ফেদেরিকো ফেলিনি ও তার চলচ্চিত্রের জগৎ

share on:
ফেদেরিকো ফেলিনি

ফেদেরিকো ফেলিনি ইতালিও নিউ রিয়েলিজমের অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ।

১৯৯৩ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি যখন মারা গেলেন তার আগেই তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পেয়েছেন বিদেশী ভাষার ক্যাটাগরীতে ৪টি অস্কার পুরষ্কার। মৃত্যুর বছরেই পেয়েছেন আজীবন সম্মাননার অস্কার পুরষ্কারও। হয়ে উঠেছেন বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা নির্মাতা।

আর এটা কেবল মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গী সমৃদ্ধ অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমেই নয়, বরং ভবিষ্যতের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পথ দেখালেন- কিভাবে চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা সৃষ্টি করতে হয় এবং প্রচলিত গল্প বলার ধরণের সাথে অবাস্তব দৃশ্যসমূহের কাব্যিক সংযোগের ঝুকি নিতে হয়।

ফেদেরিকো ফেলিনি অতর জনরাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন, সিনেমাকে করে তুললেন ব্যক্তিগত পরিভ্রমনের বিষয়, অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যত যেখানে জড়িয়ে থাকে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে, পুলকিত দৃশ্যভাবনার মাধ্যমে যেখানে প্রতিটি শট নৃত্যের তালে এগিয়ে যায়।

মার্টিন স্করসেজি ফেলিনি সম্পর্কে এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি প্রতি বছর একবার ফেলিনির ৮ ১/২ সিনেমাটা দেখেন। ফেলিনি সম্পর্কে তার মতামত হলো,  ‘ফেলিনির চিন্তার স্বাধীনতা, নতুনত্বের অন্বেষণের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা, অন্তর্নিহিত কঠোরতা, আরও গভীরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, জাদুকরী ক্ষমতা, ক্যামেরা মুভমেন্ট ও কম্পোজিশনের শক্তিশালী বন্ধন, তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা ও সেরা করে তুলেছে।’

সংস্কৃতি ডটকম

ফেলিনি চলচ্চিত্র দর্শককে সম্পূর্ণ নতুন এক দেখার অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায়। অন্ধকার থিয়েটারে স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে থাকা দর্শকের পূলকিত হওয়ার সাথে সাথে চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ছাড়া গতি থাকে না। প্রচলিত ইংরেজি সিনেমার বাইরের জগতের ভেতরে নিয়ে যায়, যা হলিউডি হিংস্র কল্পণার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ক্রমেই সিনেমায় স্বকীয় নিজস্বতা তৈরি করেন, যা রহস্যজনক ও দৈবক্রমে হয়ে ওঠে বৈশ্বিক, ভৌগলিক দূরত্ব যেখানে বিলিন হয়ে যায় এবং সবাইকে বেঁধে ফেলেন অন্তরঙ্গতায়।

সিনেমার নির্মাণে তার কৌশলী নিয়ন্ত্রণ এক আনন্দদায়ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। তিনি আরোপিত অনুগ্রহ সাজিয়ে তৈরি করেন শিল্পের নিজস্বতা।

ফেলিনি চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন চিত্রনাট্যকার হিসেবে। যদিও শিল্পে তার যাত্রা প্রায় ছোটবেলা থেকেই। থিয়েটারে তারকাদের ক্যারিকেচার করে, ম্যাগাজিনের জন্য লিখে, রেডিওর জন্য পান্ডুলিপি লিখে এবং বিভিন্ন নির্মাতার জন্য চিত্রনাট্য লিখে নিজেকে তৈরি করেছেন তিনি। রোসেলিনির জন্য লেখা ‘রোমা চিত্তা অপেরতা’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি প্রথম অস্কারের জন্য নমিনেশন পান। রোসেলিনির সাথে জুটি বেধে তিনি ইতালির দর্শককে উপকার দেন বিখ্যাত সব সিনেমা।

