গুন্টার গ্রাসের সাক্ষাৎকার : দ্বিতীয় পর্ব

share on:
গুন্টার গ্রাসের সাক্ষাৎকার

গুন্টার গ্রাসের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এলিজাবেথ গ্যাফনি। এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় প্যারিস রিভিউতে ১৯৯১ সালের গ্রীষ্ম সংখ্যায়।

একই সঙ্গে তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী। ‘টিনড্রাম’ উপন্যাসের জন্য ১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

Show Your Tongue, বইটিতে শুধু কবিতাই ছাপা হয়নি, হাতের লেখাও ড্রয়িংয়ের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এই হাতের লেখা শব্দগুলো কে কি আপনার ড্রয়িংয়ের অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে?

কবিতার কিছু কিছু উপাদান এই ড্রয়িংগুলোর সাথে সরাসরি সংযুক্ত। কবিতা যখন আসা শুরু করে তখন আমি এই ড্রয়িংগুলোর উপর তা লিখতে শুরু করি। ড্রয়িং আর কবিতা একসাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। যদি তুমি ড্রয়িংয়ের ভেতরের লেখাগুলো পড়তে পারো তবে ভালো, কেননা তা লেখা হয়েছে পড়তে পারার জন্যই। ড্রয়িংগুলো সাধারণত এঁকে থাকি প্রথম খসড়া তৈরির আগে টাইপরাইটারে বসার আগে। এর কারণ অবশ্য জানা নেই। এই বইটা কলকাতা বিষয়ক। আমি সেখানে দুই বার গিয়েছি। Show Your Tongue শুরু করার বারো বছর আগে একবার গিয়েছিলাম। সেটাই প্রথম ভারত ভ্রমণ। মাত্র কয়েকদিন কলকাতায় ছিলাম। আমি ফেরার সময় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখনই ইচ্ছা ছিলো সেখানে আবার যাবো, দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে থাকবো, অনেক কিছু দেখবো আর লিখবো। এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশে আমি গিয়েছি — কিন্তু যখনই আমি হংকং, ম্যানিলা বা জাকার্তার বস্তিগুলো দেখি, তখন আমার কলকাতার কথা মনে পড়ে। প্রথম বিশ্বের সমস্যা তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে এভাবে মিশে একাকার হয়ে আছে- এমন দৃশ্য আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি।

তাই আমি আবার কলকাতায় ফিরে গেলাম। আর আমি আমার ভাষা দক্ষতা হারিয়ে ফেললাম। আমি একটা অক্ষরও লিখতে পারিনি। সেই মুহূর্তে ড্রয়িং খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো আমার কাছে। ভারতের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলার অন্য রকম প্রচেষ্টা ছিলো এটা। এই ড্রয়িংগুলোর সাহায্যে আমি আমার গদ্য লেখার শক্তি পুনরায় ফিরে পেতে থাকলাম। এটাই হলো এই বইয়ের প্রথম অংশ, খানিকটা নিবন্ধের মত। এরপর তৃতীয় অংশ — বারো ভাগে বিভক্ত একটা দীর্ঘ কবিতা। এটা ছিলো কলকাতা বিষয়ক একটা নাগরিক কবিতা। তুমি যদি নাগরিক গদ্য, পদ্য আর ড্রয়িংগুলো দেখো তবে দেখবে এর সব কয়টিই কলকাতা বিষয়ক। তবে তারা পরস্পরের সাথে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে যুক্ত। এদের মধ্যে এক রকম গোপন কথোপোকথন আছে, তবে ব্যাপারটা বেশ একটু জটিল।

কবিতা, ড্রয়িং আর ভাস্কর্য এই তিনটি কাঠামোর মধ্যে কোনটি কি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে?

