গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার : প্রথম পর্ব

share on:
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার সিরিজটি তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন সময় দেওয়া তার সাক্ষাৎকার থেকে। এ সাক্ষাৎকার সিরিজ পড়ে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সামগ্রিকতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করছি।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস , গাবো নামেই যিনি সমধিক বেশি পরিচিত। সাম্প্রতিক বিশ্ব সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আশ্চর্য—সুন্দর গল্পকথকদের একজন। গাবোর সাহিত্য বিষয়ে ধারণা পেতে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : আশ্চর্য-সুন্দর গল্পকথক লেখাটি পড়ুন।

একটা বিষয় কথিত আছে যে, আপনার নাকি ঐতিহ্যগত ভাবে সাহিত্য-শিক্ষার অভাব আছে? আপনি আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর কল্পনা থেকে লেখেন। এ সম্ভন্ধে আপনি কি বলবেন?

হ্যাঁ, তা কিছুটা সত্যিই বটে। নিজেকে নিয়ে রসিকতা করার সময় মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে যে আমার কোন সাহিত্য শিক্ষা নাই। আমি যা লেখি তা কল্পনা আর আমার অভিজ্ঞতার মিশ্রণ থেকে লিখি। আর আমার লেখালেখির গুরু হলো ফকনার, হেমিংওয়ে; তাঁরা পরদেশী লেখক। কলম্বিয়ার শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে আমি নিদারুণ ভাবে কমই জানি বোধ হয়। কোন সন্দেহ নেই, কলম্বিয়াই আমাকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করেছে, তবে তা কিন্তু এখানকার সাহিত্য নয়। কোন বইও নয়। আমার মনে হয় যা আমার চোখ খুলে দিয়েছে তা হলো সঙ্গীত, বিশেষ করে লোকগীতি।

আমি অনেক বছর আগের কথা বলছি, অন্তত ত্রিশ বছর আগের কথা, যখন আমাদের নামে মাত্র পরিচয় ছিলো লোকগীতি সাথে, ম্যাগডালেনা উপত্যকার বাইরে এক কোনায় চর্চা হতো এর। আর আমার মনযোগ ছিলো মূলত গানগুলোর ফর্মের দিকে, এগুলো কিভাবে একটা কাহিনী বয়ান করে, একটা গল্প বলে চলে । খুব সাধারণ, স্বতস্ফূর্ত এর কারুকাজ। তারপর যখন লোকগীতি বাণিজ্যিক ভাবে আসা শুরু হলো, দেখা গেলো ভাব আর ছন্দই প্রধান হয়ে উঠলো। এই লোকগীতিই যেনো আমার নানা গাইতেন, আমার মনে আছে। পরে আমি যখন স্প্যানিশ রোমান্সেরো-এর ব্যালাড শেখা শুরু করলাম দেখলাম যে এদের মধ্যে অভূতপূর্ব নান্দনিক মিল রয়েছে। রোমান্সেরো-এর মধ্যে আমি আমার লোকগীতিকে আবিস্কার করলাম।

কোন ধরণের সংগীতের মধ্যে আপনার বিশেষ অনুরাগ রয়েছে?

দেখো আমি কোন জিনিসের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে পছন্দ করি না। আমার মনে হয় প্রত্যেকটা জিসিনের একটা মূল্য আছে। সংগীত থেকে আমার পাওয়ার শেষ নেই। প্রতিদিন আমি অন্তত দুই ঘন্টা গান শুনি। এটাই একমাত্র জিনিস যা আমাকে প্রশান্ত করে, আমার মানসিক অবস্থা ঠিক রাখে। এবং এর জন্যই আমি নানা রকম পরিকল্পনা এবং মানসিক ভ্রমণ করতে পারি।

লোকে বলে আমাদের ঘর হলো তাই যেখানে বই আছে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে একথা খাটে না। আমার মনে হয় যেখানে গানের রেকর্ড আছে সেটাই আমার ঘর। আমার প্রায় পাচঁ হাজারের উপরে রের্কড আছে।

আপনার সাহিত্য চর্চার শুরুটা কিভাবে?