১৯৫১ সালে ‘দা হোয়াইট শেক’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথম পরিচালনায় নাম লেখান ফেলিনি। তবে তিনি সফলতার দেখা পান ১৯৫৩ সালে নির্মিত ‘ই ভিত্তেল নি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ‘ই ভিত্তেল নি’ কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরষ্কার জেতে। এর পরের বছরই ‘লা স্ত্রাদা’ চলচ্চিত্রের জন্য বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় অস্কার জেতেন তিনি। তারপর তৈরি করতে থাকেন ‘লে নত্তি দি কাবিরিয়া’, ‘লা দোলচে ভিতা’, ‘ফেলিনি সাতিরিকন’, ‘ফেলিনি রোমা’, ‘আমারকরদ’র মতো বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র।

‘লা দোলচে ভিতা’ চলচ্চিত্রটি সারাবিশ্বে প্রচন্ড আলোড়ন তৈরি করে এবং নির্মাতা ফেলিনিকে নতুন রাস্তায় ঠেলে দেয়। এই সফলতাই তাকে ৮ ১/২ নির্মাণে উৎসাহী করে তোলে। যদি সারাবিশ্বের সেরা দশ সিনেমার তালিকা করা হয় তাহলে তাতে অবশ্যই ৮ ১/২ রাখতে হবে। আর এই সিনেমা যাত্রা তাকে এমন এক নির্মাতার কাতারে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়- ভবিষ্যতের অনেক নির্মাতার জন্য অণুপ্রেরণা ও অণুকরণীয় হয়ে ওঠেন।

তার চলচ্চিত্রগুলো বেশিরভাগই আত্মজীবনী মূলক। তিনি বাস্তবতার সাথে কাল্পণীক ও উদ্ভট দৃশ্য জুড়ে দিতেন। তার সিনেমায় মানুষের উদ্ভট দিকগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। তার সিনেমার পুরুষ চরিত্রগুলো সৃষ্টিশীল অখন্ডতা ও অগভীর প্রেমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। নারী চরিত্রগুলো উপাসনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে পুরষত্বের জোরে ও কর্তৃত্বে। পুরষের কল্পণায় পরে যা কখনও হয়ে ওঠে আরাধনার বস্তু। আর এভাবেই তিনি বাস্তবতার সাথে পরাবাস্তবতা মিশিয়ে তৈরি করেন স্বপ্নময় এক জগৎ। নিজের ভাষায় বলতে গেলে, আমি সেভাবেই সিনেমা তৈরি করি যেভাবে আমি স্বপ্নের ভেতরে বসবাস করি।

ফেলিনি কেবল একজন নির্মাতাই ছিলেন না। তার ছিলো অসামান্য শৈল্পিক শক্তি। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন এবং মানুষের ব্যর্থতাকে গ্রহণ করে তাকে উৎরে যাওয়ার ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি সে ধরণের নির্মাতা নয়, যারা সমাজের সাথে, পরিবারের সাথে, প্রযোজকের সাথে ও স্ত্রীদের সাথে প্রতারণা করে।

তিনি নিজের শারীরিক ক্ষমতাকে বুঝতে পারতেন এবং অক্ষমতাকে ভয় পেতেন না। যখন পৃথিবী ক্রমেই যৌক্তিকতা ও সাংগঠনিক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, তখন তিনি কাল্পণিক পৃথিবী একেছেন এবং স্বপ্নের ক্ষমতাকে উদযাপন করেছেন। এই সব বৈপরিত ভুলের কারণেই অন্যসব চলচ্চিত্র নির্মাতা থেকে তিনি আলাদা হয়ে উঠেছেন। তার সিনেমা ভ্রম ও জীবনের বিশৃঙ্খল সৌন্দর্য্যকে ধারণ করে হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র। সিনেমা হয়ে ওঠে যারা কেবল সিনেমায় বিনোদন খোজে তাদের জন্য উপভোগ্য আর যারা সিনেমায় শিল্পের কারিশমা দেখতে চান তাদের জন্যও অনন্য খোরাক।

আরও পড়ুন : আকিরা কুরোসাওয়ার সাক্ষাৎকার

Facebook Comments Box
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।