দ্রৌপদীর দুনিয়া দর্শন : গাজী তানজিয়ার গল্প

share on:
গাজী তানজিয়ার গল্প

শেষ জীবনে রাজ্যপাট সব ত্যগ করে শান্তির আশায় মহাভারতের কুশিলবেরা অরণ্যে গমন করেছিলেন। সেই শান্তির খোঁজে দ্রৌপদীও ছিলেন। যেখানে ধ্বংশ, যুদ্ধ ও দুর্নীতির ছোঁয়া লাগেনি এমন জীবনের খোঁজে দিশেহারা তখন তারা।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

সেই সময়ে মহাভারতের যুদ্ধোম্মত্ত মানুষের হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, দুর্নীতি ও আত্মকেন্দ্রীকতা দেখে ব্যাসদেব যে পৃথিবীকে বিগত যৌবনা বলেছিলেন, সেই পৃথিবী এখনো টিকে আছে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও পূঁজিবাদের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে থেকে সেই পৃথিবীর বৈষম্য, বিদ্বেষ আরো কতটা প্রকট হয়েছে সেটা জানার জন্য দ্রৌপদী’র একদিন পুনরায় পৃথিবী দর্শনের খুব শখ হলো। স্বর্গে বসে সব সময়ই শুনছেন পৃথিবীর কি ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। ওখানে গেলে অবতার এবং দেবতাদেরও চোখ ঝলসে যচ্ছে। টেকনোলজি নামের ব্যপারটা গোটা জগতটাকে এমন বদলে দিয়েছে— এমন বদলে দিয়েছে যে, ওটা এখন সুযোগ সুবিধায় প্রায় স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট নামের এক ধরণের প্রযুক্তি যা নিমেষে পৃথিবীর এক কোণ থেকে আরেক কোণের খবরাখবর নখদর্পণে নিয়ে আসতে সক্ষম। স্বর্গের দেবতাদের মায়া দর্পণ—টর্পণ ওই সব প্রযুক্তির কাছে নস্যি। তাছাড়া কী অত্যাধুনিক সব যুদ্ধাস্ত্র। ড্রোন বিমান, মিজাইল, পরমানু বোমা আরো কত্তো কি! ক্ষমতা যার দুনিয়া তার। সঙ্গে লাগবে শুধু দুইটা জিনিস বুদ্ধি আর সম্পদ।

চির যৌবনা দ্রৌপদী প্রায় প্রতিদিনই এসব শুনছেন আর পৃথিবীটা থেকে আর একবার ঘুরে যাবার ইচ্ছা প্রকট হচ্ছে। তবে ঠিক পাকাপাকিভাবে সেখানে থাকবার ইচ্ছা তাঁর নেই। কারণ একবার পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী হয়ে সেখানে গিয়ে যে নাকানি চোবানি তাকে খেতে হয়েছে তাতে আর দ্বিতীয়বার ওই পৃথিবীতে থাকবার কথা সে ভাবে না। তবে বেড়াতে যেতে বাধা কি? দ্রৌপদী তার এই মনের ইচ্ছাটা একদিন ব্যাসদেবকে জানালেন।

ব্যাসদেব শুনে ঈষত বিরক্ত হলেও ক্ষণকালের জন্য তাঁকে পুষ্পক রথে চড়িয়ে ফের একবার পৃথিবী দর্শনের ব্যবস্থা করে দিতে রাজি হলেন। এবং যথারীতি জানতে চাইলেন, তুমি কোথায় কোথায় দর্শন করতে চাও?

দ্রৌপদী নিচের ঠোট আলতো কামড়ে ধরে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, ভারতবর্ষে একবার যখন জন্মেছিলাম তখন তো বন জঙ্গলে ঠাঁসা ছিল, শুনলাম এখন নাকি ওরা অনেক উন্নতি করেছে। তো প্রভু আর একবার যদি ভারতবর্ষ ভ্রমনে যেতে পারতাম তাহলে বেশ হতো। ভাষা এবং আচার আচরণটাও কমন পড়ত।

কতটা কমন পড়বে জানি না। ওরাতো এখন ইংরেজিটাই বলে বেশি। এই যেমন তুমিও একটু বাংলার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে। ভ্যাজালতো দেখি স্বর্গেও প্রবেশ করেছে। ঠিক আছে যাও, ভারতবর্ষেই যাও। আচরণগত কিছু মিল খুঁজে পেলেও পেতে পার। কিন্তু জায়গাটা কোথায় নির্ধারণ করেছ?

তেমন কিছু ঠিক করিনি, তবে কোন ব্যস্ত শহরে অবতরণ না করে আমার পুষ্পক বিমান যদি কোন এক নদীর তীরে শান্ত স্থানে অবতরণ করে…! নইলে দুম করে অমন গাড়ি ঘোড়া, ট্রাফিক, পলিউশনের মধ্যে পড়ে গেলে হার্ট ফেল হয়ে যেতে পারে প্রভু।

যথা আজ্ঞা, তাই হবে। তোমার পুষ্পক বিমান কোন নদী তীরেই অবতরণ করবে। তবে নদীর ওপরে ব্রীজ দেখলে বা জলে ফেরী বা জাহাজ দেখলে যেন আবার ভয় পেয় না।

না প্রভু, কী যে বলেন!

