ভবঘুরে সংস্কারক চার্লি চ্যাপলিন : বিশ্বসেরা নির্মাতা

share on:
চার্লি চ্যাপলিন

চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রার ফলে যদি একক কোন নাম উল্লেখ করতে হয়, অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনায় পৃথিবীব্যাপী সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, নিঃসন্দেহে সবাই সমস্বরে বলে উঠবে- চার্লি চ্যাপলিন।

লন্ডনের ইস্ট লেনের থিয়েটার হলটা সন্ধ্যার পরই ভরে ওঠে অসংখ্য মানুষের মুখর কোলাহলে। নিম্নবিত্ত এসব মানুষের প্রায় সকলেই শ্রমিক, ভবঘুরে অথবা মদ্যপ প্রকৃতির। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে বা হতাশ দুশ্চিন্তার জীবন থেকে একটু মুক্তি পাবার আশায় ছুটে আসে। এই থিয়েটার হলের গায়িকা বা নর্তকীর গান বা নাচ’ই তাদের বিনোদনের প্রধান বিষয়বস্তু।

কোন কারণে গায়িকা বা নর্তকী একটু ব্যর্থ হলেই থিয়েটার হল জুড়ে শুরু হয় গম্ গমে চেঁচামেচি আর বিকৃত স্বরে ডেকে ওঠা। সেদিন গায়িকা হিসেবে থিয়েটার হলে গান গাচ্ছিলেন হানা চ্যাপলিন। সুন্দর কণ্ঠের জন্য তিনি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। সন্ধ্যার এই অনুষ্ঠানে হানা সঙ্গে এনেছেন তাঁর পাঁচ বছরের ছেলে চার্লিকে। দর্শকদের মত চার্লিও মগ্ন হয়ে গানের মধ্যে ডুবে আছে।

ইদানিং মা গলার অসুখে ভুগছেন। অসুখটার নাম ল্যারেনজাইটিস। হঠাৎ মায়ের গলা চির খেয়ে গেল। গলা থেকে স্বর বের করার অনেক চেষ্টা তিনি করলেন কিন্তু পারলেন না। সারাদিন খেটে আসা ক্লান্ত সব মানুষগুলো বহু কষ্টের টাকায় কেনা টিকিটে বিনোদন না পেয়ে চিৎকার করে উঠলো। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে চার্লির কিছুটা সময় লেগেছিল। তারপর মায়ের সম্মান বাঁচাতে মা যে গানটি গাইছিলেন সেই ‘জ্যাক জোনস্’ গানটিই শুরু করল সে। শুধু গানই নয়, গানের সঙ্গে নাচও শুরু করল। দর্শকরা কখনো এত ছোট একজন ছেলের এত অদ্ভুত গান ও নাচ দেখেনি। মুগ্ধ দর্শকরা মূহুর্মুহু তালিতে অভিবাদন জানালো ছোট্ট চার্লিকে। আর সেই সাথে খুশি হয়ে পয়সা ছুঁড়তে লাগল মঞ্চের ওপর।

ওটাই ছিল চার্লির জীবনের প্রথম দর্শকদের সামনে উপস্থিতি যিনি প্রায় ষাট বছর পৃথিবীর চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন আবার কখনো অভিনয় দিয়ে কাঁদিয়েছেন। ১৮৯৫ সালে চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রার ফলে যদি একক কোন নাম উল্লেখ করতে হয় যিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনায় সারা পৃথিবীব্যাপী সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, নিঃসন্দেহে সবাই সমস্বরে বলে উঠবে চার্লি চ্যাপলিনের নাম।

প্রথম যে চলচ্চিত্রে চার্লি চ্যাপলিন অভিনয় করেছিরেন তার নাম ‘মেকিং এ লিভিং’। ছবির পরিচালক ছিলেন ফ্রান্সের অরি লোর্মা। এক রিলের এই ছবিটির প্রদর্শনের মেয়াদ ছিল মাত্র দশ মিনিট। এই ছবিতে চার্লি অভিনয় করেন খামখেয়ালি উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির যুবকের যে খবরের কাগজের এক ফটোগ্রাফারের স্ত্রীর সাথে প্রেম জমিয়ে ফটোগ্রাফের ক্যামেরাটি বাগিয়ে নিয়ে সটকে পড়ে। জনতার হাত থেকে পালাতে গিয়ে সে আশ্রয় নেয় এক মহিলার শয়নকক্ষে। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, খবরের কাগজের অফিসে এসে চার্লি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ফটোগ্রাফার সেখানে এসে ঢুকতেই তার হাতে তিনি তুলে দিলেন ভদ্রমহিলার শয়নকক্ষের সেই ধস্তাধস্তির একখানা ছবি। ১৯১৪ সালের ০২ ফেব্র“য়ারি ‘মেকিং এ লিভিং’ ছবিটি মুক্তি পায় ব্যবসায়িকভাবে ছবিটি তেমন সুবিধা করতে পারে নি। এ ছবিতে চার্লির অভিনয় দেখে অনেকেই মুগ্ধ হয়েছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার অভিনয়ের প্রশংসা করা হয়েছিল।