এই প্রশ্ন যদি আমাকে করে থাকো,.তবে একমাত্র নিজের ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি, আমার কাছে কবিতা অনেক বেশি অর্থবহ। একটা উপন্যাসের জন্ম হতে পারে একটা কবিতা থেকে। তবে আমি বলছি না এটাই শেষ কথা। তবে আমি কবিতা ছাড়া কিছুই গড়ে তুলতে পারবো না। এই বিষয়টাকে আমি খুব সরাসরি দেখি।

অন্যান্য শিল্প মাধ্যম থেকে চিত্রকলার বিশেষ এবটা ভূমিকা রয়েছে আপনার কাজের মধ্যে।

না না। তা ঠিক নয়। গদ্য, পদ্য, ড্রয়িং সমস্তই আমার কাজের মধ্যে অনায়াসেই ঢুকেছে।

 ড্রয়িংয়ের ভেতর অনুভবগত বা দৃশ্যগত ভাবে এমন কিছু কি আছে যা লেখনীর ভেতর নেই?

হ্যাঁ, লেখা লেখি আসলেই একটা কঠোর পরিশ্রমের ব্যাপার। বিমূর্তও বটে। লেখার আনন্দ, ড্রয়িংয়ের আনন্দ থেকে একদমই আলাদা। ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রে এক খণ্ড সাদা কাগজের উপর আমি আমার সৃষ্টিকে ফুটিয়ে তুলি। এটা খুবই স্পর্শকাতর একটা ব্যাপার যা তুমি লেখালেখির ক্ষেত্রে পাবে না। প্রায়ই আমি লেখালেখির ভেতর ফিরে আসার জন্য ড্রয়িং করে থাকি ।

লেখালেখি খুব বেদনাদায়ক?

এটা একটা মূর্তি গড়ার মত কাজ। মূর্তি গড়ার সময় তোমাকে এর চারপাশে চোখ রাখতে হয়। তুমি যদি কোন এক পাশে কোন রকম পরিবর্তন করো তবে অন্য পাশেও তোমাকে পরিবর্তন করতে হবে। যদি হঠাৎ কোন পরিবর্তন করে বসো তবে তা কিন্তু আর মূর্তি হবে না। তাকে সেক্ষেত্রে অন্য কিছু বলা ভালো। এর ভেতর একটা সংগীত ধর্ম আছে। লেখালেখির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। আমি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় খসড়া নিয়ে একই কাজ বারবার করতে থাকি। সমস্তই ঠিক আছে তবে কি যেনো নেই। এই নেই টাকে ঠিক করার জন্য সামান্য কিছু পরিবর্তন করি। আমার মনে হয় এটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এরপর আমি এগিয়ে যাই। কাজ করতে থাকি।

কবিতায় ফিরে আসি। উপন্যাসের অংশ হিসাবে আপনি যে কবিতা লেখেন সেই কবিতা আর সচারাচর আমার কবিতা বলতে যা বুঝি তার মধ্যে কি কোন পার্থক্য আছে?

এক সময় কবিতা লেখার ক্ষেত্রে আমি পুরনো ধ্যান ধারণার অধিকারী ছিলাম। আমি ভাবতাম বেশ কটা কবিতা লেখা হয়ে গেলেই সেই কবিতাগুলো আর কিছু ড্রয়িং নিয়ে একজন প্রকাশকের কাছে চলে যাওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে একটা দারুণ কবিতার বই পাওয়া যাবে কবিতা প্রেমিকদের জন্য। সেই সময় From the Dairy of a Snail লেখার সময় আমি গদ্য আর পদ্য উভয়ই একসাথে রেখে দিলাম এক বইয়ে। এই কবিতাগুলোর আলাদা একটা সুর আছে। গদ্য আর পদ্যকে আলাদা ভাবে দেখার কোন কারণই আমি দেখি না। বিশেষত জার্মান সাহিত্যে গদ্য-পদ্য মিশ্রনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আছে। প্রতিটি অনুচ্ছেদে কবিতা ঢোকানোর ঝোক আমার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে লাগলো। এবং এর মধ্যেই আমি গদ্যের বুনন খঁজে পেতে চাইলাম। যে সমস্ত পাঠক ভাবেন ‘কবিতা খুবই কঠিন’ তারা দেখে থাকবেন কিছু কিছু কবিতা গদ্য থেকে অনেক সহজ।

যারা ইংরেজিতে আপনার বই পড়ে তাদেরতো এর মূল স্বাদ থেকে অনেক কিছুই হারাতে হয়?