মূলত আমার লিটারারি ব্যাকগ্রাউন্ড হলো কবিতা, কিন্তু তা হলো বাজে কবিতা। এই বাজে কবিতাগুলোই আমার কাছে ভালো কবিতা হিসাবে আসতো। জনপ্রিয় ধারার যে কবিতা তা দিয়েই শুরু। এগুলো নানা রকম কাগজে প্রকাশিত হতো। এর মধ্যে আবার জুলিয়ো ফ্লোরেজের প্রভাব ছিলো। আর যখন আমি হাই স্কুলে এলাম তখন পাঠ্য বইয়ে যে কবিতা থাকতো তা দিয়েও আমি প্রভাবিত হয়েছি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি কবিতা দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হই। আর আমি সব থেকে বেশি অপছন্দ করতাম স্পানিশ ক্লাস আর ব্যাকরণ। আমি এগুলোর উদাহরণ পছন্দ করতাম। সেখানে আমার পছন্দ ছিলো স্পানিশ রোমান্টিসিজম, এ জাতীয় কবিতা। জুলিয়ো ফ্লোরেজ Nuñez de Arce, Espronceda এগুলো বেশ ভালো লাগতো তখন। এর পর ভালো লাগলো স্প্যানিশ ক্লাসিকস। কিন্তু বড় ধরনের একটা বিবর্তন ঘটে যায় যখন প্রকৃত পক্ষে তুমি কলম্বিয়ার কবিতার কাছে ফিরে আসবে: ডোমিনগুয়েজজ ক্যামার্গো। এই সময় তুমি বুঝতে পারবে বিশ্ব সাহিত্য কি জিনিস। এটা ছিলো ভয়াবহ! এর মধ্যে ঢোকার কোন প্রবেশ পথ নেই। এটার হয় ভয়ংকর বা না হয় এর মধ্যে প্রবেশ করার কোন পথ নেই, এ কারনে প্রফেসররা এটা কে ভালো বলে থাকে। অনেক পরে আমি এটা পড়েছি, এটা বিস্ময়কর। এবং আমার মনে হয় এটা একটা মহান ক্লাসিক।

প্রফেসররা এটাকে ভালো বলেছে এই কারণে এটা ভয়ংকর রকম ভালো, এমন নয় কিন্তু ব্যাপারটা। কারণটা অন্য কোথাও। ইউলিসিসি মাস্তুলের সাথে দৃঢ ভাবে বাধা তাই তাকে এর জন্য সাইরেনের গানে বশীভূত করতে হয়নি … এসমস্ত একাএকাই ঘটেছে। এর পর আমি স্প্যানিশ সাহিত্য পড়ছি, কলম্বিয়ার সাহিত্য পড়ছি হাই স্কুলের শেষের দিকে। ফলে ক্লাসের প্রফেসর থেকে বোধ হয় আমি একটু বেশি জানি। জিপাকুইরায় যখন আমি ছিলাম, তখন আমার কিছু করার ছিলো না। আমি আমার একঘেয়েমি এই সব দিন গুলো ভুলে থেকেছি স্কুল লাইব্রেরীতে বসে। সেখানে আলডিনা সমগ্র ছিলো। আমি তার সমস্তই পড়েছি। প্রথম খণ্ড থেকে শেষ খণ্ড পর্যন্ত পড়েছি। আমি নানা রকম ভ্রমন কাহিনী, স্মৃতিচারণ মূলত লেখা, পুরাকাহিনী গড়েছি গোগ্রাসে। সমস্তই আমি পড়েছি বাছ বিচার না করে। অবশ্যই কলেজের শেষ বছরে আমি জেনেছিলাম যে আমি আমার শিক্ষকদেও চেয়ে বেশি জানি। তখন আমি বুঝেছিলাম রাফায়েল নুনেজ হলো এই দেশের সবচেয়ে খারাপ কবি … আর জাতীয় সংগীত! … তুমি কি চিন্তা করতে পারো জাতীয় সংগীতের কথা হলো একটা কবিতা কারণ মাত্র সেটা নুনেজের একটা মহান কবিতা ছিলো? এটাই প্রথম যে একটা কবিতাকে তুমি জাতীয় সংগীত হিসাবে মেনে নিলে। সরকারী ভাবে এটা গৃহিত হলো কারণ এটা ছিলো একটা কবিতা।

ক্যারীবিয়ো উপকূল কখনওই সাহিত্যের বাইরে ছিলো না। যখন সাহিত্য জীবন থেকে আলাদা হতে শুরু করেছে, সাহিত্যকে যখন বৃত্তবন্দি করা শুরু হয়েছে তখন একটা নিস্ফলা জায়গা দেখা গেলো। এই শূন্যস্থানে পূর্ণ করা হলো সঙ্কীর্ণ মনমানসিকতা দিয়ে। যখন সাহিত্য অলংকারবহুল ভাষায় পরিণত হলো তখন তারা এটাকে বাঁচিয়েছে।

আপনার উপন্যাস রচনার চিন্তাটা তাহলে কিভাবে তৈরি হলো?

বাইশ বছর বয়সে আমি সাহিত্যের একটা দৃঢ জ্ঞান লাভ করেছিলাম। সেই জ্ঞান ছিলো আমার জন্য যথেষ্ট যা দিয়ে আমি সব কিছুই লেখার ক্ষমতা অর্জন করেছিলাম। এবং লিখেছিও। আমি জানি না আমি কিভাবে উপন্যাস লেখায় জড়িয়ে গেলাম। কবিতাই আমাকে বেশি আন্দোলিত করতো । আমি জানি না , আমি মনে করতে পারছি না কখন আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে আমি আমার যা প্রকাশ করতে চাই তা উপন্যাসেই সম্ভব । সম্ভবত কাফকার মেটামরফোসিস ছিলো আমার কাছে একটা বিবর্তনের মত। আমার মনে হয় সালটা ছিলো ১৯৪৭, আমার তখন ১৯ বছর বয়স, আমার এখনও এর প্রথম লাইনটি মনে আছে। এটা হুবহু এমন ছিলো: ” একটা বাজে স্বপ্ন দেখে সকালে ঘুম থেকে গ্রেগর সামসা জেগে দেখলো যে, সে একটা আরশোলায় রূপান্তরিত হয়েছে।” হায়! যখন আমি এটা পড়েছি তখন নিজেকে বলেছিলা , ” এটা ঠিক নয়। এটা ঘটতে পারে এমন কথা কেউ আমাকে বলতে পারে না … বাস্তবে এটা ঘটা কী সম্ভব! তাই আমি পারি! … হায়! … ” আমার নানা এমন ভাবেই গল্প বলতেন … বিশাল একটা কিছু খুব সাধারণ ভাবে তিনি বলে যেতেন।

পরদিন আমি এর একটা ব্যাখা দাড় করাতে চাইলাম। তার পরের দিন সকাল আটটায় আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম মানব সভ্যতার শুরুর পর থেকে এই আমি পর্যন্ত এই পৃথিবীতে কী ঘটে গেছে। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে এটা বোঝার চেষ্টা করেছি। বাইবেল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কি লিখিত হয়েছে। এরপর ছয় বছর আমি আর কিছু লিখতে পারিনি। আমি কোন সাহিত্যই সৃষ্টি করতে পারিনি এই সময়ে। আমি লেখাপড়া ছেড়ে দিলাম এমনকি সমস্তই ত্যাগ করলাম। এরপর আমি এক গুচ্ছ গল্প লেখা শুরু করলাম, গল্পগুলো ছিলো অনেক বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক। সেগুলোই আমার প্রথম গল্প। এই গল্প গলোই তখন এল স্পেকটাডর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। গল্প গুলো আমি যখন লিখছিলাম তখন আমার জন্য একটা মূখ্য সমস্যা ছিলো, তা হলো গল্পগুলো সম্পর্কে অন্যান্য লেখকেরা কি বলছে।