অবশেষে দ্রৌপদীর পুষ্পক বিমান আকাশে ভেসে থাকা যাবতীয় পলিউশান পেরিয়ে ধীর গতিতে যখন পৃথিবীতে অবতরণ করল তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। স্থানটা নদী তীরেই বটে তবে দ্রৌপদীর সেটা বুঝতে একটু বেগ পেতে হলো। একটা প্রায় মরে যাওয়া বালুচর সর্বস্ব নদী দেখে তার বুকের ভেতর থেকে ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। যাহ্ বাবা, এ কোথায় এনে ফেললে! যা—ও একটা আধমরা ছোট খাটো নদী দেখা যাচ্ছে তবে ঘর বাড়ির তো কোনো নাম নিশানা নেই। এই নাকি আধুনিক সভ্যতা! তিনি বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। চারদিক তো শুনশান নীরব, ওদিকে সন্ধা ঘনিয়ে আসছে। এখন এই নির্জন দ্বীপে তার এই ভরা যৌবন নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন! ভাবতে ভাবতে তিনি সামনে এগোচ্ছেন এমন সময় তার চোখে পড়ল একটা লম্বা মতন একতলা দালান। বাড়িটার সামনে ফুলের বাগান পেরিয়ে একটা ছোট্ট গেট। সেখানে বসে আছে রক্ষী মতন এক লোক। এখানে গিয়ে আশ্রয় চাইলে নিশ্চই রাতের জন্য আশ্রয় মিলতে পারে; মনে মনে ভাবলেন তিনি। আর যেই ভাবনা সেই কাজ। দ্রুত পায়ে বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।

যথারীতি রক্ষী বাধা দিল।

কার সাথে দেখা করতে আসছেন? এখন ভিজিটিং আওয়ার শেষ। দেখা হবে না — কাল আসবেন।

দ্রৌপদী বুঝতে পারলেন, এই অদ্ভুত পোষাক পরা, ইংরেজি বাক্য বলা লোকটা তাকে এখন ভেতরে ঢুকতে দেবে না। নিমেষে তখন তাঁর জয়দ্রুথের কথা মনে পড়ে গেল। ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলেন তিনি। অমন কামুক যৌন—সন্ত্রাসীরা এ যুগেও তো আছে বলে শোনা যায়। হর হামেশা ধর্ষণ আর ঈভটিজিং না কী যেন বলে, চলছেই। তাহলে এখন তার কী হবে! যে করেই হোক রাতটুকুর জন্য তাকে এখানে আশ্রয় নিতেই হবে। তাই তিনি তার স্বভাবসুলভ নম্রতায় এবং শরীরি ভঙ্গিতে আবেদন ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘যেতে দিন না, সব প্রটোকল শেষ করে এখানে এখানে এসে পৌছতে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এখন এই রাতে আমি একলা নারী কোথায় যাই বলেন তো!’

দ্রৌপদীর অনুরোধ উপেক্ষা করার মতো পৌরুষ নিয়ে যেহেতু এই পৃথিবীতে এখনো কোনো পুরুষ আসে নাই, সেখানে দারোয়ান তো কোন ছার। সে তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দিল এবং সঙ্গে নিয়ে গিয়ে একেবারে ভিজিটিং রুমে বসিয়ে দিয়ে বলল, আপনি কার সাথে দেখা করতে আসছেন ম্যাডাম?

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দ্রৌপদী ঝটিতে বুঝে ফেললেন যে এখন যে কেউ একজনের নাম বলতে হবে, নইলে তার এখানে এন্ট্রি নেয়া সহজ হবে না। তাই মানুষ বিপদে পড়লে, কষ্টে পড়লে, রোগ—শোকে পড়লে যার নাম নেয় সেই নামটাই বললেন। ‘মা’।

মা মানে আপনি ঠিক কোন মায়ের সাথে দেখা করতে চান? এখানে তো অনেক মা থাকেন, আপনার মায়ের নাম কি?

দ্রৌপদী এবার বুদ্ধি করে বললেন, আমি মূলত সব মায়ের সাথেই দেখা করতে এসেছি। একটা বিশেষ প্রয়োজনে।

বাক্যটা শেষ করার আগেই রক্ষি বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওহ্ ম্যাডাম, আপনি! আপনি কতৃপক্ষের লোক? আগে বলবেন তো! আপনার তো এখানে সকালে আসার কথা ছিল। ঠিক আছে, কোনো অসুবিধা নাই, আমি এখনি সুপারভাইজার আপাকে খবর দিতেছি।

দ্রৌপদী কতৃপক্ষের লোক হয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে আপেক্ষা করছেন।

এরই মধ্যে হন্ত দন্ত হয়ে কোথা থেকে যেন ওখানকার সুপারভাইজার ছুটে এলেন।

সরি ম্যাডাম, কিছু মনে করবেন না। আমি একটু জরুরী কাজে বাইরে গিয়েছিলাম আর কি, আপনার কোনো অসুবিধা হয় নাই তো?