এর উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। কারণ আমি ইংরেজি পাঠক নই। তবে আমার বই অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি আমার অনুবাদকদের সাহায্য করে থাকি। The Flounder নিয়ে আমি যখন আমার জার্মান-প্রকাশকের কাছে গেলাম তখন তারা আমাকে আরও একটা কাজের সাথে সম্পৃক্ত করে দিলো। আমার পাণ্ডুলিপি শেষ করার পর আমার অনুবাদকরা এটা পড়ে। আমার প্রকাশকই সব দায়িত্ব পালন করে থাকে। The Flounder, The Meeting At Telgle, The Rat প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটেছে। অনুবাদক আমার বইয়ের নানা বিষয় জানতে চেষ্টা করে। বইটি সমন্ধে নানা প্রশ্ন করে। আমার মনে হয় এই কাজগুলো অনুবাদ কার্যকে বেশ সহায়তা করে। আমার মনে হয় বইটি সর্ম্পকে তারাই আমার চেয়ে বেশি জানে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এটা বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ অনেক সময় তারা বইয়ের কিছু বিষয়কে ভুল বলে প্রমান করতে চায়। এবং আমাকে সে সম্পর্কে বলেও। ফ্রেন্স, ইতালিয়ান আর স্প্যানিশ অনুবাদকেরা নানা বিষয়ে কথা বলে এ জাতীয় সাক্ষাৎকারের সময়। এবং সত্যিকার অর্থে তারা অনুবাদটিকে তাদের নিজস্ব ভাষায় উদ্ভাসিত করে তুলতে চায়। আমি অনুবাদকে সমর্থন করি কারণ যখন আমি কোন অনুবাদ পড়ি তখন আমি কখনোই ভাবি না যে বইটি অনুদিত। আমার সৌভাগ্য যে রাশিয়ান সাহিত্যের চমৎকার কিছু অনুবাদ আমরা জার্মান ভাষায় পেয়েছি। তলস্তয় বা দস্তোয়ভস্কির অনুবাদ একদম নিখুঁত- মনে হয় যেনো বইগুলো জার্মান ভাষাতেই লেখা হয়েছে। শেক্সপিয়র বা তাদের মত রোমান্টিদের যে সমস্ত অনুদিত বই আমি দেখেছি তা ভুলে ভরা, তবে সুপাঠ্য। নতুন অনুবাদকদের অনুবাদে ভুল কম- ভুল নেই বললেই চলে। তবে Fridrich Schlegel এর মত যথার্থ আর কেউ নেই। প্রতিটা বই অনুবাদের ক্ষেত্রে- তা কবিতা বা উপন্যাস যাই হোক না কেন, সে ক্ষেত্রে অনুবাদককে বইটিকে তার নিজস্ব ভাষায় পুনঃউৎপাদন করতে হয়। বই অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি এই নীতিকে সমর্থন করি।

আপনি কি মনে করেন না যে আপনার Die Rättin এর ইংরেজি অনুবাদ The Rat যথার্থ হয়েছে? ( জার্মান ভাষায় প্রতিটা বিশেষ্য এর আগে পুং বা স্ত্রী বাচক Article বসে। Der পুং অর্থে, Die স্ত্রী অর্থে Das ক্লীব অর্থে -অনুবাদক ) জার্মান ভাষা তো Die Rättin বলতে মেয়ে ইঁদুরকে বোঝায়। আর স্প্যানিশে একে Rattessa লেখার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ মেয়ে ইঁদুর এরতো একটা বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু ইংরেজিতে The Rat এমন একটি শব্দ যা কুৎসিত দেঁতো একটা প্রাণীকেই বোঝায়।

এই জাতীয় শব্দ আমাদের জার্মান ভাষাতেই নেই। আমি এটা তৈরি করেছি। আমি আমার অনুবাদকদের সব সময় নতুন কিছু আবিস্কার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকি। আমি তাদের বলি যদি এমন কোন শব্দ পা’ও যা আমাদের ভাষায় আছে কিন্তু তোমাদের ভাষায় নেই সেক্ষেত্রে নতুন শব্দবন্ধন তৈরি করো। She-Rat শব্দটা আমার ভালোই লাগছে। খারাপ না।

আপনার বইয়ের ইঁদুরটি মেয়ে ইঁদুর কেনো? যৌন কাতরতা, নাকি নারীবাদি দৃষ্টিভঙ্গি, নাকি রাজনৈতিক কোন অভিলক্ষ্য এর পেছনে আছে?