অভিনয় করার সাথে সাথে চার্লি চ্যাপলিন পরিচালনায় আসলেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি হচ্ছে ‘কট ইন এ ক্যাবার’। ১৯১৪ সালের এপ্রিলে ছবিটি মুক্তি পায়। ম্যাবেল নরম্যাল্ড এর সাথে যুগ্মভাবে তিনি ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন। সংবাদপত্রে ছবিটির খুবই প্রশংসা করা হয়। সমালোচকরা তাঁর নাম উল্লেখ করে তার পরিচালনা ও অভিনয়ের ভুয়সী প্রশংসা করেন। ‘ড্রামাটিক মিরব’ পত্রিকায় লেখা হয়; চার্লির কোনও তুলনা হয় না। তিনি অদ্বিতীয়।

পরের ছবির কাহিনী তিনি নিজেই লিখলেন। পরিচালনার ব্যাপারেও তিনি কারো সাহায্য নিলেন না। দশ মিনিটের ছবির নাম ছিল ‘কট ইন দি রেন’। কিস্টোন স্টুডিও’র কোন ছবিই কখনও আগে থাকতে ভেবেচিন্তে তোলা হয়নি, ‘কট ইন দি রেন’ এর ব্যতিক্রম। এ ছবি পরিচালনার পূর্বে চ্যাপলিন তার আনুপূর্বিক একটি পরিকল্পনা স্থির করে নিয়েছিলেন। এ ছবিটিও প্রচুর দর্শক প্রিয়তা লাভ করে।

১৯১৫ সালে দ্য ট্র্যাম্প বা ভবঘুরে ছবিটি করার পর চার্লির জনপ্রিয়তা প্রচুর বেড়ে যায়। ছবিটিকে তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ছবিটি দেখে দর্শকরা শুধু হাসলেনই না বরং ভবঘুরে চার্লির জন্য প্রাণ থেকে সহানুভূতি বোধ করলেন। শেষ দৃশ্যে চার্লির অভিনয় দর্শকদের হৃদয়কে মোচড় দিয়ে দেয়। চার্লির চাপা কষ্টে দর্শকদের মন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।

১৯১৭ সালে নির্মিত দ্য ইমেগ্রান্ট ছবিতে চার্লি স্বাধীনতার জন্য আমেরিকানদের গর্বকে বিদ্রƒপ করলেন। উদ্বাস্তুদের প্রতি কর্তৃপক্ষের আচরণকে তিনি পৃথিবীর মানুষদের সামনে তুলে ধরলেন। ছবিতে দেখা যায়, উদ্বাস্তুদের প্রত্যেকের গলায় একটি করে নম্বর লাগানো ট্যাগ বুলিয়ে দেয়া হয়েছে, তারপর গরু ছাগলের মত একটি নৌকায় গাদাগাদি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোনো এক আশ্রয় শিবিরের দিকে। আমেরিকার স্বাধীনতার গর্ব স্ট্যাচু অফ লিবার্টির পাশ দিয়ে যখন নৌকাটি যাচ্ছিল তখন উদ্বাস্তু চার্লির বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে সেই মুর্তির দিকে তাকিয়ে থাকা দর্শকদের উদ্বাস্তুদের মনের বেদনা উপলব্ধি করতে অনেকটা সাহায্য করে।

রাস্তা যাদের ঘরবাড়ি, ভিক্ষে করে বা ছোট খাটো চুরি করে যাদের জীবন চলে এমন সব মানুষের জীবন কাহিনী নিয়ে ১৯১৮ সালে চার্লি চ্যাপলিন তৈরি করলেন এ ডগ্স লাইফ ছবিটি। একটি কুকুর এবং একটি দরিদ্র মানুষের জীবনের মধ্যে যে পার্থক্য সেটাই ছবিতে উঠে এসেছে। কুকুরটার খাদ্য সংগ্রহ ও খাওয়ার পদ্ধতির সাথে যে দরিদ্র মানুষদের জীবনের কোন পার্থক্য নেই, সেটি উপস্থাপন করায় ছিল এই ছবির মূল উদ্দেশ্য।