না না কোনো অসুবিধা হয় নাই। তিনি আশ্বস্ত করলেন তাকে।

এরপর আপ্যায়ন পর্ব শেষে সুপারভাইজার তাঁকে একে একে সব ঘর ও তার বাসিন্দাদের দেখাতে লাগলেন।

এই বাড়ির প্রতিটি ঘর জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন বয়স এবং শ্রেণীর বৃদ্ধা মহিলারা। এটা একটা বৃদ্ধাশ্রম।

দ্রৌপদী বৃদ্ধাশ্রম দেখে বিস্মিত হলেন। এটা গয়া, কাশী, হরিদ্বারের মতো কোনো তীর্থস্থান না যে কেউ তীর্থে এসে রয়ে গেছেন। বরং এই বৃদ্ধারা সবাই তাদের সংসার থেকে বিতাড়িত। বেশিরভাগ বৃদ্ধাই তাদের পুত্রবধূর যন্ত্রণায় বাড়িতে টিকতে না পেরে এখানে এসেছেন। ছেলেরা বৌ—এর কথা মতো মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পার করে দিয়ে গেছে। কারো বৌ চাকরি করে, কারো ঘরে স্থান সংকুলান হয় না, কারো কারো মায়েরা ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি ইন্টারফেয়ার করে। এই সব না—না অজুহাতে তারা ঘর ছাড়া।

ব্যপারটা দেখে দ্রৌপদীর চিন্তার জগতে ঝড় উঠল, ’মা’! কলিকালে মায়েদের এই অবস্থা!

ইস্ তখন যদি থাকতো! নিজের অজান্তে মুখ ফুটে বেরিয়ে এলো কথাটা।

তখন মানে কখন? বৃদ্ধাশ্রমের হলরুমে তাঁর সাথে দেখা করতে আসা সমবেত বৃদ্ধাদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করলেন।

দ্রৌপদী তখন আর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি তাঁর নিজের পরিচয় দিলেন এবং কলিকালে মায়েদের এমন পরিণতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেন!

তাঁর পরিচয় পেয়ে সমবেত বৃদ্ধাদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন উঠল। কারো কারো চোখে অবিশ্বাস দেখা দিলেও ওদের ভেতর থেকে একজন জানতে চাইলেন, ‘তখন যদি থাকতো’ কথাটা বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইলেন? কিসের আফসোস আপনার?

দ্রৌপদী তখন ধরা পড়ে যাওয়া ভঙ্গিতে বললেন, আমার কেন পঞ্চ—পাণ্ডবের সাথে বিয়ে হয়েছিল জানেন?

কেন?

মাতৃ আদেশ। মাতৃ আদেশ পালন করতে গিয়ে।

কার মাতৃ আদেশ?

কার আবার! আমার পঞ্চস্বামীর মাতৃ আদেশ।

ওমা তাই নাকি! কীভাবে তাদের মা এমন আদেশ দিলেন?

আপনারা সব ভুলে বসে আছেন! তাহলে তো সব আবার খুলেই বলতে হয়।

আমার পিতা পঞ্চালরাজ দ্রুপদর ডাকা স্বয়ম্বর সভায় বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা সব ক্ষত্রিয় রাজাদের পরাজিত করে অর্জুণ যখন আমার বরমাল্য অর্জন করলেন, তখন সেখানে বাধ সাধলেন আমন্ত্রিত পরাজিত ক্ষত্রিয় রাজারা। তারা বললেন, ‘আমাদের অগ্রাহ্য করে পঞ্চাল রাজ একটা ব্রাক্ষ্মণকে কন্যা দান করবেন, এ হতে দেয়া যায় না।’ আমরা দ্রুপদ ও তাঁর পুত্রকে এজন্য হত্যা করব।’

রাজারা অক্রমন করতে উদ্যত হয়েছে দেখে দ্রুপদ রাজা শান্তির আশায় ব্রাক্ষ্মণদের শরণাপন্ন হলেন। ব্রাক্ষ্মণ ভাইয়েরা যুদ্ধে ওই সব রাজাদের পরাজিত করে আমাকে নিয়ে তারা বারণাবতে নির্বাসিত হয়ে যে কুম্ভকরের গৃহে অবস্থান করছিলেন সেদিকে যাত্রা করলেন। এরপর কুম্ভকরের কর্মশালার সামনে এসে জয়ের আনন্দে ও উচ্ছাসে দিশেহারা হয়ে ভীম ও অর্জুণ ভেতরে অবস্থ্নরত তাঁদের মাকে ডেকে বলতে লাগলেন, ‘মা দেখো আমরা ভিক্ষা নিয়ে এসেছি।’

মা কুন্তী তখন গৃহকর্মে ভীষণ ব্যস্ত। ভাবলেন ব্রাক্ষ্মণেরা তো ভিক্ষালব্ধ অন্নই খেয়ে থাকে— তাই তাঁর ক্ষত্রিয় থেকে খণ্ডকালীন কনভার্টেড ব্রাক্ষ্মণ পুত্ররাও হয়ত ভিক্ষান্নই জোগাড় করে এনেছে। তাই ছেলেদের ডাকে বাইরে না এসে তিনি কুটিরের ভিতর থেকে বললেন, ‘তোমরা সকলে মিলে ভোগ কর।’

কিন্তু মা!

