হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হক , ষাটের দশকে আবির্ভূত এই কথাসাহিত্যিক তার সুঠাম গদ্য এবং মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির জন্য প্রসিদ্ধ। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের কথকতা তার গল্প-উপন্যাসের প্রধানতম অনুষঙ্গ। রাঢ়বঙ্গ তার অনেক গল্পের পটভূমি।

হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে নগরের চৌদ্দপায়ে আবাসিক এলাকা ‘বিহাস’ অনেক বছর ধরে তার ঠিকানা।

১৯৬০ এর দশকে তিনি কথাসাহিত্যিক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন তার মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির জন্য। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ও ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তাকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের পক্ষ থেকে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি দেওয়া হয়।

হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যে পদচারণা রাজশাহী কলেজে পড়ার সময়; ভাঁজপত্র ‘চারপাতা’য় প্রকাশিত এক রম্য রচনার মাধ্যমে। রাজশাহীর আম ছিল সেই রচনার উপজীব্য।

এরপর শিক্ষকতা করতে খুলনায় গিয়ে লেখালেখিতে সক্রিয় হয়ে ‍ওঠেন তিনি। খুলনায় এসে তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির উৎসমুখ খুলে গেল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সন্দীপন’-কে কেন্দ্র করে। ষাটের দশকের প্রথম দিকেই নাজিম মাহমুদ, মুস্তাফিজুর রহমান, জহরলাল রায়, সাধন সরকার, খালেদ রশীদ প্রমুখ সংগ্রামী কয়েকজন তরুণের চেষ্টায় গঠিত হয়েছিল ‘সন্দীপন গোষ্ঠী’। গণসঙ্গীত ও গণসংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁরা। পরে ১৯৭৩ সালের দিকে তাঁদেরই কেউ কেউ, বিশেষ করে নাজিম মাহমুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নাটক, আবৃত্তি, সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতি চর্চা দিয়ে সরগরম করে তোলেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। ততদিনে অবশ্য হাসান আজিজুল হক রীতিমতো বিখ্যাত। আদমজী এবং বাংলা একাডেমী পুরস্কারের মুকুট তাঁর মাথায়। আঙ্গিক, ভাষা ও বিষয়ের অভিনবত্বে তিনি বাংলা গল্পে তাঁর অবস্থান সংহত করে নিয়েছেন। ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘জীবন ঘষে আগুন’ এইসব গ্রন্থের গল্পগুলো লিখে মনোযোগ কেড়ে নিয়েছেন বোদ্ধা পাঠকদের। ষাটের দশকে বাংলা কথাসাহিত্যের বাঁক বদলের রূপকারদের অন্যতম একজন হিসেবে স্বীকৃতিও মিলতে শুরু করেছে তাঁর।

আদমজী ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর তার লেখায় আসে বৈচিত্র্য। আঙ্গিক, ভাষা ও বিষয়ের অভিনবত্বে বাংলা গল্পে অবস্থান সংহত করেন তিনি।

প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’-এর প্রথম গল্প ‘শকুন’-এ সুদখোর মহাজন তথা গ্রামের সমাজের তলদেশ উন্মোচিত করেছিলেন তিনি। সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় তাঁর গল্পের ভিতর-বাহির কীভাবে পাল্টেছে, প্রথম গ্রন্থের প্রথম গল্পের সাথে এ যাবত্‍ প্রকাশিত শেষগ্রন্থের শেষ গল্পটি পাশাপাশি রেখে পড়লেই পাঠক তা ধরতে পারবেন। সময়, সমাজ ও মানুষের অন্তর-বাহির ও বিস্তৃতি চষে বেড়িয়েছেন হাসান আজিজুল হক। প্রখর দৃষ্টি দিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজেছেন মানুষের গহীন তল্লাট।