১৯১৮ সালেই চার্লি আরেকটি বিখ্যাত ছবি তৈরী করলেন। সেটি হচ্ছে শোল্ডার আর্মস। এই ছবিতেই প্রথম যুদ্ধ নিয়ে মস্করা করা হয়। আনাড়ি সৈনিক চার্লি যুদ্ধ সম্পর্কে কিছুই জানে না। বাহিক্যভাবে ছবিটি হাসির মনে হতে পারে। কিন্তু এই হাসির মধ্য দিয়ে চার্লি চ্যাপলিন সভ্য জগতের মানুষদের সৃষ্ট যুদ্ধের ব্যঙ্গ করেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, চার্লি যেভাবে ছবিটিকে উপস্থাপিত করেছেন, তা অনন্য এবং তার আবেদন কালকে অতিক্রম করে যায়।

১৯২১ সালে নির্মিত হল দ্য কিড ছবিটি। চার্লি চ্যাপলিনের নাম উচ্চারিত হলে যে কয়েকটি ছবির নাম স্মরণ হয়, এটি তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকার বাস্তবচিত্রের এক প্রতিছবি বলা যেতে পারে ছবিটিকে। বিশেষ করে হাজার হাজার অনাথ শিশুদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল এবং দারিদ্র্যের কারণে কিভাবে মায়েরা তাদের শিশু সন্তানকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছিল তার একটি প্রামাণ্য দলিল বলা যেতে পারে এই ছবিটিকে। এই ছবিতে চার্লি চ্যাপলিন এবং শিশু জ্যাকি কুগানের অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল।

১৯২৪ সালে চার্লি চ্যাপলিন বানালেন তাঁর জীবনের আরেকটি বিখ্যাত ছবি দ্য গোল্ড রাশ। আট লক্ষ ডলার খরচ করে সোয়া দুই ঘন্টার এই নির্বাক ছবিটির শ্যুটিং হয়েছিল আলাস্কার বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে। ১৮৯৮ সালের স্বর্ণ-অভিযানের একটি সত্যিকারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চ্যাপলিন এ ছবিটির চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন। আলাস্কা, ইউকন ও চিলকুট পাশ এর বরফের মরুভূমিতে সোনা পাওয়া যাচ্ছে এমন একটা গুজব রটে যাওয়ায় দলে দলে অভিযাত্রীরা সোনার সন্ধানে সেখানে গিয়েছিলেন। একশ পঞ্চাশ জনের মধ্যে মাত্র আঠার জন বেঁচেছিলেন। তারা সঙ্গীদের মৃতদেহের মাংস, কুকুরের মাংস এমনকি জুতোও সিদ্ধ করে খেয়েছিলেন। এমন একটি বীভৎস ও করুণ কাহিনীকে চ্যাপলিন একটি হাসির সিনেমায় রূপান্তরিত করলেন। চার্লি চ্যাপলিন প্রায় বলতেন, ভয়ংকরকে ভয় পেয়ো না, ঐ সব মুহূর্তেও তোমাকে হাসতে হবে, নইলে পাগল হয়ে যাবে। তাঁর জীবন ও সিনেমায় এই কথাটায় তিনি বার বার প্রমাণ করতে চেয়েছেন। মানুষের লোভ, মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষের বাঁচার অপ্রতিরোধ্য তাগিদ গোল্ড রাশ ছবির মূল সুর। এই ছবিতে ক্ষুধার তাড়নায় চার্লি চ্যাপলিনের জুতো সিদ্ধ করে খাওয়ার দৃশ্যটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের একটি স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে রইল।

১৯২৮ সালে চার্লি চ্যাপলিন বানালেন দ্য সার্কাস ছবিটি। পৌনে দুই ঘন্টার এই ছবিতে চ্যাপলিন প্রমোদ শিল্পের অধিপতিদের চরিত্র স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। যেভাবেই হোক টাকা রোজগারই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। শিল্পী ও শিল্পের প্রতি তাদের মায়া মমতা নেই। এটিই চ্যাপলিনের সর্বশেষ নির্বাক ছবি। ঐ বছরই আমেরিকায় অস্কার পুরস্কার দেয়ার বিষয়টি চালু হয় এবং চ্যাপলিনকে দ্য সার্কাস ছবির লেখক, প্রযোজক, অভিনেতা এবং পরিচালক হিসেবে অস্কার পুরস্কারের সম্মানে ভুষিত করা হয়।