কি কিন্তু কিন্তু করছ, একটা সামান্য কাজও মাকে ছাড়া করতে পার না! ছেলেদের কপট তিরস্কার করতে করতে তিনি বাইরে এসে যা দেখলেন তাতে নিজের ভুলে হতবাক হয়ে পড়লেন। হা ভগবান! এতো ভিক্ষন্ন নয় সাক্ষাত এক নারী।

তিনি তখন কি করেন! দ্রুত আমার (দ্রৌপদীর) হাত ধরে বড় ছেলে যুধিষ্ঠিরের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘পুত্র, তোমার দুই ভাই দ্রুপদ রাজার এই কন্যাকে আমার কাছে এনেছে, আমি প্রমাদ বশে বলেছি — সকলে মিলে ভোগ কর। আমি ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি। এ তো ভিক্ষন্ন নয়, এ যে নারী, একে কী করে সকলে মিলে ভোগ করতে পারে! এই পাপ থেকে মুক্তির উপায় বল বাবা।’

যুধিষ্ঠির একটু চিন্তা করে বললেন, ‘অর্জুণ তুমি এঁকে জয় করেছ, তুমিই একে যথাবিধী বিবাহ কর’।

ভাইয়ের কথায় বিগলিত অর্জুন তখন লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, ‘আমাকে এভাবে অধর্মভাগী করবেন না। বড় ভাইকে রেখে আমি কীভাবে আগে বিয়ে করতে পারি! প্রথমে আপনার, তারপর ভীমের, তারপর আমার এবং তারপর নকুল—সহদেবের বিয়ে হবে।’

একথা শোনার পর আপনি কি বললেন? বৃদ্ধারা প্রশ্ন করলেন দ্রৌপদীকে।

আমার তখন কিছু বলার অধিকার ছিল না। আমি নীরবে দাড়িয়ে সবাইকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম। ভাবছিলাম, এই রে! বিয়েতে যে গিট্টু লেগে গেল। ওপরে যে এমন ধেড়ে দু’জন ভাসুর আছে কে জানত! এখন তো আর আমার বিবাহে বিলম্ব না হয়ে উপায় নেই, কারণ আমার দুই ভাসুর যুধিষ্ঠির ও ভীমের বিবাহ সম্পন্ন হবে তারপরই আমার বিয়ে। আর এতোটা সময় আমাকে হয়ত এই কুম্ভকরের ঘরে আশ্রিত হয়ে থাকতে হবে! আমি উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে এমন আকাশ—পাতাল ভাবছি আর আতঙ্কিত হচ্ছি। এই ক্ষণে পঞ্চপাণ্ডবের প্রত্যেকেই তাকিয়ে তাকিয়ে আমাকে দেখতে লাগলেন। আমার তখন পূর্ণ যৌবন, আপনারা তো জানেন— আমার দৈহিক সৌন্দর্য বিশেষ করে সেক্স—এ্যাপিলের অনেক বর্ণনাই আপনারা শুনে থাকবেন।

হ্যাঁ নিশ্চই শুনেছি, বললেন প্রাক্তন সংস্কৃতের অধ্যাপিকা। আপনি অতিশয় রূপবতী অথচ কৃষ্ণাঙ্গী তাই আপনার আরেক নাম কৃষ্ণা। আপনি ছিলেন সব বিষয়ে অসামান্যা। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে অন্য কোনো নারী আপনার মতো জীবন্ত রূপে চিত্রিত হন নাই।

হ্যাঁ কথাটা ঠিকই । বৃদ্ধাশ্রমের অন্য এক বাসিন্দা সায় দিয়ে বললেন, তাছাড়া আপনার পঞ্চস্বামী যখন দ্বারকায় অস্ত্র শিক্ষা করছেন তখন জয়দ্রুথ তার বিবাহ যাত্রা পথে আপনাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘এই নারীকে দেখে মনে হয় অন্য নারীরা বানরী । এঁকে পেলে আমার আর বিবাহের প্রয়োজন নাই।’ এবং তিনি আপনাকে তখন অপহরণও করেছিলেন।

হ্যাঁ কথা সত্যি। বয়সের হিসাবে তখন আমি যৌবনের শেষ প্রান্তে। পাঁচ সন্তানের জননী, অথচ জয়দ্রুথ আমাকে দেখে এতো মোহগ্রস্থ হয়ে পড়ল যে…! তাঁর বলার ভঙ্গিতে প্রচ্ছন্ন গৌরব ফুটে উঠল।

