ফররুখ আহমদ : ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’

share on:
ফররুখ আহমদ

ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জাগরণের কবি । রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতা পরিস্ফুট। ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব এবং আরবি ও ফার্সি শব্দের প্রাচুর্য তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

‘‘ভারতে মুসলমানদের মধ্যে বড় কোনো কবি জন্ম নিলে হোসেন ও তাঁর ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে চমৎকার এক মহাকাব্য লিখতে পারতেন। রূপদান করতে পারতেন গোটা জাতির অনুভূতিকে।’’ (মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ, পৃষ্ঠা- ৫১)

বন্ধু রাজনারায়ণকে লেখা চিঠিতে আক্ষেপ করে কথাটা বলেছিলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার এই আক্ষেপ মোচনের দায় কাঁধে নিয়ে কেউ দণ্ডায়মান হয়নি। কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতিকে বাংলা সাহিত্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য আবির্ভাব ঘটেছিল একজন সাহিত্যিকের- ফররুখ আহমদ।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

মাইকেল তার কাব্যকাহিনী গড়ে তুলতে যেমন মহাভারত ও রামায়ণের মতো গ্রন্থ বেছে নিয়েছিলেন; ফররুখ তেমন সামনে টেনেছিলেন বিশ্ব মুসলিম সাহিত্য, আলিফ লায়লা ও হাতেম তাই এর মতো কাহিনীর। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলিম জাগরণের যে স্রোত প্রবাহিত হয়, তিনি তার প্রত্যক্ষ ফসল। সেই সাথে গেয়েছেন মানবতার জয়গান। আযানের মতো উদাত্ত স্বরে তার আহবান ধ্বনিত হয়েছে জাতির উদ্দেশ্যে।

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলাল এখনো উঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।
(পাঞ্জেরী, সাত সাগরের মাঝি)

‘সাত সাগরের মাঝি’ বিষ্ময়কর এক কবিতা গ্রন্থ। ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ট গ্রন্থ এটি। প্রকাশের এত বছর পরও এ গ্রন্থ সমানভাবে জাগ্রত ও প্রাণবন্ত। এ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি জনপ্রিয় ও বিখ্যাত কবিতা হলো ‘পাঞ্জেরী’। মুসলিম জাতীর পিছিয়ে পড়ার, অন্ধকার থেকে পরিত্রাণের কত দেরী তা জানতে কবি উৎসুক।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ’ এর পরে অন্যতম সফল মহাকাব্য ফররুখ আহমদ রচিত ‘হাতেম তায়ী’। মুসলিম কবিদের মধ্যে কাব্যনাটক রচনার পথিকৃত তিনি। তার ‘নৌফেল ও হাতেম’ একটি সফল ও জনপ্রিয় কাব্যনাটক। সনেট রচনায়ও সফল তিনি। বাংলা সাহিত্যে মাইকেলের পরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আর কোন কবি এত বেশি সফল সনেট রচনা করতে পারেন নি। তার সনেট গ্রন্থের মধ্যে- ‘মুহুর্তের কবিতা’, ‘দিলরুবা’, ‘অনুস্বার’ প্রধান।

‘‘তাঁর কবিতা এবং নামের গায়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার সিল আঁটা পড়েছে। এর কারণ বহুবিধ। উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের পক্ষে কবিতা লেখা, কবিতায় পর্যাপ্ত আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার, রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে চল্লিশজন স্বাক্ষরদাতার একজন হয়ে স্বাক্ষর দেওয়া ইত্যাদি। এ থেকে কেউ কেউ মরিয়া হয়ে মুক্ত করতে চান তাঁকে। আবার কেউ কেউ তাঁকে বারবার এদিকেই ঠেলতে চান। এই ঠেলাঠেলির সংস্কৃতির মধ্যে ফররুখকে দেখা একটু মুশকিলই বটে। তবে আমাদের বিবেচনায় এসব কোনো কাজের কথা না। ইতিহাসের গভীর পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়। আমরা এই বিতর্ক পাশে সরিয়ে রাখতে চাই। তবু যাঁরা ব্যক্তিগততার মধ্যে থেকে ফররুখকে দেখতে চান, তাঁদের জন্য আহমদ ছফার ‘কবি ফররুখ আহমদের কি দোষ’ লেখাটি পড়ার নিমন্ত্রণ জানাই।’’ ( ফররুখ আহমদ শতবর্ষের ফেরারি!, কুদরত-ই-হুদা, প্রথম আলো।)

সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তার প্রধান পরিচয় ‘কবি’। তিনি ভাষা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। আশ্বিন ১৩৫৪ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭) সংখ্যা মাসিক সওগাতে ‘পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য নিবন্ধে লেখেন: “গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র্রভাষাকে পর্যন্ত যারা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রুপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীদের সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি”। বায়ান্নর রক্তাক্ত ঘটনার পর রেডিওতে কর্মরত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল হালিম চৌধুরীদেরকে নিয়ে তিনি ধমঘটে যোগদেন। তিনি তদানিন্তন পাকিস্তানী শাসকদের ব্যাঙ্গ করে ‘রাজ-রাজরা’ নামে একটি নাটক লেখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়। প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী এতে অভিনয় করেন।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলি চালানোর প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তান থেকে তাৎক্ষণিক সব অনুষ্ঠান বন্ধ করেন তিনি। নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে নিয়ে নেমে আসেন রাস্তায়। ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে তার লেখা ছিল কঠোর। ১৯৬৬ সালে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের হাত থেকে ‘সিতারা-ই ইমতিয়াজ’  পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান। ‘হায়াতদারাজ খান’ ছদ্মনামে পাকিস্তানি শাসকচক্রের অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে রচনা করেন অসংখ্য ব্যঙ্গ কবিতা। খুব সম্ভবত তার অপরাধ, তিনি তার জনগোষ্ঠীর ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী নতুন জাগরণকে ধরতে পারেননি। পাকিস্তানকে সমর্থনের জন্য তিনি পরে বিতর্কিত হন।  স্বাধীনতার পর তাকে চাকরির ক্ষেত্রে বিপর্যয়ে পড়তে হলো। এ সময়ে এগিয়ে এলেন আরেক কিংবদন্তী সাহিত্যিক আহমদ ছফা। ‘ফররুখ আহমদের কী অপরাধ’ শীর্ষক তীব্র ও তীক্ষ্ণ প্রতিবেদন লিখলেন গণকণ্ঠ পত্রিকায়। ফলে কবিকে পুনর্বহাল করা হয়। আহমদ ছফার ভাষায়,

পাকিস্তান এবং ইসলাম নিয়ে আজকের বাংলাদেশে লেখেননি, এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই বললেই চলে। অন্য অনেকের কথা বাদ দিয়েও কবি সুফিয়া কামালের পাকিস্তান এবং জিন্নাহ্‌র ওপর নানা সময়ে লেখা কবিতাগুলো জড়ো করে প্রকাশ করলে সঞ্চয়িতার মতো একখানা গ্রন্থ দাঁড়াবে বলেই আমাদের ধারণা। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃষ্ঠা- ৫৩৯)

ফররুখ আহমদের জন্ম ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুন তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে। তার বাবা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর ও মা রওশন আখতার। খুলনা জিলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক ও কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আইএ পাস করেন। এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে পড়েন। ছাত্রাবস্থায় বামপন্থী রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। তবে চল্লিশের দশকে রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে।

তার কর্মজীবনের শুরু কলকাতায়। ১৯৪৩ সালে আইজি প্রিজন অফিস, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাই ও ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন। ১৯৪৫ সালে মাসিক মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। প্রথমে অনিয়মিত ও পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৩৬ খুলনা জিলা স্কুল ম্যাগাজিনে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত বুলবুল পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় ‘রাত্রি’ নামে এবং মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত মোহম্মদীতে ‘পাপ-জন্ম’ নামে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘অন্তর্লীন’ প্রকাশিত হয় মোহাম্মদীতে আষাঢ় সংখ্যায়। অন্যান্য প্রকাশিত গল্প বিবর্ণ, মৃত বসুধা, যে পুতুল ডলির মা, প্রচ্ছন্ন নায়িকা প্রকাশিত হয় ১৩৪৪-৪৬ বঙ্গব্দের পরিসরে। ১৯৩৮ সালে আল্লামা ইকবালের মৃত্যুতে তাকে উদ্দেশ্যে করে লেখেন স্মরণী। ১৯৪১ সালে কাব্যে কোরান শিরোনামে মোহাম্মদী ও সওগাত পত্রিকায় বেশ কিছু সুরার স্বচ্ছন্দ অনুবাদ করেন।

ফররুখ আহমদ প্রথম খ্যাতি পান ১৯৪৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা ‘লাশ’ কবিতার জন্য। প্রকাশিত হয় সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আকাল’-এ। প্রথম কাব্যগন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ প্রকাশিত হয় এ বছরেই। কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল কাদির ও রেজাউল করীম তার কবিতার সম্ভাবনা প্রকাশ করেন। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ কাব্য-পুস্তিকা।

দেশভাগের বছর ‘পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায়। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘সিরাজাম মুনীরা’। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বেতারে প্রচারিত হয় তার কাব্যনাট্য ‘নৌফেল ও হাতেম’। প্রযোজক ও নায়ক হিসেবে ছিলেন খান আতাউর রহমান। ১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ লাভ করেন। একই বছর পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। পরবর্তী বছর নৌফেল ও হাতেম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ঢাকা হলে তাকে দেয়া হয় বিপুল সংবর্ধনা।

১৯৬৩ সালে ‘মুহূর্তের কবিতা’ সনেটগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সপ্তাহ’ তে ফররুখের ডাহুক আবৃত্তি করা হয়। পাখির বাসা নামে শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৯৬৫ সালে। পরের বছর আসে আরেকটি গ্রন্থ– হাতেম তা‘য়ী। গ্রন্থদ্বয়ের জন্য যথাক্রমে ইউনেস্কো পুরস্কার ও আদমজী পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহারে অভিনবত্ব, বিষয়বস্তু ও মৌলিক আঙ্গিক তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর ঘটনা, ১৮৫৭-৫৮ সালে ভারতের আজাদী আন্দোলন, পরবর্তী দিনগুলোতে ব্রিটিশ বিরোধী বিভিন্ন তৎপরতা, ১৯২৩ সালে তুরস্কে দীর্ঘকালের মুসলিম খেলাফতের অবসান প্রভৃতি ঘটনাবলি ফররুখ আহমদকে প্রভাবিত করেছিল দারুণভাবে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে রেনেসাঁয় জ্বলে উঠে ইউরোপ। তাদের অনুপ্রেরণা ছিল প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিক্ষা, শিল্প এবং সভ্যতা। ফররুখ আহমদ অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন নবম ও দশম শতকের বাগদাদ, কায়রো কিংবা কর্ডোবার ভাঁজে। আর তাই রুমি, ফেরদৌসি, জামী, কারবালা কিংবা শবে কদর অনায়াসে তার কবিতার বিষয়স্তু হয়ে উঠেছে। অধঃপতিত মুসলিম জাতির আশা ও ঐতিহ্যকে তুলেছিলেন কণ্ঠ ও ভাষায়,

মোর জামাতের সকল স্বপ্ন ভেঙে ভেঙে হ’ল চুর,
মিশে গেল মরু-বালুকায়-সাইমুমে,
ঝড়-মৌসুমে চলো আজি মোরা গড়ি সেই কোহিতুর
কারিগর, তুমি থেকো না অসাড় ঘুমে।

– কারিগর, আজাদ করো পাকিস্তান।

মুসলিম জাতীয়তাবোধ এবং ইসলামী ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার প্রতি তার দ্বিধাহীন সমর্থন। বস্তুত ফররুখ আহমদ আবিষ্কার করেছেন অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ইসলামের সংগ্রামকে।

কবি ফররুখের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, একজন আধুনিক ও সৃষ্টিশীল কবি হওয়ার পরও আত্মপরিচয় ভোলেননি কখনো। সাহিত্য সাধনার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি আত্মবিমুখ হননি কখনো। বরং তিনি তাঁর কাব্য ও রচনায় ‘বাঙালি মুসলিম’ পরিচয়টি জাগিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন বরাবর।

সাহিত্য সমালোচক ড. আহমদ শরীফ ফররুখ আহমদের এই চেতনাবোধ সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের বাংলা ভাষায় স্বকীয় আদর্শে সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে, আদর্শ হবে কোরআনের শিক্ষা, আধার হবে মুসলিম ঐতিহ্যানুগ, বিষয়বস্তু হবে ব্যক্তি বা সমাজ অথবা বৃহদর্থে জগৎ ও জীবন। এভাবে আমাদের জাতীয় সাহিত্য ও জাতীয় জীবন গড়ে উঠবে। তরুণ কবি ফররুখ আহমদ একান্তভাবে মুসলিম ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিতে কাব্য সাধনা করে পথের দিশারির গৌরব অর্জন করেছেন।’

সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘ফররুখের কাব্যপ্রক্রিয়ায় যেহেতু একটা বিশ্বাসের উন্মুখরতা ছিল, তাই তার পাঠকের সংখ্যা আমাদের মাঝে সর্বাধিক। বিশ্বাসের সে একটা কল্লোলিত সমর্থন পেয়েছে। আবার ব্যবহৃত শব্দের পরিধির সার্থক বিবেচনায় এবং ধ্বনি সাম্যের কারণে অবিশ্বাসীরাও তাকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি।’

কবি ফররুখ আহমদকে চরম দারিদ্রের সাথে জীবন যাপন করতে হয়েছে। কিন্তু অর্থের প্রতি, ক্ষমতার প্রতি তার কোন মোহ ছিল না। দারিদ্রতাকে তিনি সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। ভোগ বিলাসিতা তিনি ঘৃণা করতেন। তার কবিতার মতই ছিল কবির দৈনিক জীবন। তিনি তার কবিতায় সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা লিখে গেলেও তার জীবনে তাকে বহু দুঃখ কষ্ঠের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছে। মূলত ইসলামী আদর্শ লালন করার কারনেই তাকে এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ঢাকা বেতার থেকে তার চাকুরী চলে যায়। তার এক ছেলে ডাক্তারি পড়ছিল, টাকার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। চিকিৎসার অভাবে এক মেয়ে মারা যায়। তখন রমজান মাস ছিল। টাকার অভাবে ও শারীরিক অসুস্থতার কারনে না খেয়েই রোজা রাখতেন তিনি। ২৭শে রমজান ইন্তেকাল করেন কবি। তাকে কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক আসাফউদ্দৌলা রেজাসহ অনেকেই সরকারিভাবে কোন জায়গা পাওয়া কিনা চেষ্টা করলেন। কিন্তু সরকারিভাবে কোন জায়গা পাওয়া যায়নি। অবশেষে কবি বেনজীর আহমদ তার শাহজাহান পুরের পারিবারিক গোরস্থানে কবিকে দাফন করার জায়গা দান করেন।

কবি ফররুখ আহমদের করুণ পরিণতি দেখে আহমদ ছফা লেখেন- “আজকের সমগ্র বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদের মত একজনও শক্তিশালী স্রষ্টা নেই। এমন একজন স্রষ্টাকে অনাহারে রেখে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করেছি আমরা। ভবিষ্যত বংশধর আমাদের ক্ষমা করবে না।”
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘তিনি মারা গেছেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়। না, ভুল বললাম, নিঃস্ব কথাটা তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। তাঁর মানসিক ঐশ্বর্যের কোনো কমতি ছিল না। তিনি রেখে গেছেন এমন কয়েকটি গ্রন্থ, যেগুলো পঠিত হবে দীর্ঘকাল।’