১৯৩১ সালের জানুয়ারি মাসে চার্লি চ্যাপলিনের সিটি লাইটস মুক্তি পেল। লস এঞ্জেলস্-এর থিয়েটার হলে সেদিন বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রীরা সেদিন ছবিটি দেখতে এসেছিলেন। আর তাদের দেখতে আসা সাধারণ মানুষ এত বেশি এসেছিল যে, তাদের ভীড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে চার্লির নিজস্ব অতিথি ছিলেন অধ্যাপক আলবার্ট আইনস্টাইন ও তার স্ত্রী। সবার প্রিয় বিজ্ঞানী আইজেনস্টাইন যখন থিয়েটার হলে ঢুকেন, তখন হলের প্রতিটি দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে বরেণ্য এই ব্যক্তিকে সম্মান জানিয়েছিলেন। তখন আমেরিকায় সবাক চলচ্চিত্রের প্রচলন হয়ে গেছে। চার্লি এই ছবিতে আবহ সঙ্গীত ছাড়া কোন সংলাপের সাহায্য নিলেন না। এক অন্ধ ফুলওয়ালাকে নিয়ে অপূর্ব এই কাহিনীটি গড়ে উঠেছে।

চার্লি চ্যাপলিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ছবি মডার্ণ টাইমস। যন্ত্রচালিত আধুনিক সমাজের ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে প্রভেদ তুলে ধরা হয়েছে। যে সব শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে চলে যন্ত্রের চাকা, সেইসব শ্রমিকরা মালিকপক্ষ থেকে কতবেশী বঞ্চিত ও নিগৃহীত তা এই ছবিতে দেখানো হয়েছে। ছবির প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় একদল ভেড়া ধাক্কাধাক্কি করতে করতে এগিয়ে চলেছে কসাইখানার ফটকের মধ্যে। এ দৃশ্য মিলিয়ে গিয়ে তার জায়গায় ফুটে ওঠে আরেকটি দৃশ্য। এ দৃশ্যে একদল শ্রমিক কারখানায় ঢুকছে কাজ করতে। চার্লিও এই দলে আছে। আধুনিক সময়ে ভেড়ার পাল আর কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে যে কোন পার্থক্য নেই এবং দুই দলই যে মৃত্যু গহ্বরে ঢুকছে সেটা স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই ছবিটি।

চার্লি চ্যাপলিন যেদিন জন্মেছিলেন ঠিক তার চার দিন পর ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল সেই লন্ডনের বার্মনসি থেকে প্রায় এক হাজার মাইল পূর্বে জার্মানী শহরে চার্লির মতই একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন আরেকজন শিশু। পরবর্তী জীবনে দুজনেই পৃথিবীর ইতিহাসে নিজেদের স্থান মোটা দাগে করে নেন। বেশভুষা এবং উচ্চতায় অপূর্ব সমিল থাকা এই মানুষ দুটির একজন পৃথিবীর মানুষকে হাসিয়েছেন কান্নাকে দু’পাশে সরিয়ে রেখে জীবনের আনন্দের মধ্যে নিজেদের রাঙাতে বলতেন। যাকে সবাই আদর ও সম্মানের সাথে ডাকতো চার্লি । অন্যদিকে অপর যে জন, দাম্ভিকতা ও প্রতিরোধের নেশায় এত বেশি মরিয়া হয়ে গেলেন যে, লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যুর কঠোর কঠিন হিম রাজ্যে পাঠাতে তার অন্তরাত্মা সামান্যতম কেঁপে উঠতো না।

বরং নিজ জাতির শুদ্ধতায় বিশ্বাসী এবং দাম্ভিক ব্যক্তিটিকে সামনে দেখলে তার বাঘা বাঘা জেনারেলরাও কেঁপে উঠতেন। লোকে খটমটে জার্মানীর উগ্র এই জাতীয়তাবাদী নেতার নাম দিয়েছিলেন ‘হের’। হের হিটলার। নিজের খামখেয়ালীর মূল্য দিতে গিয়ে লাখ লাখ সাধারণ ও নিরীহ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন। মর্ডাণ টাইমস্-এর তিন বছরের মধ্যে শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ এডলফ হিটলার। ফ্যাসিবাদী এই মানুষটাকে এবং তার কাজকর্মকে আঘাত করার জন্য চার্লি নতুন এক চিত্রনাট্য তৈরি করলেন। আর তার দীর্ঘ পরিচিত ভবঘুরে বেশভুষা ছেড়ে তিনি নতুনরূপে পর্দায় উপস্থিত হলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও সাধারণ মানুষের জীবন শান্তি ফিরে আসেনি। যুদ্ধের পর একদিকে যেমন শিল্পোৎপাদন কমে গিয়েছিল, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের বাজার সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় রপ্তানি কমে গিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও রপ্তানি বাণিজ্য হ্রাসের দরুণ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষদের সংসার চালানো দুঃসাহ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের ওপরতলার মানুষকে এসবের আঁচ একটুও লাগেনি বরং তাদের প্ররোচনায় সরকার সাধারণ মানুষের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়ে দিচ্ছিল। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে ১৯৪৭ সালে চ্যাপলিন তৈরি করলেন ‘মঁসিয়ে ভের্দু’। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চার্লি যে ইঙ্গিত করেছিলেন, তাতে বুর্জোয়া সমালোচক মহল তার পেছনে লেগে যায় এব তাকে কমিউনিষ্ট আঙ্খ্যায়িত করে। এমনকি অনেক জায়গায় ছবিটি প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। এমন কি আমেরিকায়ও বসবাসে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

চার্লি চ্যাপলিনের জীবনের শেষ স্মরণীয় চলচ্চিত্র লাইম লাইট এবং আমেরিকায় নির্মিত এটাই তাঁর শেষ ছবি। এর পরও তিনি যে দুটো ছবি তৈরি করেছিলেন সেগুলো হয়েছিল ইউরোপ ক্যালভেরা নামের প্রবীণ কমিডিয়ানের জীবনের করুণ চিত্র তিনি তুলে এনেছেন এ ছবিতে বলা যেতে পারে অসংখ্য শিল্পী জীবনের অমোঘ কড়াচা ওঠে এসেছে এখানে। বলা হয় লাইমলাইট ছবিটির শেষ দৃশ্যটি শতবর্ষের সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম একটি অসাধারণ দৃশ্য। বিখ্যাত ফরাসী নাট্যকার ও অভিনেতা মলিয়েরও ঠিক এভাবেই অভিনয় করতে করতেই মঞ্চের ওপরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।

চার্লি চ্যাপলিনের ইচ্ছে ছিল শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমেরিকাতেই থাকবেন। আমেরিকার সাধারন মানুষদের তিনি খুব ভালোবাসতেন। এরাই ছিল তাঁর ছবির পৃষ্টাপোষক। কিন্তু শেষে যখন তার স্থায়ীভাবে আমেরিকায় বসবাস করা সম্ভব হল না। ফলে ১৯৫৩ সাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি সুইজারল্যান্ডের ডেভে ৩৭ একর জমিসহ একটি বাড়ি কিনে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করলেন। স্বদেশ সম্পর্কে তাঁর কোন মোহ ছিল না। গ্রেট ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের জন্যে তিনি লজ্জিত ছিলেন। গান্ধীজীর সঙ্গে তিনি নিজের গরজেই দেখা করেছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর সহানুভূতির কথা তিনি গান্ধীজীকে জানিয়ে এসেছিলেন।

১৯৭৪ সালে লিখলেন মাই লাইফ ইন পিকচার্স গ্রন্থটি। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা তিনি লিখতেন। ১৯৭৭ সালের শুরু থেকেই চার্লি চ্যাপলিনের শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। ২৫ ডিসেম্বর সকালে চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : ইঙ্গমার বার্গম্যানের শিল্প ভাবনা।

ইতিহাসের সাক্ষী: চার্লি চ্যাপলিন

Facebook Comments Box
share on:
মনিস রফিক

মনিস রফিক

মনিস রফিকের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই রাজশাহী শহরে। ২০০৭ সাল থেকে চলচ্চিত্র ও আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা, পত্রিকা সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টোতে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কিছু বই হচ্ছে - ক্যামেরার পেছনের সারথি, চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা, তারেক মাসুদ : চলচ্চিত্রের আদম সুরত, সুবর্ণরেখা : প্রসঙ্গ ঋত্বিক ( সম্পাদনা), তিতাস একটি নদীর নাম ( সম্পাদনা)।