তাছাড়া বিরাট ভবনে আপনি সৈরিন্দ্রী রূপে যখন গিয়েছিলেন তখন রাজ মহিষী সুদেষ্ণা আপনাকে দেখে বলেছিলেন,‘ তোমার করতল, পদতল ও ওষ্ঠ রক্তবর্ণ, তুমি হংসগদগদ ভাষিণী, সুকেশী, সুস্তণী, কাশ্মীরী তুরঙ্গময়ীর ন্যায় সুদর্শনা। নারীরাই তোমাকে একদৃষ্টে দেখে পুরুষ তোমাকে দেখে মোহিত হবে না কেন?’

সত্যিই ওরা ওদের স্বামীদের নিয়ে ভীষণ ভীত হয়ে পড়েছিল। তোমরা দেখি এযুগে এসেও আমার সৌন্দর্য গাঁথা জান। আমার কী যে ভাল লাগছে!
অন্য কিছু না জানলেও মেয়েদের সৌন্দর্য গাঁথাটা জানতে হয় দিদি। নইলে স্বামীদের মুখে দ্রৌপদী, ক্লিওপেট্রাদের কথা শুনতে শুনতে মরতে হয়।

কপাল আর কাকে বলে! সেই কারণেই তো আমার পঞ্চপাণ্ডবের সাথে বিয়ে হয়েছিল।

ওহ্ তাইতো! শোনা হল না তো আপনার পঞ্চপাণ্ডবের সাথে কিভাবে বিয়ে হয়েছিল?

তবে শোন, শাশুড়ী কুন্তিদেবী তো মতামতের ভার যুধিষ্ঠির মহাশয়কে দিয়ে খালাস। তখন যুধিষ্ঠির আমাকে আরো একবার অপাদ—মস্তক দেখে নিয়ে এবং ভাইদের সবার মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁদের অন্তরের ভাষা পড়ে নিয়ে বুদ্ধিজিবীদের কৌশল আঁটলেন। তিনি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে রেফারেন্স হিসেবে ব্যাসদেবের কথা স্মরণ করলেন। তারপর এক রুদ্ধদার কক্ষে বিস্তর পরামর্শ করলেন মায়ের সাথে। যার মূল কথা হলো, ‘একজন সামান্য নারীর কারণে ভাইয়ে ভাইয়ে বিভেদ সৃষ্টি করা যাবে না। তাই ইনি আমাদের সকলেরই স্ত্রী হবেন।’

বলেন কী! এমন একটা সিদ্ধান্ত এতো সহজে আপনি এবং অপনার বাবাও মেনে নিলেন?

আমি তখন মানা না মানার উর্ধ্বে। অর্জুন আমার বিশেষ প্রেমাষ্পদ হলেও পাঁচ ভাইকেই আমার ভালো লেগেছিল। বুঝতেই পারছ আমার তখন বয়স কম। সমাজের অতো মার প্যাঁচ তখন বুঝি না। এক সঙ্গে পাঁচ স্বামী এ তো কারো হয় না, আমার হলো। কেউ না জানলেও মনে মনে আমি একটু আনন্দিতই হয়েছিলাম। তবে পিতৃদেব বাধা দিয়েছিলেন।

তারপর, তারপরও বিয়েটা হলো কিভাবে?

পিতা একথা শুনে রাজদরবারে পাণ্ডবদের অহ্বান জানালেন। তাঁর ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তি দেখে পাণ্ডবরা বিস্মিত হলেন। স্বর্ণ ও রৌপ্য পাত্রে পানাহার শেষে যুধিষ্ঠির নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন— মহারাজ, নিশ্চিত হন আমরা ক্ষত্রিয়। বিশেষ কারণে ছদ্মবেশ ধরে আছি। পদ্মিনী যেমন এক হ্রদ থেকে অন্য হ্রদে যায় অপনার কন্যাও তেমন এক রাজ গৃহ থেকে অন্য রাজ গৃহে গেছেন।

তখন পিতা দ্রুপদ বললেন যে, আজ শুভ দিন তাহলে আজই অর্জুন আমার কন্যার পাণি গ্রহণ করুন।

যুধিষ্ঠির তখন ঈষত লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, মহারাজ আমারও যে বিবাহ করতে হবে।

পিতা তখন বললেন, ‘তাহলে আমার কন্যাকে তুমিই নাও, অথবা অন্য কাকে উপযুক্ত মনে কর আমাকে বল, ব্যবস্থা করি।’

তখন যুধিষ্ঠির বললেন, ‘দ্রৌপদী আমাদের সকলের মহিষী হবেন এই কথা আমাদের মাতা বলেছেন।’

তার মানে? উঠে দঁড়ালেন পিতা।

যুধিষ্ঠির তেমনি ধীর স্থীর ও শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আজ্ঞে আমাদের মধ্যে এই নিয়ম আছে রত্ন পেলে এক সঙ্গে ভোগ করব। এই নিয়ম ভঙ্গ করতে পারি না।’

বাবা রেগে গিয়ে বললেন, ‘কুরুনন্দন, এক পুরুষের বহু স্ত্রী হতে পারে, কিন্তু এক স্ত্রীর বহু পতি শোনা যায় না। তুমি ধর্মজ্ঞ ও পবিত্র স্বভাব জানতাম কিন্তু এমন বেদ বিরুদ্ধ, লোক বিরুদ্ধ কার্যে তোমার মতি হলো কেন?’