সময় ও সমাজ আলাদা হলেও যেসব সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কারণে ভিন্ন ভিন্ন সমাজে ভিন্ন ভিন্ন সময়েও মানুষ মানুষই থাকে, সেসব বৈশিষ্ট্যের দিক তুলে ধরে তাঁর গল্প বিশ্বজনীন এবং চিরন্তন আবেদন নিয়ে এসেছে। যেমন ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পের সেই উদ্বাস্তু লোকটি- যে তার মেয়ের মাংস বিক্রির টাকায় জীবনাতিপাত করে। তার সেই উদ্বাস্তু জীবনের গ্লানি ও বেদনাবোধ স্থান ও কালের পরিসর ছাড়িয়ে ওঠে। প্রায় অর্ধশতাব্দীর গল্পচর্চায় বিষয়, চরিত্র ও নির্মাণকুশলতায় উল্লেখ করার মতো গল্প হাসান আজিজুল হকের অনেক।

তাঁর একটি গল্পগ্রন্থের নাম ‘রাঢ়বঙ্গের গল্প’। শুধু এ গ্রন্থের গল্পগুলোই নয়, তাঁর অনেক গল্পেরই শিকড় আছে রাঢ়বঙ্গে। তবু আজ তিনি এই বাংলাদেশেরই লেখক। নিজেকে আমূল প্রোথিত করে নিয়েছেন এই বাংলাদেশের বাস্তবতায়।

হাসান আজিজুল হকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: গল্পগ্রন্থ- সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য (১৯৬৪), আত্মজা ও একটি করবী গাছ (১৯৬৭), জীবন ঘষে আগুন (১৯৭৩), নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৮), রোদে যাবো (১৯৯৫), মা মেয়ের সংসার (১৯৯৭), বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প (২০০৭), রাঢ়বঙ্গের গল্প (১৯৯১), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৭), হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠগল্প (১৯৯৫)। উপন্যাস- বৃত্তায়ন (১৯৯১), আগুনপাখি (২০০৬), শিউলি।

বাংলা ছোট গল্পের ‘রাজপুত্র’ খ্যাতি পাওয়ার পর উপন্যাসে হাতে দেন হাসান আজিজুল হক। তার লেখা উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে বৃত্তায়ন, আগুনপাখি, সাবিত্রী উপাখ্যান।

প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- চালচিত্রের খুঁটিনাটি, একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথা, কথাসাহিত্যের কথকতা, অপ্রকাশের ভার, অতলের আধি, সক্রেটিস, কথা লেখা কথা, লোকযাত্রা অআধুনিকতা সংস্কৃতি।

চন্দর কোথায়’র মতো ভাষান্তরিত নাটকের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য লালঘোড়া আমি, ফুটবল থেকে সাবধানের মতো গল্পও এসেছে তার লেখনীতে। গল্পগ্রন্থ আত্মজা ও একটি করবী গাছ, শীতের অরণ্য কিংবা উপন্যাস আগুনপাখি তাকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়।

হাসান আজিজুল হকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবন ঘষে আগুন, পাতালে হাসপাতালে, নামহীন গোত্রহীন, চলচিত্রের খুঁটিনাটি, মা মেয়ের সংসার, বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প, সক্রেটিস, বৃত্তায়ন, শিউলি, ফিরে যাই ফিরে আসি, উঁকি দিয়ে দিগন্ত প্রভৃতি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইয়ের মধ্যে রয়েছে একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথা, লাল ঘোড়া আমি, ফুটবল থেকে সাবধান ইত্যাদি।  সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে গোবিন্দচন্দ্র দেব রচনাবলী, একুশে ফেব্রুয়ারি গল্প সংকলন, জন্ম যদি তব বঙ্গে ইত্যাদি।

কথাসাহিত্যে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা।

এর মধ্যে আরো রয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কাজী মাহবুব উল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার।

‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার।

২০১২ সালে তিনি ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি পান।

আরও পড়ুন : মাহবুব মোর্শেদের সাক্ষাৎকার : পর্ব ১

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *