ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের সাক্ষাৎকার

share on:

বিশ্বের বৃহত্তর বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পদকসহ দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষার অগ্রগতি, কৃষি, খাদ্য এবং নারী উন্নয়ন বিষয়ে অবদানের জন্য দেশ-বিদেশে সর্বোচ্চ সম্মাননা এবং খেতাব পেয়েছেন তিনি। প্রায় ৪৭ বছরের বেশি সময় ধরে ব্র্যাকের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার পর ২০১৯ সালে আগস্ট মাসে তিনি ব্র্যাকের চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

গত ২১শে সেপ্টেম্বর ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের ভিডিও সাক্ষাৎকারটি নেন নবনীতা চৌধুরী। ৪৩ মিনিটের এ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ব্র্যাকের শুরু থেকে পথচলা, সহযোগী প্রতিষ্ঠান, কর্মরত লক্ষাধিক কর্মীর কথা। শুধু তাই নয়, ১৩ কোটির বেশি সুবিধাভোগীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা। সাক্ষাৎকারটি ব্র্যাকের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে রিলিজ করা হয়।

বাংলাদেশে এত বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করে কাউকে অবসরে যেতে দেখা যায় না। আপনি কীভাবে আস্থা পেলেন যে, ব্র্যাকের লক্ষাধিক কর্মী এবং ১৩ কোটিরও বেশি সুবিধাভোগী আপনার অনুপস্থিতিতে তাদের কোনো অসুবিধা হবে না?

আমার পরে ব্র্যাকের নেতৃত্বে কারা আসবে- এটা নিয়ে বহুদিন ধরে আমি চিন্তাভাবনা করেছি। আমি বিশ্বাস করি যারা এখন দায়িত্বে আছেন তারা সুচারুভাবেই আমার কাজকর্ম এগিয়ে নিতে পারবেন। যারা নেতৃত্বে আসছেন তাদের সেই দক্ষতা তৈরি হয়েছে। আর আমার পরে ব্র্যাক যেন আরো ভালোভাবে চলে সেটাও আমি চাই।

সংস্কৃতি ডটকম

ব্র্যাককে শুধু যে আপনি আপনার ওপর নির্ভরশীল করেননি সেটাই নয়, ৪৭ বছরের চার দশক ধরে ভাবছেন বিদেশি অনুদান থেকে বেরিয়ে কি করে ব্র্যাক নিজের আয়ে স্বাবলম্বী হয়ে তার নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। আপনি আড়ং প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক আছে, বিকাশ আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের টাকা দিয়েই ব্র্যাকের ৭০ শতাংশ উন্নয়ন কাজ চলছে। এই মডেলটি কীভাবে মাথায় এলো?

এই মডেলটি আসছিলো ৭৫-এর দিকে। হঠাৎ করে ইন্দিরা গান্ধী ইলেকশন বন্ধ করে দিয়ে শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন। তখন বিদেশ থেকে টাকা পাওয়ার জন্য সরকারি অনুমোদন নিতে হতো। তো আমি ভাবলাম, এটা যেহেতু ভারত করেছে আমাদের বাংলাদেশেও আসবে। তখন বাংলাদেশে সামরিক শাসন শুরু হচ্ছে। আমি ভাবলাম পরে বিদেশ থেকে টাকা পাওয়া কঠিন হবে। তো আমাদের এখানেই কিছু কাজকর্ম শুরু করা দরকার যাতে আমরা বিদেশি অনুদানের প্রতি নির্ভরশীল না থাকি। সেজন্য প্রথমে আড়ং তৈরি হলো। এভাবে ছোট ছোট কিছু বিজনেস শুরু হলো। যা থেকে কিছু মুনাফা আসতে থাকলো। আমরাও আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলাম। যদিও আমাদের বিদেশি সাহায্য একেবারে লুপ্ত হয়নি। সব সময়ই কিছু কিছু আসছে। তবুও আমরা পরনির্ভরশীলতা থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসলাম।

ব্র্যাক যেহেতু কমিউনিটির সঙ্গে মিলে, অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে কাজ করেছে। ঠিক সেভাবে ব্র্যাকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিষ্ঠা হলো? যেমন উত্তরবঙ্গে মানুষ দুধ রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে, তখন আপনি আড়ং ডেইরি করলেন?

