ফ্রান্সিস বেকন : অভিজ্ঞতাবাদের জনক

share on:
ফ্রান্সিস বেকন

ফ্রান্সিস বেকন ষোড়শ শতাব্দীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব , যিনি একই সঙ্গে ছিলেন আইনবিদ, রাজনীতিক, দার্শনিক, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, বিজ্ঞান অনুরাগী, ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ এবং সম্রাট প্রথম জেমসের উপদেষ্টা, বিতর্কিত অথচ অসাধারন এক ব্যাক্তিত্ব।

আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞানের অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্বের অন্যতম ফ্রান্সিস বেকন। ফ্রান্সিস বেকন বিশ্বাস করতেন কুসংস্কার ও স্বতঃসিদ্ধের প্রতিবন্ধকতা থেকে মনকে মুক্ত করা হলে মানুষ জ্ঞান দিয়ে প্রকৃতির ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারবে। ‘অভিজ্ঞতাবাদের জনক’ খ্যাত এ দার্শনিকের প্রবর্তিত মৌলিক তত্ত্বকে বেকনিয়ান মেথড বলা হয়। তিনি আরোহমূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া প্রবর্তন করেন, যা বেশ প্রভাব সৃষ্টিকারী ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বেন জনসন, যিনি বেকনকে জানতেন, তাঁর সম্বন্ধে লিখেছেন ‘তার লেখার ও কাজকর্মের বিচার করলে আমার মনে হয় সে অকেন যুগের সবথেকে প্রশংসনীয় সেরা মানুষদের একজন।’ আবার আইজাক ওয়ালটন তার সম্বন্ধে বলেছেনঃ ‘তিনি ছিলেন বিশ্ব প্রকৃতির একজন বিশ্বস্ত সহচর ও অনুলেখক ।’ কিন্তু পরের শতকেই আলেকজান্ডার পোপের তীক্ষন কলম বোধহয় বেকন সম্বন্ধে শেষ কথা বলে গেছে –

‘মানুষের মন আর মননের গভীর অতল
কেমনে তা ছুঁতে হয় যদি নাই শিখে থাকো
চেয়ে দেখো, সামনে উদাহরন রয়েছেন
মেধাবী বেকন ।
সব থেকে জ্ঞানী আর উজ্জ্বল মানুষ একজন,
বিকীর্ণ করেছেন আলো,
যদিও সবার থেকে ছোট তার মন’।
(If parts allure thee, think how Bacon shined,
The wisest, brightest, meanest of mankind)

ফ্রান্সিস বেকন ১৫৬১ সালেল ২২ জানুয়ারি লন্ডনের কাছাকাছি মিডলসেক্সের ইয়র্ক হাউসে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইংল্যান্ডের রাজসভায় উচ্চপদস্থ সভাসদ স্যার নিকোলাস বেকন ও মা এ্যানা বেকন। দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে শৈশবে ফ্রান্সিস ঘরেই পড়ালেখা করেন। ১৫৭৩ সালে ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে মূলত ল্যাটিন ও মধ্যযুগের পাঠসূচি অনুসরণ করেন। ক্যামব্রিজে পড়াকালে তার সঙ্গে রাণী এলিজাবেথের দেখা হয়। বেকনকে লর্ড উপাধির যোগ্য বলে মন্তব্য করেন এলিজাবেথ।

ফ্রান্সিস বেকন ১৫৮২ সালে আইনশাস্ত্রে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। ১৫৮৪ সালে সংসদ সদস্য হন। অচিরেই তিনি রাণীর ঘনিষ্ঠ সভাসদ আর্ল অব এসেক্সের সহযোগী ও বন্ধু হয়ে ওঠেন। ১৬০১ সালে আর্ল রাণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং বিচারে আর্লের প্রানদণ্ড হয়। বেকন ওই বিচারে বন্ধুর বিপক্ষে অবস্থান নেন। পরে তিনি ইংল্যান্ডের এ্যাটর্নি জেনারেল ও লর্ড চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেন।

১৬২০ সালে তার লেখা ‘নোভাম অর্গানাম’ বইটি পরীক্ষামূলক প্রাকৃতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতির সূচনা করে। পরের বছরই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। এতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। স্বীকারোক্তিতে তিনি বলেন, উপঢৌকন নিলেও তার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়নি। এর জন্য লন্ডন টাওয়ারে কারাভোগ ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হন। তার সদস্যপদ বাতিল করা হয়, ভবিষ্যতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অধিকার হরণ করা হয়।

এর পর ফ্রান্সিস বেকন নিজেকে চিন্তা ও লেখালেখির জগতে ব্যস্ত রাখেন। ওই সময়ের বেশীরভাগ মূল্যবান বই ল্যাটিনে রচিত হওয়ায় এটি ছিল বেকনের প্রিয় ভাষা। ইংরেজি ভাষার প্রতি ফ্রান্সিস বেকনের বড় একটা শ্রদ্ধাবোধ ছিল না। কারণ, তিনি মনে করতেন, এসব আধুনিক ভাষা এক সময় উপযুক্ত গ্রন্থের অভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়বে। তবে ইংরেজি ভাষায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ও সম্ভাবনার প্রবক্তা হিসেবে শ্রেষ্ঠদের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয়।

বেকনকে বলা হত ‘philosopher of utilities’। ব্যবহারিক জগতের দার্শনিক, জাগতিক জ্ঞান ও বুদ্ধির আশ্চর্যজনক আকর তাঁর রচিত প্রবন্ধসমূহ, এত গল্প কথায় ব্যবহারিক চিন্তার এত দিক, এত দিগন্ত উন্মোদিত করেছেন তিনি, যে অবাক হতে হয়।

বেকনের শ্রেষ্ঠ বই ধরা হয় ‘এসেস’কে। এ বইটির তিনটি সংস্করণ প্রকাশ হয়। ১৫৯৭ সালের প্রথম সংস্করণে ১০টি, ১৬১২ সালে দ্বিতীয়টিতে ৩৮টি ও ১৬২৫ সালের তৃতীয় সংস্করণে ছিল ৫৮টি প্রবন্ধ। ১৬০৫ সালে ‘এ্যাডভ্যান্স মন্ট অব লার্নিং’ প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানের শ্রেণী বিভাগ সংবলিত ‘দ্য গ্রেট ইনসিচুয়েশন’ মূল গ্রন্থের প্রথম খণ্ড হিসেবে এটি প্রকাশিত হয়। এর ১৫ বছর পর ১৬২০ সালে প্রকাশ হয় ‘নোভাম অর্গানাম’। অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- দ্য এ্যাডভান্সমেন্ট অব লার্নিং ডিভাইন এ্যান্ড হিউম্যান (১৬০৫), নোভাম অর্গানাম সায়েন্টিয়ারম (নিউ মেথড, ১৬২০) ও নিউ আটলান্টিস (১৬২৭)। ‘নোভাম অর্গানাম’ বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন সরদার ফজলুল করিম।

ফ্রান্সিস বেকন ১৬০৩ সালে নাইটহুড পান। এ ছাড়া ১৬১৮ ও ১৬২১ সালে ব্যারন ভিরলাম ও ভিসকাউন্ট সেন্ট এলবান উপাধি পান।

১৬২৫ সালের এক বিকালে তিনি মাংস প্রিজার্ভ করার জন্য একটি পরীক্ষা চালাতে মুরগি বেছে নেন। সেই বিকালে তুষারপাতের ঝড়ে তিনি দেখতে চাইছিলেন যে মাংস ফ্রিজেন হয় কিনা। এই নিয়তে মুরগি নিয়ে বরফের মধ্যে থাকার দরুন ইংরেজ এ দার্শনিক ১৬২৬ সালের ৯ এপ্রিল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হেইগেটে মারা যান।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : আন্তন চেখভ।

Facebook Comments
share on: