন ধরণের চলচ্চিত্র আপনি তৈরি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন?

আমি কোন চলচ্চিত্রই করি না, যা আমি চাই না। আমি সেই চলচ্চিত্র করতে উৎসাহী হই না সেখানে আমাকে বেশি টাকা কামানোর জন্য জোর করা হয়। এটা ভাল হোক বা না হোক, এইক্ষেত্রে আমি দৃঢ়। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার অবশ্যই একটি বিষয়ে বিশ্বস্থ থাকতে হবে, নিজের কাছে সৎ থাকা এবং তার কাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া। একজন প্রোডিউসার একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে অবশ্যই টাকা দিবেন, যদি একজন নির্মাতা প্রোডিউসারকে তার ক্রিয়েটিভিটি সম্পর্কে বিশ্বাসস্থাপন করাতে পারে। তবে  সত্যি কথার মাধ্যমে টাকা আদায় করাটা অনেক বেশি কঠিন। তারচেয়ে, এটা খুবই সহজ কাজ, জাপানের ইতিহাস ও তার কালচারাল ভেলুজ তুলে ধরার একটা ধোয়া তুলে খুব সহজেই টাকা আদায় করা যায় বিভিন্ন প্রোডিউসারদের কাছ থেকে।

আপনার চলচ্চিত্রে সম্পাদনার ক্রেডিট থাকে না কেন?

আমার চলচ্চিত্রে আমিই সম্পাদনা করি। সম্পাদনা করা নির্মাতা হিসেবে কাজ করারই একটি অংশ। তাই আমি আর আলাদা করে সম্পাদনার যায়গায় আমার নাম দেই না। আমি প্রতিদিন শ্যূটিং শেষে আমার রাশগুলোকে এডিট করি। এই ক্ষেত্রে আমি অন্যদের থেকে একটু আলাদা। আমি এটা পছন্দ করি, প্রিন্ট করার আগে লাস্ট মিনিট ডিসিশন বলে যে একটা ব্যাপার থাকে তা আর আমার বেলায় খাটে না। তাছাড়া দৃশ্যের ফ্রেশ ফিলিং থাকতে থাকতে এডিট করাটা বেশি এফেকটিভ মনে হয় আমার কাছে। এটা ফাইনালি সঠিক সম্পাদনা করার ক্ষেত্রেও অনেক সহজ হয়ে যায়। আমি প্রতিদিন শ্যুটিং শেষে রাফ এডিটিং এর জন্য সর্বোচ্চ দুই ঘন্টা সময় রেখে দেই।
সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময়ে আমি একথা বুঝে গেছিলাম যে, সম্পাদনা ঠিকঠাকমতো করতে না জানলে ভাল চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়া যায় না। সম্পাদনার টেবিলেই একটি চলচ্চিত্র তার জীবন পায়। সেই রকমের জীবন ও গতি যা আমি আমার চলচ্চিত্রে চাই।

একটা চলচ্চিত্র করতে আপনি কতোদিন সময় নেন?

আমার একটি চলচ্চিত্রের শ্যুটিং শেষ হতে আট-নয় মাস সময় লেগে যায়। আর আমি প্রতিদিন শ্যুটিং করি না। আমি একসঙ্গে তিনটি ক্যামেরা ব্যবহার করি শ্যুটিং এর সময়। আমি খুব কমই আমার শট ও কাট রিপিট করি। মাঝে মাঝে একসঙ্গে ১৬ মিনিট শ্যুট করি।

অভিনেতাদেরকে আপনার চরিত্রের উপযোগি করে তোলার পেছনের গোপন রহস্য কি?

আমি রিহার্স করাই ও তাদের আমার চরিত্রের উপযোগি করে তৈরি করি। আর এটা করতে আমার আট মাসের মতো সময় লেগে যায়, এই দীর্ঘ সময়ে তারা চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় এবং নিজেরাই বুঝতে পারে কখন তাদের কি ধরণের ইন্টারপ্রিটেশন এর দরকার হবে। একটি চরিত্র তৈরি করার জন্য অভিনেতাদের সময় দেওয়া উচিত, আর আমি তা দেই। এখানে কোন রহস্য-টহস্য নেই। প্রথম কাজ হলো তাদের মধ্যে প্যাশেন্সটা তৈরি করা।

আপনার চলচ্চিত্রে প্রকৃতিকে আমরা ভিন্ন এক চমৎকারীত্বে পাই, এটার ভেতরে কি কোন ইঙ্গিত আছে?

হ্যা, আমার চলচ্চিত্রের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রকৃতি। আমি আমার চরিত্রগুলোর ইমোশন তুলে ধরতে প্রকৃতিকে ব্যবহার করি। আমরা মানুষেরা বিশেষ করে জাপানিজরা প্রকৃতির সঙ্গে খু্বই ঘনিষ্টভাবে জড়িত। আমি মনে করি, প্রকৃতির সঠিক উপস্থাপনের ক্ষমতার মধ্য দিয়ে একটি খারাপ চিত্রনাট্য ও অপেশাদার অভিনেতা দিয়েও ভাল চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব। আমি আমার অভিনেতাদেরকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করার একটা প্রচেষ্টা করে থাকি। আমার মনে হয় এজন্যই নতুন একজন অভিনেতাও অনেক ভাল অভিনয় করে।

ভাল চলচ্চিত্র তৈরির জন্য কি করা দরকার? আপনি এজন্য কি করেন?

যখন আপনি একটি চলচ্চিত্র তৈরি করবেন, তখন আপনাকে চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হতে হবে- তার দুঃখে আপনি কাঁদবেন , সুখে হাসবেন, একত্রে সবকিছুর মোকবিলা করবেন- এটাই হলো চলচ্চিত্র।
আমি আমার ক্রিয়েটিভিটির যে এবিলিটি আছে তার মাধ্যমেই সবকিছু করি। যা আমি করতে পারি না, তা করার চেষ্টা আমার মধ্যে নেই। আমি আমার চেনা সমাজ ও চেনা মানুষকে এবং তাদের সমস্যাকে আমার বিষয় হিসেবে বেছে নেই। এর ভেতরকার যে লুকায়িত নতুনত্ব তা আমার ক্ষমতা দিয়ে বের করে নিয়ে আসি। আমি খুবই খুশি যে আমি আমাকে প্রকাশ করতে পারছি। আমি আমার প্রফেশনের প্রতি দায়িত্ববান, সত্যবাদী ও সৎ থাকার চেষ্টা করি। আপনি যখন আমার চলচ্চিত্র দেখতে যাবেন তখন বুঝতে পারবেন যে, গল্প বলার ক্ষেত্রে আমার গোপন কোনো বিষয় নেই।

আরও পড়ুন : প্রতিটি চলচ্চিত্র আমার শেষ চলচ্চিত্র : ইঙ্গমার বার্গম্যান

আইএমডিবি লিংক :  আকিরা কুরোশোয়া

Facebook Comments Box