ব্র্যাকের ব্যবসাগুলোকে আমরা বলতাম প্রোগ্রাম সাপোর্ট এন্টারপ্রাইজ। আড়ং যখন হলো, তখন আড়ং আসলে বিজনেস হিসেবে আসেনি। আড়ং হয়েছে যখন গ্রামের মানুষ কারুকাজ করত। তাদের সেই কারুপণ্য বিক্রি করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন আমরা ভাবলাম তাদের সেই পণ্য বিক্রি করার জন্য ঢাকায় যদি একটি ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তাদের একটি বিপণন ব্যবস্থা হবে। এই চিন্তা থেকে আড়ং প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। এটা যখন সাফল্য লাভ করলো তখন এটা থেকে মুনাফা আসা শুরু হলো। তো আমরা এগুলোকে প্রোগ্রাম সাপোর্ট এন্টারপ্রাইজ হিসেবে দেখেছি। আমাদের প্রোগ্রামই ছিল গ্রামের মানুষের আয় বর্ধক কাজে সহযোগিতা করা। তাদেরকে আমরা ট্রেনিং দিয়েছি, ডিজাইন দিয়েছি। এভাবে অনেক ধরনের সহযোগিতা করেছি, যাতে করে তারা নিজেরা কাজ করে আয় বাড়াতে পারে, এবং সেটাই হয়েছে।

 এক সময় যখন সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংক ব্যবস্থা পৌঁছাতে পারেনি। নিরাপদে টাকা লেনদেনের তাদের কোনো সুযোগ ছিল না। তখন ব্র্যাক এমন একটি উদ্ভাবন সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে গেল, এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আরেকটি নাম হয়ে গেছে এই বিকাশ। এই যে বিকাশ, ব্র্যাক ব্যাংক এবং আড়ংয়ের কথা যদি বলি এগুলোর কোনোটাতেই আপনার বা আপনার পরিবারের মালিকানা নেই। এই প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবেই টিকে যাবে?

এভাবেই টিকবে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা তো ব্র্যাকের। ব্র্যাক যারা চালাবেন তারাতো একটি নন প্রোফিট অর্গানাইজেশন। প্রতিষ্ঠানের সব আয় আসবে নন প্রোফিট অর্গানাইজেশনের কাছে এবং আমরা এর আয়ের টাকা দিয়ে আমাদের প্রোগ্রাম চালাব। আমাদের কোনো কর্মসূচি বা বিভিন্ন কাজ চলবে এই টাকা দিয়ে।

আপনার কি মনে হয় যে, সাধারণ মানুষ এই মডেলটি বুঝে? তারাতো জানে বিকাশ দিয়ে, আড়ং দিয়ে এবং ব্র্যাক ব্যাংক দিয়ে ব্র্যাক এক প্রকার ব্যবসা করছে।

এটা বেশির ভাগ মানুষ বুঝে না। নন প্রোফিট অর্গানাইজেশনের প্রসেসটাও অনেকেই বুঝে না। যেকোনো একটি সংগঠন তার কোনো মালিকানা নাই। এটাও বুঝে না।

তাহলে একটু বুঝিয়ে বলুন। যে প্রতিষ্ঠানের কোনো মালিকানা নাই। তাহলে এ প্রতিষ্ঠানটি আসলে কার?

প্রতিষ্ঠানটি জনগণের। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক কোনো একক ব্যক্তি নয়। একটি নন প্রোফিট প্রতিষ্ঠান। এটা দিয়ে যত আয় হবে তা দিয়ে জনগণের কাজ হবে। কোনো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

 ব্র্যাকের মতো একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে ১ লাখ কর্মী কাজ করেন। যেখানে ১৩ লাখ সুবিধাভোগী। তাহলে সাধারণ জনগণের জন্য কি কাজ করে। কীভাবে কাজটি করে? কোন কাজটি কারা করে?

এটা সাধারণত আমাদের যে পরিচালনা পরিষদ তারা ঠিক করেন যে কী কী কাজ হবে। আর যারা অর্গানাইজেশন চালান তারা সেটা করেন। এখানে পরিচালনা পরিষদের একটি দায়িত্ব দেয়া আছে যে, তারা কী কী করবেন আগামীতে সেটার পরিকল্পনা করেন এবং তারা সেটা বাস্তবায়ন করেন।

এই যে বিকাশ, আড়ংসহ ব্র্যাকের যে নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে শুধুমাত্র বিজনেস মডেল ছাড়া সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা দিয়ে সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়?

অনেক টাকা বিদেশ থেকে আসে। অনেক দেশ আছে যারা গরিব দেশগুলোকে বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগিতা করে থাকে। এই সব দেশের সহযোগিতা ছাড়া নিজেরা যদি ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়ন করতে পারে, তাহলে এটা এডিশনাল। নিজের যদি কিছু আয় থাকে সেটা দিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করা যায়। আর সেটা যদি খুব ভালো হয় তবে সেটা দিয়ে বিদেশ থেকে টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আপনি দেখাতে পারেন যে, এই কর্মসূচি খুব সফল। এটাতে আরো যদি ইনভেস্ট বাড়ানো যায় তবে আরো উন্নয়ন করা যায়। যেমন ধরুন, আমরা যদি নারী-পুরুষ সমতায় একটি ভালো কিছু দেখাতে পারি। সেটা করতে যদি আমরা ১০০ কোটি টাকা খরচ করি তাহলে আরো ১ হাজার কোটি টাকা আমরা আনতে পারবো। যদি আমরা বাংলাদেশে সত্যিই দেখাতে পারি যে, আসলেই এখানে নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি অনেক উন্নত হয়েছে।

ব্র্যাক এমন কিছু মডেল তৈরি করতে পেরেছে যা দেখে বিশ্ব অনুসৃত হচ্ছে। যেমন আল্ট্রা প্রো মডেল গ্র্যাজুয়েশন, চরম দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের যে মডেল ব্র্যাক তৈরি করেছে। সেটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনুসরণ করেছে। তারা তাদের দেশে এখন এই মডেলটি চালু করেছে। তাহলে আমরা যে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের কথা শুনি, ব্যবসার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের কথা শুনি। তাহলে কী সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উদ্ভাবন খুব জরুরি হয়ে উঠছে? আর ব্র্যাক যে তার আল্ট্রা প্রো মডেলটি দেশে দেশে দিচ্ছে এটা কি ব্র্যাকের নামেই দেয়া হচ্ছে?

এটা অবশ্য ব্র্যাকের নামেই সবাইকে দেয়া হয়েছিলো। তবে এটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা চাই আমাদের মডেলটি সবাই ব্যবহার করুক। এটা থেকে আমরা কিছু চাচ্ছি না। আমরা চাই দরিদ্র মানুষগুলো তাদের জীবন মানের উন্নয়ন করুক। এটাকে আমরা বিজনেস হিসেবে দেখছি না। তবে এক্ষেত্রে ব্র্যাক দুটি জিনিস করেছে। একটি হলো কারিগরি পরামর্শ আরেকটি হলো যারা টাকা যোগাড় করতে পারছে না, তাদের জন্য আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যাচ্ছি। তাদেরকে বলছি যে, এই দেশকে টাকা দিলে তাদের প্রোগ্রামের জন্য আমরা সাহায্য করবো। এভাবে তাদের ফান্ডিংয়ের ব্যাপারটিও আমরা দেখি।

এই কাজগুলো করতে গবেষণার দরকার হয়। যেমন ওরস্যালাইনের কথাই ধরা যাক। প্রথমে আধা লিটার পানিতে ১ চিমটি লবণ দিয়ে স্যালাইন বানানো এবং সেটি কীভাবে খাওয়ানো হবে। সবকিছুর জন্য একটা গবেষণার প্রয়োজন হয়েছে। এর ফলে দেশে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে। এখন এটা সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। এই কাজগুলো করতে যেমন গবেষণার দরকার হয়, তেমনি দক্ষ কর্মীও প্রয়োজন। এসব দক্ষ কর্মীরা দেশের বাইরে গিয়েও কাজ করছে। তাদের এতটা দক্ষ করে গড়ে তোলা কীভাবে সম্ভব হয়েছিলো?

একটি হলো দক্ষতা বাড়ানো, আরেকটি হলো দেশের জন্য কাজ কারার মোটিভেশন করা। দেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে এই মোটিভেট দিয়েও তাদেরকে গড়ে তোলা হয়েছে।

আমাদের দেশে যেখানে সবখানে দুর্নীতির বিষয়টি দেখা যায়। যা নিয়ে আমাদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় থাকে। যে দেশে দুর্নীতিমুক্ত কিছু চিন্তা করা যায় না। সেখানে দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এ ছাড়া যৌন হয়রানির বিচারের ব্যবস্থা করা। যা নিজের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। তা না হলে তো সারাবিশ্বের মধ্যে একটি এত বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হতো না। এতটা স্বচ্ছ করে কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হলো?

সব সময় আমি এটি ভালো প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চেয়েছি। এটা শুরু থেকেই ছিল। যাতে কেউ মনে না করে যে আমার প্রতি সুবিচার করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশে অনেকটা মনেই করা হয়ে থাকে যে, নিয়মের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান করলে তা সফল হয় না, সেখানে একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাহলে তাদের এই কথাটি কী ভুল?

আমি এটাকে ভুল মনে করি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। আর সংগঠন বড়ও হয় নিয়মতান্ত্রিকভাবে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তো নিয়ম মেনেই চলে।

তাহলে কঠিন নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হলো কি করে? যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ কর্মী কাজ করেন। সেখানে এতটা নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠান করা একটি কঠিন চর্চারও বিষয় বটে।

কঠিন চর্চা, কঠিন নিয়মকানন থাকতে হবে। কে কাকে সুপারভাইস করবে, কতোক্ষণ করবে? আমাদের স্কুলে এখন সুপারভিশন হয়। সপ্তাহে কতদিন যায়? কতোক্ষণ থাকে? কি দেখে, একজন শিক্ষক তার সিন প্লান নিয়ে আসলো কিনা সেটাও দেখতে হয়। সবকিছু চেক আউট করতে হয়।

বাংলাদেশে মানুষের যে আচরণগত দিক। সহজে তারা কোন বিষয় নিতে চায় না। ওরস্যালাইনের মতো যতো সেবা আছে সেগুলোতে কীভাবে তাদের এত সাড়া পেলেন। ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচি যেমন ওরস্যালাইন কিংবা টিকাদানের বাংলাদেশের যে সাফল্য তাতো সারাবিশ্বে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। সেই গুরুত্ব প্রদানের কারণ কী বলে মনে করেন?

তারা খুব সহজে সাড়া দেয় তা নয়। কিন্তু আমাদেরকে তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে মায়েদেরকে বোঝাতে হয়েছে যে টিকা দিলে আপনার সন্তান ভালো থাকবে। এটা কিন্তু গ্রামে গিয়ে সবাইকে ধরে ধরে বোঝাতে হয়েছে। ডিপিটি ওয়ান দেয়ার পরে ডিপিটি টু দিতে হবে সেজন্য তাদের বাচ্চাটিকে নিয়ে আসা হয়েছে। এরপর ডিপিটি থ্রি দেয়ার সময় আবার বাচ্চাটিকে নিয়ে আসা হয়েছে। এ নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে তখন।

আপনি প্রথমে এলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পুনর্বাসনের কাজ করতে। তখন সুনামগঞ্জের দু’শ গ্রামে কাজ করলেন। তারপর নাম বদলালো ব্র্যাক। রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি হলো। আবার এখন কোনো নাম নেই। তার মানে ব্র্যাক তার কাজ অনুযায়ী নিজের নাম বদলেছে এবং কাজের ধরন এমনকি কাজের পরিধিও কি বেড়েছে?

কাজের পরিধি বেড়েছে। অনেক ধরনের কাজ বেড়েছে। প্রধানত দারিদ্র্যবিমোচন। আর দারিদ্র্যতো একরকম নয়, বহুমাত্রিকতা আছে। নিউট্রেশন, হাঙ্গার, অপরচুনিটি ফর এডুকেশনসহ অনেক রকমের সুযোগ-সুবিধা নেই দরিদ্রদের। এই অপরচুনিটিগুলো তৈরি করাসহ দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতা নিয়ে কাজ করেছি।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর পর সামরিক শাসন, প্রেসিডেন্ট জিয়া, এরপর এরশাদ। এরপর দেশের রাজনৈতিক অবস্থায় অস্থিরতা চলছিলো। কিন্তু ব্র্যাকতো তার কাজ চালিয়ে গেছে আবার পিছিয়েও পড়লো না। তাহলে রাজনৈতিক উৎসাহ, ইচ্ছা, সদিচ্ছা কতোটুকু প্রয়োজন?

রাজনৈতিকভাবে আমাদের কোনো সরকার বাধা দেয়নি। যে সরকারই আসছে সব সরকারের সঙ্গে আমরা কাজ করতে রাজি ছিলাম এবং করেছিও। মোটামুটি ভালো সাপোর্ট পেয়েছি। কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। আমরা তো দেশের জন্য, মানুষের জন্য সব সময় কাজ করেছি। আমরা সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছি।

আপনি প্রায় ৫০ বছর বাংলাদেশের তৃণমূলে কাজ করলেন। কোন কাজগুলোকে আপনি বড় অর্জন বলে মনে করছেন?

শিক্ষায় আমাদের বড় অর্জন আছে। এখানে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যদি সফল করতে না পারতাম তা হলে দেশে আরো জনসংখ্যা বেড়ে যেতো। আর জনসংখ্যা বাড়লে আমাদের জনপ্রতি আয় আরো কমে যেতো। আমরা এখন প্রায় স্বয়ংসম্পন্ন। কিন্তু জনসংখ্যা বেশি হলে এটা সম্ভব হতো না। কিন্তু নারী-পুরুষের যে সমতার কথা আমরা বলি, সেখান থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আরেকটা বিষয় হলো- আমাদের এখন প্লে বি স্কুল হচ্ছে। এই স্কুল থেকে যে বাচ্চারা বের হবে ওরা সোশ্যালি এবং ইমোশনালি খুব ইন্টেলিজেন্ট হবে। সোশ্যাল ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্ট পিপল যদি আমরা আমাদের দেশে পাই তাহলে কনফ্লিক্ট অনেক কমে যাবে। এর ফলে আমরা বেটার কোয়ালিটি অব সিটিজেনস পাবো।

ব্র্যাক তো নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করেছে। নারীকে কর্মস্থলে আনতে চেয়েছে। কিন্তু এখন দেশে ৯৬ শতাংশ ছেলে এবং ৯৮ শতাংশ মেয়ে স্কুলে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি ব্র্যাক সেখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ব্র্যাকের যে গত বছরের যুব জরিপ, সেখানে বলা হচ্ছে যেসব মেয়েরা ৫ম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করছে তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ মেয়ে এখন উপার্জনমূলক কাজ করেছে। আর কোনো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে না, শিক্ষা নিচ্ছে না এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৯০ শতাংশ নারী। আর ৪০ শতাংশ নারী মনে করে তাদের চলাফেরার কোনো স্বাধীনতা নেই। তাহলে নারী-পুরুষের যে সমতার কথা বলি সেখান থেকে আমরা কি অনেক পিছিয়ে নই?

এই কাজটি করতে পারলে বড় একটি কাজ হবে। একটি মুভমেন্ট তৈরি করা। ছক তৈরি করা, ট্রেনিং তৈরি করা।

এখন আমাদের নারীদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা দিতে চাইলে কি করা উচিত? কর্মক্ষেত্রে হোক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হোক, চলাফেরায় হোক কি করা উচিত।

সেটা যদি একটি মুভমেন্ট হয় তাহলে হবে। এতে যে সবাই নারীদের হেল্প করছে। আইনজীবীরা নারীদের প্রটেক্ট করছে। বাসযাত্রীরাও যদি সচেতন থাকেন এভাবে সব ধরনের লোককে অর্গানাইজ করা যায়। এটা সরকারের পক্ষ থেকেও করা যায়। সব ধরনের পেশাজীবীদের সংগঠন যদি করা যায়। সমাজে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। তাহলে হতে পারে। সমান অধিকার মানে চাকরি পাওয়ার অধিকার, কাজে সমান বেতন পাওয়ার অধিকার, চলার অধিকারসহ সব ধরনের কাজে নারীদের অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশের কী ধরনের পরিবর্তন আশা করেন।

যেটা আগেও বললাম যে, প্লে বি স্কুলের কথাটি। আমি আশা করি এর মাধ্যমে দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন আসবে। সোশ্যালি ইন্টেলিজেন্ট হয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেড়ে উঠবে। এই পরিবর্তনটা হলে দেশেরও পরিবর্তন হবে।

ভিডিওটি দেখুন এখানে :

Facebook Comments
share on: