প্রতিটি চলচ্চিত্র আমার শেষ চলচ্চিত্র : ইঙ্গমার বার্গম্যান

প্রতিটি চলচ্চিত্র আমার শেষ চলচ্চিত্র : ইঙ্গমার বার্গম্যান

সুইডেনের চলচ্চিত্র নির্মাতা ইঙ্গমার বার্গম্যান চলচ্চিত্র বিশ্বের শেক্সপিয়ার হিসেবেই সর্বাধিক সুপরিচিত তার নিজস্ব শিল্পভাবনার কথা তিনি ব্যক্ত করেছেনইচ ফিল্ম ইজ মাই লাস্টশীর্ষক প্রবন্ধে

শিল্পসম্মত সৃষ্টি আমার কাছে বরাবরের মতই একটা ক্ষুধার মতো ব্যাপার। ছেলেমেলায় একটা বিষয় নিয়ে খুবই ভাবনার মধ্যে থাকতাম। যেন আমি আমার চারপাশের লোকজনকে আমার দিকে আকৃষ্ট করতে পারছি না। যদিও অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের একটি দুর্নিবার ইচ্ছা আমার মধ্যে সবসময়ই কাজ করতো। চিক্রাঙ্কনে, খেলাধুলায় এবং সাতারে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে আমি বয়োজ্যেষ্ঠদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চালাতাম। চমৎকার সব জিনিসের উদ্ভাবন ও আজব আজব গল্প ফেঁদে আমি আমার বন্ধুদের চমৎকৃত করার চেষ্টা করতাম। আমার এরকম করার পেছনে একটা ভাবনা কাজ করত- আমার প্রতি আমার চারপাশের লোকজন যথেষ্ঠ মনোযোগি নয়। যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার এ প্রচেষ্টা থেকে বিরত হই।

তবুও নিজেকে প্রকাশ করার বাসনা আমার মধ্যে তীব্রভাবে কাজ করতো। যতই আমি নিঃসঙ্গ হতে থাকি আমার ভেতরকার বাসনাটাও তত তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। তখন নিজেকে প্রকাশ করার জন্য সারাক্ষণ আমি একটি ভাষার সন্ধানে ব্যাপৃত হই। যে ভাষা সঙ্গীত বা চিত্রকলার চেয়েও বেশি দৃঢ়ভাবে এক আত্মা থেকে আরেক আত্মায় স্থানান্তরিত হয়। একসময় সে ভাষার সন্ধান আমি পাই। আর সেই ভাষা হলো চলচ্চিত্র। তারপর থেকেই এই ভাষার মাধ্যমে আমার স্বপ্ন, বুদ্ধিমত্তার উত্তেজনা, কল্পনা অথবা আমার পাগলামীর কথা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে মনোনিবেশ করেছি।

তবে সাম্প্রতিককালে আমার ভাবনার বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে। অকপটেই বলছি, শিল্পকলার আজ আর আমার কাছে একান্ত অপরিহার্য কোন বিষয় নয়। আমার জীবনের প্রবাহমানতাকে প্রভাবান্বিত করার ক্ষমতা বা সম্ভাবনা আজ আর শিল্পকলার আয়ত্বের মধ্যে নেই।

আমার মনে হয় মানুষ যেকোন সময় নাটককে বর্জন করতে পারে। কারণ জীবনধারণ করতে গিয়ে মানুষকে প্রতিনিয়ত এমনসব বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে হয় যে- যেকোন নাটকীয়তা বা ট্রাজেডিকে হার মানায়।

সঙ্গীতের প্রয়োজনও তার ফুরিয়ে গেছে। কেননা প্রতিটি মূহুর্ত একন সবাইকে শব্দের ঝড়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়।

কাব্যেরও প্রয়োজন মানুষের আর নেই। যান্ত্রিক জীবন মানুষকে আজ কলের পুতুলের  মতো প্রাণীতে রূপান্তরিত করেছে। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাকে নানারকম আকর্ষণীয় কাজকর্ম করে যেতে হচ্ছে। কাব্যের দৃষ্টিকোণ থেকে যা মোটেই আকর্ষণীয় নয়।

মানুষ আজ নিজেকে প্রচণ্ডভাবে মুক্ত করে দিয়েছে। তারপরও সে শিল্পকলা ও ধর্মকে জীবিত রেখেছে কেবলমাত্র অতীতের প্রতি বিনয় প্রকাশের জন্যই হয়তো।
এই অনুভূতিতেই আজকাল আমি আচ্ছন্ন হয়ে আছি। একটা প্রশ্ন স্বভাবতই সবার মনে জাগতে পারে- তবুও কেন আমি শিল্পকলার চর্চা করে যাচ্ছি। এর উত্তর আমার কাছে একটাই- আকর্ষণ। একটি সীমাহীন অতৃপ্ত আকর্ষণ। যে আকর্ষণ আমাকে সর্বদা তাড়িত করে নিজেকে অপরের কাছে প্রকাশে।

এক একটা চলচ্চিত্র তৈরি করার পর আমার মনে হয়- যেন দীর্ঘকাল কারাবাসের পর আমি কোলাহলমুখর জীবনে ফিরে এসেছি। দুচোখে অপার বিস্ময় নিয়ে আমি চলমান জীবনকে প্রত্যক্ষ করি। এ সব কিছুই তখন আমার কাছে মনে হয় অবাস্তব, আশ্চর্যজনক, ভীতিউদ্বেগকারী ও রীতিমত হাস্যকর। আর তখনই আমি আমার বাস্তবতায় আশ্রয় নেই। প্রতিটি উড়ে যাওয়া ধুলিকণাকে মনেপ্রাণে আঁকড়ে ধরি। আর সেটাই হচ্ছে আমার এক একটি চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্রের প্রতি আমার আকর্ষণ অত্যন্ত নিবিড়। চারপাশে ঘটে যাওয়া যেসব পরিস্থিতি, ছবি, ছন্দ বা চরিত্র আমাকে চমকিত করে সেগুলোই আমার চলচ্চিত্রের প্রধান উপজীব্য বিষয়। চলচ্চিত্রকে সাহিত্যের মতো করে বিচার করাকে আমার কাছে অবমানকর বলে মনে হয়।

চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়ার মধ্যে চিত্রনাট্য রচনার সময়টিকেই সবচেয়ে কঠিন সময় বলে মনে হয় আমার কাছে । একটি ভাল চলচ্চিত্র করার জন্য এ সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রনাট্য রচনার সময়ে আমি আমার ধারণার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে বাধ্য থাকি। কেননা আমি শুধু আমার জন্য বা কতিপয় কয়েকজন ব্যক্তির জন্য চলচ্চিত্র তৈরি করি না। আমি চলচ্চিত্র করি সর্বসাধারণের জন্য। আর সেজন্যই সর্বসাধারণের চাহিদা মেটানোর বিষয়টা আমার একান্ত অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আর এ কারণে চিত্রনাট্য রচনার সময়ে একটি জটিল পরিস্থিতির চিত্রায়ণে সহজ পথ খুজতে গিয়ে বরাবরই আমি একটা দ্বিধার সম্মুখিন হই। আমি বিশ্বাস করি আমার বক্তব্যকে জোরদার করার জন্য সারল্যের সঙ্গে প্রতিটি দৃশ্যের চিত্রায়ণ করা উচিত। শিল্পীদের এক্সপেশনকে জোড়ালো করার জন্য ক্যামেরার মুভমেন্ট সহজ-মুক্ত ও বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। আমি বিশ্বাস করি শিল্পীদের এক্সপ্রেসনকে ফুটিয়ে তোলার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে- দৃষ্টি (লুক)।

অনেকের ধারণা কমার্শিয়াল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কোন নৈতিকতা নেই। অথবা এর নীতিগুলো এত বেশি ‘ইম্মরাল’ যে শিল্পসম্মত কোন নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এখানে রক্ষা করার কোন উপায় অবশিষ্ট নেই। তবে আমি আমার নৈতিকতাকে মেনে চলার জন্য তিনটি অনুশাসন মেনে চলি। অনুশাসনগুলো হলো-

এক. তোমাকে সবসময় আনন্দদায়ক হতে হবেঃ
যারা আমার ছবি দেখে এবং আমার অন্ন যোগায়, আমার কাছ থেকে আনন্দ প্রত্যাশা করার অধিকার তার অবশ্যই আছে। তাদের আনন্দ দান করার অধিকার তাই আমার কাঁধে বর্তায়। তার মানে এই নয় যে, আমি আমার প্রতিভাকে বেশ্যায় রূপান্তরিত করবো। আর এখানেই আমার কর্মের স্বাধীনতা। যদি আমি আমার প্রতিভাকে বেশ্যায় রূপান্তরিত করি তবে আমি দ্বিতীয় অনুশাসনকে অমান্য করবো।

দুই. তোমাকে তোমার শৈল্পিক চেতনা অনুসরণ করে চলতে হবেঃ
এটা একটি চতুর অনুশাসন। কেননা এই অনুশাসনটি আমাকে চৌর্যবৃত্তি, মিথ্যাচারিতা, প্রতিভাকে বেশ্যায় রূপান্তরিত করা বা হত্যা করা থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে। যদিও শৈল্পিকভাবে যৌক্তিক মিথ্যাচারিতা করার অধিকার আমার রয়েছে। আমার শিল্পকর্মের প্রয়োজনে আমি বন্ধুবান্ধব, নিজেকে বা যে কাউকে হত্যাও করতে পারি। আমার কর্মকে এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে প্রতিভাকে বেশ্যাবৃত্তিকেও আমি অনুমোদন করবো। অন্য কোন পথ না থাকলে চুরিও আমি করতে পারি। আর এজন্যই আমার যেন পদস্থলন না ঘটে আমার সেই ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রিত রাখার তাগিদে তৃতীয় আরেকটি অনুশাসন মেনে চলি।

তিন. প্রতিটি চলচ্চিত্রই আমার শেষ চলচ্চিত্রঃ
১৯৫১ সালের পর থেকে সুইডেনে সকলের জন্যই চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই বাধ্যতামূলক নিষ্ক্রিয়তার সময়ে আমি অনুধাবন করি যে- বাণিজ্যিক জটিলতা বা আমার কোন দোষ না থাকা স্বত্বেও আমাকে পথে নামতে হতে পারে। যদিও এর বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। কিংবা আমি ভীতু বা তিক্তও নই। সে সময়টাতেই আমি একটি যুক্তিপূর্ণ ও নৈতিকথাবোধ সম্পন্ন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলামঃ প্রতিটি চলচ্চিত্রই আমার শেষ চলচ্চিত্র।

ফলে যে চলচ্চিত্রের আমি কাজ করি কেবলমাত্র সেইটার প্রতিই আমার সকল অনুরক্ততা নিবদ্ধ থাকে। চলচ্চিত্রটি সমাপ্ত করার পর কি করতে পারলাম বা পারলাম না সে চিন্তা আমার কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ। সে চিন্তা আমার মনে কোন উদ্বেগ বা প্রত্যাশার জন্ম দেয় না। আর এই মানসিকতাই আমাকে দেয় কাজের নিশ্চয়তা ও শৈল্পিক আত্মবিশ্বাস। বস্তুগত নিশ্চয়তা অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু শৈল্পিক আত্মবিশ্বাস অসীম ও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

আমি এমন অনেককে দেখেছি, যারা ক্লান্ত, দুঃচিন্তাগ্রস্থ, নিন্দিত, ধিকৃত ও নিরানন্দ হওয়া স্বত্বেও অবিরাম কাজ করে গেছেন। অবশেষে করুণভাবে পরিত্যক্ত হয়েছেন। জানি না ক্লান্তি ও শূন্যতা আমাকে কোনোদিন গ্রাস করবে কিনা? তবে এটা জানি, যদি কখনো এমন পরিস্থিতি এসে সামনে দাঁড়ায়, তখন আমার ক্যামেরা আমি নামিয়ে রাখব এবং স্বইচ্ছায় বিদায় নেব। আর এই মানসিক প্রস্তুতিই আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় – হতে পারে এটাই আমার শেষ চলচ্চিত্র।

 

Facebook Comments Box

2 thoughts on “প্রতিটি চলচ্চিত্র আমার শেষ চলচ্চিত্র : ইঙ্গমার বার্গম্যান

Comments are closed.