‘‘ইতিহাসের পটে রেখে ফররুখের পাঠ দেওয়া দরকার। ফররুখকে অস্বীকার করলে তো এই জনগোষ্ঠীর একসময়ের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার বাসনাকে অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের কবিতার বিকাশের যে ধারা, তার যে চড়াই-উতরাই, সংগ্রাম, ঘাত-প্রতিঘাত, তাকেই অস্বীকার করা হয়। ভাষা আন্দোলনের পরে বাংলাদেশের কবিতার যে ধারা বলবান হয়েছে, তাকে তো ফররুখী ধারাকে মোকাবিলা করে পুষ্ট হতে হয়েছে। এর শক্তিকে বোঝার জন্যও তো ফররুখের পাঠ আর বহুমাত্রিক বিবেচনা অতীব জরুরি। এ বিষয়টি হাসান হাফিজুর রহমান ঠিকই বুঝেছিলেন। আধুনিক কবি ও কবিতা (১৯৯৩) বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ফররুখ আমাদের কাব্য সাহিত্যে আধুনিক উত্তরণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তাঁর কাব্যভাষা এবং আঙ্গিকের প্রয়োগে।’ ফররুখকে বাদ দেওয়া মানে আমাদের জাতিসত্তার এবং কবিতার একটি অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে কেটে ফেলে দেওয়া। এই প্রবণতা বোধ করি পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসেই পাওয়া যাবে না। ফররুখ আমাদের বহুস্বর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বর হিসেবে আদরণীয় হোক। বহুস্বরের মধ্যে প্রধান স্বরের গুরুত্ব বাড়ে বই কমে না।’’ ( ফররুখ আহমদ শতবর্ষের ফেরারি!, কুদরত-ই-হুদা, প্রথম আলো।)

তার প্রকাশিত কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে- সাত সাগরের মাঝি (ডিসেম্বর ১৯৪৪), সিরাজাম মুনীরা (সেপ্টেম্বর ১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (জুন ১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (সেপ্টেম্বর ১৯৬৩), ধোলাই কাব্য (জানুয়ারি ১৯৬৩), হাতেম তায়ী (মে ১৯৬৬), নতুন লেখা (১৯৬৯), ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭৬), কাফেলা (আগস্ট ১৯৮০), হাবিদা মরুর কাহিনী (সেপ্টেম্বর ১৯৮১), সিন্দাবাদ (অক্টোবর ১৯৮৩) এবং দিলরুবা (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), চাঁদের আসর (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০) এবং ফুলের জলসা (ডিসেম্বর ১৯৮৫)। কবি ও সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ তাকে নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে তার সম্পাদনায় দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ফররুখ রচনাবলী। ফররুখকে নিয়ে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার দুটি বই- ফররুখ আহমদ (১৯৮৮) এবং ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য (১৯৯৩)। এ ছাড়া সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘কবি ফররুখ আহমদ’ তার ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ গবেষণা গ্রন্থ।

জীবদ্দশায় ও মরণোত্তর অনেকগুলো পুরস্কার লাভ করেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পদক ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ (১৯৬৫), আদমজী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৬) এবং মরণোত্তর ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৭৯), একুশে পদক (১৯৭৭) ও স্বাধীনতা পদক (১৯৮০)।

১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে সৈয়দা তৈয়বা খাতুনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ে উপলক্ষে ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লিখেন, যা ‘সওগাত’ অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়। এ দম্পতির ১১ সন্তান।

ফররুখ আহমদ ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

আরও পড়ুন : কাজী মোতাহার হোসেন । আমার বাবা – ফাহমিদা খাতুন।

Facebook Comments
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।