The Flounder এটি পুরুষ। আরও একটু বয়স বাড়ার পর আমি দেখলাম আমি আবারও আরেক নারীর প্রেমে জড়িয়ে পড়েছি। এর থেকে মুক্তির কোন পথই আমার জানা ছিলো না। সে নারী কিংবা ইঁদুর বা She-Rat যাই হোক না কেন। আমি একটা আইডিয়া পেলাম। সে আমাকে উদ্বেলিত, উত্তেজিত করলো- আমি শব্দ খুঁজে পেলাম, গল্প পেয়ে গেলাম এবং পুনরায় মিথ্যাচার শুরু করলাম। মিথ্যা বলার জন্য এটা অত্যাবশ্যকীয়। একজন পুরুষের পাশে বসে মিথ্যা বলার কোন মানেই হয় না। তবে ভাবো, একজন উজ্জ্বল তরুণীর সাথে মিথ্যাচার কেমন উত্তেজনাকর!

আপনার অধিকাংশ বই যেমন The Rat, The Flounder, From The Dairy Of The Snail, Dogs Year এ উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রস্থলে কোন না কোন প্রাণীই আমরা দেখতে পাই। এর কি বিশেষ কোন কারণ আছে?

সম্ভবত। আমার মনে হয় আমরা মানবজাতি সম্পর্কে খুব বেশি কথা বলি। পৃথিবীতে কি শুধু মানুষ আছে, আর কিছু নেই? পশু, পাখি, মাছ, কীট-পতঙ্গ সব আছে। তারা আমাদের আবির্ভাবের পূর্বেই পৃথিবীতে ছিলো। এবং এমন একদিন আসবে যখন আমরা থাকবো না অথচ আমরা বাদে পুরো প্রাণী জগতই টিকে যাবে। একদিন তাদের আমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। জাদুঘরে কি দেখো? লক্ষ লক্ষ বছর আগের ডাইনোসর আর বাইসনের হাড়। তারা খুব স্বাভাবিক ভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাদের হাড়ে কোন বিষাক্ত কোন উপাদান পাওয়া যায়নি। তুমি দেখতে পারো। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এমন ঘটে না। আমরা মৃত্যুর পূর্বে বিষ ছড়িয়ে যাই বাতাসে বাতাসে। আমাদের মনে রাখা দরকার পৃথিবীতে আমরা একা নই। ধর্মগ্রন্থ আমাদের ভূল শিক্ষা দিয়েছে। সেখানে বলা আছে পশু পাখি মাছ গরু সমস্তু জীব জগতের উপর প্রভুত্ব করো। সমস্তু পৃথিবী আমরা যুদ্ধ করে জয় লাভ করতে চেয়েছি। এই ভুলের ফলাফল বড় বেদনাদায়ক।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : গুন্টার গ্রাসের সাক্ষাৎকার : প্রথম পর্ব

Facebook Comments
share on:
মৃদুল মাহবুব

মৃদুল মাহবুব

মৃদুল মাহবুব একজন কবি, গদ্যকার, চিন্তক, সমাজ দর্শক। মৃদুল মাহবুবের জন্ম ঝিনাইদহে ৯ অ‌ক্টোবর, ১৯৮৪। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে থাকেন ঢাকায়। প্রকাশিত বই : কবিতা— জল‌প্রিজমের গান [কবিয়াল, কলকাতা ২০১০] কা‌ছিমের গ্রাম [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৫] উনমানুষের ভাষা [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৭], কবিতাকলা ভবন [ বৈভব, ঢাকা ২০২০]।