৯ এপ্রিল এর দাঙ্গার পর আমি যখন বোগোটা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম তখন জামা কাপড় ছাড়া আর কোন কিছু ফেলে যাবার মত অবস্থা আমার ছিলো না। আমি উপকূল ছেড়ে দিলাম। সংবাদপত্রে একটা চাকরি খুঁজে নিলাম। নানা রকম বিষয় দ্বারা আমি আক্রান্ত হলাম। আমার পিছনে ফেলে আসা এক বিশাল বাস্তবতা আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলো। আমার ফেলে আসা সেই উপকূলকে আমি বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই না কারণ তার কোন সাহিত্য ঐতিহ্য নেই। এটাই ছিলো প্রথম আক্রমণ। ফলে একটা ব্যাপ্তি নিয়ে আমি লিখতে থাকি যেনো আমি জ্বরের ঘোরের ভেতর।

‘লিফ স্টর্ম’ বইটির প্রতি আমার অন্য রকম একটা ভালোবাসা আছে। এমনকি এটা যিনি লিখেছেন তার প্রতি আমার প্রচুর সমবেদনা আছে। আমি তাকে পরিস্কার দেখতে পাই। একটা ২২ কি ২৩ বছরের ছেলে যে ঠিক করলো সে আর জীবনে কিছুই লিখবে না। সে মনে করে, এটাই তার একমাত্র পরিবর্তন। তার যা কিছু মনে আছে সমস্তই সে ভুলে যেতে চায়। শিল্প সাহিত্যের নানা রকম কৌশল যা সে শিখেছে বা বড় লেখকদের মধ্যে যা যা সে দেখেছে তার সমস্ত কিছু সে ভুলে যেতে চায়। সে সময় আমি বুঝতে পারলাম যে আমি ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকান লেখকদের বলয়ের মধ্যে আছি। যখন আলোচকরা খোঁজা শুরু করলো ফকনার আর হেমিংওয়ের কত খানিক প্রভাব আমার উপর রয়েছে। তারা যা খুঁজে পেয়েছে তা যে পুরোপুরি বেঠিক তা কিন্তু নয়। কিন্তু একটা বিষয় আছে, যখন আমি আমার এই উপকূলের বাস্তবতাটা পুরোপুরি বুঝতে পারলাম তখন আমি আমার অভিজ্ঞতাটাকে সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। খুব পরিস্কার ভাবে বললে বললে বলা যায়- আমি বুঝতে পারলাম কাফকার বাস্তবতা আর আমার বাস্তবতা এক না। আমি যথাযথ ভাবে আমেরিকান উপন্যাসিকদের চিনতে শিখলাম। আমেরিকান বাস্তবতার তীব্র রূপান্তর আর প্রকাশ ছিলো ফকনারের লেখায়। তাদের কাছ থেকে আমি একটা বীক্ষণ শক্তি পেয়েছি।

যখন আমি আমার ‘লিফ স্টর্ম’ পুনঃরায় পড়ে দেখিছিলাম- দেখলাম যে আমার পাঠের কিছু কিছু বিষয় এর মধ্যে প্রবেশ করেছে। আমি বোঝাচ্ছি যে মাত্র এটুকুই !  যখন আমি আমার বুদ্ধিবৃত্তিক গল্পগুলোকে উতরে চলে এসেছি, যখন আমি বুঝতে পারলাম যে এটা আমার মাথার ভেতর, আমার দৈনন্দিন জীবনের ভেতর, বেশ্যা পাড়া, শহর, সংগীতের ভেতর … যথাযথ ভাবে বললে বলা যায় আমি পুনরায় সেই লোকগীতিকেই অবিস্কার করলাম। সেই সময় আমার পরিচয় হলো এস্কেলোনার সাথে, তুমি জানো। আমরা একসাথে কাজ শুরু করলাম, আমরা একসাথে কলম্বিয়ার নানা প্রদেশ ঘুরে দেখেছি । সেই সমস্ত দিনগুলোর অভিজ্ঞতা আমি এখনো পুরোপুরি স্মরণ করতে পারি। আমার কোন বইয়ের মধ্যে এমন কোন লাইন পাবে না যা সরাসরি আমার জীবন অভিজ্ঞতায় প্রাপ্ত কঠোর বাস্তবতাকে উন্মোচিত করে। সর্বদা হয়তো বাস্তবতার একটা উল্লেখ থাকতে পারে মাত্র। কোন বইতেই তুমি পাবে না। কোন একদিন অনেক সময় বয়ে যাওয়ার পর আমরা এটা নিরীক্ষা করে দেখতে পারি, একটা মননের খেলা খেলে দেখতে পারি , এটাকে যেভাবে দেখা হয় এটা ঠিক তা নয়, অন্য কিছু। আমার মনে হয় সেই দিনটাই এর যথার্থ বিচার সম্ভব।