যুধিষ্ঠির এমন মোক্ষম ঘায়ে একটু বিব্রত হলেও চেহারায় তা ফুটে উঠতে দিলেন না। তিনি তাঁর বুদ্ধিজীবি সুলভ সুশীলিয় চাতুর্যে বললেন, ‘ধর্ম অতি শুক্ষ্ম, তার গতি আমরা কতটা বুঝি! বরং প্রাচীনদের পথই আমরা অনুসরণ করি।’ এরপর তিনি কন্ঠে গাম্ভীর্য ভরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি অসত্য বলি না। আমার মনও অধর্মে বিমুখ। তবে আমার মা যা বলেছেন সেটাই শীরধার্য।’

তারপর? বিয়ে হয়ে গেল!

এতো সহজে কি হয়! এই নিয়ে পিতা দ্রুপদ, শাশুড়ি কুন্তী, আমার ভাই ধৃষ্ঠদ্যুম্ন ও যুধিষ্ঠির এদের সবার মধ্যে ব্যপক তর্ক বেধে গেল। এবং এক পর্যায়ে ব্যাসদেব সেখানে উপস্থিত হলেন। তাকে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে পিতা বললেন, ‘আমার মতে এক স্ত্রীর বহু স্বামী হওয়া লোক বিরুদ্ধ, বেদ বিরুদ্ধ।’

ধৃষ্ঠদ্যুম্ন বললেন, ‘সদাচারী বড় ভাই কী করে ছোট ভাইর স্ত্রীর ওপর উপগত হবেন!’

যুধিষ্ঠির এর জবাবে আবার রেফারেন্স টানলেন। বললেন, ‘পুরাণে শুনেছি গৌতম বংশীয়া জটিলা সাতজন ঋষির পত্নী ছিলেন। আবার মুণিকন্যা বাক্ষর্ীর দশ পতি ছিল। তাদের সকলেরই নাম প্রচেতা। আর সব কথার শেষ কথা মা সকল গুরুর শ্রেষ্ঠ গুরু, তিনি যখন বলেছেন, ‘তোমরা সকলে মিলে ভোগ কর; তখন তখন তাঁর আজ্ঞা পালন করাই ধর্ম।’

কুন্তি তখন ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘যুধিষ্ঠিরের কথা সত্য। আমি মিথ্যাকে অত্যন্ত ভয় করি, কি করে মিথ্যা থেকে মুক্তি পাব ব্যাসদেব?

ব্যাসদেব তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ ভেব না, তুমি মুক্তি পাবে। দ্রুপদ এবং যুধিষ্ঠির যা বলেছেন তাই সনাতন ধর্ম তবে এটা সবার জন্য প্রযোজ্য না।’

এরপর তিনি একটা বিধান দিলেন, ‘ শোনা যায় প্রাচীন পঞ্চইন্দ্র একালে পঞ্চপাণ্ডব রুপে জন্মেছেন তাই তারা একই অর্থাৎ ‘একজন’ ধরতে হবে।’

পাঁচ ভাইকে একজন মনে করার এমন একটা বিধান ব্যাসদেব দেয়ার ফলে বিয়ে হয়ে গেল। শুধুমাত্র মাতৃ আজ্ঞার কারণে গোটা ধর্মের বিধান যেখানে আমার স্বামীরা আগ্রাহ্য করল সেখানে কলিকালে মা—এর এ কোন অবমাননা দেখলাম! দুঃখে বিমূঢ় হলেন দ্রৌপদী।

দ্রৌপদীর এহেন অবস্থা দেখে বৃদ্ধাশ্রমের সমবেত বৃদ্ধারা হেসে ফেললেন।

ধাতস্থ হয়ে দ্রৌপদী বললেন, হাসছেন কেন আপনারা?

উত্তরে এক সময়ের ডাকসাইটে নারী নেত্রী বললেন, হাসছি আপনার নির্বুদ্ধিতা দেখে।

মানে?

আপনি এখনো বুঝতে পারছেন না! দ্রৌপদী এবার অসহায়ের মতো এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন।

কিছু মনে করবেন না মিজ, এটা কখনোই মাতৃ আজ্ঞা না। আপনি ভুল করছেন। আপনাদের কামদেব ওরফে মদন দেব এ সম্পর্কে কি ব্যাখ্যা দেবেন জানি না, তবে আমাদের ফ্রয়েড সাহেবের কাছে গেলে এই মাতৃআজ্ঞার কি ব্যাখ্যা হতো সেটা ভেবে হাসছি।

আপনাদের ফ্রয়েড সাহেব কি ব্যাখ্যা দিতেন?

তিনি একে বলতেন কামআজ্ঞা।

মানে?

আপনি বুঝতে পারছেন না, এর পেছনে মাতৃভক্তি কতটা আর একজন সুন্দরী নারীকে দখল করার— তার সৌন্দর্যকে ভোগ করার বাসনা কতটা কাজ করেছে? আপনার মতো সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ও আবেদনময়ী নারীকে পাবার এক দুর্বার বাসনা পঞ্চপাণ্ডবের সবার মধ্যে ছড়িয়ে যায়নি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন? আর তাছাড়া আপনার বেলায় ব্যতিত অন্য কোন ক্ষেত্রে তাদের এমন মাতৃ—আজ্ঞা পালনের নজির কোথায়? মায়ের সব আজ্ঞাই যদি তার কাছে শীরধার্য হবে তাহলে, কৌরবদের বিরুদ্ধে যখন পুত্র যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধে যেতে বলেছিলেন মা, তখন তাঁর সুশীল পুত্র তো ধর্ম, শাস্ত্র এসব বোঝাচ্ছিলেন মাকে। তাই মা কুন্তি না পেরে পুত্রদের যুদ্ধে যেতে রাজি করানোর জন্য কৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। আর পুত্রকে বুঝিয়ে বলতে তিনি কৃষ্ণের কাছে বিদুলা নামক পূর্বসুরীর উক্তিকে উদাহরণ হিসেবে টানেন। যার সার কথা হলো, ‘লোকে যার মহৎ চরিত্রের আলোচনা করে না সে পুরুষ নয়, স্ত্রী ও নয়, সে কেবল মানুষের সংখ্যা বাড়ায়। যার দান—তপস্যা, শৌর্য, বিদ্যা বা অর্থের খ্যাতি নেই সে তার মায়ের বিষ্ঠা মাত্র।’

কই, এতো কথা বলার পরও তো তারা এতো সহজে মাতৃ—আজ্ঞা পালন করেন নাই!

তাছাড়া এতই যখন মাতৃভক্তি সেই মায়ের আদেশে যাঁকে বিয়ে করেছেন তারা সবাই — সেই স্ত্রীর প্রতি কতটা কর্তব্য তাঁরা তাঁরা পালন করেছেন? অন্য স্ত্রী গ্রহণ না হয় বাদই দিলাম। এসব বাদ দিলেও এমন স্ত্রীর প্রতি কোনো অপমান অবমাননা কি পরোক্ষে মায়ের প্রতি অবমাননা না?

আমার প্রতি অবমাননা! বিস্মিত দ্রৌপদী। নারীবাদীদের নাম শুনেছিলেন, এখন দেখি তাদের ক্ষপ্পরে পড়ে গেলেন শেষমেশ। এখন কী উপায়! এমন সাত— পাঁচ ভাবছেন এমন সময় ওপাশ থেকে আবার আক্রমন; কেন ভুলে গেলেন আপনার প্রতি অবমাননার কথা?
না মানে, মিন মিন করছিলেন দ্রৌপদী।

ঠিক আছে অপনাকে বলতে হবে না— আমরাই বলছি শোনেন। যেদিন যুধিষ্ঠির আপনাকে শকুনির প্ররোচনায় দ্যূত—সভায় পণ রেখে হেরে গিয়েছিলেন সেদিন এরা কি কেউ আপনার সম্ভ্রম রক্ষায় এগিয়ে এসেছিল? বরং এক বস্ত্রা রজঃস্বলা অবস্থায় আপনাকে রাজ সভায় এসে দাঁড়াতে এই যুধিষ্ঠিরই নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। এরপর দুঃশাসন আপনার চুল ধরে টেনে সভায় নিয়ে গিয়েছিল। আর সেখানে, সেখানেই তো আপনার পাণি গ্রহণে ব্যর্থ কর্ণ (নিচু জাতের অজুহাত দেখিয়ে সয়ম্বর সভায় শর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় বাধা দেয় অর্জুন) বলেছিলেন, ‘স্ত্রীদের এক পতিই বেদ বিহিত; দ্রৌপদীর অনেক পতি, অতএব এ বেশ্যা।’ শুধুমাত্র ভীম, ভীম আপনার এমন অপমান দেখে যুধিষ্ঠিরকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘ দ্যূতকাররা তাদের বেশ্যাকেও কখনো পণ রাখে না।’

আর তাছাড়া আপনিইতো কামাসক্ত কীচকের পদাঘাতে অপমানিত হয়ে ভীমের কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘যুধিষ্ঠির যার স্বামী সে তো শোক পাবেই। তোমার দ্যুতাসক্ত জ্যেষ্ঠ্য ভ্রাতার জন্যই আজ আমি অনন্ত দুঃখ ভোগ করছি। তিনি যদি সহস্র স্বর্ণমুদ্রা বা স্বর্ণ—রৌপ্য—বস্ত্র—যান—অশ্বাদি—পশু পণ রাখতেন তবে বহু বৎসর দিবারাত্র খেলেও নিঃস্ব হতেন না। তিনি খেলায় প্রমত্ত হয়ে ঐশ্বর্য হারিয়েছেন।’

তার মানে কি, এটা তো সহজেই বোঝা যায়, তিনি তাঁর স্বর্ণ—রৌপ্য ও জাগতিক ধন—সম্পদের তুলনায় আপনাকে কম মূল্যবান বা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। আপনাকে তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানের মা হিসেবে নয় শুধুমাত্র একটা স্বল্পমূল্য ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখেছেন। মাতৃআজ্ঞা! ওটা একটা আই ওয়াশ। ধরলাম মাতৃআজ্ঞা পালন করতে গিয়েই তারা আপনাকে বিয়ে করেছেন। তাই বলে এভাবে একটা পণ্যের মতো আপনাকে ব্যবহার করতে হবে! একজন নারী হিসেবে আপনাকে তো তারা কম নিগৃহীত করেননি। এটা কি কখনো ভেবেছেন? পঞ্চ স্বামীর স্ত্রী হওয়ার কারণে — শুধুমাত্র এ কারণেই ইতিহাস আপনাকে চির যৌবনা, মা হওয়ার পরও চীর প্রেমিকা, যৌনাবেদনময়ী নারী হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। এর কারণ কি আপনি কখনো ভেবেছেন দেবী?

এমন হঠাৎ প্রশ্নবানে দ্রৌপদী কিছুটা বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। কথা তো ঠিক। তাহলে তিনি কেন বুঝতে পারেন নি এতোদিন? তাঁর সুন্দরী হয়ে জন্মগ্রহণ করাটাই যে কাল হয়েছিল সেটা তিনি বুঝতে পারলেন এতোকাল পর পুনরায় এই পৃথিবীতে এসে! তিনি বুদ্ধিমতি ও বাকপটু হিসেবে খ্যাতিমান হলেও যতখানি বাস্তবজ্ঞান থাকলে কূট—তর্ক করা যায় সেটা তখন তার হয়ত ছিল না। আর থাকবে কি করে? তখন কি তিনি কোথাও এমন এক ঝাঁক ঘর তাড়ানো মা দেখেছেন! না কি শুনেছেন! এখানে এসে এদের দেখে তার বিশেষ জ্ঞান লাভ হলো। ফিরে গিয়ে এজন্য ব্যাসদেবকে ধন্যবাদ দিতে হবে। তিনি হয়ত তাকে এটা বোঝাতেই পৃথিবী থেকে আর একবার ঘুরিয়ে নিয়ে গেলেন। এই মায়েদের দেখে দ্রৌপদী বুঝতে পারলেন, পুরুষের কাছে মাতৃ আজ্ঞা—টাজ্ঞা সব তুচ্ছ। পুরুষের কাছে মায়ের গুরুত্ব ততদিন যতদিন না তাদের হাত পা গজায়। ওদের কাছে কাম—আজ্ঞাই মূখ্য। সে যদি সুন্দরী ও রাজনন্দিনী না হতো তাহলে তাদের সেই মাতৃ আজ্ঞার হয়ত ভিন্ন বিধান হতো। স্বয়ং ব্যাসদেবই দিতেন সেই বিধান, কারণ তিনিও তো একজন পুরুষ!

(তথ্য সূত্র: মহাভারত। অনুবাদ; রাজ শেখর বসু।)

আরও পড়ুন : ‘তোমারে চিনিনা আমি’ : নিঃসঙ্গ মানুষের নিজেকে খোঁড়াখুঁড়ি।

Facebook Comments
share on:
গাজী তানজিয়া

গাজী তানজিয়া

গাজী তানজিয়া, জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭। বাংলাদেশ। শিক্ষা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ। পেশা : উন্নত কৃষি গবেষণা। প্রকাশিত গ্রন্থ : জাতিস্মর [উপন্যাস; বাংলা প্রকাশ, ২০১০] পৃথিবীলোক [উপন্যাস; বাংলা প্রকাশ, ২০১১] বায়বীয় রঙ [উপন্যাস; অ্যাডর্ন, ২০১৩] কালের নায়ক [উপন্যাস; অ্যাডর্ন, ২০১৪] আন্ডারগ্রাউন্ড [উপন্যাস; মনদুয়ার, ২০১৭] সবুজঘাসে মুক্তবেশে [কিশোরগল্প সংকলন; বাংলায়ন, ১০১২] অরক্ষিত দেশে অবরুদ্ধ সময়ে [নিবন্ধ সংকলন; আদর্শ, ২০১২], কালের নায়ক [উপন্যাস; অ্যাডর্ন, ২০১৪], জগৎ বাড়ি [গল্প সংকলন, চৈতন্য, ২০১৯]।