‘ব্যারানকুইলা গোষ্ঠি’ আপনার সাহিত্য শিক্ষাকে কতটুকু প্রভাবিত করেছে?

আমি যখন বোগতা এ বাস করতাম তখন তাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আমি খুব বিমূর্ত একটা পথে সাহিত্য পাঠ করতাম, এমনকি বইও। আমি যা পড়তাম তার সাথে বাইরের রাস্তায় কি ঘটছে তার কোন সম্পর্ক ছিলো না। এক মিনিটের জন্য কফির কাপ হাতে এক কোনায় গেলে আমি এমন এক পৃথিবী খঁজে পেতাম যা খুবই আলাদা। যখন ৯ এপ্রিল আমাকে এই উপকূল থেকে চলে যেতে হলো তখন আমি বুঝলাম আসলে বাস্তবতা কি জিনিস। একটা বিশাল কিছু বুঝতে পেরেছিলাম তখন। আমার বই পড়া পৃথিবী আর বাস্তব দুনিয়ার একটা সম্পর্ক খুঁজে পেলাম। আর ‘ব্যারানকুইলা গোষ্ঠি’ আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একারণে যে আমি তাদের কাছ থেকে প্রচুর বই পেয়েছি। কারণ আলফনসো ফুয়েনমায়োর, এলভারো সেফিডা, জার্মান ভার্গাস সেই দলে ছিলো আর এরা ছিলো এক এক জন পড়ার দৈত্য। নানা জাতীয় বই তাদের কাছে ছিলো। সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত আমরা পান করতাম আর সাহিত্য নিয়ে কথা বলতাম। এমন দশটা বইয়ের নাম আমি শুনতাম যা আমার পড়া হয়নি। পরদিন তা খুব অনায়াসেই পেয়ে যেতাম তাদের কাছ থেকে। জার্মান হয়তো দুইটা বই… আলফনসো তিনটা বই … এভাবেই সব পেয়ে যেতাম। রোমান ভিনোয়েস নামে এক বৃদ্ধ ছিলো আমাদের দলে, তিনি সব সময় আমাদের অ্যাডভেন্সার পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বলতেন, ” তোমরা ফকনার, ইংরেজ, রাশিয়ান, ফেন্স ঔপন্যাসিকদের লেখা পড়ো, কোন সমস্যা নেই, কিন্তু অ্যাডভেন্সারকেও সাথে রেখো।” হোমার, রোমান ক্লাসিক গুলো বাদ দিয়ে খুব বেশি উন্মাদনা দেখানোরও দরকার নাই। কোন কিছু পাঠ করে যে অভিভূত আমরা পেতাম ঠিক তেমন বিস্ময় অনুভূতির কাছেই পৌচ্ছে দিতো আমাদের পান পাত্র।

আমাদের মধ্যে মেকি কোন ব্যাপর ছিলো না। তাই আমরা এক সাথে জীবন যাপন করা শুরু করি। আর বুঝতে পারি আসলেই কি জীবন আমি কাটাচ্ছি। এর একটা সাহিত্যি মূল্য ছিলো এবং কিভাবে একে শিল্পে প্রকাশ করতে হয় সেই জাতীয় একটা শিক্ষা এর ভেতর ছিলো। ফলে ‘লিভ স্টর্ম’ এ তুমি দেখতে পাবে এটা লেখার জন্য যতটা সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিলো তা দেওয়া হয়নি। এটা এক প্রকার ব্যারোক উপন্যাসের ঢঙে লেখা একটি লেখা মাত্র, বেশ জটিল হয়ে উঠেছে এটি এবং কিছু কিছু জায়গায় খুব পাগলামিতে ভরা। যে কাজ আমি আগেও করেছি সেই কাজটি আরও সুক্ষ্ণ ভাবে করার চেষ্টা করলাম ‘অটাম অব দ্য পের্টিআর্ক’ এ। ‘লিভ স্টম’ আর ‘অটাম অব দ্য পের্টিআর্ক’ এর কাঠামো প্রায় একই রকম। একটা শব দেহ নিয়ে দুটো কাহিনীই এগিয়েছে। ‘লিভ স্টম’ পদ্ধতিগত ভাবে বেশ ভালো। কেননা তখন আমার বয়স মাত্র ২২ কি ২৩ বছর। সেই বয়সে একা একা নিজের মত উড়ে চলা কোন ব্যাপারই না। ফলে এখানে ফকনারের আজ ‘আই লে ডাইয়িং’ এর কিছু কিছু প্রভাব দেখা যায়। সত্যি বলতে কি ফকনারের ক্ষেত্রে দেখা যায় মাত্র একজন ব্যক্তিই কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু আমি সেই একই পথে গেলাম না। আমি একজনের পরিবর্তে তিনজনের সমাবেশ ঘটালাম — একজন বৃদ্ধ, একজন বালক আর একজন মহিলা। ‘অটাম অব দ্য পের্টিআর্ক’ এ আমি বেশ স্বেচ্ছাচরিতা করলাম। আমার যা ভালো লাগলো তাই করলাম। কে কথা বললো আর কে কথা বললো না সেটা আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো না। আমার শুধু বাস্তবতাকে প্রকাশ করার একটা আকুতি ছিলো মাত্র। এটা যে খুব অপ্রয়োজনীয় ছিলো তাও কিন্তু নয়, আমাকে বলতে দাও, আমি আসলে প্রথম দিকে খুব বেশি বদলাইনি। প্রথম বইটাই আবার লিখতে বসেছিলাম আর কি। আমি ‘অটাম অব দ্য প্রের্টিআর্ক’ লিখতে গিয়ে দেখেছিলাম, কিভাবে একজন তার পুরানো কাঠামেতে পুনরায় ফিরে যেতে পারে, শুধু কাঠামোতেই না এমনকি একই কাহিনীর মধ্যে ফিরে যেতে পারে।

এটা এমনই। আমি যে সাহিত্যের ভেতর বসাবাস করছিলাম, সেই একই জিনিস আমি তৈরি করে যাচ্ছিলাম। সে এক অদ্ভুত সময় ছিলো। ইউরোপীয়োরা আমার সৃষ্টির আলোচনা করতে গিয়ে একটা কথাই বলতো যে আমি যা লিখছি তা কখনোই আমার দ্বারা তত্ত্ববদ্ধ করা সম্ভব নয়। তারা সর্বদা এই প্রশ্নটিই তুলে ধরতো। আমার উত্তরটা খুব সোজা তাহলো আমি মজার ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখে থাকি, মূলত বাস্তবতার প্রকাশ ভিন্ন আমার লেখা আর কিছুই না। আমার লেখাকে সমর্থন করার একটা উপায় এটা এবং এই বিষয়েই তারা প্রশ্ন করে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে নিয়ে সব লেখা।

Facebook Comments Box
share on:
মৃদুল মাহবুব

মৃদুল মাহবুব

মৃদুল মাহবুব একজন কবি, গদ্যকার, চিন্তক, সমাজ দর্শক। মৃদুল মাহবুবের জন্ম ঝিনাইদহে ৯ অ‌ক্টোবর, ১৯৮৪। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে থাকেন ঢাকায়। প্রকাশিত বই : কবিতা— জল‌প্রিজমের গান [কবিয়াল, কলকাতা ২০১০] কা‌ছিমের গ্রাম [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৫] উনমানুষের ভাষা [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৭], কবিতাকলা ভবন [ বৈভব, ঢাকা ২০২০]।